বর্ণপ্রথা নয় সনাতন ধর্মে রয়েছে বর্ণাশ্রম প্রথা

0
66

বর্ণপ্রথা নয় সনাতন ধর্মে রয়েছে বর্ণাশ্রম প্রথা

সনাতন হিন্দু সমাজে বহুল প্রচলিত ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয়, বৈশ্য, শূদ্র সুপরিচিত এক শ্রেণিবিভাগ।সনাতন হিন্দু ধর্মে জন্ম নিয়েছে এমন কোন ছেলে বা মেয়ে নেই যে এই শব্দগুলো শোনেননি। বর্তমান হিন্দু সমাজ ব্যবস্থা আমাদের এ ধারণার জন্ম দিয়েছে যে কোন একটি শ্রেণিতে সকল মানুষ বংশানুক্রমিক ভাবে সেই শ্রেণির ধারক ও বাহক হয়ে পড়ে। কিন্তু আসল সত্যিটা কিন্ত একেবারেই ভিন্ন। চলুন প্রিয় পাঠক আজ আমরা এ বিষয়ে একটু বিশদ জেনে আসি।

সত্যিকার অর্থে সনাতন হিন্দু সমাজে বর্ণ প্রথা বলে ধর্মগ্রন্থ সমূহে কোন শব্দই নেই। যেটা রয়েছে তা হলো ‘বর্ণাশ্রম’। শাব্দিক অর্থ বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় ‘বর্ণ’ শব্দটি এসেছে ‘Vrn’ থেকে; যার অর্থ ‘to choose’ বা পছন্দ করা অর্থাৎ পছন্দ অনুযায়ী আশ্রম বা পেশা নির্ধারণ করা। কর্মের উপর ভিত্তি করে সনাতন ধর্মে চারটি বর্ণের কথা বলা হয়েছে।বর্ণ চারটি হলো ব্রাহ্মণ,ক্ষত্রিয়,বৈশ্য,শুদ্র। কালের পরিবর্তনে এই বর্ণাশ্রম প্রথা হয়ে গেছে বর্ণ প্রথা!

এবার আসুন দেখি এই চার বর্ণের বৈশিষ্ট কি কি বা কি কি কর্মের উপর ভিত্তি করে চারটি বর্ণ এসেছে-

ব্রাহ্মণঃ “যে ঈশ্বরের প্রতি গভীরভাবে অনুরক্ত, অহিংস, সত্যনিষ্ঠ, নিষ্ঠাবান, সুশৃঙ্খল, বেদ প্রচারকারী, বেদ জ্ঞানী সে ব্রাহ্মণ।”(ঋগবেদ ৭.১০৩.৮)

ক্ষত্রিয়ঃ দৃঢ়ভাবে আচার পালনকারী, সত্যনিষ্ঠ;কর্মের দ্বারা শূদ্ধ, রাজনৈতিক জ্ঞান সম্পন্ন, অহিংস, ঈশ্বর সাধক, সত্যের ধারক ন্যায়পরায়ন, বিদ্বেষমুক্ত ধর্মযোদ্ধা, অসত্য এর বিনাশকারী সে ক্ষত্রিয়।(ঋগবেদ ১০.৬৬.৮)

বৈশ্য
দক্ষ ব্যবসায়ী দানশীল চাকুরীরত এবং চাকুরী প্রদানকারী।(অথর্ববেদ ৩.১৫.১)

শূদ্র
যে অদম্য, পরিশ্রমী, অক্লান্ত জরা যাকে সহজে গ্রাস করতে পারেনা, লোভমুক্ত কষ্টসহিষ্ণু সেই শূদ্র।(ঋগবেদ ১০.৯৪.১১)

এই হচ্ছে সনাতন ধর্মের চারটি বর্ণ।এই বর্ণ গুলো কিসের ভিত্তিতে নির্ধারণ হবে তা সনাতন ধর্মের প্রাণপুরুষ ভগবান শ্রীকৃষ্ণ শ্রীমদ্ভাগবদ গীতায় চতুর্থ অধ্যায় জ্ঞান যোগের ১৩ তম শ্লোকে বলে গেছেন-

চাতুর্বর্ণ্যং ময়া সৃষ্টং গুণকর্মবিভাগশঃ।
তস্য কর্তারমপি মাং বিদ্ধ্যকর্তারমব্যয়ম্।।১৩।।

অনুবাদঃ প্রকৃতির তিনটি গুণ ও কর্ম অনুসারে আমি মানব-সমাজে চারটি বর্ণবিভাগ সৃষ্টি করেছি। আমি এই প্রথার স্রষ্টা হলেও আমাকে অকর্তা এবং অব্যয় বলে জানবে।

এছাড়াও এই বর্ণাশ্রম প্রথা নিয়ে ঋগবেদে বলা হয়েছে

“একেকজনের কর্মক্ষমতা ও আধ্যাত্মিকতা একেক রকম আর সে অনুসারে কেউ ব্রাহ্মণ কেউ ক্ষত্রিয় কেউ বৈশ্য কেউ শূদ্র।” (ঋগবেদ ৯.১১২.১)

এ থেকে একটি বিষয় একবারেই পরিস্কার সনাতন হিন্দু ধর্মের বর্ণাশ্রম প্রথা কোন ক্রমেই বংশানুক্রমিক নয়,এটা সম্পূর্ণ গুণ,কর্ম অনুসারে নির্ধারিত হয় এবং এটা মানুষের বিচার্য বিষয় নয়,পরম করুণাময় যিনি সৃষ্টি করেছেন তিনিই জানবেন কে কোন বর্ণের।

বিষয়টি ভালো ভাবে বুঝার জন্য কিছু উদাহরণ নিচে দেয়া হলো-

ঋষি ঐলুশ জন্মেছিলেন দাসীর ঘরে যিনি ছিলেন জুয়াখোর এবং নিচু চরিত্রের লোক। কিন্তু এই ঋষি ঋগবেদের উপর গবেষণা করেন এবং কিছু বিষয় আবিষ্কার করেন। তিনি শুধুমাত্র ঋষিদের দ্বারা আমন্ত্রিতই হতেন না এমনকি আচার্য্য হিসেবেও অধিষ্ঠিত হন। (ঐতরেয়া ব্রহ্ম ২.১৯)

প্রীষধ ছিলেন রাজা দক্ষের পুত্র যিনি পরে শূদ্র হন। পরবর্তীতে তিনি তপস্যা দ্বারা মোক্ষলাভ করেন। (বিষ্ণু পুরাণ ৪.১.১৪)

ধৃষ্ট ছিলেন নবগের (বৈশ্য) পুত্র কিন্তু পরে ব্রাহ্মণ হন এবং তার পুত্র হন ক্ষত্রিয়। (বিষ্ণু পুরাণ ৪.২.২)

তেমনি ভাবে মাতঙ্গ ছিলেন চন্ডালের পুত্র কিন্তু পরে ব্রাহ্মণ হন।রাবণ জন্মেছিলেন ঋষি পুলৎস্যের ঘরে কিন্তু পরে রাক্ষস হন। ত্রিশঙ্কু ছিলেন একজন রাজা যিনি পরে চন্ডাল হন।বিশ্বামিত্রের পুত্রেরা শূদ্র হন। বিশ্বামিত্র নিজে ছিলেন ক্ষত্রিয় যিনি পরে ব্রাহ্মণ হন।( মহাভারত)।বিদুর ছিলেন এক চাকরের পুত্র কিন্তু পরে ব্রাহ্মণ হন এবং হস্তিনাপুর রাজ্যের মন্ত্রী হন।( মহাভারত)।
এরকম শত শত উদাহরণ রয়েছে যা লিখে শেষ করা যাবেনা।

শাস্ত্রে বলা আছে

জন্ম জায়তে শূদ্রঃ
সংস্কারঃ দ্বিজ উচ্চতে
বেদঃ পঠনাৎ ভবেত বিপ্র
ব্রহ্ম জ্ঞানেতী ইতি ব্রাহ্মণ।

অর্থাৎ, জন্ম মূহুর্তে সকলেই শূদ্র, সংস্কার দ্বারা দ্বিজ, জ্ঞান লাভে বিপ্র আর ব্রহ্মজ্ঞানে হয় ব্রাহ্মণ।
তো এই ক্ষেত্রে আপনার পিতা বা পিতামহ কি করে তার কোন মহত্ব নেই। পিতা ব্রাহ্মণ হলেও আপনি জন্মের পর শূদ্র। অনেকের বিরোধ লাগতে পারে তবে এটাই প্রকৃত সত্য।
নিজেই চিন্তা করে দেখুন, আপনার বাবা যুদ্ধ করতো বলে আপনাকে যুদ্ধে নেওয়া কতটা যুক্তিযুক্ত? যে বেদ জানেনা সে কেমনে পূজা করবে?যুক্তি একজন শাস্ত্রের একটি বড়ো অংশ, শাস্ত্র নিজেই বলে –

য়ুক্তিহীন বিচারেন ধর্মহানী জায়তে।
অর্থাৎ, যুক্তিহীন বিচার ধর্মহানী করে।
অর্থাৎ যুক্তিহীন বিচারে ধর্মের হানী হয়।তাই ধর্ম হতে হবে যুক্তি নির্ভর।

আসলে বর্ণাশ্রম হচ্ছে নির্ভেজাল যোগ্যতা অনুযায়ী ব্যবস্থা। যেমনভাবে এখনকার সময়ে ডিগ্রী প্রদান করা হয়। ডাক্তার এর ছেলে যেমন ডাক্তার হবেই এমন কোন কথা নেই।অর্থাৎ ডাক্তার এর ঘরে জন্ম নিলেই এম.বি.বি.এস এর সার্টিফিকেট যেমন পাওয়া যায়না ঠিক তেমনি ব্রাহ্মণ এর ঘরে জন্ম নিলেই ব্রাহ্মণ হওয়া যায় না।

পরিশেষে বলবো কিছু অশাস্ত্রীয় লোক থেকে সাবধান হোন।এরা ধর্মটাকে ব্রহ্মন্যবাদের ফাঁদে ফেলে সাধারণ হিন্দুদেরকে ধর্মগ্রন্থ পাঠ থেকে দূরে রেখে, সনাতন শাস্ত্রের অপব্যখ্যা ছড়িয়ে দিয়ে নিজেদের সু্বিধা আদায় করছে যুগ যুগ ধরে।আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিত সমাজে এদের আর কোন প্রশ্রয় নেই।মনে রাখতে হবে সত্যই ধর্ম,মিথ্যাই পাপ।তাই আসুন প্রকৃত সত্য চর্চায় আমরা আগুয়ান হই,সেই সাথে মিথ্যা,কুসংস্কার সমৃদ্ধ বর্ণপ্রথাকে সনাতন হিন্দু সমাজ থেকে অনতিবিলম্বে বিতাড়িত করি সেই সাথে সনাতন ধর্মকে একটি শ্রেণী বৈষম্যহীন,বর্ণ বৈষম্যহীন,জাতি বিভেদহীন আধুনিক যুগোপযুগী ধর্ম হিসেবে গড়ে তুলি।

লেখক

জীবন কৃষ্ণ সরকার
কবি ও প্রাবন্ধিক

তথ্যসূত্রঃ শ্রীমদ্ভগবদ গীতা,ঋগবেদ,বিষ্ণুপুরাণ,ঐতেরিয়া ব্রহ্ম,বিভিন্ন পত্রিকা,বিভিন্ন অনলাইন পোর্টাল,সববাংলা ডটকম।

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে