হাওরসাহিত্যঃ হাওরের এক নিজস্ব সত্ত্বা

0
109

হাওরসাহিত্যঃ হাওরের এক নিজস্ব সত্ত্বা( একটি মৌলিক গবেষণা প্রবন্ধ)

মৎস্য,পাথর, ধান,হাওরের প্রাণ এই কথাটি অনেক পূরনো। এবার আরেকটি নতুন বিষয় এড করতে যাচ্ছি।সেটি হচ্ছে হাওরের “হাওরসাহিত্য”। শব্দটি একেবারেই নতুন।পাঠকদের বুঝতে প্রথমে একটু কষ্ট হতে পারে।বিষয়টি পরিস্কার করতেই আজ বসছি প্রিয় পাঠক।ধৈর্য ধরে পড়তে থাকুন, আশা করি ধীরে ধীরে বিষয়টি বুঝে চলে আসবে।তাহলে আর দেড়ি না করে চলুন নিচে চোখ বুলিয়ে আসি।

বাংলা সাহিত্য ও তার কয়েকটি শাখা প্রশাখা

বন্ধুরা, হাওরসাহিত্য কি সেটা বুঝতে হলে আমাদের একটু পেছনে ফিরে তাকাতে হবে।প্রথমেই বাংলা সাহিত্য ও বাংলা সাহিত্যের কয়েকটি শাখা, উপশাখা সমন্ধে কিছুটা ধারণা নিতে হবে।তাহলে বিষয়টা অনুধাবন করতে হবে।প্রথমেই আলোচনা করবো বাংলা সাহিত্য।

বাংলাসাহিত্য

বাংলা ভাষায় রচিত সাহিত্যকর্ম বাংলা সাহিত্য নামে পরিচিত। আনুমানিক খ্রিষ্টীয় সপ্তম শতাব্দীর মাঝামাঝি বাংলা ভাষায় সাহিত্য রচনার সূত্রপাত হয়। খ্রিষ্টীয় দশম থেকে দ্বাদশ শতাব্দীর মধ্যবর্তী সময়ে রচিত বৌদ্ধ দোহা-সংকলন চর্যাপদ বাংলা সাহিত্যের প্রাচীনতম নিদর্শন। আবিষ্কারক হরপ্রসাদ শাস্ত্রী আরও তিনটি গ্রন্থের সঙ্গে চর্যাগানগুলি নিয়ে সম্পাদিত গ্রন্থের নাম দেন ” হাজার বছরের পুরাণ বাঙ্গালা ভাষায় রচিত বৌদ্ধ গান ও দোহা “। মধ্যযুগীয় বাংলা সাহিত্য ছিল কাব্যপ্রধান। হিন্দুধর্ম, ইসলাম ও বাংলার লৌকিক ধর্মবিশ্বাসগুলিকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছিল এই সময়কার বাংলা সাহিত্য।

এই হচ্ছে বাংলা সাহিত্যের শুরুটা।আর এখন তো বাংলা সাহিত্যকে সমৃদ্ধ করেছে বিভিন্ন শাখা প্রশাখা সৃষ্টির মাধ্যমে,নতুন নতুন ধারা সৃষ্টির মাধ্যমে।প্রিয় পাঠক চলুন নিচে বাংলা সাহিত্যের কয়েকটি শাখা প্রশাখা দেখে আসি-

১।চর্যাপদ সাহিত্য ২।পদাবলী সাহিত্য ৩। বাংলা সাহিত্য ৪।আরাকান সাহিত্য ৫।পুথি সাহিত্য ৬।নাথ সাহিত্য ৭।ব্রজপুলি সাহিত্য ৮।মঙ্গল কাব্য সাহিত্য ৯।জীবনী সাহিত্য ১০।হাওরসাহিত্য ১১।গদ্য সাহিত্য ১২।পদ্য সাহিত্য ১৩।উপন্যাস সাহিত্য ১৪।প্রনয় কাব্য সাহিত্য ১৫।ফোকলর (মৈমনসিংহ গীতিকা) সাহিত্য ১৬।রবীন্দ্র সাহিত্য ১৭।নজরুল সাহিত্য প্রভৃতি।
এবার একটা একটা করে সংক্ষিপ্ত জানার চেষ্টা করি

চর্যাপদঃ চর্যাপদ বাংলা ভাষার প্রাচীনতম পদ সংকলন তথা সাহিত্য নিদর্শন। নব্য ভারতীয় আর্যভাষারও প্রাচীনতর রচনা এটি।খ্রিষ্টীয় অষ্টম থেকে দ্বাদশ শতাব্দীর মধ্যবর্তী সময়ে রচিত এই গীতিপদাবলির রচয়িতারা ছিলেন সহজিয়া বৌদ্ধ সিদ্ধাচার্যগণ। বৌদ্ধ ধর্মের গূঢ় অর্থ সাংকেতিক রূপের আশ্রয়ে ব্যাখ্যার উদ্দেশ্যেই তাঁরা পদগুলো রচনা করেছিলেন।অর্থাৎ বৌদ্ধ ধর্মগুরুদের ধারা সৃষ্ট সাহিত্যটাই মূলত চর্যাপদ সাহিত্য হিসেবে অভিহিত।

পদাবলী বা বৈষ্ণব পদাবলী সাহিত্যঃ বৈষ্ণব মতকে কেন্দ্র করে রচিত বৈষ্ণব সাহিত্য। পঞ্চাদশ শতকে শ্রী চৈতন্য দেবের ভাব বিপ্লবকে কেন্দ্র করে গোটা বাংলা সাহিত্যে বৈষ্ণব সাহিত্যের জন্ম হয়। বৈষ্ণব ধর্মের প্রর্বতক শ্রী চৈতন্য দেব কোন পুস্তক লিখে যাননি অথচ তাকে ঘিরেই জন্ম হয় এই সাহিত্যের। বৈষ্ণব পদাবলী সাহিত্যর সূচনা ঘটে চর্তুদশ শতকে বিদ্যাপতি ও চণ্ডীদাস-এর সময়ে তবে ষোড়শ শতকে এই সাহিত্যের বিকাশ হয়।

আরাকান সাহিত্যঃ মায়ানমারের আরাকান রাজ্যে বাংলা বিষয়ক যে সাহিত্য রচিত হয়েছিল সেই সাহিত্যই ইতিহাসে আরাকান সাহিত্য হিসেবে পরিচিত।আরাকানে বাংলা সাহিত্য চর্চাকারীদের মধ্যে দৌলত কাজী অন্যতম।

পুঁথি সাহিত্যঃ পুঁথি সাহিত্য আরবি, উর্দু, ফারসি ও হিন্দি ভাষার মিশ্রণে রচিত এক বিশেষ শ্রেণীর বাংলা সাহিত্য। আঠারো থেকে উনিশ শতক পর্যন্ত এর ব্যাপ্তিকাল। এ সাহিত্যের রচয়িতা এবং পাঠক উভয়ই ছিল মুসলমান সম্প্রদায়।

নাথ সাহিত্যঃ নাথপন্থী সাধকেরা একটা বিশেষ ধর্মকর্মের সঙ্গে যুক্ত। যোগসাধনাই সেই ধর্মের মূল প্রেরণা। এজন্য নাথপন্থী সাধকদের যোগী বলা হয়।এই বিশেষ ধর্ম কর্মের উপর ভিত্তি করে যে সাহিত্য রচিত হয়েছে তাকে নাথ সাহিত্য হিসেবে অভিহিত করা হয়েছে।

ব্রজবুলি সাহিত্যঃ ব্রজবুলি মধ্যযুগীয় বাংলা সাহিত্যের দ্বিতীয় কাব্যভাষা বা উপভাষা। ব্রজবুলি মূলত এক ধরনের কৃত্রিম মিশ্রভাষা। মৈথিলি ও বাংলার মিশ্রিত রূপ হলো ব্রজবুলি ভাষা। মিথিলার কবি বিদ্যাপতি (আনু. ১৩৭৪-১৪৬০) এর উদ্ভাবক।এই ভাষায় রচিত সাহিত্যকে ব্রজবুলি সাহিত্য হিসেবে অভিহিত করা হয়।

মঙ্গলকাব্য সাহিত্যঃ বাংলা সাহিত্যের মধ্যযুগে বিশেষ এক শ্রেণীর ধর্মবিষয়ক আখ্যান কাব্য মঙ্গলকাব্য নামে পরিচিত। বলা হয়ে থাকে, যে কাব্যে দেবতার আরাধনা, মাহাত্ম্য-কীর্তন করা হয়, যে কাব্য শ্রবণেও মঙ্গল হয় এবং বিপরীতে হয় অমঙ্গল; যে কাব্য মঙ্গলাধার, এমন কি, যে কাব্য ঘরে রাখলেও মঙ্গল হয় তাকে বলা হয় মঙ্গলকাব্য।

চৈতন্য সাহিত্যঃ চৈতন্য সাহিত্য আধ্যাত্মিক শক্তিসম্পন্ন ধর্মীয় পুরুষ কৃষ্ণ চৈতন্য ওরফে বিশ্বম্ভর মিশ্রকে (১৪৮৬-১৫৩৩) নিবেদিত বাংলা ও সংস্কৃত সাহিত্য বাংলাভাষী অঞ্চলে বৈষ্ণব ধর্মীয় সাহিত্যের বৃহত্তম উপধারা গঠন করেছে।অর্থাৎ চৈতন্য দেবকে নিবেদিত সাহিত্যই চৈতন্য সাহিত্য হিসেবে পরিচত।

লোকসাহিত্য( Folklore)ঃ লোকসাহিত্য মৌখিক ধারা হতে সংগৃহিত সাহিত্য যা অতীত ঐতিহ্য ও বর্তমান অভিজ্ঞতাকে আশ্রয় করে রচিত হয়। একটি নির্দিষ্ট ভৌগোলিক পরিমন্ডলে একটি সংহত সমাজমানস থেকে এর উদ্ভব।

মৌখিক সাহিত্যঃ লোক সাহিত্যের মৌখিক রুপটাই মূলত মৌখিক সাহিত্য। ফলে এধরনের সাহিত্য স্মৃতিসহায়ক কৌশল, ভাষার গঠনকাঠামো এবং শৈলীর উপরও নির্ভর করে।

প্রনয় কাব্য সাহিত্যঃ ছন্দের মাধ্যমে এক প্রকার প্রেম বিনিময় সম্বলিত কাব্য সমূহকে প্রনয় কাব্য সাহিত্য বলা হয়।মধ্য যুগের শাহ মুহাম্মদ সগীর রচিত “ইউসুফ জুলেখা” কাব্যগ্রন্থটি বহুল আলোচিত প্রনয় কাব্য সাহিত্য হিসেবে পরিচিত।

জীবনী সাহিত্যঃ জীবনী ( Biography গ্রিক ভাষায় bíos-এর অর্থ ‘ জীবন’ এবং gráphein (γράφειν), অর্থ ‘লেখন’ থেকে Biography, বাংলা অভিধান মতে জীবনচরিত, জীবনবৃত্তান্ত। [সং. জীবন + ঈ]। ) সাহিত্যে বা চলচ্চিত্রের একটি শাখা। জীবনী কোনো উল্লেখযোগ্য ব্যক্তির জীবনের গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাগুলিকে তুলনামূলকভাবে পূর্ণ তথ্য সহকারে উপস্থাপন করে । জীবনী একধরনের সাহিত্য যা কোন মানুষের জীবনের উপর লেখা হয়।

অনুবাদসাহিত্যঃ মধ্যযুগের বাংলা সাহিত্যের বিস্তৃত অঙ্গন জুড়ে অনুবাদ সাহিত্যের চর্চা হয়েছিল এবং পরিণামেএ সাহিত্যের শ্রীবৃদ্ধিসাধনে অনুবাদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা অপরিসীম।”সমৃদ্ধতর নানা ভাষা থেকে বিচিত্র নতুন ভাব ও তথ্য সঞ্চয় করে নিজ নিজ ভাষার বহন ও সহন ক্ষমতা বাড়িয়ে তোলাই অনুবাদ সাহিত্যের প্রাথমিক প্রবণতা।”

কল্পবিজ্ঞান সাহিত্যঃ বাংলা বিজ্ঞান কল্পকাহিনী হল বাংলা সাহিত্যের একটি বিশেষ সাহিত্য ধারা যেখানে বাংলা ভাষায় কল্পবিজ্ঞানের কাহিনীগুলি স্থান পেয়েছে। স্যার জগদীশ চন্দ্র বসুকে বাংলা বিজ্ঞান কল্পকাহিনীর জনক বলা হয়।

কথা সাহিত্যঃ কথাসাহিত্য বলতে সেসব গল্প-কাহিনীকে বোঝানো হয় যেগুলোর আছে সাহিত্যিক মূল্য, যেমন সামাজিক ভাষ্য, রাজনৈতিক সমালোচনা বা মানুষের অবস্থা ইত্যাদি। কথাসাহিত্য লেখায় সংলাপ ব্যবহার করা হয় এবং উপরোক্ত লক্ষ্যানুসারে তা প্লটের চেয়ে থিমের ওপর বেশি জোর দেয়। স্কুল বা বিশ্ববিদ্যালয়ে কথাসাহিত্যের পাঠদান করা সাধারণ ব্যাপার।

বৈদিক সাহিত্যঃ আর্য যুগকে বৈদিক যুগ বলা হয়। আর্যরা বহুকাল এই দেশে বাস করে একটি উন্নত ধরনের সভ্যতা গড়ে তোলে এবং তা বৈদিক সভ্যতা নামে সুপরিচিত। বেদ হলো আর্যদের প্রধান ধর্মগ্রন্থ এবং এটা বিশ্ব সাহিত্যে একটি বিশিষ্ট স্থান অধিকার করে রয়েছে। বেদ শুধু ভারতের আর্যদের প্রাচীন গ্রন্থ বা সাহিত্য নয়, সারা বিশ্বের আর্য জাতিরও এটা প্রাচীনতম গ্রন্থ। বেদ শব্দের মৌলিক অর্থ জ্ঞান এবং এই জ্ঞান বা অভিজ্ঞতাই আর্য সমাজের জীবনধারার আদর্শ বা ভিত্তি।আর এই ধর্মবিশ্বাসের মানুষদের নিয়ে তৈরি হয়েছে বৈদিক সাহিত্য।

ইসলামী সাহিত্যঃ ইসলামী সাহিত্য’ হলো যেকোন ভাষায় ইসলামের দৃষ্টিকোণ থেকে লেখা সাহিত্য।
ইসলামী সাহিত্যের কালকে মূলত চারভাগে ভাগ করা যায়- ১) রাশিদী এবং উমাইয়াদ যুগ (৬২২-৭৫০ খ্রিস্টাব্দ / ১-১৩২ হিজরি)। ২) আব্বাসীয় যুগ (৭৫০-১২৫৮ খ্রিস্টাব্দ/ ১৩২-৬৫৬ হিজরি) ৩) তুর্কি যুগ (১২৫৮-১৭৯৮ খ্রিস্টাব্দ / ৬৫৬-১২১৩ হিজরি)। ৪) নবজাগরণের সময়কাল, বিশেষত আঠারো শতকের শেষ থেকে আজ অবধি।

কিশোর সাহিত্যঃ শিশু কিশোরদের মনোরঞ্জনের জন্য সাধারনত যে সাহিত্য রচনা করা হয় তাকেই কিশোর সাহিত্য বলা হয়।
আখ্যান সাহিত্যঃ সাধারনত গল্প নির্ভর সাহিত্যকেই আখ্যান সাহিত্য বলা হয়।

এছাড়াও রবীন্দ্রনাথঠাকুরের রচনাবলীকে একসাথে বলা হয় রবীন্দ্র সাহিত্য এবং নজরুল রচনাবলী নিয়ে তৈরি হয়েছে নজরুল সাহিত্য।

“হাওরসাহিত্য” এবং কিছু কথা

প্রিয় পাঠক,উপরোক্ত সাহিত্য শাখাগুলো পড়ার পর নিশ্চই অনুধাবনে আসছে প্রতিটি শাখাই তার নিজ নিজ বৈশিষ্ট্যে সমৃদ্ধ।আবার এই সবগুলো শাখাই কিন্তু বাংলা সাহিত্যকে সমৃদ্ধ,সাবলীল করেছে।ঠিক তেমনি হাওরসাহিত্য ও বাংলা সাহিত্যে নিজ বৈশিষ্টগুণেই নিজস্ব জায়গা করে নিয়েছে এবং বাংলা সাহিত্যকে সমৃদ্ধ করেছে।পার্থক্য শুধু এটাই উপরোক্ত শাখাগুলোকে বাংলা সাহিত্যের কর্তা ব্যক্তিরা স্বীকৃতি দিয়েছে,যার ফল শ্রুতিতে ঐ শাখাগুলো উইকিপিডিয়া,বাংলাপিডিয়া সহ বড়,ছোট সকল সাহিত্যিকদের মূখে মূখে অপরদিকে হাওরসাহিত্য তার নিজস্বতার ধারা বাংলা সাহিত্যকে সমৃদ্ধ করলেও এপর্যন্ত নীতি নির্ধারক কর্তাব্যক্তিগণ বা কোন গবেষকের নজরে আসতে পারেনি।তাই বাংলাপিডিয়া,উইকিপিডিয়া কেউই শাখাটিকে স্থান দেয়নি এর প্রমান আমি দুটি স্ক্রিনশট যুক্ত করে দিয়েছি আপনারা দেখে নেবেন।তাছাড়া আপনারাও গুগলে সার্চ দিয়ে দেখতে পারেন।এমনকি এই বিষয়ে ইতোপূর্বে কেউ কোন গবেষণা নিবন্ধ প্রকাশ করে নি।আপনারা এখুনি গুগলে সার্চ দিয়ে দেখে নেবেন। প্রিয় পাঠক তাহলে চলুন দেখে আসি হাওর সাহিত্য কিভাবে বাংলা সাহিত্যে নিজস্বতা তৈরি করেছে।

হাওর শব্দটি সায়র থেকে এসেছে।বুঝাই যাচ্ছে হাওর একটি বৃহৎ জলাশয় সম্বলিত এলাকা।এই এলাকার মানুষদের জীবন জীবিকা বাংলাদেশের অন্যান্য অঞ্চলের চাইতে সম্পূর্ণ ভিন্ন।এখানের মানুষ ইজারাদার,দখলদারদের সাথে যুদ্ধ করে চলতে হয় নিয়ত।মৎস্য আর ধান চাষ করেই চলে এখানকার মানুষ।এখানকার মানুষ শাসন আর শোষণের স্বীকার হয়েই দিনাতিপাত করে।কাজেই এখানের কান্নার সুর,বেদনার সুর দেশের অন্যান্য এলাকার চেয়ে সম্পূর্ণ ভিন্ন।তাই এখানকার সাহিত্য চর্চা বা সাহিত্যের কাচামাল সাহিত্যের অন্যান্য শাখা থেকেও সম্পূর্ণ ভিন্ন।হয়েছেও তাই।যেমন হাসন রাজা,শাহ আব্দুল করিম, রাধারমন,আরকুম শাহ,দুর্বীন শাহ যেসব লেখা বা গীত লিখে গেছেন তা দেশের অন্যান্য অঞ্চলের চাইতে ভিন্ন।আর এই সাহিত্য কণাগুলো বাংলা সাহিত্যকে করেছে ধন্য।যার প্রমাণ দেশের রেডিও, টেলিভিশন সবখানেই হাওরিয়ান গানের জয় জয়কার।

কিন্তু পরিতাপের বিষয় এই হাওরিয়ান তথা হাওরসাহিত্যকে, লোক সাহিত্যের সাথে এক করে হাওরের স্বাধীন সত্বাকে আজ বিলীন করতে বসেছি আমরা।হাওর একটি নিজস্ব সত্ত্বার উপর দাঁড়িয়ে আছে।হাওরের রয়েছে নিজস্ব ইতিহাস,ঐতিহ্য।তাই একে লোক সাহিত্যের সাথে গুলিয়ে ফেলার প্রশ্নই আসেনা।লোক সাহিত্য বলে বলে হাওরসাহিত্যকে আড়াল করা আর হাওরের নিজস্ব ইতিহাস,ঐতিহ্যকে গুলিয়ে ফেলারই নামান্তর।লোক সাহিত্য বলতে বুঝায় দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে লোকমূখে প্রচারিত বিভিন্ন বিষয় থেকে যেটা উৎপন্ন হয়েছে।সে অর্থে হাওরেও লোক সাহিত্য রয়েছে,অস্বীকার করার জো নেই।কিন্তু হাওর অঞ্চল একটি বিশেষ এলাকা নিয়ে গঠিত।হাওরের সাতটি জেলা এর অন্তর্গত।অতএব এখানকার মানুষজনের আচরণ,ভাষা,কর্ম,গীত,সাহিত্যে একটা নিজস্বতা থাকবেনা? অবশ্যই থাকবে।যেমন একটা উদাহরণ দিলে বিষয়টা স্পষ্ট বুঝা যাবে।ছোট বেলা থেকে দেখে আসছি হাওরের জাঙাল (এক প্রকার বেড়ি বাঁধ) যাতে চৈত্র বা বৈশাখ মাসে নদীর পানির চাপে ভেঙ্গে গিয়ে হাওরের ধান নষ্ট করতে যাতে না পারে সেজন্য বিভিন্ন এলাকার মানুষ বিভিন্ন দেবদেবী বা পীর আউলিয়ার দোহাই দিয়ে বিভিন্ন মানত করে এবং মানত আদায় করে যা বিভিন্ন লোক গবেষকরা বিভিন্ন পুস্তকে লিপিবদ্ধ করতে পারেন বা করছেন।তাহলে এই কাজগুলো কি হাওরাঞ্চল ব্যাতীত দেশের আর কোথাও হয়? এগুলো নিয়ে যে সাহিত্য রচনা হবে সেটিই মূলত হাওরসাহিত্য।হাওরের একটি জনপ্রিয় একটি গান “কোন গাঙে আইলো জোয়ার মন হইল উতালা গো,কোন গাঙে” গানটি একটু বিশ্লেষণ করে দেখুন,হাওর পারের সাধারণ মানুষ বেশিরভাগই গাঙের পারে গোসল/স্নান করে অভ্যস্থ।যদিও বর্তমানে অবস্থার কিছুটা উন্নতি হয়েছে, গ্রামের পাড়ায় পাড়ায়, এমনকি বাড়ি বাড়িতেও অনেকাংশে টিউবওয়েল বসছে।কিন্তু গানটি অনেক আগে রচিত হওয়ায় আগের চিত্র চিত্রিত হয়েছে।অর্থাৎ শুকনো মরশুমে হাওরের সাধারণ মানুষের একমাত্র শরীর ভেজানোর সম্বল হাওরের নদীগুলো।আর চৈত্রমাসে নদীগুলো শুকিয়ে যায় অবস্থা। অনেক কষ্ট করে গ্রামের মানুষগুলো ঐসব নদী ডোবাতে স্নান/গোসল পাক পবিত্র হয়।আর চৈত্রের শেষের দিকে বা বৈশাখের প্রথমে নদীতে জোঁয়ার (স্থানীয় ভাষায় ‘ঢল’) আসে তখন হাওরবাসীর মনে আনন্দেরও হিড়িক পরে যায় যেটা আমার শৈশব বেলায় আমি অনুভব করেছি।জোয়ার এলে মা বাবাকে ফাঁকি দিয়ে দিনে কতবার দিনে স্নান করেছি আজকের এইবেলায় এসে শিহরিত হই।শুধু বালক,বালিকারাই নয় আবাল বৃদ্ধ বনিতা সবাই নদীর জোঁয়ারে গাঁ ভাসায় সানন্দে।এই বিষয়টি কবি তাঁর ভাষায় লিখেছেন “কোন গাঙে আইলো জোঁয়ার মন হইলো উতালা গো”। তাহলে খেয়াল করুন,বাংলাদেশের আর কোন অঞ্চলের মানুষ এইভাবে নদীতে জোঁয়ার আসলে আনন্দে মন উতালা হয় বলতে পারবেন? পারবেন না কারণ তাদের চিত্র আর হাওরের চিত্র এক না।অন্যান্য এলাকার মানুষ আরো আগেই অবস্থানগত কারণেই হোক আর রাজনৈতিক কারণেই হোক তারা নিজেদের ডেভলাপ করতে পেরেছে।আর চির অবহেলার হাওর এখনো প্রায় আগের মতোই।তখন আপনারাই বলুন এই সাহিত্যটা কি অন্যান্য অঞ্চলের সাথে যায়? এটাকে তো লোক সাহিত্যও বলা যাবেনা।এটা লোক মূখে শোনা কথা নয়,এটা কবির সচক্ষে দেখে লেখা।হে এটিই হচ্ছে “হাওরসাহিত্য”।আজকে আমরা যখন হাওরকে নিয়ে লিখছি সেটা লোকমূখ থেকে শোনে নয় বরং নিজ চক্ষে অনুধাবান করেই লিখছি।কাজেই লোক সাহিত্য বলে সব কিছু চালিয়ে দেয়া সম্ভব নয়।

পরিশেষে আমরা বলতে পারি হাওরসাহিত্য হচ্ছে সেই সাহিত্য যেখানে হাওর ও হাওরের মানুষের সুখ,দুখ,আনন্দ,বেদনা অকপটে বর্ণিত রয়েছে।যেখানে হাওর ও হাওরের মানুষের সমস্যা সম্ভাবনার কথা বর্ণিত রয়েছে।উদারণস্বরুপ আমার লেখা “হাওরবিলাপ” ও “হাওর মোদের জীবন মরণ” দুটি কাব্যে হাওরের বাস্তব চিত্র তুলে ধরার চেষ্টা করেছি।হাওরের মানুষের সুখ দুঃখটাকে সরাসরি তুলে ধরার চেষ্টা করেছি।এইভাবে অনেক নবীন লেখকরাও হাওর নিয়ে লিখতে শুরু করেছে।বের হচ্ছে হাওর ভিত্তিক ম্যাগাজিন,পত্রিকা হাওরপত্র,জলকন্যা ইত্যাদি।আশার কথা এই হাওরসাহিত্যের বিষয়টিকে আমি গভীর ভাবে অনুধাবন করে হাওরভিত্তিক এই সাহিত্যশাখাটিকে প্রচার, প্রসার ও সংরক্ষণের জন্য কেন্দ্রীয় হাওরসাহিত্য গণপাঠাগার (২০১৭) ও হাওর ভিত্তিক সাহিত্য ও সামাজিক সংগঠন হাওর সাহিত্য উন্নয়ন সংস্থা(২০১৮) নামে প্রতিষ্ঠাণ দুটি প্রতিষ্ঠা করি।দুটি প্রতিষ্ঠানই সুনামের সাথে চলমান।আর সচাইতে খুশি খবর হলো হাওরের নব আলোচিত সাহিত্য শাখা “হাওরসাহিত্য” নামেই পাঠাগারটিকে বাংলাদেশ সরকারের সংস্কৃতি মন্ত্রনালয় স্বীকৃতি প্রদান করেছে।এর মধ্য দিয়ে দেশে প্রথমবারের মতো সরকারি অনুমোদনক্রমে “হাওরসাহিত্য” শব্দটির যাত্রা শুরু হলো।আশা করা যায় সকল হাওরিয়ানের সহযোগিতা পেলে অতিশীঘ্রই বাংলা সাহিত্য জগতে জাতীয়ভাবে “হাওরসাহিত্য” শাখাটি স্বীকৃতি পাবে,সেই সাথে বাংলাপিডিয়া,উইকিপিডিয়া সহ সকলের মূখে মূখে স্থান করে নেবে হাওরসাহিত্য।সেই সাথে হাওরসাহিত্য হিসেবে বিভিন্ন মৌলিক গ্রন্থ রচনার মাধ্যমে সমৃদ্ধ হবে আমাদের বাংলা সাহিত্য।শুভকামনা সকলের জন্য।

জীবন কৃষ্ণ সরকার
কবি,প্রাবন্ধিক,গবেষক
প্রতিষ্ঠাতা ও সভাপতি,
কেন্দ্রীয় হাওরসাহিত্য গণপাঠাগার,বংশীকুন্ডা
হাওর সাহিত্য উন্নয়ন সংস্থা(হাসুস)বাংলাদেশ।

তথ্যসূত্রঃ উইকিপিডিয়া,বাংলাপিডিয়া,বিভিন্ন পত্রপত্রিকা।
বিঃদ্রঃ উপরোক্ত গবেষণা প্রবন্ধটি লেখক কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।লেখাটি সম্পূর্ণ বা আংশিক কপি দন্ডনীয় অপরাধ।যদি কেউ উপর্যুক্ত তথ্যসূত্র ব্যাতীত কপি করে তাহলে কপিকারীর বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেয়া হবে।

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে