রাশিয়ার মানবতা লঙ্ঘন বনাম আমেরিকার মানবতার গান – একটি যৌক্তিক পর্যালোচনা

0
111

লেখাটি এমন এক সময় লিখছি যখন রাশিয়া কর্তৃক ইউক্রেনের উপর চলছে অহেতুক হামলা,চলছে মানবতা লঙ্গন,চলছে রাশিয়ার প্রতি কেবল নিন্দা আর নিন্দা।ধেয়ে আসছে রাশিয়ার প্রতি মানবতার তল্পি বাহক আমেরিকার মানবতা লঙ্গনের অভিযোগ!সাথে চতুর্মূখী হিমালয় সম নিষেধাজ্ঞার পাহাড়। চলুন বন্ধুরা দেখে নেয়া যাক বাস্তবতা জানান দেয় আমাদেরকে।

আপাত দৃষ্টিতে রাশিয়া কর্তৃক ইউক্রেনের উপর হামলাটিকে একটি অন্যায়,অসম,মানবতাবিরোধী যুদ্ধ মনে হতে পারে।এটাই স্বাভবিক।এমন হওয়ার কারন দশবার কোস মিথ্যাও কানে বাজলে তা সত্যের মতো মনে হয়। কিন্তু বিষয়টিকে একটু পেছনের বিশ্ব ইতিহাসের সাথে মিলিয়ে দেখলে ঘটনাটির বাস্তব চিত্র আপনাদের চোখেই স্পষ্ট হয়ে যাবে।চলুন তাহলে দেখে নেয়া যাক ইতিহাস কি বলে।

ইসরাইল কর্তৃক ফিলিস্তিনি মুসলিমদের নির্যাতনের ইতিহাস অনেক পুরনো।এই নির্যাতনের ভয়াবহতা যে কতটুকু ভয়ঙ্কর তা আমার বলার দরকার পড়ে বলে মনে করিনা।কেবল সাম্প্রতিক একটি প্রতিবেদন আপনাদের সামনে তুলে ধরলাম।গত ২০২১ সালের ২০ মে ফিলিস্তিন জাতীয় কর্তৃপক্ষের প্রতিবেদন অনুযায়ী,গত ২০২১ সালের মে মাসে ইসরাইল কর্তৃক ১১ দিনের যুদ্ধে কমপক্ষে ১,৯০০ ফিলিস্তিনি নিরীহ বেসামরিক নাগরিক আহত হন।২০২১ সালের ১৯ মে অনুযায়ী, এই সংঘাতে কমপক্ষে ৭২,০০০ ফিলিস্তিনি বাস্তুচ্যুত হয়। ২৫৬ জন বেসামরিক নাগরিক এবং সেনা নিহত, ২,০০০ আহত (গাজা স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় অনুযায়ী) ১২৮ জন বেসামরিক নাগরিক নিহত (জাতিসংঘ অনুযায়ী) ৮০–২২৫ জন সেনা নিহত (সর্বনিম্ন সংখ্যা হামাস ও পিআইজে অনুযায়ী।(তথ্যসূত্রঃ উইকিপিডিয়া) এর পূর্বেও অনেক সঙ্ঘাতে হাজারের উপর নিহতের রেকর্ড রয়েছে।তখন এই সব হামলার সময় একবারো তো আমেরিকা বলে নি মানবতা লঙ্ঘন হচ্ছে? এতো গেলো কেবল ফিলিস্তিনি সংকটের কথা।

এবার ইরাকের কথায় আসি?২০০৩ সালে এক সাদ্দামকে ক্ষমতাচ্যুত করতে লক্ষ লক্ষ নিরীহ বেসামরিক মুসলিম হত্যা করা হয়েছে।উইকিপিডিয়ার তথ্যমতে এই যুদ্ধে কেবল মৃতের সংখ্যা আনুমানিক ১৫০,০০০ থেকে ১০ লক্ষের বেশি!তখন আপনাদের মানবতা গান কোথায় ছিল হে বিশ্ব মানবতার ইজারাদার ? আফগানিস্তানের কথা সবারই জানা।বিডিনিউজ ২৪ ডটকমের তথ্য মতে ২০০১ সালে শুরু হওয়া এ যুদ্ধে ২০০৭ সাল থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত ১১ হাজার আটশ’ ৬৪ জন বেসামরিক মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন বলে জাতিসংঘ জানায়।তাহলে বুঝুন বাস্তবতা কতো কঠোর? কতো নির্মম? এসময় আপনাদের মানবতার গান কোথায় ছিল?এইভাবে একের পর এক জঙ্গি নিধনের নামে মুসলিম রাষ্ট্রগুলোতে বেসামরিক নাগরিক হত্যা,গৃহ যুদ্ধ লাগিয়ে রেখে এখন মানবতার ফেরিওয়ালা হয়ে গেলেন?বাহ! চমৎকার তাইনা? আপনাদের এই মানবতার ট্যাবলেট গুটিকয়েক চাটুকার ছাড়া আর কেউ গিলবে বলে মনে হচ্ছেনা।যদি ভেবে থাকেন আপনারা যা বলে বেড়ান,সকলেই তা গিলে বেড়ায়,তাহলে আপনারা বোকার স্বর্গে বাস করেন।গুগল, ইন্টারেনেটের যুগে মানুষ এখন আর ইতিহাস ভুলে যায় না,বরং ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি দেখার অপেক্ষায় থাকে।যেটা শুরু হয়েছে ইতিমধ্যে।আজকের ইউক্রেনেও কিন্তু কিছুদিন পূর্বেই ইসরাইলের সাথে তাল মিলিয়েছে।অথচ আজ তার মিত্ররা কোথায়?

হঠাৎ করে কেন আমেরিকার মুখে এতো মানবতার গানঃ

সংগত কারণেই একটা প্রশ্ন মাথায় ঘুরপাক ঠেকেছে যে হঠাৎ করে কেন আমেরিকার মুখে এতো মানবতার গান! সোজা কথায় উত্তর আমেরিকান স্বার্থই মূল চাবিকাটি।আমেরিকা এমন এক দেশ যাদের নিজের স্বার্থ রক্ষায় একের পর এক দেশ ধ্বংস করা,লক্ষ লক্ষ নিরীহ প্রাণ হরণ করা একেবারেই মামুলি ব্যাপার। এগুলো এখন আর খবরে,টকশোতে নয় পাড়ার বিড়ি টেনে ধুমা ছাড়া নির্বোধেও জানে। ইউক্রেনকে ভুলিয়ে ভালিয়ে তার কব্জায় নেবার পথ করে ফেলেছিলেন প্রায়। রাশিয়ার ইউক্রেন আক্রমণের কারণে তা রণে ভঙ্গ হওয়ার উপক্রম সৃষ্টি হয়েছে তাদের।খুব গাঁ জ্বলছে তাদের তাই না? যুদ্ধের দুই দিন না যেতেই শত শত নিষেধাজ্ঞা দিয়ে রাশিয়াকে এক ঘরে করে ফেলার জন্য মাঠে নেমেছেন।কই বছরের পর বছর ইসরাইল কর্তৃক ফিলিস্তিনি আক্রমণে একটা নিষেধাজ্ঞা তো তারা দিলেন না? যুদ্ধের তিনদিন যেতে না যেতেই জাতিসংঘ অধিবেশ ডাকলেন,নিন্দা প্রস্তাব পাশ করাতে না পেরে বিগত ৩০ বছরেরও বেশি সময়ের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো জরুরী সাধারণ অধিবেশন বসালেন,নিন্দা প্রস্তাব পাশ করালেন,কই ফিলিস্তিনির বেলায় অধিবেশন ডাকবেন তো থাক দূরের কথা উল্টো ভেটো দিয়েছেন কত বার তা নোটিজেনদের সবার জানা। আমি বলবো আজকের ইউক্রেন সংকট আমেরিকারই সৃষ্টি।আপনি সাত সমুদ্র তেরো নদী পার হয়ে অন্যের প্রতিবেশী দেশে ঘাঁটি স্থাপণ করবেন,অস্ত্র তাক করে রাখবেন সেটা কি সামর্থবান কোন রাষ্ট্র মেনে নেবে? যাহারা বরাবরের মতো মার্কিনে মুল্লুকে চড়ে মার্কিনের এখনো জয়ো গান গাইছেন,সমর্থন দিচ্ছেন।তাদের কাছে আমার একটা প্রশ্ন আজ রাশিয়া যদি আমেরিকার প্রতিবেশী কোন রাষ্ট্রে একটি মিসাইল স্থাপন করে,সেনা ঘাঁটি করে তখন কি আমেরিকা মেনে নেবে?মোটেও না। তাহলে কেন ইউক্রেনকে ন্যাটোতে যোগদানে উসকানি দিলেন? এখন যে ইউক্রেন ধ্বংস হচ্ছে এর দায়ভার আমেরিকাকেই নিতে হবে। আপনি আপনার নিরাপত্তার জন্য লক্ষ লক্ষ কিলোমিটার দূর পর্যন্ত বলয় তৈরীর পরিকল্পনা করবেন আর আরেকজন তার প্রতিবেশীটাকে হাত ছাড়া করবে তা কি হয়?তাই ইউক্রেন নয় বিশ্বে মারামারি,হানাহানি যুদ্ধে আমেরিকার ভেল্কিবাজি বন্ধের আহ্বান জানাচ্ছি।আপনাদের ভেল্কিবাজি,মানবতাপূজি এখন সবার কাছে দিনের মতো পরিস্কার।নিজেদের সাম্রাজ্যের প্রসারের জন্য অন্যকে পুতুল সমান মূল্যও আপনারা দিতে জানেননা। আজকের ইক্রেনের এই করুন পরিনতির জন্য জেলেনস্কির অতি উচ্চাভিলাসি একঘেঁয়ে মনোভাবই দায়ী।অভিনেতা থেকে রাষ্ট্র প্রধান হলেও জেলেনস্কি মার্কিনিদের অভিনয়ট মোটেও ধরতে পারেননি।তাইতো ভুল করেছে জেলেনস্কি আর খেসারত দিচ্ছে ইউক্রেন ও তার জনগণ।ভাগ্যের নির্মম পরিহাস। প্রভু সহায় হোন।

বলতেই হয় যুদ্ধ কারো কাম্য নয়,যুদ্ধ কখনো সমাধান হতে পারেনা।শতকিছুর পরে আমরাও যুদ্ধ চাইনা। চাই সমজোতার মাধ্যমে অনতিবিলম্বে যুদ্ধ বন্ধ হোক। যুদ্ধ নয় শান্তি চাই আমরা।ইউক্রেনীয় জনগন এই বিভিষীকাময় দিনগুলো থেকে দ্রুত রেহাই পাক।কথায় আছে আমেরিকা যার বন্ধু তার আর শত্রু লাগেনা।তাই আমেরিকার চক্রান্ত থেকেও পৃথিবী মুক্তি পাক। শুভকামনা সকল ইউক্রেনীয়ানদের জন্য।শুভকামনা পৃথিবীর সকল মানুষদের জন্য।

লেখক

কবি ও প্রবান্ধিক
সভাপতি হাওর সাহিত্য উন্নয়ন সংস্থা(হাসুস) বাংলাদেশ।

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে