হিন্দু শাস্ত্র মতে গোত্র ভিত্তিক বিবাহ রীতি এবং বর্তমান বাস্তবতা

0
1204

হিন্দু শাস্ত্র মতে গোত্র ভিত্তিক বিবাহ রীতি এবং বর্তমান বাস্তবতা

বিশ্বের প্রতিটি ধর্মেরই নিজস্ব বিবাহ পদ্ধতি রয়েছে।সনাতন হিন্দু ধর্মও এর ব্যাতিক্রম নয়।অধিকন্তু হিন্দু ধর্মের বিবাহ পদ্ধতিতে রয়েছে অনেক সুশৃঙ্খল নিয়ম কানুন যা ধর্মপ্রাণ হিন্দু ধর্মাবলম্বীরা অনুসরণ করে থাকেন।সনাতন হিন্দু ধর্মে মোট আট প্রকার বিবাহের কথা বলা হয়েছে।স্মৃতিশাস্ত্রের বিখ্যাত গ্রন্থ ‘মনুসংহিতা’য় এই আট প্রকার বিবাহের উল্লেখ রয়েছে যেমন ব্রাহ্ম, দৈব, আর্য, প্রাজাপত্য, আসুর, গান্ধর্ব, রাক্ষস এবং পৈশাচ ইত্যাদি । এই আট প্রকার বিবাহের মধ্যে ব্রাহ্ম, দৈব, আর্য ও প্রাজাপত্য প্রশস্ত । বর্তমানে সমাজে ব্রাহ্ম বিবাহই স্বীকৃত ও প্রচলিত । কন্যাকে বস্ত্র দ্বারা আচ্ছাদন করে এবং অলংকার দ্বারা সজ্জিত করে বিদ্বান ও সদাচারী বরকে স্বয়ং আমন্ত্রণ করে যে কন্যা দান করা হয় তাকে বলা হয় ব্রাহ্ম বিবাহ ।সনাতন ধর্মে রয়েছে অনেক গোত্র এবং তদানুযায়ী রয়েছে গোত্র ভিত্তিক বিবাহ। এবার চলুন দেখে নেয়া যাক গোত্র কি এবং কেন সৃষ্টি হয়েছিল-

বিশ্ব মুক্ত কোষ উইকিপিডিয়া হতে জানা যায়- গোত্র শব্দটির অর্থ বংশ বা গোষ্ঠীকে বোঝায়। সনাতন ধর্মে গোত্র মানে একই পিতার ঔরসজাত সন্তান-সন্ততি (সমূহ) দ্বারা সৃষ্ট বংশ পরম্পরা। বৈদিক শাস্ত্র অনুসারে, একটি বংশের রক্ত প্রবাহিত হয় পুরুষ পরম্পরায়। সুতরাং বংশের রক্তের ধারক ও বাহক হলো পুরুষ। সনাতন ধর্মের বংশ রক্ষার ধারায় ছিলেন প্রথম সত্য যুগের শুরুতে ব্রহ্মার মানস সন্তানদের মধ্যে অন্যতম ঋষিগণ। পরবর্তীকালে অন্যান্য ঋষির বংশ পরম্পরাও পরিলক্ষিত হয়।
এই একেকজন ঋষির বংশ পরম্পরা তাদের নামে এক একটি গোত্র হিসেবে পরিচিত লাভ করে। সে হিসেবে একই গোত্রের বংশীয়গণ পরস্পর ভাইবোন। এমনকি একই বংশের স্বজনেরা পরবর্তীকালে জীবিকা নির্বাহের প্রয়োজনে, সাধন-ভজন, পরমেশ্বর ভগবানের বাণী প্রচারের প্রয়োজনে ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়লে পিতার নামের সাথে গোত্র নামের গুরুত্ব প্রকাশ পায়। যেমন- কাশ্যপ মুনির বংশধরেরা নিজেদের “কাশ্যপ গোত্রস্য” বা কাশ্যপ মুনির বংশ পরিচয় দিয়ে থাকেন।তার মানে একই গোত্রভুক্ত মানুষজন একই রক্তের প্রবাহ থেকে সৃষ্টি হয়েছে। এবার দেখে যাক হিন্দু বিবাহের ক্ষেত্রে গোত্রের প্রভাব-

সনাতন শাস্ত্র মতে একই গোত্রে ছেলেমেয়ের মধ্যে বিবাহ নিষিদ্ধ। কারণ সনাতন ধর্মে একই রক্তের বা আত্মীয়ের মধ্যে বিবাহ নিষিদ্ধ। নিচে তার বিশদ বর্ণনা করা হলো-

ঋগ্বেদেও ১০ম মন্ডলের ১০ম সূক্তের সপিণ্ডে (সমগোত্রে) ও রক্তের সম্পর্কে মধ্যে বিবাহ নিষিদ্ধ করেছে। পাত্র নির্বাচনে অর্থের চেয়ে বিদ্যান ও সদাচারকেই অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে শাস্ত্রে।বিখ্যাত স্মৃতিশাস্ত্র মনুসংহিতার মধ্যে রক্তের সম্পর্কে বিবাহ নিয়ে কি বলেছেন দেখা যাক এই সম্পর্কে-

মনুসংহিতা মতে সনাতন ধর্মের নিজ বংশের মধ্যে বিবাহ সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। এই সম্পর্কে মনুসংহিতা ৩/৫ শ্লোকে বলা আছে –

অসপিন্ডা চ যা মাতুরসগোত্রা চ যা পিতুঃ।
সা প্রশস্তা দ্বিজাতীনাং দারকর্ম্মাণি মৈথুনো।।

অনুবাদঃ- “যে স্ত্রী মাতার সপিণ্ড (সমগোত্রা) না হয়, এবং পিতার সগোত্রা বা সপিণ্ড না হয় অর্থ্যাৎ পিতৃয়স্রাদি সন্ততি সম্ভূতা না হয়, এমন স্ত্রীই দ্বিজাতিদিগের বিবাহের যোগ্যা জানিবে”।
অর্থাৎ এই শ্লোকে এটা স্পস্ট যে নিজ রক্তের সম্পর্কের মধ্যে বা সমগোত্রের মধ্যে বিবাহ করা যাবেনা।তাই সনাতন ধর্মে আপন ভাইবোন, কাকাতো ভাইবোন, মামাতো ভাইবোন, পিসিতো ভাইবোন মাসিতো বোন, রক্তের সম্পর্কে বিবাহ নিয়ে শাস্ত্রীয়ভাবে সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ।

আর তাই গোত্র যেহেতু একই পরিবারের অর্থাত্‍ একই গোত্র বা বংশের অন্তর্গত। তাই হিন্দু ধর্মে ছেলে -মেয়েরা একই গোত্রের কারণে ভাই -বোন হয়।এবং ভাই -বোন হওয়ার কারণে বিয়ের কথা বলাও পাপ বলে মনে করা হয়। এই কারণেই হিন্দু ধর্মে একই গোত্রের বিবাহ অনুমোদিত নয়। একই গোত্রের হওয়ায়, বৈশিষ্ট্যগুলিও একই হয়। তাই অনুরূপ গুণাবলীর কারণে বিয়ের পর অনেক সমস্যা তৈরি হতে পারে।

বিশ্বাস করা হয় একই গোত্রের বিয়েতে জন্ম নেওয়া শিশুদের মধ্যে অনেক ধরনের রোগ এবং অনেক ধরনের অপকারিতা পাওয়া যায়। সেজন্য বলা হয়েছে একই গোত্রে বিয়ে উচিত্‍ নয়।বলা হয়ে থাকে ভিন্ন গোত্রের ছেলে এবং মেয়ে যতদূর এগিয়ে যাবে, বিয়েকে তত ভাল বিবেচনা করা হবে। এই ধরনের বিবাহ থেকে জন্ম নেওয়া শিশুরা অত্যন্ত পুণ্যবান বলে বিবেচিত হয়। এই ধরনের শিশু খুব শক্তিশালী।

তবে কিছু ক্ষেত্রে পাত্র/পাত্রী পক্ষের সম্মতি থাকলে একই গোত্রে বিবাহ করা যাবে তবে সেক্ষত্রে শাস্ত্রে বলা আছে মানবদেহে পুরুষানুক্রমে সপ্তমপুরুষ (সাতপুরুষ) পর্যন্ত একই রক্ত প্রবাহিত হয় বলে ঐ পুরুষ পর্যন্ত ছেলে মেয়ের বিবাহ নিষিদ্ধ। তবে বিশেষ ক্ষেত্রে ধর্মীয় পন্ডিতদের মতে কন্যার বংশের তিনপুরুষ ও পুরুষের ক্ষেত্রে পাঁচপুরুষ চলে গেলে বিবাহ চলতে পারে।

এ বিষয়ে মনুসংহিতা ৩/৬ শ্লোকে বলা হয়েছে –

মহান্ত্যপি সমৃদ্ধানি গোহজাবিধনধান্যতঃ।
স্ত্রী সম্বন্ধে দশৈতানি কুলানি পরিবর্জয়েৎ।।

অনুবাদঃ- “গো, মেষ, ছাগ ও ধন-ধান্য দ্বারা অতিসমৃদ্ধ মহাবংশ হইলেও বিবাহ বিষয়ে এই বক্ষ্যমাণ দশ কুল পরিত্যাগ করিতে হইবে”।অথাৎ দশ কুল বা দশম পুরুষকাল পর সমগোত্রে বিবাহ হতে পারে।

অতএব উপরোক্ত আলোচনা হতে স্পষ্ট যে হিন্দু শাস্ত্রমতে সমগোত্রে বিবাহকে নিরুৎসাহিত করা হয়েছে ভিন্ন গোত্রে বিবাহকে উৎসাহিত করা হয়েছে অথচ বর্তমান সমাজ ব্যবস্থায় গোত্রগত প্রতি হিংসার দরুণ ভিন্ন গোত্রে বিবাহকে একেবারেই নিরুৎ সাহিত করা হয়েছে।এমন কি এমন একটা সময় ছিল ভিন্ন গোত্রে বিবাহকে নিষিদ্ধ পর্যন্ত করা হয়েছিল বাংলাদেশে যা পরবর্তিকালে The Hindu Marriage Disabilities Removal Act, 1946 ধারা বৈধতা দেয়া হয়েছে অর্থাৎ ভিন্ন গোত্রে বিবাহ নিষিদ্ধ সম্বলিত কালো আইনটি বাতিল করে ভিন্ন গোত্রে বিবাহকে বৈধতা দেয়া হয়েছে।বর্তমান ভারত সরকার ভিন্ন গোত্রে অর্থাৎ অসবর্ণে বিবাহকে উৎসাহ দিতে প্রতি ভিন্ন গোত্রের বিয়েতে ৫০ হাজার রুপি করে পুরস্কার দিচ্ছে।তাই বলতেই হয় শাস্ত্রে বলছে কি আর আমরা করছি কি।আশাকরি এ ব্যাপারে সনাতন হিন্দু সমাজের সচেতন হওয়া অতীব জরুরী।এছাড়াও

পাণিনীয় শাস্ত্রে উল্লেখ আছে –
অপত্যাম পৌত্রপ্রভৃতি গোত্রম্।
অর্থাৎ, অপত্য (সন্তান), পৌত্র এবং এভাবে চলতে থাকা ব্যক্তিদের নিয়ে হয় গোত্র।
আর্যগণ অনেক আগেই এই গোত্র সৃষ্টি করেছিল, মূলত বিবাহের এবং বংশ পরিচয়ের জন্য যাতে করে ভুল করে নিজ রক্তে বিবাহ সংঘটিত না হয় অথচ গোত্রগত হিংসার দরুণ আমরা করছি এর পুরো পশুর উল্টো!।

বৈজ্ঞানিক ভাবেও নিজ গ্রুপের রক্তের মধ্যে বিবাহ নিরুৎসাহিত!

বৈজ্ঞানিকভাবেও প্রমাণিত নিজ রক্তে বা নিজ গ্রুপের রক্তের মাঝে বিবাহ ক্ষতির কারণ। বিজ্ঞান মতে প্রতিবার কোষ বিভাজনে Chromosome-এর শেষাংশে কিছু ক্ষয় দেখা দেয়। এবং যা বিরাট ক্ষয়ের সৃষ্টি করে যখন একজন ব্যক্তি বড় হতে থাকে। এবং ভাই বোনের মধ্যে তার রূপ প্রায় একই থাকে। জননের সময় Crossing-Over প্রক্রিয়ায় যা ঠিক হতে পারে যদি তা নতুন Gene-এর সঙ্গে পরিবর্তন করে। কিন্তু সেই Gene যদি একই বৈশিষ্ট্য ধারণ করে তাতে লাভ হয় না। যেই ক্ষয় সেই ক্ষয়ই রয়ে যায়। এবং এরকম চলতে থাকলে, এক পর্যায়ে তা বিরাট রূপ ধারণ করে। এবং Gene নষ্ট করে ফেলে। তাতে মানুষের মৃত শিশু তথা দুর্বল শিশুর জন্ম হয়। এবং এরা বেশিদিন বাঁচতে পারে না।
এইসব হতে মানুষকে দূরে রাখতে গিয়ে সৃষ্টি হয়েছে গোত্রের প্রথা।

এছাড়াও স্বগোত্রে বিবাহ নিষিদ্ধ যেসব কারণে –

১. স্বগোত্রে বিবাহ মানে নিজের ভাই-বোনদের মধ্যে বিবাহ।
২. স্বগোত্রে বিবাহে বংশধর বিকলাঙ্গ হয়, এমনকি প্রতিবন্ধী বা মৃত সন্তানের জন্মও হতে পারে।
৩. বংশগত রোগ প্রকটভাবে দেখা দিতে পারে।

৪। স্বামী স্ত্রীর ঝগড়ার কারণে সৃষ্ট বিচ্ছেদ কখনোই কাম্য নয়। এতে বিয়ে করার সময় দেওয়া সপ্তপদীর বচন ভঙ্গ হয়।
আরও অনেক সমস্যা হয়, যা এক প্রবন্ধে সব কিছু তুলে ধরা সম্ভব নয়।

পরিশেষে এটুকুই বলবো আসুন শাস্ত্র জানি,শাস্ত্র মানি,সুন্দর জীবন গড়ে তুলি,নিজে সুখী হই,অন্যকে সুখী হতে উৎসাহিত করি,গোত্র ভিত্তিক হিংসা ত্যাগ করি,মানুষকে ভালোবাসি,ধর্মীয় গোঁড়ামী বা কুসংস্কার থেকে দূরে থাকি।শুভকামনা সবার জন্য।

লেখক-

জীবন কৃষ্ণ সরকার
কবি ও প্রাবন্ধিক

তথ্যসূত্রঃ ঋগ্বেদ,মনুসংহিতা,,পাণিনি শাস্ত্র গ্রন্থ,বিভিন্ন অনলাইন ও প্রিন্ট পত্রিকা,বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় ব্যাক্তিদের লেখা,উইকিপিডিয়া।

বিঃদ্রঃ লেখাটা কারো ভালো লাগলে শেয়ার, কমেন্ট,লাইক দিয়ে উৎসাহিত করতে পারেন,ভালো না লাগলে ফোনে,ম্যাসাঞ্জারে আজাইরা প্যাঁচাল থেকে দূরে থাকুন এবং লেখাটি এড়িয়ে যাবেন।লেখাটি কপি করা সম্পূর্ণ নিষেধ।

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে