হিন্দু ধর্মের প্রবর্তক কে?।।হিন্দু ধর্মের ধর্মগ্রন্থ বৈশিষ্ট্য

0
366

হিন্দু ধর্মে প্রবর্তক ও ধর্মগ্রন্থ বৈশিষ্ট্য

হিন্দু ধর্মের যেমন নির্দিষ্ট কোনো প্রবর্তক নেই; তেমনি এর কোনো নির্দিষ্ট ধর্মগ্রন্থও নেই। ভক্তগণ ভক্তিসহকারে এ জন্য বলেন যে, স্বয়ং ঈশ্বর এর স্রষ্টা, আর জ্ঞান ও বিবেক এর ধর্মগ্রন্থ। অন্যরা এটা মেনে না নিলেও তারা জানেন যে, এই ধর্মের মূলে রয়েছে গুরু ও শিষ্য। বিভিন্ন যুগে বিভিন্ন গুরু ও অবতার যে বাণী প্রচার করেছেন, সেইগুলোর সমষ্টিই হিন্দু ধর্ম। গুরুর বাণী শিষ্য পরম্পরা প্রথমে মুখে মুখে মুখস্তের মাধ্যমে, তারপর লিপিবদ্ধ হয়ে বয়ে এসেছে বর্তমান পর্যন্ত। বৈদিক ঋষিগণ একে ঐশীবাণী বলে প্রচার করেছেন। তবে সকল বাণীই যেহেতু বেদ, উপনিষদকে ভিত্তি করে বর্ণিত; তাই এইগুলোই সেই হিসেবে মুল ধর্মগ্রন্থ হিসেবে বিবেচিত।

কোনো কিছু শত শত বৎসর যাবৎ মুখস্ত রাখা যেমন কঠিনতর কর্ম; তেমনি অবিকৃতভাবে লিপিবদ্ধ করে রাখাও কষ্টসাধ্য। বৈদিক খষি থেকে শুরু করে পরবর্তীকালের শাস্ত্রকারগণ তারপরও সেই কর্ম বেশ সফলভাবে করেছিলেন সম্পাদন। সফল নাই বা হবেন কেন? শিষ্যগণ তো গুরুর উপদেশ ও বাণী কেবল মুখস্তই করতেন না; অবিকৃতভাবে উচ্চারণের জন্য করতেন কঠোর পরিশ্রম। উচ্চারণের ব্যাকরণও তাদের ঠোটস্থ রাখতে হতো সব সময়। যখন লেখার প্রচলন শুরু হলো তখন বিশুদ্ধতাবে লেখার জন্য ব্যাকরণ, ছন্দ, অলংকারের ওপর নির্ভরশীল হতে হলো ঠিকই; কিন্তু সেগুলোও সঠিকভাবে আবৃত্তি করার জন্য সুর, স্বর, উচ্চারণের দিকে মনোযোগ রাখতে হতো। এ সম্পর্কে সুকুমার সেন (Sukumar Sen) বলেছেন, “একটানা প্রায় দেড়-দুই হাজার বৎসর ধরিয়া খগ্বেদের মতো গ্রন্থ মুখে মুখেই পুরুষানুক্রমে কালবাহিত হইয়া পরিশুদ্ধভাবে আসিয়াছে। মৌখিক পরিবহনে যাহাতে ভ্রমপ্রমাদের প্রবেশ না ঘটে সেজন্য সেকালের বেদজ্ঞেরা অত্যন্ত সর্তক ছিলেন। খগ্বেদের সূক্ত অভ্রান্তভাবে মনে রাখিবার ও বিশুদ্ধভাবে আবৃত্তি করিবার উদ্দেশ্যে অনেক উপায় অবলম্বিত হইয়াছিল। …মুখে মুখে খগ্বেদ রেকর্ড করার বিভিন্ন উপায়গুলিকে ‘পাঠ’ বলা হয়। সাধারণ পরিচিত হইতেছে ‘পদপাঠ’ ৷ পদপাঠ প্রণালীতে প্রত্যেক পদ সন্ধি ভাঙ্গিয়া এবং সমাস পদ হইলে সমাস ভাঙ্গিয়া একটি একটি করিয়া পড়া হইত।”

এসবের ফাঁকেও যে লিপিকার বা আবৃত্তিকারের নিজস্ব মতামত এর মধ্যে প্রবেশ করেনি, তা জোর দিয়ে বলা যায় না। তবে বিভিন্ন সময় বিভিন্ন গুরুর উপদেশ ও ব্যাখ্যা কিন্তু পূর্ববর্তী মতকে (মূলত বেদ) কেন্দ্র করেই তৈরি হয়েছিল। ভারতবর্ষের বিভিন্ন সময়ের বিভিন্ন শাস্ত্রজ্ঞ পণ্ডিত, সাধক, অবতার বা গুরুর বাণী বা তাদের কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা কাহিনি সমুহই তাই পরবর্তীকালে ধর্মশান্ত্রের মর্যাদা লাভ করে ছিল। তবে বেদই হিন্দুদের মূল ধর্মগ্রন্থ; উপনিষদ এর দার্শনিক রূপ; আর পুরাণ গল্পকারে উপস্থাপিত এদের কিছু উদাহরণ বা ব্যাখ্যা বিবৃতি। ক্ষিতিমোহন সেন (Kshitimohan Sen) এ সম্পর্কে বলেন, “খ্রিস্টান, ইসলাম বা বৌদ্ধ- বিশ্বের এইসব ধর্মের যেমন একজন প্রবর্তক আছেন, হিন্দু ধর্মের তেমন কোনও প্রবর্তক নেই। প্রায় পাঁচ হাজার বছর ধরে ভারতের সমস্ত ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক আন্দোলনকে সাঙ্গীকরণ ও স্বীকরণের মধ্য দিয়ে ক্রমশ গড়ে উঠেছে এই ধর্ম। …বেদ, উপনিষদ, গীতা, রামায়ণ, মহাভারত, পুরাণ, তথাকথিত ষড়দর্শন বিষয়ক গ্রন্থাবলি ভক্তিধর্মান্দোলনের পদাবলি সাহিত্য, মরমীয়া সাধকের গান এ সমস্তই প্রামাণ্য আকর, কিন্তু কোনওটিই একক ভাবে নয়।”

আচার্য সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায় (Bhashacharya Acharya Suniti Kumar Chatterji) বলেন, “হিন্দু ধর্মের প্রথম বৈশিষ্ট্য, ইহা অন্য কতকগুলি ধর্মের মতো কোনও ব্যক্তি বিশেষের জীবন-কাহিনী অথবা জীবন-চরিত এবং তাঁহার প্রচারিত মতবাদের সঙ্গে অচ্ছেদ্যভাবে জড়িত নহে। যেমন যিশু খ্রিস্টকে বাদ দিয়া খ্রিস্টান ধর্মের অস্তিত্বের কল্পনাই করা যায় না, জরথুস্ট্রিয় (Zoroastrianism) ও বুদ্ধদেব ছাড়া জরথুস্ট্রশাস্ত্রীয় ও বৌদ্ধ ধর্ম যেমন হয় না, মোহম্মদের জীবনী ও শিক্ষা যেমন ইসলাম বা মোহম্মদিয় ধর্মের অন্যতর প্রধান প্রতিষ্ঠা, হিন্দু ধর্মে সেরূপ কোনও একজনমাত্র অবতার বা তত্ত্বজ্ঞ বা ধর্মগুরুর সর্বগ্রাহিতা নাই। পৃথিবীর ইতিহাসে বিশেষ দেশে এবং বিশেষ কালে বিদ্যমান কোনো একজন মহাপুরুষকে আশ্রয় করিয়া এই অন্য ধর্মগুলি নিজ শাশ্বতত্ত্ব প্রচার করিতেছে। দেশ-কাল পাত্র-নিবন্ধ মনুষ্য-চরিত্রের সীমার মধ্যে হিন্দু ধর্ম তাহার স্বীকৃত তত্বগুলিকে সীমাবদ্ধ করিতে চাহে নাই। হিন্দু ধর্মকে প্রাচীন মিসর, অ্যাসিরিয়, ব্যাবিলনিয়, প্রাচীন গ্রিস, চীন, জাপান প্রভৃতি দেশের ধর্মের মতো একটি Natural Religion বা স্বভাবজাত ধর্ম বলা যাইতে পারে; কারণ মানুষের অভিব্যক্তির সঙ্গে তাল রাখিয়া এইরূপ ধর্মের বিকাশ হয়, এবং জীবনের নানামুখিতার মতোই এইরূপ স্বভাবজাত ধর্ম নানামুখ। এই সমস্ত স্বভাবজাত ধর্মকে, যেগুলি কোনো বিশেষ আচার্য্যের শিক্ষাময় শাস্ত্রের মধ্যে নিবদ্ধ নহে, যেগুলি কেতাবি ধর্ম নহে, যাহা বিশ্ব-প্রপঞ্চের ও মানব-জীবনের পরিচালনাকারী কতকগুলি বিধি মানে, সেই ধর্মগুলিকে প্রাচীন কালে ইউরোপে খ্রিস্টানরা Pagan অথবা ‘জানপদ’ ধর্ম বলিত। হিন্দু ধর্মও এইরূপ Pagan ধর্ম; ইহা-ই ইহার প্রধান গৌরবের কথা, ইহার সার্থকতা এখানেই।”

ড. অতুল সুর বলেন, “হিন্দু ধর্ম বলতে আমরা সেই ধর্মকে বুঝি যে ধর্মের অনুগামীদের জীবনচর্যা একটা বিশেষখাতে প্রবাহিত হয় এবং যারা বেদ-পুরাণ-তন্ত্র ও ধর্মশাস্ত্রগুলিকে তাদের ধর্মের ভিত্তি বলে মনে করে। কিন্তু হিন্দুর জীবনচর্যার কোন একটা বিশেষ ও বিশিষ্ট রূপ নেই। …কালের আবর্তনের সঙ্গে তার বিবর্তন ঘটেছে এবং সেই সঙ্গে তার জীবন চর্যারও পরিবর্তন ঘটেছে। তার মানে, হিন্দু সমাজ Static বা অনড় নয়, এটা dynamic বা সচল”।

তথ্যসূত্রঃ bishleshon.com

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে