হাওর জনপদের অনন্য প্রতিভাধর কবিয়াল নির্মল চন্দ্র কর।।কবিয়াল নির্মল চন্দ্র কর।।

0
454

হাওর জনপদের অনন্য প্রতিভাধর কবিয়াল নির্মল চন্দ্র কর

চারণ কবি বা কবিয়াল (লোকমুখে কবি সরকার) নির্মল চন্দ্র কর সুনামগঞ্জ জেলার জামালগঞ্জ উপজেলার ০২নং সদর ইউনিয়ন পরিষদের ০৬নং ওয়ার্ডের চানপুর গ্রামে ১৩৬০ বঙ্গাব্দের ভাদ্র মাসে জন্মগ্রহণ করেন (১৯৫৩ খ্রি.)। পিতার নাম শ্রীনন্দ কর এবং মাতার নাম কমলা রানী কর। চার ভাই বোনের মধ্যে তিনি দ্বিতীয়। ব্যক্তিগত জীবনে তিনি বিবাহিত। প্রথম স্ত্রী মারা যাওয়ার পর তিনি দ্বিতীয় বিয়ে করেন। তিনি পাঠশালা পর্যন্ত লেখাপড়া করেন। শৈশবকাল থেকেই গান বাজনার প্রতি প্রবল আগ্রহ সৃষ্টি হয়। বয়স যখন ১৬-১৭ তখন গ্রামের সমবয়সীদের নিয়ে “বাঘের দল” নামে দল গঠন করে গ্রামে গ্রামে বিভিন্ন বাদ্যযন্ত্র দিয়ে নেচে-গেয়ে গ্রামের মানুষদের আনন্দ বিনোদন দেয়ার মাধ্যমে সংস্কৃতি জগতে পদার্পণ। তারওপরে গ্রামের মানুষের বৈশাখে যখন সোনালি ফসল ধান ঘরে তুলার পালা শেষ তখন হাতে কোন কাজ থাকত না। এই সময়ে হাওর জনপদের মানুষের জন্য বিনোদনের অন্যতম বিষয় ছিল বাউল গান, পালা গান, ঢপ যাত্রা, যাত্রা ইত্যাদি। তিনি ঢপ যাত্রা দলে নিজেকে জড়িয়ে পেলেন। সেখানে তার বাদ্যযন্ত্র শিক্ষায় হাতেখড়ি হয়। হারমোনিয়াম, তবলা, বেহালা, মৃদঙ্গ, ঢোল, বাঁশি, ঢাক, সরাজ, সেতার প্রভৃতি বাদ্যযন্ত্র বাজানো আয়ত্ত করেন। পরবর্তিতে তিনি নেত্রকোনা জেলার মোহনগঞ্জ উপজেলার খুরশিমুল গ্রামের ওস্তাদ গোপাল চন্দ্র দেব-কে সংগীতের গুরু হিসেবে গ্রহণ করেন। অ্যামেচার শিল্পী হিসেবে ১৫-২০ বছর এভাবে তার পেশা জীবন অতিবাহিত করেন। এছাড়াও তিনি বাউল গান, ধর্মীয় অনুষ্ঠান, কীর্তন, অধিবাস, রামায়ণ গান প্রভৃতি গেয়ে থাকেন। এক সময় এই অঞ্চলে নেত্রকোনা জেলার ব্রজেন্দ্র সরকার, আবুল সরকার এর মত কবিয়াল কবিগান গাইতে আসেন। সেখানে তিনি দোহার ও যন্ত্রী হিসেবে যুক্ত ছিলেন। এভাবে কবিগানের প্রতি তার একটা দুর্বলতা জন্ম নেয়। নেত্রকোনা জেলার কলমাকান্দার নারায়ণ চক্রবর্তী, বাবুল চক্রবর্তী তারা কবি গান গাইতে এই গ্রামে আসেন। তিনি কবিয়াল বাবুল চক্রবর্তীর কাছে কবি গানের শিষ্যত্ব লাভ করেন। তিনি ১০-১৫ বছর ধরে কবিয়াল হিসেবে জেলার গণ্ডি পেরিয়ে বিভিন্ন জায়গায় কবিগান গেয়ে আসছেন। সময় সময় তিনি গ্রাম্য সালিশ, জমিজমার হিসাব, দলিল লিখক হিসেবে গ্রামের মানুষের পাশে থেকে সেবা দিয়ে যাচ্ছেন। ষাটোর্ধ্ব এ কবিয়াল স্ট্রোকজনিত কারণে কিছুটা অসুস্থ। বর্তমানে তিনি গ্রামের মন্দিরে পরিচালিত গীতা শিক্ষা স্কুলে প্রশিক্ষক হিসেবে জড়িত রয়েছেন। জীবনের শেষবেলায় এসে এ চারণ কবি আক্ষেপ করে বলেন- কবি গানের কদর এখন আর আগের মত নেই। দৈন্যদশায় তাদের দিনাতিপাত করতে হয়। উপযুক্ত শিষ্য পেলে তিনি তার অর্জিত বিদ্যা শিক্ষাদানের আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন।

অনুলিখন : প্রদীপ চন্দ্র দত্ত
সরকারি কর্মকর্তা

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে