সিলেট সরকারি মহিলা কলেজ।Sylhet Govt. Women’s College

0
633

অবস্থানঃ সিলেট শহরের প্রাণকেন্দ্রে জিন্দাবাজার কেন্দ্রীয় শহিদ মিনারের বিপরীতে চৌহাট্টা পয়েন্ট সংলগ্ন স্থানে অবস্থিত।
মোবাঃ ০১৭৩৬৯৮৮৯৭৮

অধ্যাপক ড. মো. নজরুল হক চৌধুরী :: ১৯৩৯ থেকে ২০২০,প্রতিষ্ঠার পর থেকে ৮১তম বছর। এই দুইয়ের মধ্যে রয়েছে বিস্তর তফাত। লক্ষ্য, দৃষ্টিভঙ্গি ও প্রেক্ষাপট এসবের মধ্যে ঘটেছে অনিবার্য পরিবর্তন। বিশ শতকের প্রথমার্ধের লক্ষ্য ছিল নারী জাতিকে শিক্ষায় উদ্বুদ্ধকরণ, যা একুশ শতকে এসে উন্নীত হয়েছে নারীর ক্ষমতায়নের অগ্রযাত্রায়। প্রখ্যাত বিজ্ঞানী ও বিশ্বতত্ত্ববিদ স্টিফেন হকিং বলেছেন, একুশ শতকটি হলো নারী ও বিজ্ঞানের শতক। তাই দেখি, স্বাধীনতার আগ পর্যন্ত নারীরা শুধু শিক্ষকতা ও চিকিৎসা পেশায় আর বিশ শতকের একেবারে শেষ দিকে এসে প্রশাসন, পুলিশ, বিচার বিভাগ, ঝুঁকিপূর্ণ বেসামরিক বিমান চলাচল, সাংবাদিকতা, সেনা, নৌ ও বিমানবাহিনীতে নারীর যোগ্যতম পদচারণা স্টিফেন হকিংয়ের প্রত্যাশারই বাস্তব প্রতিফলন। আশা করা যায়, একুশ শতকটিতে হবে নারীর পরিপূর্ণ ক্ষমতায়ন।

বর্তমান সাফল্যজনক অবস্থার প্রত্যাশায়ই ১৯৩৯ সালে বিদ্যোৎসাহী জমিদার বাবু ব্রজেন্দ্র নারায়ণ চৌধুরীর জিন্দাবাজারস্থ বাসভবনে একটি মহিলা কলেজ প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে এক বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। এই বৈঠকে সিলেট অঞ্চলের শিক্ষাবিস্তারের অগ্রজ বাবু ব্রজেন্দ্র নারায়ণ চৌধুরী, মিনিস্টার বসন্ত কুমার দাশ, বাবু বৈদ্যনাথ মুখার্জী, রায়বাহাদুর ধর্মদাস দত্ত এবং অ্যাডভোকেট আবু আহমদ আবদুল হাফিজ (বর্তমান পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এম এ মোমেনের পিতা) যোগদান করেন। এ বৈঠকেই বর্তমান সিলেট সরকারি মহিলা কলেজের ভিত রচিত হয়। কলেজের প্রতিষ্ঠাকালীন অধ্যক্ষ ছিলেন বাবু ব্রজেন্দ্র নারায়ণ চৌধুরী। স্বল্পসংখ্যক ছাত্রী নিয়ে যাত্রা করা কলেজটি এক বছর, দুই বছর করে করে ৮১টি বছরে আজকের অনার্স-মাস্টার্স পাঠদানকারী প্রায় নয় হাজার ছাত্রীর সিলেট সরকারি মহিলা কলেজ। ১৯৩৯ সালে প্রতিষ্ঠার তিন বছরের মধ্যেই এটি ডিগ্রি কলেজ হিসেবে তৎকালীন কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুমোদন লাভ করে। ১৯৩৯ থেকে ১৯৪৫ সাল পর্যন্ত বেসরকারি কলেজ হিসেবে পরিচালিত হওয়ার পর ১৯৪৫ সালের ১ ডিসেম্বর তৎকালীন আসাম সরকার কলেজটিকে সরকারীকরণ করে। ১৯৫০ সালে কলেজে ছাত্রীসংখ্যা মারাত্মক হ্রাস পাওয়ায় (একটি তথ্যমতে, ছাত্রীসংখ্যা মাত্র ৮ জন) তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান প্রাদেশিক সরকার কলেজটির ওপর থেকে সরকারি নিয়ন্ত্রণ প্রত্যাহার করে নেয় এবং সিলেট এমসি কলেজের অধ্যাপক সলমান চৌধুরীকে অতিরিক্ত দায়িত্ব হিসেবে মহিলা কলেজের দায়িত্ব বুঝে নেওয়ার নির্দেশ প্রদান করে। এটি আবার বেসরকারি কলেজ হয়ে যায়। এ সময় অনিবার্য বিপর্যয়ের হাত থেকে কলেজটিকে রক্ষার জন্য সিলেটের যে কৃতী সন্তানগণ দেহ-প্রাণ কলেজের সাথে জড়িয়ে দিয়েছিলেন, তারা হলেন অধ্যক্ষ সলমান চৌধুরী, বেগম সিরাজুন্নেসা চৌধুরী, আমীনুর রশীদ চৌধুরী, সৈয়দা সাহার বানু চৌধুরী (বর্তমান পররাষ্ট্রমন্ত্রীর মাতা), বাবু বিমলেন্দু দাশ (সাধু বাবু) প্রমুখ। এমসি কলেজ থেকে সদ্য অবসরপ্রাপ্ত উপাধ্যক্ষ বাবু গিরিশ চন্দ্র দত্তকে দেওয়া হয় অধ্যক্ষের দায়িত্ব। উল্লিখিত গুণী ব্যক্তিগণ যথাসাধ্য চেষ্টা করে নারীশিক্ষার কেন্দ্র এ কলেজটির হাল ধরেন এবং উন্নয়নের দিকে নিয়ে যান। কলেজের চরম বিপর্যপ্ত অবস্থায় নামমাত্র সম্মানীতে বা অবৈতনিকভাবে অধ্যাপনার দায়িত্ব পালন করেছেন অ্যাডভোকেট রণধীর সেন, অ্যাডভোকেট আবু আহমদ আবদুল হাফিজ, বাবু কৃষ্ণকুমার পাল চৌধুরী, অ্যাডভোকেট জয়নুল আবেদীন চৌধুরী এবং মিসেস হুসন্ আরা আহমদ। ১৯৫৯ সালে গিরিশ চন্দ্র দত্ত বার্ধক্যের কারণে অবসরে গেলে মিসেস হুসন্ আরা আহমদ অধ্যক্ষের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। তার অধ্যক্ষ দায়িত্ব পালনকালীন ছাত্রীসংখ্যা বৃদ্ধিসহ কলেজের প্রভূত উন্নতি সাধিত হয়। ১৯৮০ সালে বাংলাদেশ সরকার কলেজটিকে পুনরায় সরকারীকরণ করে এবং মিসেস হুসন্ আরা আহমদ ১৯৮০ থেকে ১৯৮২ সাল পর্যন্ত অফিসার ইনচার্জ হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। এ কলেজটি বাংলাদেশের একমাত্র কলেজ, যেটি একবার ব্রিটিশ আমলে সরকারি কলেজ হয়ে পাকিস্তান আমলে বেসরকারি কলেজে পরিণত হয়ে পরবর্তীতে পুনরায় বাংলাদেশে সরকারি কলেজে উন্নীত হয়।
সিলেট সরকারি মহিলা কলেজে বিভিন্ন মেয়াদে দায়িত্ব পালন করা অধ্যক্ষবৃন্দ (ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষগণ ব্যতীত) :


ব্রজেন্দ্র নারায়ণ চৌধুরী : ১৯৩৯-১৯৪৫, ২. ধর্মদাশ দত্ত : ১৯৪৫, ৩. শশী মোহন চক্রবর্তী : ১৯৪৫, ৪. সুপ্রভা দেবী : ১৯৪৫-১৯৫০, ৫. গিরিশ চন্দ্র দত্ত : ১৯৫০Ñ১৯৫৯, ৬. হুসন্ আরা আহমদ : ১৯৫৯-২৯/১২/৮২, ৭. প্রফেসর মো. আবুল বশর : ১৩/০২/১৯৮৩-০৯/০৫/১৯৮৯, ৮. বিমল চন্দ্র দেব : ১০/০৫/১৯৮৯-২০/০৬/১৯৯০, ৯. ড. ফজলুল করিম চৌধুরী : ২১/০৬/১৯৯০-২৩/০৬/১৯৯০, ১০. প্রফেসর মো. আবুল বশর : ১২/০৭/১৯৯০Ñ১৫/০১/১৯৯১, ১১. প্রফেসর আবদুল মতিন : ০৭/০২/১৯৯১-২৫/০১/১৯৯৮, ১২. মো. মোদাব্বির আলী : ২৬/০১/১৯৯৮Ñ৩০/০৪/২০০১, ১৩. প্রফেসর এইচ বি আবু তাহের : ০১/০৫/২০০১-৩১/০৭/২০০১, ১৪ প্রফেসর মো. মোদাব্বির আলী : ০১/০৮/২০০১-২৬/০৭/২০০২, ১৫. প্রফেসর শামসুন নাহার : ০৮/০৮/২০০২-১৬/১১/২০০৫, ১৬.প্রফেসর ড. মো. নজরুল হক চৌধুরী : ২৪/১১/২০০৫-২৬/০২/২০১৫ (কলেজ সরকারি হওয়ার পরে যা সবচেয়ে দীর্ঘ মেয়াদ), ১৭. প্রফেসর বিজিত কুমার ভট্টাচার্য : ০৬/০৪/২০১৫Ñ০৫/০৯/২০১৬, ১৮. প্রফেসর ড. মো নুরুল ইসলাম : ০১/১০/২০১৬-২১/১২/২০১৭, ১৯. প্রফেসর হায়াতুল ইসলাম আখঞ্জি : ২১/১২/২০১৭-০৫/০২/২০১৮, ২০. প্রফেসর এ কে এম গোলাম কিবরিয়া তাপাদার : ০৫/০২/২০১৮-০৬/০২/২০১৮, ২১. প্রফেসর হায়াতুল ইসলাম আখঞ্জি : ১৪/০২/২০১৮Ñ৩০/০১/২০২০, ২২. প্রফেসর আবুল কালাম আজাদ : ৩০/০১/২০২০-২৯/০৯/২০২০।
২০১২ সালে কলেজে রাজস্ব খাতে অধ্যাপক ২, সহকারী অধ্যাপক ১ এবং প্রভাষকের ৭টি পদসহ মোট ১০টি স্থায়ী পদ সৃষ্টি করা হয়। বর্তমানে কলেজে অধ্যক্ষ, উপাধ্যক্ষসহ মোট শিক্ষকের পদসংখ্যা ৬১। ১৯৬৪ সালে কলেজে উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ে বিজ্ঞান বিভাগ চালু করা হয়। প্রফেসর আবুল বশরের অধ্যক্ষের দায়িত্ব পালনকালীন বিজ্ঞান বিষয়সমূহের অধ্যাপকগণের সার্বিক সহযোগিতায় ১৯৮৯ সাল হতে বিএসসি (পাস) কোর্স চালুর জন্য চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুমোদন লাভ করে। কলেজটিতে ২০০৩-২০০৪ শিক্ষাবর্ষ থেকে ৭টি বিষয়ে (বাংলা, ইংরেজি, অর্থনীতি, রাষ্ট্রবিজ্ঞান, সমাজকর্ম, দর্শন এবং ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি। সংশ্লিষ্ট বিভাগসমূহের শিক্ষকগণের সহযোগিতায় সরকারের সম্মতি নিয়ে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুমোদনক্রমে ২০১১-২০১২ শিক্ষাবর্ষ থেকে ওই ৭টি বিষয়ে ৩৫০টি আসনের মাস্টার্স শেষ পর্ব কোর্স চালু করা হয়। ২০১৩-২০১৪ শিক্ষাবর্ষ থেকে ইতিহাস বিষয়ে অনার্স কোর্স চালু করা হয়। ২০০৬ থেকে ২০১৪Ñএই কয়েক বছরের মধ্যে অনার্স বিষয়সমূহের আসনসংখ্যা ৩৫০ থেকে ২১৫টি বৃদ্ধি করে ৫৬৫টি করা হয়। পরবর্তী সময়ে আরো ১০০টি বৃদ্ধি পেয়ে অনার্স বিষয়সমূহের বর্তমান আসনসংখ্যা ৬৬৫। ২০১২-২০১৩ শিক্ষাবর্ষ থেকে বিএ, বিএসএস এবং বিএসসি পাস শ্রেণিসমূহে আসনসংখ্যা ২৫০ বৃদ্ধি করে ৯০০ থেকে ১১২০টি করা হয়। ২০১০-২০১১ শিক্ষাবর্ষ থেকে উচ্চ মাধ্যমিক বিজ্ঞান ও মানবিক শাখায় ১০০টি আসন বৃদ্ধি করে ৬০০ থেকে ৭০০টি করা হয়। পরে আরো ১০০টি বৃদ্ধি পেয়ে বর্তমানে উচ্চ মাধ্যমিকে আসনসংখ্যা ৮০০। যেহেতু উচ্চশিক্ষায় বেশির ভাগ ক্ষেত্রে লেখাপড়ার মাধ্যম ইংরেজি হয়ে থাকে, তাই উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায় থেকে যাতে শিক্ষার্থীরা ইংরেজি মাধ্যমে অভ্যস্ত হতে পারে, সে লক্ষ্যে ২০১০-২০১১ শিক্ষাবর্ষ থেকে উচ্চ মাধ্যমিক বিজ্ঞান শাখায় শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের বিশেষ অনুমতি নিয়ে কলেজে বাংলা মিডিয়ামের পাশাপাশি ১৫০ আসনবিশিষ্ট ইংরেজি মিডিয়াম চালু করা হয়। ছাত্রী ভর্তি এবং ক্লাস অনুষ্ঠান ২০১৫ সাল পর্যন্ত ভালোভাবেই চলেছে এবং এই মিডিয়ামে পরীক্ষা দিয়ে ছাত্রীরা জিপিএ-৫ও পেয়েছে। এ মিডিয়ামে অনিবার্য কারণেই কম ছাত্রী ভর্তি হয়ে থাকে। ক্যাডেট কলেজ, ক্যান্টনমেন্ট কলেজ ও ইংলিশ মিডিয়ামের কিছু প্রতিষ্ঠান ছাড়া বাংলাদেশের সব সরকারি কলেজের মধ্যে একমাত্র সিলেট সরকারি মহিলা কলেজেই উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ে বিজ্ঞান শাখায় ইংরেজি মাধ্যম চালু করা হয়। জানা যায়, এখন ইংরেজি মিডিয়াম বন্ধ হয়ে আছে, এমনকি এও শোনা যায়, ইংরেজি মাধ্যমের এফিলিয়েশন বন্ধ হয়ে গেছে, কারণ জানা নেই। ২০০৯ সাল থেকে উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ে ব্যবসা শিক্ষা কোর্স চালু করার জন্য কলেজের পক্ষ থেকে জোর প্রচেষ্টা চালানোর পরিপ্রেক্ষিতে ২০১০ সালে সরকার ওই কোর্স চালুর লক্ষ্যে বাছাই করা ৩০টি সরকারি কলেজের মধ্যে সিলেট সরকারি মহিলা কলেজকে অন্তর্ভুক্ত করে এবং প্রয়োজনীয় চাহিদা-সংবলিত তথ্য পাঠানোর নির্দেশ দেয়। সাথে সাথেই তথ্য-সংবলিত সকল কাগজপত্র পাঠানো হয়। কিন্তু অদ্যাবধি ওই কোর্স চালু হয়নি। ২০১৭ সালের জানুয়ারি মাসে বিভিন্ন পর্যায়ের আরো ৫৯টি শিক্ষক পদ সৃষ্টির জন্য কলেজের পক্ষ থেকে আবেদন করা হয়েছে, তবে এখনো সৃজন হয়নি।


সিলেট সরকারি মহিলা কলেজের সর্বজনশ্রদ্ধেয় প্রাক্তন অধ্যক্ষ হুসনে আরা আহমদের প্রতিষ্ঠিত ‘হুসন্ আরা ফাউন্ডেশন’ কর্তৃক ২০০৮ সাল থেকে প্রতিবছর উচ্চ মাধ্যমিক শ্রেণির ১১ জন দরিদ্র ও মেধাবী ছাত্রীকে জনপ্রতি এককালীন ১২ হাজার টাকা করে বৃত্তি প্রদান (সার্টিফিকেটসহ) এবং শিক্ষাদানের ক্ষেত্রে সফল বাছাই করা এ কলেজের দুজন শিক্ষককে প্রতিবছর ফাউন্ডেশনের পক্ষ থেকে সম্মাননা প্রদানের ব্যবস্থা করা হয়েছে। ২০১৪ সাল থেকে বৃত্তিসংখ্যা সম্প্রসারণ করে স্নাতক পর্যায় পর্যন্ত করা হয়েছে।
বিগত তিন দশকে কলেজটির যথেষ্ট অবকাঠামোগত উন্নয়ন হয়েছে। ১৯৮৯ সালে সাবেক স্পিকার হুমায়ুন রশীদ চৌধুরী এবং শিক্ষাসচিব হেদায়েত আহমদ চৌধুরীর আনুকূল্যে ১০০ শয্যার একটি ছাত্রীনিবাসের কাজ শুরু হয়ে ১৯৯১ সালে ছাত্রীনিবাসটি চালু হয়। সাবেক অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী এম সাইফুর রহমানের আনুকূল্যে ১৯৯২ সালে অধ্যক্ষের বাসভবন নির্মাণ, ১৯৯৩-৯৫-এর মধ্যে একাডেমিক ভবন সম্প্রসারণ, ১৯৯৫ সালের প্রথম দিকে ৬০০ আসনের অডিটরিয়ামের নির্মাণকাজ শুরু হয়ে ১৯৯৮ সালে চালু এবং ২০০২ সালে দুররে সামাদ রহমান ছাত্রীনিবাসের কাজ শুরু হয়ে ২০০৫ সালে চালু হয়। ২০০৬ সালে একাডেমিক ভবন এবং প্রশাসনিক ভবন সম্প্রসারণ কাজের জন্য সরকার থেকে অর্থ বরাদ্দ করা হলেও ২০০৭ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকার তা স্থগিত করে দেয়। পরে ২০০৯ সালে সাবেক শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদকে বিষয়টি অবহিত করলে তিনি পুনরায় সেই পরিমাণ অর্থ ছাড়ের ব্যবস্থা করলে একাডেমিক ভবন এবং প্রশাসনিক ভবন সম্প্রসারণের কাজ সম্পন্ন করা হয়। শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদের আনুকূল্যে পাঁচ তলাবিশিষ্ট একাডেমিক ভবনের নির্মাণ ব্যয় বরাদ্দ হলে ২০১৩ সালের ১৬ নভেম্বর ওই একাডেমিক ভবনের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন সাবেক অর্থমন্ত্রী এ এম আবদুল মুহিত ও শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ। একাডেমিক ভবনটি চালু হয় ২০১৭ সালে। ২০১৩ সালে দৃষ্টিনন্দিত তোরণ ও সীমানাপ্রাচীর নির্মাণের জন্য সিটি করপোরেশনের মেয়র আরিফুল হক চৌধুরীকে অনুরোধ জানালে তিনি তা অনুমোদন করেন এবং করপোরেশন প্রদত্ত তিনটি ডিজাইন থেকে একটি বাছাইয়ের জন্য কলেজ কর্তৃপক্ষের নিকট হস্তান্তর করেন। কলেজ কর্তৃপক্ষ একটি বাছাই করে সিটি করপোরেশনে জমা দেন। এর পরপর মেয়র আরিফুল হক চৌধুরী হঠাৎ গ্রেফতার হয়ে গেলে কাজটি আর শুরু হয়নি। পরে ২০১৯-২০ সালের দিকে তখন পছন্দ করা ডিজাইনেই তোরণ ও সীমানাপ্রাচীর নির্মিত হয়েছে।
সিলেট সরকারি মহিলা কলেজ ১৯৮৯ সালে সুবর্ণজয়ন্তী (৫০ বছর পূর্তি) এবং ২০১৪ সালে হীরকজয়ন্তী (৭৫ বছর পূর্তি) উদ্্যাপন করেছে। সুবর্ণজয়ন্তীতে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন তৎকালীন শিক্ষামন্ত্রী শেখ শহিদুল ইসলাম এবং অনেক গণ্যমান্য ব্যক্তির উপস্থিতিতে সার্থক অনুষ্ঠানাদি সম্পন্ন হয়েছে। ২০১৪ সালের তিন দিনব্যাপী হীরকজয়ন্তীতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বাণী দিয়েছেন। প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন তৎকালীন অর্থমন্ত্রী এ এম আবদুল মুহিত ও বিশেষ অতিথি ছিলেন শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ। এ ছাড়া সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা রাশেদা কে চৌধূরী, অধ্যাপক আবদুল্লাহ আবু সাঈদ (সিলেট মহিলা কলেজের প্রভাষক হিসেবে যার শিক্ষকতা জীবন শুরু) এবং প্রাইভেটাইজেশন কমিশনের সাবেক চেয়ারম্যান ইনাম আহমদ চৌধুরী। এ ছাড়া মাহবুবুস্ সামাদ চৌধুরী এমপি, হাফিজ আহমদ মজুমদার এমপি, আমাতুল কিবরিয়া কেয়া চৌধুরী এমপি, সৈয়দা জেবুন্নেসা হক এমপিসহ বহু গণ্যমান্য ব্যক্তি উপস্থিত ছিলেন। আলোকিত জীবন এবং কলেজের জন্য অসামান্য অবদান রাখায় ৭৫ বছর পূর্তি অনুষ্ঠানে ১০ জন কৃতী নারীকে সম্মাননা প্রদান করা হয়। তিন দিনব্যাপী অনুষ্ঠানমালায় দেশ-বিদেশ থেকে আসা প্রায় ২ হাজার প্রাক্তনীর অংশগ্রহণে হীরকজয়ন্তী একটি সুন্দর ও সাফল্যমণ্ডিত উদ্যাপন হিসেবে স্বীকৃত হয়েছে। এ উপলক্ষে প্রধানমন্ত্রীর বাণী ও অংশগ্রহণকারীদের ছবি-সংবলিত একটি সুন্দর স্মরণিকা প্রকাশ করা হয়। ৭৫ বছর পূর্তি উপলক্ষে রেজিস্ট্রেশন ফি ও অনুদানের মাধ্যমে আদায়কৃত অর্থে সকল অনুষ্ঠানের ব্যয় বাদে উদ্বৃত্ত ২ লাখ ৪২ হাজার টাকা অধ্যক্ষ ড. নজরুল হক চৌধুরী (লেখক) ‘সিলেট সরকারি মহিলা কলেজ অ্যালামনাই অ্যাসোসিয়েশন’ গঠন করে দিয়ে অ্যালামনাই অ্যাসোসিয়েশনের কর্মকর্তাদের দায়িত্বে ছাত্রীদের কল্যাণে ব্যয়ের লক্ষ্যে অ্যাসোসিয়েশনের একটি ব্যাংক হিসাব খুলে ওই হিসাবে জমা দেন।
এই কলেজের প্রাক্তনী রাশেদা কে চৌধূরী, বাংলাদেশ গার্লস গাইড অ্যাসোসিয়েশনের প্রাক্তন জাতীয় কমিশনার জেবা রশিদ চৌধুরী, মাধ্যমিক ও উচ্চ-শিক্ষা অধিদফতরের প্রাক্তন মহাপরিচালক দিলারা হাফিজসহ অনেক মহীয়সী নারী দেশে-বিদেশে অত্যন্ত উচ্চ পদে অধিষ্ঠিত হয়ে দায়িত্ব পালন করেছেন, এখনো করছেন। এ ছাড়া রয়েছেন রাজনীতিবিদ ও শিক্ষাবিদ হেনা দাস, সংগীতশিল্পী আরতি ধর, রাজনীতিবিদ ও সমাজসেবক আবেদা চৌধুরী, মানবাধিকার নেত্রী শীপা হাফিজা, যুক্তরাষ্ট্রে কর্মরত বিশিষ্ট চিকিৎসক মালেকা জাফরিন আহমদসহ অনেক কৃতী প্রাক্তনী, যাদের সবার নাম এ প্রবন্ধে উল্লেখ করলে কলেবর অনেক বড় হয়ে যাবে।
এ কলেজে নিয়মিত ক্লাস অনুষ্ঠান, ছাত্রীদের ক্লাসে উপস্থিতি, শিক্ষকদের যথাযথ পাঠদান এবং অভিভাবকদের সহযোগিতা এসবের সম্মিলিত প্রচেষ্টার ফলে কলেজের ছাত্রীরা পরীক্ষায় সর্বদাই ভালো ফলাফল করছে। বোর্ডে সকল গ্রুপে সর্বোচ্চ সংখ্যক জিপিএ ৫ পাওয়া, ২০০৯ থেকে ২০১৪ পর্যন্ত প্রতিবছর মানবিক বিভাগে সর্বোচ্চ সংখ্যক জিপিএ-৫ পাওয়া ও বিজ্ঞান বিভাগে প্রায় বছরই দ্বিতীয় সর্বোচ্চ জিপিএ-৫ (কদাচিৎ তৃতীয় সর্বোচ্চ জিপিএ-৫), অনার্সে কৃতিত্বপূর্ণ ফলাফলের জন্য ভাইস চ্যান্সেলর পদক পাওয়া, ২০১১ সালে আন্তর্জাতিক গণিত অলিম্পিয়াডে বাংলাদেশ দলের ৫ জন অংশগ্রহণকারীর মধ্যে একমাত্র মেয়ে প্রতিনিধি এ কলেজেরই একজন ছাত্রী। ফলাফলের পাশাপাশি সহ-শিক্ষা কার্যক্রমও নিয়মিত হয়ে থাকে কলেজটিতে।
আগামীর স্বপ্ন ব্যক্তি বিচারে আপেক্ষিক। সেই উনচল্লিশের সিলেট মহিলা কলেজের পাঠ্যসূচি ও ছাত্রীসংখ্যা বর্তমানের সাথে বেমানান ঠেকে। কলেজের বর্তমান বাস্তব ও সাফল্যমণ্ডিত চিত্র প্রতিষ্ঠাকালীনগণ উনচল্লিশে কল্পনা করেছেন কি না জানি না। করে থাকলে হয়তো আকাশকুসুম ভাবনা কারো কাছে মনে হতে পারে, অথচ এটাই বাস্তব। এ কলেজের প্রত্যেক ছাত্রীই নিজেকে ‘সিলেট সরকারি মহিলা কলেজ’-এর ছাত্রী পরিচয়ে গর্ববোধ করেন। দীর্ঘদিন থেকে চলমান কলেজের ঐতিহ্য অটুট থাকুক এই প্রত্যাশা করি।

লেখকঃ
সাবেক অধ্যক্ষ : সিলেট সরকারি মহিলা কলেজ
(২৪/১১/২০০৫-২৬/০২/২০১৫)

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে