সনাতন ধর্মের প্রাণপুরুষ পরমেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণ

0
40

সনাতন ধর্মের প্রাণপুরুষ পরমেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণ

সনাতন ধর্মানুসারে, ভগবান শ্রীকৃষ্ণ অত্যাচারীর বিরুদ্ধে দুর্বলের অধিকার প্রতিষ্ঠা এবং দুষ্টের দমন ও শিষ্টের লালন করতেই এ পৃথিবীতে আবির্ভূত হয়েছিলেন। শান্তিহীন পৃথিবীতে শান্তি আনতেই শ্রীকৃষ্ণের আবির্ভাব। ঈশ্বরতত্ত্বের মহান প্রতীক হলেন শ্রীকৃষ্ণ। বেদে তিনি ঋষিকৃষ্ণ, দেবতাকৃষ্ণ, মহাভারতে রাজর্ষিকৃষ্ণ।

শ্রীকৃষ্ণের জন্ম হয়েছিল ৩২২৮ খ্রিষ্টপূর্বাব্দে ১৮ জুলাই। দ্বাপর যুগের এই দিনে পাশবিক শক্তি যখন সত্য, সুন্দর ও পবিত্রতাকে গ্রাস করতে উদ্যত হয়েছিল, তখন সেই অসুন্দর, অসুর ও দানবীয় পাশবিক শক্তিকে দমন করে মানবজাতিকে রক্ষা এবং শুভশক্তিকে পুনঃপ্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে ভগবান শ্রীকৃষ্ণের আবির্ভাব ঘটেছিল পূর্ণ অবতার রূপে। পূর্ণ অবতার বলতে ভগবান বিষ্ণুর প্রত্যক্ষ উপস্থিতিকে নির্দেশ করে এবং ঈশ্বরের শক্তি ও গুণাবলি প্রদর্শন করাকে বোঝানো হয়। হিন্দু ধর্মাবলম্বীরা শ্রীকৃষ্ণকে ঈশ্বর, ভগবান, গোবিন্দ, পরমেশ্বর প্রভৃতি নামে অভিহিত করে।
হিন্দু পঞ্জিকা মতে, সৌর ভাদ্র মাসের কৃষ্ণপক্ষের অষ্টমী তিথিতে যখন রোহিণী নক্ষত্রের প্রাধান্য হয়, তখন জন্মাষ্টমী পালিত হয়। গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডার মতে, প্রতিবছর মধ্য আগস্ট থেকে মধ্য সেপ্টেম্বরের মধ্যে কোনো একসময়ে এ উৎসবটি অনুষ্ঠিত হয়ে থাকে। এ বছর ১৯ আগস্ট ২০২২ জন্মাষ্টমী পালন করা হচ্ছে।

শ্রীকৃষ্ণের প্রাচীনতম উল্লেখ পাওয়া যায় বৈদিক সাহিত্যে। ঋদ্বেদে একাধিকবার শ্রীকৃষ্ণের উল্লেখ আছে। শ্রীকৃষ্ণকে দেবকীপুত্র বলা হয়। মহাভারত, বিভিন্ন পুরাণ, শ্রীমদ্ভাগবত এবং বৈষ্ণবকাব্যে যে কৃষ্ণের কাহিনি বর্ণিত হয়েছে, তাঁর আবির্ভাব দ্বাপর যুগে।ভগবান শ্রীকৃষ্ণের পিতার নাম বসুদেব ও মাতার নাম দেবকী। তিনি পিতামাতার অষ্টম পুত্র। বাল্যকাল থেকেই কৃষ্ণ তাঁর অলৌকিক শক্তির প্রমাণ দিয়েছিলেন পুতনাবধ, দামবন্ধন লীলা, কলীয়দমন, গোর্বধন ধারণ প্রভৃতি কর্মকাণ্ডের মধ্য দিয়ে। নিপীড়িত মানুষ মুক্তির আশায় কানুর তথা কৃষ্ণের অনুসারী হয়ে ওঠে এবং ক্রমান্বয়ে কংসবধের জন্য প্রস্তুতি গ্রহণ করে। অবশেষে ভগবান শ্রীকৃষ্ণ কংস রাজাকে বধ করেন।

শ্রীকৃষ্ণ হিন্দুধর্মে পরম পুরুষোত্তম ভগবান। তিনি সনাতন ধর্মের প্রাণপুরুষ। পুরাণ অনুযায়ী তিনি ভগবান বিষ্ণুর অষ্টম অবতার রূপে খ্যাত। তাঁকে সর্বোচ্চ ঈশ্বর (পরম সত্ত্বা) উপাধিতে ভূষিত করা হয় এবং পবিত্র ধর্মগ্রন্থ শ্রীমদভগবদ্গীতা-এর প্রবর্তক। প্রতিবছর ভাদ্রমাসের কৃষ্ণপক্ষের অষ্টমী (জন্মাষ্টমী) তিথিতে তার জন্মোৎসব পালন করা হয়।ভগবদগীতাতে ভগবান শ্রীকৃষ্ণ বর্ণনা করেছেন আমি সমস্ত কিছুর উৎস ও সবকিছু আমার কাছ থেকে উৎপত্তি হয়েছে । তাই শ্রীকৃষ্ণ কে ভগবান বলা হয়। তিনি অবতার নন। তিনি সাক্ষাৎ ব্রহ্ম। তাই কৃষ ধাতু অর্থাৎ কর্ষণ থেকে যার জন্ম সেই “নন্দের নন্দন কৃষ্ণ মোর প্রাণ নাথ “। ভাগবত পুরাণে কৃষ্ণকে প্রায়শই বংশী-বাদনরত এক কিশোরের রূপে বর্ণনা করা হয়েছে।আবার ভগবদ্গীতায়, তিনি এক পথপ্রদর্শক রূপে দন্ডায়মান। সমগ্র মহাভারত কাব্যে, তিনি একজন কূটনীতিজ্ঞ হিসাবে পাণ্ডবপক্ষে মুখ্য ভূমিকা পালন করেছেন, কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধে অর্জুনের রথের সারথিরূপে অবতীর্ণ হয়েছেন।দর্শন ও ধর্মতাত্ত্বিক ঐতিহ্যে শ্রীকৃষ্ণ-সংক্রান্ত উপাখ্যানগুলি বহুধা পরিব্যাপ্ত।তিনি একাধারে দেবগুণা শিশু, রঙ্গকৌতুকপ্রিয়, আদর্শ প্রেমিক, দিব্য নায়ক ও পরম ঈশ্বর।

কেন শ্রীকৃষ্ণ সনাতন ধর্মের প্রাণপুরুষ তথা ভগবান

ব্রহ্মসংহিতার পঞ্চম অধ্যায়ের প্রথম শ্লোকেই ব্রহ্মাজী স্বয়ং বলেছেন,

ঈশ্বরঃ পরম: কৃষ্ণ সচ্চিদানন্দ বিগ্রহ।
অনাদিরাদির্গোবিন্দ সর্বকারণকারণম্,।।

অর্থাৎ সচ্চিদানন্দময় শ্রীকৃষ্ণ, যিনি গোবিন্দ নামে পরিচিত, তিনিই পরম ঈশ্বর, তিনিই অনাদির আদি এবং তিনিই সমস্ত কারণের পরম কারণ।
শ্রীমদ্ভাগবতে (১/৩/২৮) বলা হয়েছে,

এতে চাংশকলাঃ পুংসঃ কৃষ্ণস্তু ভগবান্ স্বয়ম্।
ইন্দ্রারিব্যাকুলং লোকং মৃড়য়ন্তি যুগে যুগে।।

অর্থাৎ,শ্রীকৃষ্ণই স্বয়ং ভগবান, সমস্ত অবতারগণ তাঁরই অংশ বা কলা। যুগে যুগে দৈত্য পীড়িত ভুবনকে ইনিই পরিত্রাণের দ্বারা সুখ দিয়ে থাকেন।
অর্থাৎ, শ্রীকৃষ্ণ ঈশ্বর প্রেরিত কোনো দূত বা কোনো অবতার নন বরং তিনি স্বয়ংই ঈশ্বর এবং সমস্ত অবতারগণ তাঁরই অংশ,অর্থাৎ, তিনিই সমস্ত অবতারের অবতারী। এ প্রসঙ্গে শ্রীমদ্ভগবদ্গীতায় তিনি নিজেও ঠিক তাই বলেছেন; তিনি বলেছেন (গীতা ১০/২, ১০/৮, ৯/২৪, ৭/৬-৭),

আমিই সমস্ত দেবদেবীদের উৎস, জড় ও চেতন জগতের সবকিছুর উৎস আমিই, সবকিছু আমার থেকেই প্রবর্তিত হয়, আমার উর্ধ্বে কিঞ্চিৎ বস্তুও নেই, আমিই সমস্ত যজ্ঞের ভোক্তা ও প্রভু। যারা আমার চিন্ময়স্বরূপ জানেনা তারা পুন:পুন সংসার সমুদ্রে অধঃপতিত হয়। আমিই নিখিল ব্রহ্মাণ্ডের সৃষ্টি ও লয়ের কারণ। হে ধনঞ্জয়, আমার চেয়ে শ্রেষ্ঠ পরমার্থ তত্ত্ব আর কিছু নেই।
এরপর ব্রাহ্মসংহিতায় ( ৫/৩৫) ব্রহ্মাজী আরও বলেছেন,

শ্রীকৃষ্ণ স্বরূপত এক তত্ত্ব হয়েও তাঁর অচিন্তশক্তির মাধ্যমে তিনি অনন্ত কোটি ব্রহ্মাণ্ড সৃষ্টি করেন। সমস্ত ব্রহ্মাণ্ড তাঁর মধ্যেই বর্তমান এবং তিনি যুগপৎ সমস্ত ব্রহ্মাণ্ডের পরমাণুতেও পূর্ণরূপে অবস্থিত। সেই অনাদিরাদি গোবিন্দকে আমি ভজনা করি।

তিনি আরও বলেছেন,

প্রভাবশালী এঁরই প্রভা ব্রহ্ম, কোটি কোটি ব্রহ্মাণ্ডে যাঁর ক্ষিতি, অপ, প্রভৃতি বিভূতি পরিব্যাপ্ত এবং যিনি নিষ্কল, অর্থাৎ, অখণ্ড, অনন্ত ও অশেষভূত; সেই অনাদিরাদি গোবিন্দকে আমি ভজনা করি।

অর্থাৎ, উপনিষদে যাঁকে নির্ব্বিশেষ ব্রহ্ম বলে আখ্যা দেওয়া হয়েছে সেই নির্ব্বিশেষ ব্রহ্ম ভগবান শ্রীকৃষ্ণেরই অঙ্গকান্তি। এ প্রসঙ্গে শ্রীমদ্ভাগবতেও ঠিক একই কথা বলা হয়েছে। শ্রীমদ্ভাগবতের দশম স্কন্ধের দ্বাদশ অধ্যায়ের একাদশ শ্লোকে বলা হয়েছে,

ইনিই হচ্ছেন সেই পরম ব্যাক্তি, যাঁকে মহান মুনিঋষিরা নির্ব্বিশেষ ব্রহ্ম বলে জানেন এবং সাধারণ মানুষেরা জড়া প্রকৃতির সৃষ্টি বলেই মনে করেন।

শ্রীমদ্ভগবদ্গীতায় (১৪/২৭) ভগবান নিজেও বলেছেন যে, তিনিই ব্রহ্মের প্রতিষ্ঠা, এমনকি উপনিষদে ঈশ্বরের যে বিরাট রূপের উল্লেখ রয়েছে, সেই বিরাট রূপের আশ্রয়ও ভগবান শ্রীকৃষ্ণ স্বয়ং। কারণ, ভগবান শ্রীকৃষ্ণ শ্রীমদ্ভগবদ্গীতার একাদশ অধ্যায়ে অর্জুনকে তাঁর বিরাট রূপ দর্শন করিয়েছিলেন। এসব ছাড়াও, অথর্ববেদীয় গোপালতাপনী উপনিষদে (পূর্ব-১৯) বলা হয়েছে,

একমাত্র শ্রীকৃষ্ণই হচ্ছেন পরমেশ্বর ভগবান এবং তিনিই আরাধ্য। তিনি এক হয়েও অনন্ত রূপ ও অবতারের মাধ্যমে প্রকাশিত হন।

‘যদা যদা হি . সম্ভবামি যুগে যুগে’ – গীতায় কৃষ্ণের এই বাণী অত্যন্ত পরিচিত। পৃথিবীকে ভারমুক্ত করার জন্য এর আগেও তিনি একাধিকবার এসেছিলেন। দুষ্টের বিনাশ করতে এবং জগত সংসারে শান্তি ছড়িয়ে দিতে বিষ্ণুর অবতার রূপে মর্ত্যে আবির্ভূত হন। ‘শ্রীমদ্ভাগবদ্গীতা’ ও মহাভারতের কাহিনি অনুসারে, ভগবান শ্রীকৃষ্ণ বহুবার দুঃস্থ ও দুর্গতদের রক্ষা করেছিলেন। জানা যায়, বাল্য বেলায়ই তিনি কংসের বোন পুতনাকে বধ করে ছিলেন।পরে তার মামা অত্যাচারী কংসকেও বধ করেন।এই ভাবে তিনি অঘাসুর,বকাসুর সহ অনেক অসুর নিধন করে পৃথিবীতে সত্য ও ন্যায় স্থাপন করেছে।বাস্তব জীবনে আমাদেরও উচিত পরমেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণের আদর্শ ধারণ করে পৃথিবীতে সত্য ও ন্যায়ের আলো প্রজ্জ্বলিত রাখা।

লেখক

জীবন কৃষ্ণ সরকার
কবি ও প্রাবন্ধিক
তথ্যসূত্রঃ বিভিন্ন ধর্মগ্রন্থ,অনলাইন পোর্টাল,উইকিপিডিয়া,anuragdasmodhuban.com

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে