শাহেদ আলী’র জীবন কথা।।শাহেদ আলীর আত্মজীবনী

0
720

আমার পিতা মরহুম ইসমাইল আলী আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিত ছিলেন না। কিন্তু পুথি সাহিত্যের নিষ্টাবান একজন পাঠক ছিলেন। বাড়িতে বিশাল বিশাল কলেবরে সমৃদ্ধ ছিল পুথি সাহিত্যের ভান্ডার, যেমন- ‘আমির হামজা’,‘শাহানামা’, ‘হাতেম তাই’, ‘জঙ্গনামা’, ‘শহীদে কারবালা’ ইত্যাদি। মাঝে মাঝে বাড়িতে আসরও বসত জারি ও সারি গানের। জারি গানেরও তিনি দক্ষ ছিলেন। তাই মাঝে মাঝে আশেপাশের গ্রামেও ডাক পড়তো জারি-সারি গানের আসরে। মানুষ শুধু গল্প শুনে তৃপ্ত হন না সুরের মূর্ছনায় নিজেদের ভাসিয়ে দিতে চায়। আমার শিশুমনে বাবার পুথি পড়ার সেই সুরের মূর্ছনা একটি নতুন দুয়ার খুলে দিয়েছিল সেই মনের দুয়ার দিয়ে সাহিত্য সৃষ্টির একটি ঐশ্বরিক প্রেরণা আমি অনুভব করতাম।
সেই প্রেরণার উৎসভূমি আমার সাহিত্যের জগত। অপরিশোদ্ধ বাবার সেই ঋণকে স্মরণ করে এই বইটি উৎসর্গ করলাম।

বিশেষ কৃতজ্ঞতা:
এই বইটির লেখার পেছনে যাদের উৎসাহ, উদ্দীপনা ও শ্রম দিয়েছেন তাদেরকে
কৃতজ্ঞ অন্তরে শুভেচ্ছা ও শুভকামনা জানাচ্ছি-
১. লেখক ও গবেষক অধ্যাপক মুহম্মদ মতিউর রহমান
২. লেখক ও গবেষক আহমদ মমতাজ
৩. কবি সোলায়মান আহসান
৪. মোহাম্মদ কামরুল আহসান
৫. আহমেদ রুহুল্লাহ (লেখকের মেঝ ছেলে)
৭. আহমেদ ফজলুল্লাহ (লেখকের ছোট ছেলে)
৮. কবি ও প্রকাশক এনাম রেজা

যারা জীবনী লিখতে সাহায্য করেছেন-
১. অধ্যাপক তানভীর আহমেদ
২. মোহাম্মদ মাসুদ
৩. রফিকুল ইসলাম

যারা নানাভাবে বইটি প্রকাশ করার ব্যাপারে শ্রম ও ক্রটি-বিচ্যুতি ধরিয়ে দিয়ে আমাকে উপকৃত করেছেন-
৩. মোহাম্মদ শেখ ফরিদ (রাহাত)
৪. কবি ও গল্পকার এনাম রাজু

সম্পাদকীয়

আমাদের গ্রন্থ ভূবনের পরিমন্ডলে আত্মজৈবনিক গ্রন্থের সংখ্যা খুবই অপ্রতুল। এই অপ্রতুল সংখ্যা শুধু গ্রন্থ লেখার মধ্যে নয়-বুদ্ধি, মেধা ও গুণের উৎকর্ষতায় সমুজ্জ্বল জীবনীকারদের জীবন কথা না লেখার কারণেও।
আত্মজীবনী শুধু একটি মানুষের জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত বিস্তৃত কর্মসম্ভারের বিবরণ নয়, কাল-সময়, রাজনীতি ও ইতিহাসেরও দলিল। কথাশিল্পী শাহেদ আলীর জীবনকথা গ্রন্থখানি অনেকটা তদ্রুপ।
সিলেটের সুনামগঞ্জ জেলার তাহেরপুর থানার মাহমুদ গ্রামে ১৯২৫ খ্রিস্টাব্দে সাধারণ মধ্যবিত্ত পরিবারে তাঁর জন্ম। মৃত্যু হয় ২০০১ সালের ৬ই নভেম্বর বনানীস্থ এগারো নাম্বার সড়কের ডি ব্লকের আশি নাম্বার বাসায়। এসময় থেকে আজতক সময়-কাল ও ইতিহাসের অনেক বিবর্তন ঘটে গেছে। এই বিবর্তনের বহুমাত্রিক বর্ণাঢ্য রূপ আমরা তাঁর জীবন চরিত্রে লক্ষ্য করি। শৈশব, কৌশর, যৌবন, পৌঢ় ও বাধ্যর্কের অন্তিম সময় পর্যন্ত তাঁর ঐতিহ্যময় জীবনটি নানা কর্মে সমৃদ্ধ করে গেছেন। একদিকে তিনি ছিলেন কালজয়ী ও বহুমূখি প্রতিভার এক অনন্য মণীষীতুল্য ব্যক্তিত্ব। অন্যদিকে গেথে গেছেন সুচারু কালি-কলম ও মন দিয়ে গ্রাম বাংলার অতি সাধারণ মানুষের জীবনগাথা। দেশ ও জাতির কল্যাণে গঠনমূলক কর্মসেবায় তিনি ছিলেন আজন্ম নিবেদীত একজন সাধক। তাঁর আত্মজীবনী গ্রন্থখানা জীবনের অন্তিম সময়ে তাঁর একান্ত শুভার্থীদের ও পরিবারের একান্ত পীড়াপীড়িতে কঠিন রোগে আক্রান্ত অবস্থায় ভীষণ মনোবল ও ধৈর্য্য সহকারে লেখা। তাঁর মুখ থেকে উচ্চারিত ঐশ্বর্যময় শব্দমালা অন্যজনের হাতে লেখা হয়েছে। অনেক কথা মুখে বলার জন্য বুঝায় ভুলে ঠিক মতো লিখা হয়নি। এ সমস্ত ক্রটি-বিচ্যুতির জন্য পরিবারের পক্ষ থেকে আমরা ক্ষমা প্রার্থী। তাঁর পরেও বলবো, এই অসাধারণ গ্রন্থটি তাঁর জীবনের প্রতিটি ক্ষণকে হৃদয়রসে সমৃদ্ধ করেছে। জীবন ও জগতের উপলব্ধিকে পাঠক মনকে ব্যতিক্রমধর্মী ভালোলাগার আনন্দে বিমোহিত করবে বলে আমার বিশ্বাস। চেনা-অচেনা এক অপার্থিক সুন্দরের লীলাভূমি অজপাড়াগাঁয়ে বেড়ে ওঠা অমর কথাশিল্পী শাহেদ আলীকে যারা জানেন না তারাও নবচৈতন্যে উদ্বেলিত হবেন। পরিশেষে পাঠকের কাছে এই মহান কথাশিল্পীর জন্য পরম করুণাময়ের দরবারে মাগফেরাত কামনায়।

ভাষাসৈনিক প্রফেসর চেমন আরা

সূচি

আমার পূর্বপুরুষ
বাল্যকাল
শিক্ষাজীবন
সিলেট রেফারেন্ডাম
ভাষা আন্দোলন, তমদ্দুন মজলিস ও আমি
১৯৫৪ সালের যুক্তফ্রন্ট নির্বাচন
চট্রগ্রাম জীবনের কথা
চট্রগ্রামের ঘুর্ণিঝড়
ইসলামি একাডেমির ইতিকথা
ইসলামি একাডেমি (১৯৬২-১৯৮২)
বাংলা কলেজ প্রতিষ্ঠা
আবুজর গিফারী সোসাইটি ও কলেজ প্রতিষ্ঠা
আমার গ্রামীণ জীবনের অভিজ্ঞতা
মালয়েশিয়া সাহিত্য অনুষ্ঠানে সরকারি প্রতিনিধি হিসেবে যোগদান
দুবাই সাহিত্য সম্মেলনে যোগদান
শিশুদের জন্য তামরিণ স্কুল প্রতিষ্ঠা মোয়াজ্জেমপুর স্কুল ও আমার স্বপ্ন
আমার প্রথম বই
পরিশিষ্টে অধ্যাপক শাহেদ আলীর সংক্ষিপ্ত জীবনী

আমার পূর্বপুরুষ

সকল মা-বাবার মত আমার আব্বা-আম্মাও আমার জন্মের আগে থেকেই আমার শুভ-অশুভ, ভালো-মন্দ নিয়ে ছিলেন উদ্বিগ্ন। আমার আগে আমার একটা ছোট বোন জন্মেছিল, সে জন্মের সাথে সাথেই মারা যায়। আমাকে নিয়ে আব্বাÑআম্মার নানা স্বপ্ন, সেই সাথে দুঃচিন্তারও শেষ ছিল না। আমাদের ছিল বড় বা এজমালি একটি পরিবার। পরিবারের কর্তা ছিলেন একজন। ভাইদের [চাচাদের] মধ্যে দায়িত্ব ভাগ করা ছিল। প্রত্যেকেই উপার্জনের একটা দিক দেখতেন। কেউ জমি-জমা তদারকি করতেন, কেউ বনমহলের ইজারাদারি করতেন। কেউ বড় বড় নৌকা নিয়ে দেশে-বিদেশে বাণিজ্যে যেতেন। আমার আব্বা ছিলেন খুব শৌখিন মানুষ। সুরের পাগল ছিলেন তিনি। নিজে গান গাইতেন খুব চমৎকার। জারিগানের বয়াতি আমাদের বাড়িতেই থাকতেন। তাকে নিয়ে আব্বা গাঁয়ে গাঁয়ে জারি ও পুঁথির আসর বসাতেন। সেই আব্বার ওপরই ভার পড়ল বনের ইজারাদারি তদারকি করার। এতে তাঁর হাতে কিছু কাঁচা টাকা জমা হতে থাকে। তখনকার দিনে প্রায় ষোলশত টাকা। এই টাকাটা টোলের টাকা থেকে আলাদা করে রেখেছিলেন। কর্তা ছিলেন আমাদের গোষ্ঠীর বড় চাচা। তিনিই ছিলেন মাতব্বর। তাঁর হাতেই সবাই তাঁদের আয়ের টাকা এনে তুলে দিতেন।
আমার জন্মের পরে আব্বা ঐ ষোলশত টাকা নিয়ে পড়লেন বিপদে। এই টাকার খবর আম্মা ছাড়া আর কেউ জানতেন না। তাদের মনে হতে লাগল তাঁরা গোপনে এই টাকাটা জমা করে অপরাধ করেছেন। আম্মার মুখে শুনেছি এই নিয়ে আব্বা-আম্মা খুব অস্থির ছিলেন, পাছে না আমার কোনো অমঙ্গল হয়। তারপর একদিন সাহস করে বেতের পোটলা বের করে গোপনে গোপনে ইব্রাহিম চাচার হাতে তুলে দিলেন। চাচা প্রথমে বুঝতেই পারেননি ব্যাপার কী? পরে আস্তে আস্তে সব কিছু খুলে বললেন। চাচা শুনে খুব খুশি হলেন। এভাবে আমার আব্বা-আম্মা একটা বড় মাপের মানসিক দুঃচিন্তা থেকে নি®কৃতি পেলেন।
ছোটবেলায় আমার অসুখÑবিসুখ প্রায় লেগেই থাকত। আমার অসুখ সারাবার জন্য কবিরাজরা যে পরামর্শ দিতেন আম্মা তাই করতেন। আমার বাপÑচাচারা একান্নবর্তী পরিবারে ছিলেন। অনেক লোকজন বাড়িতে, আমি আমার দাদির কোলে কোলেই থাকতাম। তখনকার দিনে কলেরা মহামারির প্রকোপ ছিল ভীষণ। প্রতিবছর আশ্বিন-কার্তিক মাসে প্রায় নিয়মিত কলেরা হানা দিত। লোকেরা বলত ‘ওলাউঠা’ এসেছে। এর কোনো চিকিৎসা ছিল না। আমার বয়স যখন বছর খানেক তখন নাকি আমাদের গাঁয়ে একবার কলেরা লাগে। আমাদের বাড়িতেই আঠারোজন লোক মারা যায়। আমারও কলেরা হয়েছিল। আমার দাদি আমাকে বুকে নিয়ে কাঁদতে কাঁদতে আল্লাহর কাছে মুনাজাত করতেনÑ ‘আল্লাহ আমার নাতিকে রক্ষা করো।’ এভাবে কাঁদতে কাঁদতে দাদি নিজেই অসুস্থ হয়ে পড়লেন, আর আমাকে রেখে চিরদিনের জন্য চলে গেলেন। আমার বড় চাচা ইব্রাহিমও কলেরায় মারা গেলেন। চাচীরাও কয়েকজন মারা গেলেন। কবর দেওয়ার জায়গা পাওয়া যায়নি কোথাও। দাদিকে বাড়ির পিছনে করজ বাগিচার কিনারে কবর দেওয়া হলো। বহুদিন পর্যন্ত কবরটা ছিল। এখন আর তার কোনো চিহ্ন নাই। বড় চাচার কবর দেওয়া হয়েছিল বাড়ির দক্ষিণে বিছড়া ক্ষেতের আইল কেটে। বহু বছর সেই কবরটা টিকে ছিল। কবরের পাশ দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে মনে পড়ত চাচার কথা। যদিও জীবিত অবস্থায় তাঁকে দেখেছি বলে মনে পড়ে না।
কলেরায় বাড়িটা প্রায় সাফ হয়ে গেলো। একটা বাড়ি থেকে আঠারো জন লোক মারা যাওয়ার ব্যাপারটা কল্পনা করতেও ভয় পাওয়ার কথা। কি অসহায় না ছিল মানুষ! এরপরেও বহুবার কলেরা হয়েছে কিন্তু এমন মহামারি আকারে নয়।
আমাদের গাঁয়ের নাম মাহমুদপুর। কার নামানুসারে এই নামকরণ হয়েছে তা জানি না। আশেপাশের গ্রামগুলোর নাম থেকে এই নামটার একটা বৈশিষ্ট্য আছে। কয়েকটা গ্রামের নাম বলিÑ কাউয়ানী, চাপাইতি, মজুমপুর, মিশুমপাড়া, ভারারচাপর, ভুমাল, লামাগাও, উইকোরগাও, রামশিংপুর, মোয়াজ্জেমপুর ইত্যাদি। এর মধ্যে মাহমুদপুর নামটি বিশেষ পরিচয় বহন করে। গ্রামে কোনো স্কুল ছিল না। দ্বীনে ইল্মে শিক্ষা করার জন্য একজন মৌলবি রাখা হতো আমাদের বাড়িতে। তিনি বাড়ির ছেলেমেয়েদের সকাল-বিকেল পড়াতেন, আমপারা ছবক দিতেন। নানা ধর্ম-কর্ম শিখাতেন। আমাদের সঙ্গে পাড়ার ছেলেমেয়েরাও এসে পড়ত। সে এক জমজমাট অবস্থা। কাচারি ঘরে চাটাই পাটি বিছায়ে শুরু হতো পাঠদান কার্যক্রম। ছেলেমেয়েরা একসাথে সুর করে পড়ত। আর এভাবেই আরবিতে হাতেখড়ি হয়েছিল আমার। আমাদের এলাকায় কাচারি ঘরকে বলা হতো লাখারিঘর। আজকালকার পরিভাষায় বলা হয় বৈঠকখানা। এই কাচারি ঘরে রাতের বেলা কামলারা ঘুমাতেন। আর দিনের বেলা চলত পাঠদান।
আমার পূর্বপুরুষেরা কেন এখানে এসে বসতি স্থাপন করেছিল তার কারণ আমার কাছে খুব স্পষ্ট নয়। নদীর পাড় থেকে বেশ দূরে অনেকটা দক্ষিণে মাঠের মধ্যে করা হয়েছিল বাড়িঘর। ডোবা জায়গা, দিঘি বা পুকুর হতো না ঐ এলাকায়। মাটি কেটে ভিটা করতে গিয়ে যে গর্ত হতো, তাকে স্থানীয় লোকের ভাষায় বলত পাগার। সেই পাগারে পানি জমে থাকত। এই পানি ব্যবহার করত স্থানীয় লোকেরা। আর খাবার পানি আনত নদী থেকে, গোসলও করতো নদীতে। আমাদের এলাকায় দেখা যায় প্রাচীন গ্রামগুলোর সবই নদীর ধারে।বেশির ভাগ গ্রামই হিন্দু গ্রাম। তারা পানির সুবিধা দেখে বাড়ি ঘরের স্থান নির্বাচন করত। আর যারা পরে এসে বাড়ি নির্মাণ করত তারা সেই সুবিধা পেত না।
আমাদের নদীটা ছিল বেগবতী নদী। আমার পূর্বপুরুষ সম্ভবত চুনের ব্যবসা করতেন। নদীর তীরে তীরে জমজমাট চুনের ব্যবসা ছিল তাদের। নদীর কূলে পাথর পুড়িয়ে চুন তৈরি করা হতো। সেইসব পাথর পোড়ানো চুনের নমুনা এখনো নদীর কিনারে কিনারে রয়েছে। লাল টকটকে ইটের তৈরি পাথর পোড়ানো চুল্লিগুলো এখনো হারিয়ে যাওয়ার স্মৃতি বহন করছে। ১৩০৪ বাংলা সনে [১৮৯৭ খ্রি:] যে প্রচ- ভূমিকম্প হয়েছিল তাতে নদীটা মরে যায়। ফলে বন্ধ হয়ে যায় আমাদের চুনের ব্যবসা। চুন নিয়ে বড় বড় জাহাজ, নৌকাÑ ঢাকা, ভৈরব, নারায়ণগঞ্জ যাওয়ার পথ বন্ধ হয়ে যায়। ফলে মানুষ চাষাবাদের দিকে নজর দেয়। বন-জঙ্গলে ঢাকা ছিল এলাকা। সেইসব বন-জঙ্গল সাফ করে খ- খ- জমিতে ধান চাষ করতে থাকে। কিন্তু বুঝা যায় চাষাবাদে তারা অভিজ্ঞ নয়। ফলে অন্যান্য অঞ্চল থেকে তাদের শ্রমিক আমদানি করতে হতো চাষাবাদ করার জন্য। আর গ্রামে তাদের বলা হতো কামলা।

বাল্যকাল

আমাদের এলাকায় যারা আবাদি বলে পরিচিত তারা সবাই এসেছে সেইসব এলাকা থেকেÑ বাংলাদেশের যেসব এলাকায় যুগ যুগ ধরে ধান চাষ হয়ে আসছে। কিভাবে ধান চাষ করতে হয় তারা তা ভালো করে জানে। এই অভিজ্ঞতা তাদের হাজার বছরের। আর আমাদের এলাকার বনজঙ্গল সাফ করে গহীন অরণ্যকে শস্যÑশ্যামল কৃষিতে পরিণত করেছে। স্থানীয় বাসিন্দাদের আশ-পাশেই তো পড়েছিল এই সোনার খনি। চাষবাসে অনভ্যস্ত এলাকার লোকেরা তাদের হাতের নাগালের মধ্যে এইসব জমিজমা থাকা সত্ত্বেও তার ব্যবহার জানত না। আজ তারা অবাক হয়ে লক্ষ্য করছে যে বহিরাগতরা কিভাবে যুগ যুগ ধরে বনজঙ্গলে আবৃত এই জমি উদ্ধার করে সোনা ফলাচ্ছে। ওদের গ্রামগুলো দেখলেই বুঝা যায় কী অপূর্ব সমৃদ্ধির জোয়ার এসেছে ঐসব গ্রামে। ওরাই এখন আমাদের গ্রামের উঠতি বিত্তবান শ্রেণীর লোক, যারা নানান রকমের ফসলের আবাদ করে এলাকাটিতে একটা সমৃদ্ধির জোয়ার এনে দিয়েছে।
চুনের ব্যবসা বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর বাঁচার তাগিদে নতুন নতুন জীবিকার পথ আবিষ্কার করার যে উদ্যোগ আবশ্যক ছিল, তার অনুপস্থিতি এলাকাটিকে করেছিল পশ্চাৎমুখী। লেখাপড়ার কোনো সুযোগ ছিল না। আমার চাচা হরমুজ আলী মাদরাসায় পড়তে গিয়েছিলেন সিলেট শহরে। দুর্লভপুরে একটি প্রাইমারি স্কুল স্থাপিত হলে সেখানে আমাদের বাড়ির ছেলেমেয়েরা দলবেঁধে ভর্তি হলো। কিন্তু স্কুলটি বেশি দিন টেকেনি। সুনামগঞ্জের মাইজবাড়ির মর্তুজ আলী পীর ছিলেন এই স্কুলের একমাত্র শিক্ষক। আমিও সেই স্কুলে প্রথম ভর্তি হয়েছিলাম। সবার সঙ্গে দল বেঁধে স্কুলে যেতাম।
বাড়িতে সবার সঙ্গে আরবি পড়তাম। পাখিছিড়ির মৌলবি সাহেব আমাদের বাড়িতে থাকতেন। তিনি খুব শৌখিন মানুষ ছিলেন। তিনি সপ্তাহে একবার তার কাপড়চোপর ধোয়াতেন। গাঁয়ে কোনো ধোপা ছিল না। আমরাই সাবান দিয়ে কাপর ধুয়ে দিতাম। কখনো বাকলার ছাল পুড়িয়ে ক্ষার তৈরি করে সেই ক্ষার দিয়ে কাপড় ধোয়া হতো। মৌলবি সাহেব কালিব দিয়ে টুপি পড়তেন। আমরা নদীর ঘাটে কাপড় ধুয়ে দিতাম। বকের ছানার রোস্ট ছিল তার প্রিয় খাবার। নদীর ওপারে মহজমপুর গ্রামের করজ বাগিচায় অসংখ্য বক ভিড় করত। বাসা বানিয়ে বাচ্চা তুলত। মৌলবি সাহেব আমাদের বকের বাচ্চা নামানোর জন্য গাছে তুলে দিতেন। একটা ব্যাপার লক্ষ্য করেছি যে, মজুমপুর করজ বাগিচায় বকেরা ভিড় করত, শরীফপুর বাগিচায় বকেরা ভিড় করত, ওয়াকপাখি, খাসিগার বাগিচায় জমা হতো পানকৌড়ী। পাখিদের থাকার এই জায়গা নির্বাচনটাও আমার কাছে কেমন যেন রহস্যময় মনে হতো।
আমাদের বাড়িতে আরেকবার কলেরা লাগল। সেই কলেরায় পাখিছিড়ির মৌলবি সাহেব মারা যান। আমাদের পারিবারিক গোরস্থানে তাঁকে কবর দেয়া হয়। গোরস্থান ঠিক বলা যায় না। আমাদের পোড়াবাড়ির একটা ভিটায় তাঁকে দাফন করা হয়। আমাদের দুঃখের শেষ ছিল না, মৌলবি সাহেব কত আদর করতেন আমাকে ! আমার চোখের সামনে তাকে কবরে শুইয়ে দেয়া হলো। পাখিছিঁড়ি গ্রামটা আমার কাছে স্বপ্নের কোনো গ্রাম বলে মনে হতো। কোথায় সেই পাখিছিঁড়ি তা জানি না। তাঁর মৃত্যুর খবর শুনে সে গাঁয়ের কেউ এসেছিল কিনা তাও আমার মনে পড়ে না। কত লোকের কাছে জিজ্ঞেস করেছি পাখিছিঁড়ি গ্রামের কথা কিন্তু কেউ বলতে পারে না, সেই গ্রামের কথা জিজ্ঞেস করলে শুধু বলে পূর্ব দিকে, পূর্ব দেশে। অতি সম্প্রতি জানতে পেরেছি যে বিশ্বনাথ থানায় পাখিছিঁড়ি বলে একটা গ্রাম আছে। আমার খুবই ইচ্ছে হয় গ্রামটা খুঁজে বের করি।
আমার দাদা ছিলেন খুব সুন্দর মানুষ। লোকমুখে শোনাকথা, আমি তাঁকে দেখিনি, আমার জন্মের আগেই তিনি মারা যান। তিনি কবিরাজি করতেন। দেশে তাঁর পরিচয় ছিল ডাক্তার হিসেবে। নিজে অনেক ওষুধ তৈরি করতেন এবং নিজের ওপরই সেগুলো ইজতেমাল করতেন। কোনো বিরূপ প্রতিক্রিয়া হলে তার প্রতিষোধকও খাইয়ে দিতেন। দাদা চোখের ডাক্তার হিসেবে ছিলেন মশহুর। বহু অন্ধ লোককে তিনি চোখের ছানি কেটে চোখের দৃষ্টি ফিরিয়ে দিয়েছেন। তিনি যে ছুরি-কাঁচিগুলো ব্যবহার করতেন সেগুলো আমি আমার বাড়িতে দেখেছি আমার চাচা মরহুম হরমুজ আলীর কাছে। তিনিও চোখের ছানি কাটা শিখেছিলেন আমার দাদার কাছে। আমার চাচাও খুব সুন্দর মানুষ ছিলেন, সোনালি রঙ ছিল তার। আমি যখন মাইনর স্কুলে পড়ি তখন আমার চাচা মারা যান। তাঁর ইচ্ছা ছিল তার প্রথম কন্যা জমিলাকে আমার কাছে বিয়ে দেবেন। কিন্তু আমি রাজি না হওয়াতে সে বিয়ে হয়নি। আমার একটা জিদ ছিল লেখাপড়া শেষ না করে বিয়ে করব না। পরে জমিলার বিয়ে হয় আমাদেরই এক আত্মীয়ের সাথে। সে এখন ছেলেÑ পুলে, নাতিÑ নাতনি নিয়ে খুব সুখেই আছে।
চাচার সঙ্গে আমার একটা হাস্যকর স্মৃতি মনে পড়েÑ আমার মাথার চুল লম্বা হয়ে গিয়েছিল, তিনি বললেন আয় আমি কাঁচি দিয়ে তোর চুল কেটে দেই। কিন্তু চুল কাটা তো এত সহজ নয়। তবুও তিনি এবড়োথেবড়ো করে কাটলেন। আমার সে কি কান্না ! মাথাটা হয়ে গেলো ইঁদুরে খাওয়া মাথার মত। পা লাফিয়ে কাঁদতে কাঁদতে রাগের চোটে বললামÑ আমার মাথার চুল ফিরিয়ে দিতে হবে। এভাবে কাঁদতে কাদঁতে নৌকায় উঠে এক ধাক্কায় নৌকা ভাসিয়ে চলে গেলাম অনেক দূরে। তারপর নৌকার গলুই থেকে পরে গেলাম।পরে গিয়ে থুতনিতে লেগে থুতনি গেলো কেটে। সেই কাটা দাগ এখনো বহন করছি। থুতনির সেই ক্ষত শুকাতে অনেক দিন লেগেছিল।
বাড়িতে আম্মার কাছাকাছি আমি থাকতাম। আম্মা ছিলেন আমার জন্য পাগল। আমার জন্মের চার বছর পর জন্ম নেয় আমার ছোট বোন আছিয়া। এই চার বছর আমি একাই আম্মার কোল দখল করে ছিলাম। আমার চাচা মৌলবি হরমুজ আলী বিয়ে করেছিলেন নোয়ানগর । সেই চাচি একটি ছেলে রেখে মারা যান। তখন চাচা পড়লেন সংকটে। ছেলেটিকে কিভাবে বাঁচাবেন। ছেলেটির নাম রেখেছিল হোসেন আলী। আম্মা বললেনÑ চিন্তা কিসের, আমি ওকে লালন-পালন করব। আমার এক বুকের দুধ খাবে হোসেন আর আরেক বুকের দুধ খাবে আমার ছেলে। সেই থেকে আমি আর হোসেন মায়ের কোলে কোলে থাকতে লাগলাম। হোসেন স্বভাবে খুব ঝগড়াটে ছিল আর আমি ছিলাম খুব শান্ত প্রকৃতির ছেলে। বয়সে যদিও আমি ওর চেয়ে বড় ছিলাম তবুও আমি ওর সাথে মারামারিতে পেরে উঠতাম না। তখন আম্মা খুব রাগ করতেন আমার উপর, বলতেনÑবোকা ছেলেদের মত কেবল মার খাবি, কাউকে মার দিতে আর পারবি না! আসলেই আমার স্বভাবে মারামারি করার কোনো গরিমা ছিল না, আর এখনো নাই। বড় হয়ে হোসেনের বিয়েতে আমি ওকালতি করতে গিয়েছিলাম। হোসেন তাহলে আমার চাচাত ভাই এবং দুধ ভাই! সেই হোসেনের ছেলের ঘরের একটা নাতনি এখন ঢাকায় কলাবাগানে থাকে, আমার ছোট বোন হেনার সঙ্গে।

তখনকার দিনে একটু বড় হয়ে কাপড় পড়ার রেওয়াজ ছিল। আমার নানা একদিন আমাদের বাড়িতে বেড়াতে এসেছিলেন। নানার বাড়ি ছিল প্রথমে বারহাট্টা থানার গুড়ল গ্রামে। পরে তারা চলে এসেছিল ঐ থানারই গাবারকান্দা গ্রামে। নানা ছিলেন একজন হাজি। তাঁর হজের সময়টা আমার জম্মের প্রায় কাছাকার্ছি ছিল। আর আমার হজ করার সৌভাগ্য হয়েছিল ১৯৮৮ সালে প্রায় ৭৫ বছর পরে। হজের তওয়াফ করতে গিয়ে নানা-নানির কথা মনে পড়েছিল। তারা তো এই পথে তওয়াফ করেছিলেন। ইট পাথর আর কাঁকড় বিছানো পথে কি কষ্টই না তাঁদের করতে হয়েছে। আমি ৭৫ বছর পরে তাদের এক নাতি সেই পথ ধরে হজ করতে বেরিয়েছি। তাঁরা গিয়েছিলেন বোম্বাই থেকে জাহাজে করে। তাদের যেতে মাসের পর মাস লেগেছে। আর আমি তো ঢাকা থেকে বিমানে করে এক দিনেই জেদ্দা এসে পৌঁছেছি। তারপর প্রাইভেট কার করে মক্কাÑ মদিনায় গিয়েছি। আমি কত সহজেই না হজ পালন করেছি । কিন্তু আমার নানা নানি কি পেরেছে এমন সহজভাবে হজ পালন করতে?
আমার নানা আলহাজ্ব সমিরউদ্দিন মক্কা শরীফের একটা গিলাফের টুকরা এনেছিলেন আমার জন্য। সেই টুকরা তাবিজের মতো করে বেঁধে দিয়েছিলেন আমার বাহুতে। নানা আমাদের বাড়িতে বারান্দায় ঘরের একটা খুঁটিতে হেলান দিয়ে বসতেন, নানা ছিলেন হালকা-পাতলা গড়নের লম্বা মানুষ, মাথায় সবসময় পাগড়ি বাঁধা থাকত। আমি হামাগুড়ি দিয়ে তার কোলে উঠতাম। নানার কোনো কথাবার্তা আমার মনে নেই। তিনি কেবল আমাকে কোলে নিয়ে চুমু খেতেন আর দোয়া করতেন। এর পরের কথা আমার আর মনে নেই। নানা কখন, কোন খানে মারা গেছেন তাও আমার মনে নেই। কিন্তু আমার নানি বেঁচেছিলেন অনেকদিন। বড় হয়ে আমি আমার নানিকে নিয়ে একটা গল্প লিখেছিলামÑ ‘নানির ইন্তেকাল’। আমার আম্মা তাঁর বাবা-মায়ের খুব আদরের মেয়ে ছিলেন। অল্প বয়সেই আমার মায়ের বিয়ে হয়েছিল। আমার মায়েরা ছিলেন তিন বোন। বড় বোনের বিয়ে হয়েছিল রামপুরে আর ছোট বোনের বিয়ে হয়েছিল গুড়ল বড় বাড়িতে। নানিই এই বিয়ে দিয়েছিলেন। বড়খালা খুব সাদাসিদা ছিলেন আর ছোট খালা ছিলেন অনেক চালাক-চতুর। কিন্তু কষ্টের জীবনটা ছোট খালাকেই বেছে নিতে হয়েছিল।
আমাদের বাড়িতে বার বার কলেরায় অনেক লোক মারা গেলেও অন্যান্যরা বেঁচে ছিল। এত বড় বাড়িতে এতগুলো লোকের খাবার দাবার কাপড়-চোপর দেওয়া রীতিমত একটা সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছিল। পরে স্থির করা হলো যে এই পরিবার কয়েকটা ভাগে ভাগ করা হবে। বড় চাচা ইব্রাহীম ও তার ছেলেরা, মেঝ চাচা খলিল ও রাঙ্গা চাচা [ইব্রাহীম] থাকবেন এক ভাগে। আর ওদিকে আমার আব্বা আর আমার চাচা আব্বাস আলী থাকবেন একসাথে আরেক ভাগে। ইব্রাহিম, খলিল ও হরমুজ আলী ছিলেন বেচু বেপারির ছেলে। সম্ভবত আমাদের এলাকায় চুনের ব্যবসায় নেতৃত্ব দিতেন তিনি। যে কারণে তার নাম হয়েছিল ‘বেপারি’। ডাক্তার হেদায়েত উল্লাহর সন্তান ছিলেন আমার আব্বা। ইসমাইল ও তার সৎভ্রাতা আব্বাস। বেচু বেপারি ও ডাক্তার হেদায়েত উল্লাহর আব্বা ছিলেন ওমর পালোয়ান তিনি মহাশক্তিধর পুরুষ ছিলেন। জনশ্রুতি ছিলÑ একবার মধ্যনগর বাজার থেকে ফেরার পথে এক অশুর তার পিছু নিয়েছিল। তখন তিনি একটি লাঠির আঘাতে ঐ অশুরকে হঠিয়ে দিয়েছিলেন। অশুর লাফ দিয়ে পড়েছিল ফনাবিলের কাঁদার মধ্যে। আশেপাশের গ্রামের লোকেরা নাকি সেই শব্দ শুনেছিল।

আমার জন্মের কথা উঠলেই আব্বা-আম্মা বলতেন, বানের আড়াই বছর পরে জ্যৈষ্ঠ মাসের এক রোববারে আমি পৃথিবীতে এসেছি। ১৩২৬ [বাংলায়] ভীষণ বন্যা হয়েছিল পূর্ববঙ্গ ও আসামে। দিনটি ছিল আশ্বিন মাসের ২৬ তারিখ। সেই দিন থেকে হিসেব করলে আমার জন্ম হয় ১৩২৯ বাংলা সালের জ্যৈষ্ঠ মাসে। সেটি ছিল রমজান মাস। রমজানের ৯ তারিখে এবং জ্যৈষ্ঠ মাসের ১২ তারিখে আমার জন্ম হয়। আমার জন্মের চার বছর পরে জন্ম নেয় আমার বোন আছিয়া। দুধের মত রঙ ছিল তার। একটু বয়স হলেই সে পাখি পুষতে শুরু করে। শালিক পাখি, ঝুটি ময়না, টিয়া ইত্যাদি ছিল তার প্রিয় পাখি। সে পাখির জন্য মাঠে চুপি চুপি ফড়িং ধরতে যেত। সে নিঃশব্দে ফড়িং ধরার জন্য অগ্রসর হতো যেন তাকে দেখে ফড়িংরা পালিয়ে না যায়। বড় চুপচাপ মেয়ে ছিল আছিয়া, যাকে বলে ধৈর্যের প্রতিমা। আছিয়ার পরে জন্ম নেয় আমিনা। তারপর মেহেরুন্নেসা। বোনদের মধ্যে সবচেয়ে বুদ্ধিমতি এবং চঞ্চল ছিল আমিনা। চার বোনের এক ভাই আমি,তাই সবাই ঘিরে থাকত আমাকে নিয়ে। আমার আম্মা তার সন্তানদের নিয়ে খুুব গর্বিত ছিলেন। যখন নানার বাড়ি বেড়াতে যেতেন তখন সবাইকে নিয়ে যেতেন। মামুরা বিত্তবান লোক ছিলেন না কিন্তু খুব হৃদয়বান লোক ছিলেন। আমরা মামার বাড়িতে বেড়াতে গেলে তারা খুব ব্যস্ত হয়ে পড়তেন। এক মামু ছিলেন বড় শিকারি। পাখি শিকার ও মাছ ধরাতে তার কোনো জুড়ি ছিল না। তিনি বড় বড় রুই মাছ শিকার করতেন যুতি আর বড়শি দিয়ে। হাওড়ে কেউ মাছ না পেলেও মামু কখনো খালি হাতে ফিরতেন না। তার নিজের কোনো বন্দুক ছিল না কিন্তু তার পরিচয় ছিল শিকারি হিসেবে। এমন অব্যর্থ শিকারি এলাকায় তেমন কেউই ছিল না। যাদের বন্দুক ছিল তারা মামুকে খুঁজে বের করত তাকে দিয়ে পাখি শিকার করার জন্য। শিকারি বলতে তাকেই বুঝাত। আমাদের বাড়িতে এলেও মামু শীতকালে হাওরে হাওরে কাটাতেন বন্দুক নিয়ে। রাজহাঁস থেকে শুরু করে লেইক্কা পেরি বোয়াল, বালি হাঁস, চখাচখি ইত্যাদি কত হাঁস যে তিনি শিকার করতেন তার কোনো ইয়ত্ত্বা নাই! বক জাতীয় পাখির মধ্যে তিনি খাক পিডাইল্যা, জাইঠা, ধল বাহাদুর, কাচিচুড়া, অঁটা, ভয়াল প্রভৃতি শিকার করতেন। মামুর কথা কেবল আমাদের এলাকায় নয় বাড়হাট্টা থানার দশদার অঞ্চলে এবং কিশোরগঞ্জের দাওয়াইল এলাকায় তার খুব পরিচিতি ছিল। ঐ সব জায়গার জমিদাররা শিকারে বের হতেন আমার মামুকে নিয়ে। আর এখনতো শিকার প্রায় উঠেই গেছে। কিন্তু মামুর কাহিনি এখনো প্রায় ঘরে ঘরে পরিচিত। মামুর মত এমন শিকারি আর হয় না।
আমাদের বাড়িতে শিকারের শখ ছিল আমার চাচার। তাঁকে আমরা কালাচাচা ডাকতাম। প্রচ- সাহসী এবং পরিশ্রমী মানুষ ছিলেন আমার সেই চাচা। লোকে টাকা পয়সা জমিজমা বাড়ানোর চেষ্টা করতেন আর তিনি ছিলেন তার উল্টোটা। তিনি বন্দুক কিনলেন আর দৌড়ের নৌকা বানালেন। লড়াইয়ের জন্য ষাঁড় কিনলেন, পাহাড় থেকে ময়না পাখি আর কিংরাজ পাখি সংগ্রহ করলেন। কোড়া শিকারের জন্য গা ডুবিয়ে বসে থাকতেন মাঠের মধ্যে। চিকন সুগন্ধি চাউলের জন্য একটা প্লট আলাদা করে রাখতেন। তাঁর এসব সখের সঙ্গি হিসেবে পেয়েছিলেন তাঁর স্ত্রীকে। আমি ‘নিরন্তর’ গল্পে তার পরিবারের ট্র্যাজেডি ফুটিয়ে তোলার চেষ্টা করেছি। একদিন তাদের সবই ছিল কিন্তু তাদের পরিণতিটা হয়েছিল করুণ। চাচার এক ছেলে বেঁচে আছে। নাতি-পুতি অনেকগুলো, কিন্তু তারা সর্বহারা। আমি আগে যখন বাড়িতে যেতাম তখন ওরা আমার চারপাশে এসে ভিড় করত সাহায্যের জন্য। কেউ বলত আমি কুমিল্লা বা চাটগাঁয় যাব কাজ করার জন্য কিন্তু আমার যাবার ভাড়া নাই। আমি ভাড়ার ব্যবস্থা করে দিতাম। চাচার একটা নাতি বলত আমি তো বড়শি দিয়ে মাছ ধরি আমার বড়শিগুলো চুরি হয়ে গেছে কিন্তু এখন কিছু টাকা হলে আমি আবার সুতা কিনে মাছ ধরে বাঁচতে পারতাম।
অমনি আমি সুতা বড়শির ব্যবস্থা করে দিতাম। অথচ আমার চাচা আর আমার আব্বা সমান জমি নিয়েই ভাগ হয়েছিলেন। আমরা প্রত্যেক পরিবার পেয়েছিলাম পঁচিশ বিঘা করে খুব উন্নত ধানি জমি। আমার আব্বা কষ্ট করেছেন কিন্তু জমি হাতছাড়া করেন নি। আর আমার চাচার শখের কাছে জমির কোনো মূল্যই ছিল না। তিনি বেঁচে থাকতেই সব হারিয়ে কর্মহীন হয়ে গেলেন। মনে আছে চাচা একবার নজিরপুর হাট থেকে বড় বড় তিনটি ষাঁড় কিনে এনছিলেন বিক্রি করার জন্য। তখন এক একটা ষাঁড়ের দাম ছিল প্রায় সাত থেকে আট টাকা। আমাদের বাড়ির পূর্বপাশে ষাঁড় তিনটিকে কয়েকদিনের জন্য বেঁধে রাখা হয়েছিল। এত তাজা মসৃণ ছিল গরুগুলো, মনে হতো যেন পিঠে হাত রাখলে হাত পিছলে পড়ে যাবে। তখন ধান বিক্রি হতো প্রতি মণ ১৩Ñ১৪ আনা করে।
চাচার পরিবারের কাহিনি বর্ণনা করতে গেলে আমি খুব কষ্ট পাই। ভেঙেচুড়ে সব ধ্বংস হয়ে গেছে। এর মধ্যে এক কা- ঘটল। চাচা যখন প্রায় সর্বস্বান্ত তবুও বড় ছেলের বিয়ে দেবেন বড় পরিবারে। ভাটগাঁয়ে একটা মেয়েকে পছন্দ করা হলো। ওরা আমাদের বংশের পরিচয়ে রাজি হয়ে গেলো। কিন্তু বিয়ের আলাপের সময় তারা শর্ত দিয়ে বসল। আমার আব্বা না গেলে বিয়ে হবে না। আব্বাকে গিয়ে বলতে হলো, কালা তার আপন ছোট ভাই। একই মায়ের সন্তান তাঁরা। এই বিয়ের জন্য চাচাকে ঋণ করতে হয়েছিল। চাচা পাঁচ বিঘা জমি বিক্রি করে টাকা যোগাড় করলেন। জমি আর কেউ কিনতে চায় না বলে আব্বাই কিনে নেন। চাচার সংসারে ভাঙন শুরু হলো বড় রকমের। সেই ধ্বংস আর ঠেকানো গেলো না। দেখতে দেখতে সব জমিজমা তার হাতছাড়া হয়ে গেলো। শেষ পর্যন্ত চাচা তার বন্দুক, নৌকা এবং তার ভিটার টিনের ঘরটিও বিক্রি করে দেন। কিছুই রক্ষা করা গেলো না। চাচা চুপ হয়ে গেলেন, শেষের দিকে তেমন কথাবার্তা বলতেন না। চুপচাপ আকাশের দিকে তাকিয়ে কি যেন ভাবতেন। এভাবে চাচা একদিন মারা যান। চাচার পরিবার বলতে আর কিছু রইল না।

আমাদের বাড়িতে আমার চাচা সিলেটি নাগরীর চর্চা করতেন। লিখতেও পারতেন সিলেটি নাগরী। আমার আব্বা মগ্ন ছিলেন পুঁথি পাঠে। বাড়িতে বিশাল বিশাল বই ছিল। আমীর হামজা, শাহনামা, হাতেম তাই, জঙ্গনামা, শহীদে কারবালা ইত্যাদি। আরো কত বই আব্বা জোগাড় করে রাখতেন। অবসর সময়ে তিনি জোরে জোরে সুর করে পড়তেন। মাঝে মাঝে পুঁথি পাঠের আসর বসাতেন। আশপাশের লোকজন ভেঙে পড়ত সেই আসরে। সোহরাব রুস্তমের কাহিনি পড়তে পড়তে মাতম শুরু হয়ে যেত। জঙ্গনামা, ইমাম হাসানÑ হোসেনের কাহিনি পড়তে পড়তে আব্বার সাথে সাথে অনেক লোকজন তাদের চোখের পানিতে বুক ভাসাতেন। সিলেটের পূর্বাঞ্চল থেকে আমাদের এলাকায় যেসব মোল্লা-মৌলবি আসতেন তারা এসব পছন্দ করতেন না। এর বিরুদ্ধে নানা রকমের ফতোয়া দিতেন। আমার আব্বা এসব ফতোয়া মানতেন না। তিনি জারি সারি গান নিয়ে মগ্ন থাকতেন। জারি গানের বয়াতি নোয়াব আলী, যার গানের কণ্ঠ ছিল কোকিলের মত। তিনি জারি গানের নেতৃত্ব দিতেন। তার বাড়ি ছিল বারহাট্টা থানার হড়িয়াতল গ্রামে। গ্রামে গ্রামে জারি হতো আর বিভিন্ন দলের সঙ্গে প্রতিযোগিতা হতো। বয়াতি সাহেব আমাকে খুব সাহায্য করতেন। আমরা দুজন প্রায়ই ওঁচা দিয়ে ঘোনা দিঘির বিলে টাকি মাছের পোনা ধরতে যেতাম। ঝাঁক বেঁধে পোনা ভেসে উঠত আর আমার এক ক্ষেপে তা তুলে ফেলতাম। আর এখন ভাবতেও খুব খারাপ লাগে যে কিভাবে আমরা মায়ের বুক খালি করে পোনাগুলোকে ধরে আনতাম। এই প্রসঙ্গে একটা ঘটনা মনে পড়ে আমাদের এলাকায় একটা ছেলে সিলেটের মাদরাসায় পড়ত আর জায়গির থাকত। একদিন দেখা গেলো যে, ছেলেটি বাড়ি যাবার জন্য পাগলামি করছে। তখন মাদরাসার হুজুর তাকে জিজ্ঞেস করলেন, কিরে, তোর কি হয়েছে? সে বললÑ ‘হুজুর দেশে এখন টাকি মাছের পোনা হয়েছে। এখন তো জ্যৈষ্ঠ মাস দেশে গিয়ে পোনা ধরে কাঁচা মরিচ দিয়ে ভেজে, লাল বোরো চালের ভাতের সাথে খাব। আমার আম্মা আমার জন্য অপেক্ষা করছে। আমি আর থাকতে পারব না।’ এই বলে সে ছুটি নিয়ে দৌঁড়ে তাদের বাড়ি যাওয়ার পথে রওনা দেয়। তার মত আমরাও টাকি মাছের পোনার সাথে বোরো ধানের চালের ভাত খাই, কি যে মজা ! তা বলে শেষ করতে পারবো না।
আমাদের বাড়িতে ধান কাটার জন্য দাওয়াল আসত ফরিদপুর, বরিশাল ও গোপালপুর থেকে। জমি চাষের জন্য চার-পাঁচ জন কামলা রাখা হতো। ধান পেকে উঠলে সে ধান বাড়িতে আনার জন্য দরকার হতো দাওয়াল। আমরা বলতাম ভাগালু। তারা ভাগে ধান কাটতে আসতো বড় নৌকা বোঝাই করে লোক নিয়ে। নৌকায় করে খেজুরের গুড় আর হাঁড়ি-পাতিল নিয়ে আসত। বিলের কিনারে নৌকা ভিড়িয়ে খলা তৈরি করত। এই বিদেশি লোকগুলোকে আমার রহস্যজনক মনে হতো। ওরা কি করে যেন টের পেল যে আমি পুঁথি পড়তে জানি। ওরা একদিন আমাকে বলল, মিয়াভাই আমাদের নৌকায় একদিন দাওয়াত রাখেন। আমরা আপনার পুঁথি পড়া শুনব। আমি বললাম তা হয় না, আব্বা নিজে পুঁথি পড়েন বটে কিন্তু তিনি নিজে চান না যে আমি পুঁথি ঘাটি, পুঁথি পড়ি। আমার পাঠশালার পড়ার প্রতি অমনোযোগী হলে চলবে না।
নৌকাগুলো এক ভিন্ন জগতের সুবাস বয়ে আনত। আমি ওদের নৌকায় যাওয়ার জন্য চঞ্চল হয়ে উঠলাম। নৌকায় গিয়ে শুনি ওরা আমার জন্য ডিঙ্গি নৌকা নিয়ে মাছ ধরতে গেছে। অনেকক্ষণ পরে একটা শোল মাছ নিয়ে এলো। সেই মাছ কেটে-কুটে ওরা খুব ভালো করে রান্না করলো। তারপর ভাত বেড়ে আমার সামনে এনে হাজির করল। ভাত দেখে তো আমার চক্ষু চরক গাছ হয়ে গেলো। বিশাল এক একটা ভাত, একটা ভাত আরেকটার সাথে যেন কোনোভাবেই মেলে না। এ ভাত মানুষ কি করে খায়! মনে হলো এক একটা ভাত যেন এক একটা স্ফটিকের খ-। আমি নার্ভাস হয়ে গেলাম। ওরা বলতে লাগল, ‘কি মিয়া ভাত খান না কেন?’ আমরা গরিব মানুষ আমরা এসব মোটা ভাতই খাই। আপনেরা খান চিকন চালের ভাত। আপনাদের রাতার ভাতের মত এমন মজার ভাত আর হয় না। যে বাড়িতে রাতার ভাত পাক হয়, সেই বাড়ির উঠানে দাঁড়ালে তার সুবাস পাওয়া যায়। বাঁশফুলের ভাতও মজা, কিন্তু আমরা গায়ে গতরে পরিশ্রম করি আমাদের এত নরম আর তুলতুলে মজার ভাত খেলে চলে না। আমি পাতে ভাত নিয়ে আঙুল দিয়ে নাড়াচাড়া করতে থাকি। ভাত মুখে উঠতে চায় না। ওরা চেয়ে দেখলো আমার তামাশা। দু-চার লোকমা খেয়ে রেখে দিলাম। মনে হলো পেটে যাবে না।
সেই দিন আর ওখানে পুঁথি পড়া হলো না। বললামÑ আরেক দিন আসবো পুঁথি পড়তে। আব্বা শুনলে মার দিবেন। ওরা বললেনÑ ‘কেন মার দিবেন, আপনার আব্বা নিজেই তো পুঁথির পাগল।’ আমার আব্বা চান যে আমার লেখাপড়ার কোনো ক্ষতি না হোক। আমি যেন কোনো নেশায় না পড়ি। পুঁথিতে যে সব কাহিনি রচিত হয়েছে তার বৈচিত্র্য অপরিসীম, ঘটনার পর ঘটনা। রহস্যের ঝাল বুনে চলে কত রস, কত কাহিনি। গভীর রস, করুণ রস তরুণ মনকে হাতছানি দেয়। এই নেশা একবার পেয়ে বসলে তার অন্য কিছু থেকে মন ওঠে যায়। তখনকার দিনে আজকের মত এত সাহিত্য ছিল না। সবেমাত্র কিছু সংখ্যক বই-পুস্তক বের হয়েছে। তার মধ্যে নজিবুর রহমানের ‘আনোয়ারা’ মীর মোশাররফ হোসেনের ‘বিষাদ সিন্দু’ কিছুটা চাঞ্চল্য সৃষ্টি করেছে। আমি এইসব বই পড়তে চাই কিন্তু পাই না। তাই পুঁথি নিয়ে ব্যস্ত আছি। অবশ্য লুকিয়ে লুকিয়ে গদ্য সাহিত্যের একটা মজা হচ্ছে যে, কাউকে না জানিয়ে না শুনিয়ে চুপি চুপি পড়া যায়। কাজেই আসর জমে না। আর পুঁথিগুলো জোরে জোরে সুর করে না পড়লে পড়া হয় না। পুঁথি মানেই আসর জমানো। যে পুঁথি পড়বে তার কিছুটা গানের গলা থাকা দরকার। সুরের মোহজাল সৃষ্টির মাধ্যমে কাহিনির একটা বিস্তার ঘটানোই হচ্ছে পুঁথি পাঠের একটা লক্ষ্য। এটা শেষ পর্যন্ত একটা নেশা হয়ে ওঠে। আব্বা চান না যে আমি নেশাগ্রস্ত হই। তাই তিনি নিজে পুঁথি পাঠ করে শ্রোতাদের কাঁদালে-হাসালেও আমাকে তার থেকে দূরে রাখতেন।

আমার ওদের নৌকায় যেতে পরাণ আইঢাই করে। ওরা কত দূর দেশ থেকে এসেছে, কত বিচিত্র উচ্চারণে কথা বলে, ওদের গ্রাম দেশের কথা বলে। আমি তো নিজের বাড়ি ছাড়া আর কোথাও যেতে পারি না। খুব ইচ্ছে হয় ওদের নৌকায় চড়ে নদী পথে ঘুরে ঘুরে দেশ বিদেশে ভ্রমণে বেড়িয়ে পড়ি। ওদের দেশে যাই কিন্তু তা আর পূরণ হয় না। জেগে জেগে স্বপ্নেই কেবল সফর করি। ওরা আমাকে খুব সম্মান করে। ওরা আমাদের বাড়িতে আসে ধান দাইতে, আমরা ওদের মালিক। আমাদের ডাকে মিয়া ভাই। আহা! যদি ওদের নৌকায় চড়ে ভেসে যেতে পড়তে পাড়তাম। ওদের গল্প শুনতাম, ওদের গান শুনতে পারতাম! কিন্তু নৌকায় ওটা সম্ভব হয় না। একদিন ফসল তোলা হলেই তাদের নৌকা বোঝাই করে নৌকা ভাসিয়ে দেয়। পাল তুলে গুন টানে, আমি তা দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখি, কোন দেশের মানুষ ওরা, কোথায়বা ওদের বাড়ি। ওদের কথা বার্তাই বা আলাদা কেন? আর কেনই বা ওরা নৌকা নিয়ে পাল তুলে গুন টানতে টানতে নদীর আঁকা বাঁকা পথ ধরে দূর দেশে হারিয়ে যায়। একটা নয় দুইটা নয় শত শত নৌকা আসে ধান দাইতে। ঐ সময়টাতে দেশে খুব আকাল থাকত আর সেই সময়টাতেই তারা আসত ধান দাইতে। আগে ধান কাঁত জমির মালিকেরা নিত সাত ভাগ-আটভাগ, আর দাওয়ালদের দেয়া হয় এক ভাগ। ভাগালু শিক্ষিত ছেলেরা পর্যন্ত ধান কাটতে আসত। একবার শুনেছিলাম আমাদের ভাগালুদের দলে ছিল ত্রিশ জন। এর মধ্যে একজন ছিল আইএ পাস। পরিশ্রমের কাজ করাকে তারা খুব সম্মান করত। আমি তো এখন পাঠশালায় পড়ি। আমি ভেবে পাই না যে একজন শিক্ষিত লোক ভাগালুর দলে শামিল হয় কি করে!
আমাদের বৈঠকখানায় পুঁথির আসর বসত। সোহরাব রুস্তমের কাহিনি শুনতে শুনতে শ্রোতারা ‘হায় হায়’ করে মাতম করত। এমন করুণ কাহিনি, পিতার হতে পুত্রের মৃত্যু আর কোনো মহাকাব্যে আছে কিনা তা আমার জানা নাই। তারপর শহিদে কারবালা, জঙ্গনামা কাহিনি, ইমাম পরিবারের শাহাদাত, হযরত ইমাম হোসেনের ইয়াজিদ বাহিনীর হাতে মৃত্যুবরণ। ইমাম যুদ্ধ করে ফোরাত নদী থেকে পানি আজলা করে নিয়েছিলেন খাবার জন্য। তার স্ত্রী, পরিবার পরিজন, ছেলেমেয়েরা পানি না পেয়ে মারা গেছেন, এই স্মৃতি তাকে ভারাক্রান্ত করে তোলে। তিনি আজলার পানি ফেলে দেন। এই কাহিনি পড়ার সময় শ্রোতারা ব্যথায় সমবেদনায় মাতম শুরু করে দিত। নবী বংশের জন্য এই ধরনের দরদ ও ভালোবাসা মুসলমানদের অস্থির করে তুলত।
বিভিন্ন গাঁয়ে থেকে আব্বার জন্য লোক আসত পুঁথি পাঠের আসরে অংশগ্রহণ করার জন্য। আসলে মানুষ কেবল গল্পই শুনতে চায় না, তারা সুরের মূর্ছনায় নিজেদের ভাসিয়ে নিয়ে যেতে চায়। আমার আব্বার গানের গলা ছিল খুব ভালো। আমি বিছানায় শুয়ে শুয়ে শুনতাম আমার আব্বার গানের গলা। তিনি মাঝে মাঝে ‘দিন ভবানন্দের’ গান গাইতেন। আসলে সুরের নেশায়ই আব্বাকে পুঁথি ও জারি সারি গানের দলে টেনেছিল। আমাদের গ্রামে তখন দুজন পীর সাহেব আসতেন। কান্দিগাঁর মৌলবি কোরবান আলী এবং নোয়াগাঁর মৌলবি সাব। মৌলবি কোরবান আলী নোয়াগাঁর মৌলবি সাহেবের চেয়ে বয়সে বড় ছিলেন। কিন্তু কামিলিয়াতের দিক দিয়ে নোয়াগার মৌলবি সাহেব ছিলেন অগ্রসর। তারা জারি সারি গান পছন্দ করতেন না। তাদের মুরিদদের এসব থেকে দূরে থাকতে বলতেন। আব্বা জারি সারি গান ত্যাগ করলেও পুঁথি কিন্তু ত্যাগ করতে পারলেন না। যখনই নতুন কোনো পুঁথির আসরের কথা শুনতেন তখনই ছুটে যেতেন। পুঁথির প্রতি তাঁর ঝোঁক থামাতে পারলো না। শেষ পর্যন্ত মৌলবি সাহেবরাও পিড়াপিড়ি করা ছেড়ে দিয়েছিলেন। মানুষ একটা আনন্দ নিয়ে বাঁচতে চায়। এটা তারা জানতেন। আব্বা নিয়মিত কোরআন শরীফ পড়তেন। কিছুদিন মানিক কেল্লার মসজিদে ইমামতিও করেছেন। কিন্তু বাড়িটি ভাগাভাগি হয়ে যাওয়ার পর তাকে সংসারের প্রয়োজনে ঘরে ফিরে আসতে হয়। আর সংসারে এসেই সংসারের হাল ধরতে হয়।
আমাদের এলাকাটা ছিল পাখির দেশ, মাছের দেশ, দুধ-ভাতের দেশ। বর্ষাকালে সারা এলাকাটা পানিতে ডুবেই থাকত। পানিতে এখনো ডুবে থাকে। তখন যেদিকে দুচোখ যেত শুধু পানি আর পানি দেখা যেত। আকাশটাকে যেন মনে হতো পানির একটা দেয়াল। আকাশের কিনারে তুফান হলে নদীর কিনারে ঢেউ ওঠে। আর সেই ঢেউ গড়িয়ে গড়িয়ে এসে ধাক্কা মারে আমাদের ভিটায়। দূর দুরান্তে গ্রামগুলো যেন মনে হতো এক একটা সাদা বকের মত ভাসছে। কিন্তু পানি শুকিয়ে গেলে এই এলাকা হয়ে ওঠে খালে বিলে মাঠে ঘাটে বিচিত্র এক স্থান। তখন এক জায়গা থেকে অন্য এক জায়গায় যেতে হলে পা দুটি কে সম্বল করা ছাড়া আর কোনো উপায় থাকে না। বর্ষাকালে ঘর থেকে নৌকা ছাড়া বের হওয়া যায় না। প্রায় ছয়মাস বন্দি থাকতে হয় ঘরে। উত্তর দিকে তাকালে দেখা যায় পাহাড় আকাশে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। গায়ের লোকদের সাথে আমি অনেক দিন গেছি ঐ পাহাড়ে বেড়াতে। সিলেট তখন আসামের একটি জেলা। আমার ‘নীল ময়না’ কাহিনিতে সেই পাহাড়ের কিছু বর্ণনা আছে।

আমাদের বাড়িটা ছিল পাহাড়ের একবারে দক্ষিণে প্রান্তে। প্রত্যেক বছর ঢেউয়ে ভেঙে যেত। আব্বা বাড়ির পূর্বপশ্চিমে এক সারি করজ গাছ লাগিয়েছিলেন। গাছগুলো দেখতে খুব সুন্দর হয়েছিল। বর্ষাকালে ঐগাছে আমাদের নৌকা বাঁধা থাকত। গাছের গুড়িতে মাছেরা এসে ভিড় করত। স্বচ্ছ পানিতে দেখা যেত মাছেরা খেলা করছে। আমি সেই গাছে উঠে ঝাঁপ দিয়ে পানিতে পড়তাম। একদিন ঝাঁপ দিতে গিয়ে দেখি পানির নীচে থেকে গজাল মাছের মত কালো কি একটা ভেসে উঠছে। ঝাঁপ দিলেই আর রক্ষা ছিল না। এটা ছিল একটা গোখরো সাপ, আমি তখনো গাছের ডালে ঝুলছি। অনেকক্ষণ পরে সাপটি সরে যায়। আমি তখন ঘরে ফিরে কাহিনিটি বললাম আমার আম্মাকে। আম্মা ডাক ছেড়ে চিৎকার করে বলেন, হায় হায় কি বিপদ থেকেই না তোকে আল্লাহ বাঁচিয়েছেন।
আমাদের বাড়ির পূর্বদিকে পাগারের কোণায় জড়াজড়ি করে ছিল একগোছা হিজল-বরজ গাছ। জায়গাটা ছিল রুস্তম ভাইদের। এই বরজের খোরলে প্রতি বছর বর্ষায় বিষাক্ত সাপ এসে জায়গা করে নিত। কু-লী পাকিয়ে থাকত খোরলের ভেতর। সবাই জানত যে এই খোরলের ভেতর এক একটা জাতিসাপ থাকে। বর্ষাকালে মুন্সিগঞ্জ থেকে সাপুড়ে আসত আমাদের এলাকায়। সাপুড়েদের নৌকার বহর থাকত জানজাইল গ্রামে। এখান থেকে ডিঙ্গিতে করে সাপ ধরতে বের হতো। আমাদের গ্রামেও আসত। এসে ঐ হিজল গাছের খোরল থেকে বের করে আনত বিষাক্ত সাপ। আমরা ওদের সাহস দেখে অবাক হয়ে যেতাম। বড় হয়ে আমি নিজেও অনেক সাপ ধরেছি। এখন আর কিছুতেই সাপ মারতে ইচ্ছে করে না।

শিক্ষাজীবন

বাড়ির গোষ্ঠী ভাইদের সঙ্গে আমাকেও ভর্তি করে দিয়েছিল দুর্লভপুর স্কুলে। কিন্তু স্কুলে ভর্তি হওয়ার বয়স তখনো আমার হয়নি। আমি সবার সঙ্গে দেখাদেখি স্কুলে যেতাম। দুর্লভপুরে আমার ফুফুর বিয়ে হয়েছিল। তিনি কোনো সন্তানাদি না রেখেই মারা যান। ফুফুর ব্যবহৃত অলংকারগুলো আমি আমাদের বাড়িতে দেখেছি। এর কোনো কোনোটি আমি শ্যাকরার অনুকরণে কয়লার আগুনে গলিয়ে খেলা করেছি। যখন আগুনে পুড়ে গলে লাল টকটকে হয়ে যেত তখন কি মজাই না লাগত। আমি ভাবতাম বড় হয়ে আমি শ্যাকরা হব। দুর্লভপুর যে বাড়িতে আমার ফুফুর বিয়ে হয়েছিল সেই বাড়িতে দেখতে পাই বিদ্যুৎ ঝলকের মত এক অপূর্ব সুন্দরী মেয়েকে। তার থেকে পরবর্তীকালে কল্পনায় রূপ নেয় ‘ঐ যে নীল আকাশ’ গল্পটি। ঐ মহিলাটি সম্পর্কে আমার ভাবী হতেন। কিন্তু তার সাথে কোনো দিনই আমার কথা হয়নি। কল্পনায় আমি তাকে তিলোত্তমা করে সৃষ্টির চেষ্টা করেছি। ফুপার বড় ছেলে গৌস আলির স্ত্রী ছিলেন তিনি। ভাবীর বাপের বাড়ি ছিল চাঁপাইতি। তারা সম্পর্কে আমাদের আত্মীয় হতেন।
এই স্কুলে আমার বেশি দিন পড়া হয়নি। স্কুলটি কিছুদিন পরে উঠে যায়। তখন আমি আবার আমার মায়ের কাছে ফিরে আসি। পরে আমাদের একটা পোড়া ভিটায় স্কুল তৈরি হয়। এবার প্রায় দুবছর পর স্কুলে ভর্তি হই। স্কুলের শিক্ষক হয়ে এলেন মৌলবি হাফেজ আলী। মাদরাসায় পড়া লোক কিন্তু খুব ডেডিকেটেট ছিলেন। মাস্টার সাহেবের বাড়ি ছিল জগন্নাথপুর থানায়। এনায়েতপুরের কাছাকাছি গাঁয়ে। তিনি তাঁর গ্রাম থেকে কয়েকটি ছেলেকে সঙ্গে করে নিয়ে এসেছিলেন। ওরা আমাদের বাড়িতেই থাকত। স্কুলে স্কুলে তখন খুব কম্পিটিশন ছিল। স্কুল সাব ইন্সপেক্টর ছিলো জাঁদরেল জলধর রায় বাবু। তার বাড়ি ছিল সাছনা থানায় রহিমপুর গ্রামে। প্রচ- ব্যক্তিত্বসম্পন্ন লোক ছিলেন জলধর বাবু। জলধর বাবুর বড় ভাই এর নাম ছিল হলধর বাবু। তার মেয়ে কমলা রাণী রায়। আমরা একই ক্লাসে পড়তাম। মেট্রিক পাস করেই তার বিয়ে হয়ে যায় একজন উকিলের সাথে। পরে তার স্বামী মারা যায়। কমলা ডিব্রুগড় মেডিকেল স্কুল থেকে ডাক্তারি পড়ে চাকরিতে ঢোকে। আমরা একই বছর জুনিয়র স্কুল পাস করি। পরবর্তীকালে কমলা রাণী ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেন এবং তার নতুন নাম রাখা হয় শাহীন কুরাইশী। সে এখন ঢাকায় আছে।

জলধর বাবুর কল্যাণে আমাদের এলাকায় নিম্ন মাধ্যমিক শিক্ষা ছিল খুবই উন্নতমানের। এমন শিক্ষানুরাগী মানুষ আজকাল খুবই বিরল। আমি যখন গ্রামের স্কুলে ভর্তি হই, তখন আমাকে শাসন করার মত কেউ ছিল না। আমি ছিলাম মা-বাবার আদরের দুলাল। স্মৃতিশক্তি খুব প্রখর ছিল আমার। একবার পড়লে বা শুনলেই মনে থাকত। পড়তে হতো না বেশি। আর তাই পড়াশুনা বেশি করতাম না। করার দরকারও হতো না। স্কুলের পরীক্ষায় আমিই হতাম প্রথম। হাডুডু, বল খেলা, গোল্লাছুট খেলাধুলা নিয়ে সবসময় ব্যস্ত থাকতাম। কার্তিক মাস হলেই তীরÑধনুক নিয়ে ছুটাছুটি করতাম। এই সব করেই আমার দিন যেত। আমাদের স্কুল বাড়ির ভিটায় ছিল একটা এজমালি আম গাছ। বহু পুরানো গাছ এটা। খুব মিষ্টি ছিল এই গাছের আম। আম গাছের তলায় পিলা খেলার প্রতিযোগিতা হতো। প্রতিযোগিতায় প্রায় সবসময় আমিই জিততাম। প্রতিপক্ষের সকলের পিলা আমি জিতে নিতাম। তারপরে আবার নতুন করে খেলা আরম্ভ করার জন্য তাদের আমার পিলা থেকে ধার দিতাম। একদিন পিলা খেলতে গিয়ে ধরা পড়ে যাই। মাস্টার সাহেব আমাকে স্কুলে নিয়ে বেঞ্চের উপরে দাঁড় করিয়ে রেখেছিলেন তারপর একটি বেত দিয়ে শপাৎ-শপাৎ মারতে শুরু করলেন। আর আমি নীরবে চোখের পানি ফেলতে থাকি। সেইদিন থেকে আমার স্কুলে যাওয়া বন্ধ হলো। খেলাধুলা করলেও যেহেতু আমি পড়াশুনায় একজন ভালো ছেলে ভালো রেজাল্ট করেই প্রত্যেক পরীক্ষায় প্রথম হতাম। আমাকে কেন শাস্তি দেওয়া হলো? আব্বা-আম্মা বললেনÑ যতদিন ঐ মাস্টার আছে ততদিন আর তোকে ঐ স্কুলে যেতে দেবো না। দরকার নাই পড়াশুনার। এর কিছুদিন পরে সাবইন্সপেক্টর স্কুল ভিজিট করতে এলেন। সম্ভবত উত্তর সিলেটের কোথাও তার বাড়ি। নাম খলিলুর রহমান চৌধুরী। তিনি রেজিস্ট্রিতে আমার নাম দেখলেন কিন্তু আমি স্কুলে অনুপস্থিত। ক্লাসের প্রথম ছাত্র আমি, লোক পাঠিয়ে আমাকে ধরে আনলেন বাড়ি থেকে। ক্লাসের প্রথম ছাত্র হিসেবে আমাকে জিজ্ঞেস করলেন কেন তুমি স্কুলে আসো না। তোমার কি পড়াশুনা ভালো লাগে না? তুমি তো ক্লাসের ফার্স্ট বয়! আমি কোনো জবাব দিতে পারলাম না। এর মধ্যেই তিনি আমার স্কুলে না আসার কারণ জেনে মাস্টার সাহেবকে বললেন, অতটা কঠোর হওয়া আপনার উচিত হয়নি। ছেলেটিকে এবার বৃত্তি পরীক্ষা দিতে পাঠাবেন। তখন থেকে আমি আবার স্কুলে যাওয়াÑ আসা শুরু করি।
মাস্টার সাহেব আমাকে নিয়ে খুব ব্যস্ত হলেন। সাব ইন্সপেক্টরের তাগিদে আমাকে বৃত্তি পরীক্ষা দিতেই হবে। তখনকার দিনে একটা কেন্দ্র স্কুল ছিল। মাসে একবার এলাকার প্রাইমারি স্কুলগুলোর সেরা ছাত্রদের নিয়ে কম্পিটিশন হতো। আমাদের ছিল মধ্যনগর স্কুল। আমাকে সেই স্কুলে নিয়ে যাওয়া হলো। অনেক ছেলে জমায়েত হয়েছে আশপাশের স্কুলগুলো থেকে। আমি তখন তৃতীয় শ্রেণীর ছাত্র। মধ্যনগর স্কুলের শিক্ষক রামমোহন বাবু স্থির করলেন, আজ ছেলেদের মেধা পরীক্ষা করা হবে। আমাকে কিছু না বলেই একটা বাংলা বই পড়তে দেয়া হলো। ইতিহাসের একটা চটি বই। বইটি হাতে নিয়ে আমি গড় গড় করে চার-পাঁচ পৃষ্ঠা পড়ে গেলাম । এর আগে আমি কখনো এ রকম বই পড়িও নাই, দেখিও নাই। আরো কয়েকজন ছাত্র এভাবে কয়েকটি বই থেকে পাঠ করল জোরে জোরে। এইবার মাস্টার মশাইরা আমাদের কাছ থেকে বইগুলো নিয়ে গেলেন। প্রথমে আমাকে রামমোহন বাবু প্রশ্ন করলেনÑ আমি যে পৃষ্ঠাগুলো পড়েছি তারই বিষয়বস্তু থেকে বলতে। আমি একটু চিন্তা করলাম, তারপর দেখতে পেলাম আমার সামনে যেন পৃষ্ঠাগুলো খোলা রয়েছে। আমি গড় গড় করে মুখস্ত বলে যেতে লাগলাম। একেবারে বইয়ের ভাষায়। সবাই অবাক হলেন! প্রশ্ন করলেন অনেকগুলো। প্রত্যেক প্রশ্নেরই উত্তর করলাম বইয়ের ভাষায়। পরীক্ষকেরা চোখ বড় বড় করতে লাগলেন। কেউ কেউ মুখ টিপে হাসলেন। একজন জিজ্ঞেস করলেন তুমি কি এই বই এর আগে কখনো পড়েছ? আমি বললামÑ না, এই বইয়ের নামও কখনো আমি শুনি নাই। মনে আছে তারা আমাকে পঁচিশ নাম্বারে পঁচিশই দিয়েছিলেন। শুনলাম নিজেদের মধ্যে আলাপ আলোচনা করে বলেছেন এই ছেলে বৃত্তি পরীক্ষা দিলে অবশ্যই বৃত্তি পাবে।বৃত্তি কি তখন আমি বুঝতাম না। আমাদের এলাকায় তখন একজন মাত্র ছেলে বৃত্তি পেয়েছিল আমার কয়েক বছর আগে, তার নাম ছিল কুদরত আলী। বাড়ি শিয়ালশালা । সম্পর্কে তিনি আমার ভাই হতেন। তিনি যখন কলেজে পড়েন তখন চেষ্টা করে তার গ্রামের নাম পরিবর্তন করেন। সেই থেকে গ্রামের নাম হয় আবিদ নগর। কুদরত আলী খুব মেধাবী ছাত্র ছিলেন। তিনি মাইনর পরীক্ষাতেও সরকারি বৃত্তি পেয়েছিলেন। প্রবেশিকা বৃত্তি পেয়েছিলেন। আর তাই ছাত্র হিসেবে গ্রামে তার খুব খ্যাতি ছিল। বলা যায় তিনিই সিলেট এমসি কলেজে পড়ার সুযোগ পেয়েছিলেন। আমাকে খুবই হেল্প করতেন কুদরত আলী ভাই। তারা খুব অবস্থাশালী লোক ছিলেন। তার পিতা লুঙ্গির কারবার করতেন। প্রতি বছর ফসল উঠার পর মেজবানী করতেন। অনেকগুলো গরু জবাই করা হতো। আমাদেরকে দাওয়াত করা হতো। আমরা সবাই নৌকা বোঝাই করে দাওয়াত খেতে যেতাম।
কুদরত আলীর এক চাচাত ভাই আক্কেল আলীর সঙ্গে আমার এক ফুপাতে বোনের বিয়ে হয়েছিল। তারা আমাদের খুব সম্মান করতেন। কারণ আমার ফুফুর বিয়ে হয়েছিল ইয়াকুব বেগের সঙ্গে। বেগদের খুব সম্মান ও প্রতিপত্তি ছিল। সেই ইয়াকুব বেগের মেয়েকে বিয়ে করেন আক্কেল আলী। বুবু আমাকে ভীষণ আদর করতেন। কুদরত আলী এই এলাকাটিকে কাঁদিয়ে খুব অল্প বয়সেই মারা যান। তখন তিনি এম.সি কলেজে ফোর্থ ইয়ারে পড়েন। সম্ভবত তার লিভার থিরোসিস হয়েছিল। কুদরত আলী বেঁচে থাকলে এলাকার নেতৃত্ব তিনিই দিতেন। কিন্তু আল্ল¬াহর ইচ্ছা ছিল অন্য রকম। তাকে আমাদের মধ্যে থেকে তুলে নেন।
শেষ পর্যন্ত সুনামগঞ্জ গেলাম বৃত্ত্ িপরীক্ষা দিতে। আমাদের এলাকা থেকে বৃত্তি পরীক্ষা দিয়েছিল ডুগনই স্কুলের ছাত্র সোমধন রুদ্র পাল। তাদের পৈত্রিক পেশা ছিল কুমারগিরী করা। পরীক্ষা দিতে গিয়ে সুনামগঞ্জ জেলখানার পাশে দেখা হয় স্কুল সাব ইন্সপেক্টর শাহ ইমতিয়াজ আলীর সঙ্গে। তিনি আমাকে পরীক্ষার হলে দেখেছিলেন। শাহ ইমতিয়াজ আলী ছিলেন হবিগঞ্জের লোক। তিনি আমাকে দেখে জিজ্ঞেস করলেনÑ‘কিতারে বো তোমার বাড়ি কোয়াই?’ আমি বললাম ধর্মপাশা। তিনি পিঠে থাপ্পর দিয়ে বললেন ‘ও তুমি ধর্মপাশার ছেলে। হায়রে যে যায় ধর্মপাশা তার নাই কোনো আশা।’ এই ইমতিয়াজ আলী হচ্ছেন শাহ এমএস কিবরীয়ার পিতা। তখন আমাদের ইউনিয়নটি ছিল ধর্মপাশার অর্ন্তগত, পরে তাহিরপুর থানা হলে ধর্মপাশার নয় নম্বর ইউনিয়নটিকে তাহিরপুরের সাথে সংযুক্ত করে দেয়া হয়। তাই এখন আমি তাহিরপুরের লোক, কিন্তু ধর্মপাশাকেই আমাদের বেশি আপন মনে হয়।

শাহ ইমতিয়াজ আলী ঠিকই বললেন। হেমন্তকালে ধর্মপাশায় চলাফেরা করতে হলে পায়ের উপর ভরসা করতে হতো। হাঁটতে হাঁটতে জান বেরিয়ে যেত। আর বর্ষাকালে বের হতে হতো নৌকা দিয়ে। ঢেউ আসলে নৌকা প্রায় ডুবে যেত। লোকজন হাওড়ে হারিয়ে যেত। তা থেকেই সৃষ্টি হয়েছিল সতর্ক বুলি, ‘যে যায় ধর্মপাশা তার নেই জীবনের আশা।’ তবুও ধর্মপাশা তাহিরপুরের লোকেরা হাওড়ের বুকে ঝড়Ñতুফানের সঙ্গে লড়াই করে যুগযুগ ধরে বেঁচে থাকার সংগ্রাম চালিয়ে যাচ্ছে। জীবনের আশা কেউ ছাড়তে রাজি নয়।
পরীক্ষা দিয়ে চলে এলাম বাড়িতে। আর কোনো খোঁজখবর নেই। মাস্টার সাহেবের খুব সুবিধা হয়েছে। আমার তখন কোনো কাজকর্ম নেই। আমাকে স্কুল দেখতে হবে। মাস্টার সাব বেড়াতে যান বাইরে। আর স্কুল দেখি আমি। প্রায় পঞ্চাশ-ষাট জন ছাত্র ছাত্রী। ভালোই লাগে মাস্টারি করতে। একদিন স্কুলের ছাত্র-ছাত্রী নিয়ে কথাবার্তা বলছি, এমন সময় ডুগনুই স্কুলের শিক্ষক বৈকুণ্ঠ বাবু এসে ঢুকেছেন আমাদের স্কুলে। তার ধুতি হাটু পর্যন্ত তোলা। গোফ জোড়া পুরো তাতে ঠোঁট দুটি ঢেকে আছে। আমি আদাব জানিয়ে তাকে বসতে বললাম। তিনি বললেন আমি সুনামগঞ্জ গিয়েছিলাম। সেখান থেকেই আসছি। তোমার পরীক্ষার খবর জানো? আমি বললামÑ ‘না, আমি তো কোনো খবরই রাখি না।’ তিনি বললেন গতকালই পরীক্ষার রেজাল্ট বের হয়েছে। আর তুমি বৃত্তি পেয়েছ, আর আমার সোমধনও বৃত্তি পেয়েছে। সোমধন সেকেন্ড হয়েছে, আর তুমি হয়েছ পঞ্চম। পরীক্ষার এই অবস্থান নিয়ে আমার কোনো মাথাব্যথা ছিল না। বৃত্তি পেয়েছি এই খবরটাই আমার কাছে চাঞ্চল্যকর ব্যপার। আমি কাঁদবো না হাসবো তা বুঝে ওঠতে পারছিলাম না।
বৈকুণ্ঠ বাবু চলে যান। আর আমি ছুটলাম বাড়িতে। আম্মাকে গিয়ে বললাম, শুনছেন আপনার এই অপদার্থ ছেলেটা বৃত্তি পেয়েছে। আম্মা শুনে হাসতে লাগলেন। বৃত্তির ধারণা তো আমাদের পরিবারে নাই। লোক মুখে শুনেছেন বৃত্তির কথা, যে বৃত্তি পায় তার খুব ইজ্জত। আম্মা বললেন খুব ভালো কথা, পরিবারে আগে আলাপ হতো বৃত্তি পাওয়া ছাত্র কুদরত আলীর কথা। এখন আমাদের পরিবারেও তো একজন বৃত্তিধারী এসেছেন। এই আনন্দ ধরে রাখার জায়গা নাই। আব্বা যখন ঘরে ফিরে শুনলেন বৃত্তি পাওয়ার কথা তখন প্রথমে তিনি বিশ্বাসই করতে পারলেন না। এখন তা হলে আমাকে পড়াবার জন্য বাড়ি ছেড়ে দূরে কোথাও যেতে হবে। এই চিন্তা আমাকে অস্থির করে তুলল। আব্বা মনে মনে ঠিক করতে লাগলেনÑ কোথায় আমাকে ভর্তি করাবেন। শুনেছেন বৃত্তিধারী ছাত্রÑছাত্রীদের কোনো মাইনে দিতে হয় না। তাহলে পড়াতে আর অসুবিধা কোথায়। এমনকি ভর্তির টাকাও নাকি লাগে না।
মাস্টার সাহেব ফিরে এলেন, আমার এই বৃত্তির খবর শুনতে পেয়ে আনন্দে লাফাতে লাগলেন। তিনি নানা রকম টুক-টাক জানতেন [মানে যাদু]। বললেন আমি আজ সবাইকে টাটকা আঙ্গুর খাওয়াব। তিনি থাবা দিয়ে গাছের ডাল ধরতে লাগলেন, আর অমনি তার হাতের থাবায় এলো এক ঝোপা আঙ্গুর ফল। আমরা অবাক হই। যাদু তিলিসমাতি ব্যাপার। এই রহস্যের আজও কোনো সমাধান হয়নি। মাস্টার সাহেব এভাবে প্রায়ই আমাদেরকে আঙ্গুর ফল দেখাতেন।
ঐ সময়ে আমাদের স্কুলে উরুঙ্গিরা আসত। ওরা ছিল যাযাবর। আমাদের বাড়ির পশ্চিমে একটা বড় মাঠ ছিল। সেই মাঠেই তারা তাবু ফেলত। তারপর বাড়ি বাড়ি ঘুরে যাদু দেখাত। একদিন কেউ হয়ত দাঁড়িয়ে তামাশা দেখছে আর অমনি তার লুঙ্গির নিচ থেকে বেড়িয়ে এলো একটা আস্ত ডিম। কি লজ্জাই না লাগত আমাদের। এই যাদু দেখানোর জন্য তাদেরকে চাল-ডাল আর পয়সাÑকড়ি দিতে হতো। তাদের ভাষা আমরা বুঝতাম না। তাদের চুল ছিল পিঙ্ঘল আর চোখ দুটি ছিল লাল কোরলের মত। এই চোখ নাকি আধ্যাত্মিক চোখ। আমাদের এই এলাকায় বলত বুরুঙ্গিয়া চোখ। ওরা দৌড়ের ঘোড়া বিক্রি করত। ঘোড়ার পশম দিয়ে তৈরি করত পাখি ধরার ফাঁদ। আমরা এই ফাঁদকে বলতাম জাঙ্গি। জাঙ্গি পেতে আমরা ঘুঘু ধরতাম, জালালী কবুতর ধরতাম। কোড়া শিকার করতাম। এসব শিকারে আমার ছোট মামা ছিলেন খুব ওস্তাদ। তিনি মাদরাসায় পড়তেন আর ছুটির সময়ে এসে আমাদের বাড়িতে থাকতেন। মৌলবি বলে একটা মাসিক পত্রিকা বের হতো উর্দু ভাষায়। বার্ষিক এক টাকা ছিল এর চাঁদা। আমার মামু এই পত্রিকার একজন গ্রাহক ছিলেন। শাহরানপুর থেকে আসত এই পত্রিকা। মামু পরে সিলেটের ফুলবাড়ি মাদরাসা ছেড়ে পড়তে গিয়েছিলেন সাহারানপুর। মামুর কাছে গাড়ির বর্ণনা শুনে আমরা খুব অবাক হতাম। মামু বলতেন যখন গাড়ি চলত তখন গাড়ি চলার একটা শব্দ হতো থার্টি ফোর থার্র্টি ফোর। মামু শাহরানপুরের পড়া শেষ না করেই বাড়ি ফিরে আসেন। মামুর কণ্ঠস্বর ছিল খুবই মধুর। তার কোরআন তেলাওয়াত শুনে সবাই মুগ্ধ হতেন। তিনি পরে তার পৈত্রিক নিবাস ছেড়ে আমাদের গ্রামে চলে আসেন। ঘরবাড়ি বেঁধে এখানেই বসবাস করা শুরু করেন।
উরুঙ্গিরা এক শ্রেণীর ভাসমান লোক যারা ম্যাজিক যাদুটোনা করত। তারা ইরান দেশ থেকে আসত। তারা তাদের সঙ্গে করে আনত বিচিত্র সব অভিনব পসরা। ওরা দুতিন মাস থেকে আবার অন্য জায়গায় চলে যেত। ঘোড়ার খাবার সংগ্রহ করা তাদের জন্য একটা সমস্যা হয়ে দাঁড়ায়। ঘাস ফুরিয়ে গেলে নতুন ঘাস সহজে পাওয়া যেত ন্।া মাঠে ঘুরে ঘুরে ঘোড়ারা ঘাস খেতো । আমরা দেখে অবাক হতাম। একবার তাদের একটি ঘোড়া একব্যক্তি কিনেছিলেন। সেই ঘোড়া দৌঁড়াতে গিয়ে দুগনুই গ্রামের একটি ছেলে ঘোড়ার পিঠ থেকে পরে গিয়ে তার একটি পা ভেঙে গিয়েছিল। তা নিয়ে মানুষের কত আফসোস। তার এই ভাঙা পা ভালো হতে বহুদিন লেগেছিল।
আমাদের দেশে বেদেদের মধ্যে দুটি ভাগ আছে। একদল সাপুড়ে আর তাদের কাজ হচ্ছে গাঁয়ে গাঁয়ে গিয়ে বিষাক্ত সাপ ধরা। আরেক দল হচ্ছে তাবিজ বিক্রি করা। আমাদের গ্রামের পাশেই জাঞ্জাইল বলে একটা গ্রাম আছে। বর্ষাকালে এখানে সাপুড়েরা তাদের বহর নিয়ে এসে ভিড় করে। গাঁয়ে গাঁয়ে মেয়েরা সাপ নাচিয়ে পয়সা রোজগার করে। বেহুলা লক্ষিণধরের গান শোনায়।
আরেক দল বেদে আছে তাদের বলে গাইন। ওরাও নৌকায় নৌকায় থাকে। মেয়েরা ঝাঁপিতে করে বেলোয়াড়ি চুড়ি নানা রকমের মশল্লা, রঙ খেলনা অলংকার বিক্রি করে ঘরে ঘরে। নগদ পয়সায় অথবা ধান চাউলের বিনিময়েও বিক্রি করত। আজকাল ওদের অনেকেই গ্রামে বসতি স্থাপন করেছে। সময়টা কখনো তারা নৌকায় এবং বস্তিতে কাটাতো। এই ধরনের একজন গাইনের সঙ্গে আমার মিতালি পাতানো হয় । কেননা তার নাম এবং আমার নামে মিল ছিল বলে আমাকে মিতা বলে ডাকত। আমার বয়স যখন সাত-আটবছর আর তখন আমার মিতার বয়স ছিল চল্লিশ বছর। এরা যেহেতু ব্যবসাবাণিজ্য করার জন্য গ্রামে আসে সেহেতু প্রতি গাঁয়ে এদের একজন পৃৃষ্ঠপোষকের দরকার হয়। আমাকে মিতা বানিয়ে এই অঞ্চলে তারা একটা বড় পরিবারকে পৃষ্ঠপোষক হিসেবে পেয়ে যায়। ওরা প্রতি বর্ষায় আমাদের ঘাটে এসে নৌকা ভিড়াত। আমার জন্য নানা রকমের চিড়া, মুড়ি, বিস্কুট নিয়ে আসত। আব্বা-আম্মাও ওদের খুব ভালো জানতেন।
একবার আমার ইচ্ছা হলো আমি ওদের বাড়িতে যাব। ওরা কিভাবে জীবন যাপন করে তা দেখব। মধ্যনগর বাজারে গিয়েছিলাম। মধ্যনগর গ্রামে আমাদের দূর সম্পর্কের একজন আত্মীয় আছে। নদীর ওপাড়ে গাইনদের নৌকার বহর আর
বস্তি। বস্তিতে যাবার আমার খুব ইচ্ছা হয়। তখন বোধ হয় ফাল্গুন-চৈত্র মাস। সুমেশ্বরী নদী প্রায় শুকিয়ে গেছে। নদীতে পানি নাই। আমি যাব ওপাড়ে। এপাড়ে মধ্যনগর গ্রাম। আমার দূর সম্পর্কের আত্মীয় মহিউদ্দিন মিয়ার বাড়ি একেবারে নদীর ওপাড়েই। আমি সড়ক থেকে বাড়িতে উঠে জিজ্ঞেস করলাম ওপাড়ে কি করে যাওয়া যাবে। দেখলাম নদীর ওপাড়ে একেবারে কিনারে উঠানে একটি মেয়ে ফ্রক পড়ে দাঁড়িয়ে আছে। আর কেউই নেই। আমি তাকেই জিজ্ঞেস করলাম ওপাড়ে কি করে যাওয়া যায়। সে হেসে বলল ওপাড়ে তো গায়েনরা থাকে, ওপাড়ে কেন যাবে? আমি বললামÑ ওপাড়ে আমার মিতা থাকে।

তোমার মিতা থাকে! মেয়েটি যেন আসমান থেকে পড়ল! গোলগাল মুখে চিরল চিরল হাসি তার। হাসিটা কি উজ্জ্বল, বললামÑ গাইয়েনদের বাড়িতেই যাব। মেয়েটি বলল, সাঁতার জান? আমি বললামÑ হ্যাঁ বেশ জানি। মেয়েটি হাসতে হাসতে বলল, তাহলে ঝাঁপ দাও নদীতে। বুঝলাম মেয়েটা রসিকতা করছে। আমি অল্প কথার মানুষ। গায়েন পাড়ায় আমার মিতা আছে, তা সে বিশ্বাস করতে পারল না। মেয়েটি কেবল হাসতে লাগল আমার দিকে চেয়ে। আমি ওদের বাড়ি থেকে নেমে নদীর কিনারে এসে একটি ডিঙি নৌকার মাঝিকে ডেকে অনুরোধ করলাম আমাকে পার করে দেয়ার জন্য। বললামÑ আমার মিতার বাড়িতে যাব, আমাকে পার করে দেবে ভাই? নৌকা থেকে জিজ্ঞেস করল কে তোমার মিতা? তখন আমি বললাম, শাহেদ। ঐপাড়েই থাকে। শুনে ডিঙিওয়ালার দয়া হলো। সে আমাকে পার করে দিলো। মিতার বাড়িতে উৎসব শুরু হয়ে গেলো আমাকে পেয়ে। স্থানীয় লোকদের দৃষ্টিতে গাইয়েনদের কে নীচু জাতের বলে গণ্য করা হয়। তাদের সঙ্গে ব্যবসায়িক সম্পর্ক ছাড়া আর কোনো সম্পর্ক রাখে না কেউ। আমার তো এসব বোধ ছিল না। গাইয়েনরা খুব মজা করে রান্না-বান্না করতে পারে। আমি তাড়াহুড়া করে খেয়ে রওয়ানা দিলাম। একা অনেক দূর যেতে হবে। মিতার সংসার পড়ে রইল অনেক পিছনে।
আমাদের ছোট্ট গ্রামে প্রায় অর্ধেক ছিল হিন্দু জেলে। এক ঘর ঋষি আর আরেক ঘর হাজাম। ঋষিরা মরা গরুÑছাগলের ছাল তুলে নিত শুকিয়ে বিক্রি করার জন্য। সেই ঋষিদের আর এখন কোনো অস্তিত্ব নাই। সেই পাড়াটির এখন নাম হয়েছে ইসলাম বাড়ি। গ্রামে যে সব জেলে ছিল তারও এখন কোনো চিহ্ন নাই। এরা ছিল হিন্দু, আরো দুই শ্রেণীর জেলেরা থাকত আমাদের অঞ্চলে। হিন্দু জেলেদের বলা হতে কৈবর্ত্ত আর মুসলমান জেলেদের বলা হতো মাইমল। ওরা আমাদের গ্রামে আশেপাশের বিল ঝিলগুলোকে ইজারা নিত। আর নদী ইজারা নিত কৈবর্ত্তরা।
আমাদের নদীটা মরে যাবার পরে তাতে বেশি পানি থাকত না। এই নদীতে বাঁধ দিয়ে পানি আটকাতে হয়। ফলে বর্ষাকালে প্রচুর মাছ এই নদীতে এসে ভিড় করত। পানি সরে গেলেও মাছে ভরে থাকত নদীটা। এই মাছ ধরত কৈবর্ত্তরা কেননা তারা বেশি পানিতে মাছ ধরতে খুবই পটু। কৈবর্ত্তদের কাছ থেকে আমরা মাছের সাপ্লাই পেতাম। ঘরে কোনো দিন মাছের অভাব হলে কামলাদের বলা হতো, বাদাম নাও নিয়ে নদীতে নামতে। নদীর বুকে কামলারা হেইয়ো হেইয়ো বলে দাঁড় টানত। শব্দ করে পানি কেটে নৌকা অগ্রসর হতো। আর সেই শব্দে দুদিক থেকে মাছেরা পানির ভেতর থেকে লাফিয়ে উঠতে থাকত। নৌকার দুপাশে মাছ উড়াল দিত। আর সেই মাছ এসে পড়ত নৌকার উড়াতে বা খোলে। কিছুক্ষণ পরেই কামলারা কয়েকটা বড় বড় রুই মাছ নিয়ে ঘরে ফিরত। নদীর ঘাটে কনুই ঝাল দিয়ে কয়েকটা খেও দিলেই ধরা পড়ত অনেক রুই মাছ। ১০Ñ১৫ সের ওজনের রুই মাছ ধরা পড়ত সেই জালে।
বিলে যেখানে পানি কম থাকত সেসব জায়গায় মাছ ধরত মাইমলেরা। মাইমলদের আমাদের এলাকায় মির্দও বলা হতো। একবার আমি আর আমার চাচা হরমুজ আলী দুজনে ঘোড়ায় চড়ে গিয়েছিলাম পাটা বুকার কাছে পানা বিলের খলায়। আমাদের দুজনকে ওরা পরম যতœ করেছিলেন। লাছা মাছের তেল দিয়ে লাছা মাছ রেঁধেছিলেন। কি মজাই না লেগেছিল খেতে! আসবার সময় ওরা দুই ঘোড়া বোঝাই করে মাছ দিয়ে দিয়েছিলেন। আমি আর আমার চাচা ঘোড়ার লাগাম ধরে টেনে টেনে এনেছিলাম। আমাদের বাড়ি ফিরতে সন্ধ্যা হয়েছিল। আরেকবার আমি আর আমার আব্বা গিয়েছিলাম কানাশইয়া খলায়। ওখানেও ওরা খুব যতœ করেছে আমাদের। খলাটা আমাদের বাড়ি থেকে খুব একটা দূরে নয়। মাইমলেরা তাদের বড় নৌকা বোঝাই করে কিছুক্ষণ পরপর নিয়ে আসত খলায়। ওরা বলল আরো অপেক্ষা করেন আরো ভালো মাছ আসবে। তখন পছন্দ করে নেবেন। প্রায় সন্ধ্যার দিকে এক গলুই বোঝাই করা মাছ এলো। ওরা আমাদের বলল, ওখানে গিয়ে পছন্দ করেন কোন মাছ নেবেন। গিয়ে দেখি নৌকার উড়াভর্তি পানির মধ্যে অনেক মাছ খাবি খাচ্ছে। মাঝখানে ভেসে আছে একটি অন্যরকম ঝলমলে আলাদা রকমের মাছ। আমি বললাম আমি ঐ মাছটি নেব। তখন ওরা ঐ মাছটি আমাদের জন্য বেঁধে দিলো। কানাশইয়া থেকে আমাদের বাড়ি প্রায় তিন মাইল দূরে। এই বিশাল মাছ আমরা কিভাবে নিবো তা চিন্তা করতে থাকলাম। পরে একটা বাঁশের লাঠিতে বেঁধে ঝুলিয়ে দেয়া হলো। তারপর কি করে নেব এই মাছ? আব্বা তো আমার চাইতে অনেক উঁচু আর আমি বাচ্চা মানুষ। মাছটি কাঁধে নিলে সমস্ত ওজন এসে পরে আমার উপর। আব্বা তখন হায় হায় করতে থাকেন। এই মাছ নিয়ে গিয়ে মারা পড়ব নাকি? শেষ পর্যন্ত কি করে যে মাছটি এনেছিলাম তা ভাবতেও আজ আমার বিস্ময় লাগে।
আগেই বলেছি আমাদের এলাকাটা ছিল মাছের দেশ, দুধেরÑদইয়ের দেশ। হেমন্তে গাইয়ের ঘাসের জন্য আমরা ছেলে পেলেরা প্রতিযোগিতায় নামতাম। ফকরার মাঠে বোরো ক্ষেতের কাঁচা আইলে এক ধরনের ঘাস জন্মে। এলাকায় একে বলে গাই ঘাস। সেই ঘাস জোগাড় করার জন্য খুব ভোরে উঠে আমরা দল বেঁধে পূর্ব দিকে রওয়ানা করতাম। সূর্য উঠার আগেই আমরা ঘাস কাটা শেষ করতাম। শিশিরভেজা সেই কচি ঘাস আঁটি বেঁধে মাথায় নিয়ে আমরা আমাদের বাড়িতে ফিরতাম। তারপর গাভীকে খেতে দিতাম। দুধেল গাভী এই ঘাস খেলে নাকি বেশি দুধ হয়। আমাদের দুধের গাই ছিল কয়েকটি। আমি দুধের চেয়ে বেশি পছন্দ করতাম দই। সর পড়া দই পাতে হাত ডুবিয়ে রাখতাম। কবজি পর্যন্ত না ডুবলে হাত তুলতাম না। দই পাক দিলে মাখন তোলা হতো। সেই মাখন জাল দিয়ে ঘি তৈরি করা হতো। আমাদের এলাকায় দুধ বিক্রির কোনো রেওয়াজ ছিল না। দুধ বিক্রিকে একটি ঘৃণার কাজ বলে মনে করা হতো। এত বেশি মাঠা উঠত যে লোকে তা খেতে না পেরে ফেলে দিত। গাঁয়ে কারো দুধের দরকার হলে এমনিতেই হাঁড়ি পাতিল ভরে দুধ দেয়া হতো। মাছ আর দুধ-ঘি এর জন্য এলাকাটা ছিল মশহুর। মধ্যনগর থেকে শত শত টিনভর্তি ঘি চালান হতো কলকাতায়। মধ্যনগরের ভারতচন্দ্র রায় ঘি সংগ্রহ করতেন এবং পরে তা কলকাতায় পাঠাতেন। ভারত বাবুর তালুক সম্পত্তি ছিল প্রচুর। তার অনেক প্রভাব ছিল এলাকায়। তিনি সুদের ব্যবসাও করতেন। আব্বা মাঝে মাঝে ভারত রায়ের কাছ থেকে টাকা ঋণ করতেন। ভারত রায় আমার আব্বাকে ঐ টাকার জন্য তেমন একটা চাপ দিতেন না।

মধ্যনগর বাজারের ব্যবসা-বাণিজ্য পুরোটাই ছিল হিন্দু শাহ শ্রেণীর দখলে। ওরা ভৈরব-নারায়ণগঞ্জ থেকে পাইকারি দরে বাকিতে মাল আনত। হাটÑবাজারে ঐ সব মাল কেনার জন্য অনেক দূর-দূরান্তে থেকে অনেক লোকজন এসে ভিড় করত। ব্যবসা বাণিজ্যে মুসলমানদের তেমন কোনো স্থান ছিল না। তারা কেবল ধান-চাউল উৎপাদন করত। সেই ধান-চাউল বিক্রি করে তাদের সংসারের বউঝিসহ সকলের কাপড়Ñচোপড়, লবণÑমরিচ ও মশলাপাতি কিনত। ঐ সময়ে আমি একদিন শুনতে পাই যে বাজারে চাটগাঁয়ের মরিচের চালান আসে নাই। ফলে মরিচের দাম হু হু করে বেড়ে গেছে। এই বাড়িতে প্রথম শুনলাম চাটগাঁও শব্দটি। কে জানত আমি পরবর্তী কালে চাটটগার সঙ্গে নানান বন্ধনে [বিয়ে] জড়িয়ে পড়ব।
মধ্যনগর বাজারে তখন একটা মুসলমানের দোকান ছিল। দোকানীর নাম ছিল ছমেদ আলী। ছমেদ আলী জাতে ছিলেন গাইন। আর সব দোকানই ছিল হিন্দুদের। অবশ্য হাটবাজারে অনেক মুসলমান দর্জি এবং কাপড় বিক্রেতা তাদের চালান নিয়ে আসত এবং খুচরা চালান নিয়ে বসে থেকে বিক্রি করত। সন্ধ্যা হলেই তারা তাদের চালান গুটিয়ে নিয়ে চলে যেত। হাটের দিন ছাড়া প্রায় অন্যান্য দিন বাজার খালি থাকত। কেবল স্থায়ী দোকানগুলোতে কিছু বেচাকেনা চলত। মধ্যনগরের ঠিক কেন্দ্রস্থলে একটা পুকুর কেটে তারই মাটি জমিয়ে উঁচু পাড়ে দোকানপাটের ব্যবস্থা করা হতো। গৌরীপুরের জমিদারির অর্ন্তগত ছিল এই অঞ্চল। ওরাই মধ্যনগর এলাকায় একটা কাচারি করে এবং বিশ্বেসরী স্কুল নামে একটা মাইনর স্কুল প্রতিষ্ঠা করে। পাঠশালা পাস করে আমি গিয়ে ভর্তি হলাম মধ্যনগর হাই স্কুলে। আমাদের স্কুলে কোনো হোস্টেল ছিল না। বাধ্য হয়ে আমার জায়গির খুঁজতে হলো।
তখনকার দিনে ছাত্রদেরকে খাওয়ানো একটা ছোয়াবের কাজ বলে মনে করা হতো। অবস্থাপন্ন যে কোনো বাড়িতেই দুএকজন করে জায়গির ছাত্র থাকত। আমার জায়গির হলো মোমিন মুন্সির বাড়িতে। মোমিন মুন্সির মেয়েকে বিয়ে করেছিল ইয়াদ আলি মাস্টার। কমলাকান্দা থানার বাহাদুরকান্দা গ্রামে ছিল তার বাড়ি। তিনি পোস্টমাস্টার ছিলেন। তার স্ত্রী আমার চাইতে বয়সে একটু বড় ছিলেন। তিনি বইপুস্তক নিয়ে আমার সাথে পড়তে বসতেন। মাস্টার সাহেব খুব তাগিদ দিতেন তার স্ত্রীকে মন দিয়ে পড়াবার জন্য। আমি বৃত্তি পরীক্ষায় পাস করে স্কুলে এসে ভর্তি হয়েছি। বয়সে ছোট হলেও মাস্টার সাহেব আমাকে খুব সম্মান করতেন, আদর করতেন। আমি তার স্ত্রীর শিক্ষক। তিন টাকা করে বৃত্তি পাই। তার এক টাকা দিতাম জায়গির বাড়িতে। তখনকার দিনে এক টাকায় প্রায় এক মণ চাল পাওয়া যেত। আর মাঝেÑমাঝে বাড়ি থেকে চাউল, ঘি, দুধ, দই আসত। তবুও মোমিন মুন্সির বিধবা বোনের আফসোস ছিল যে আমি তার ভাইয়ের সর্বনাশ করে দিলাম। পরবর্তীকালে ঢাকাতে আমার এই রকমই একটি অভিজ্ঞতা হয়েছিল। তমদ্দুনে মজলিশের কাজের জন্য কাসেম ভাইয়ের ডাকে তার বাসায় এসে উঠলাম। ঐ বাসায়ই ছিল তমদ্দুন মজলিশের অফিস। কাসেম ভাইয়ের মায়ের মানুসিক সমস্যা ছিলো। তিনি ঐ বাড়িতে আমাদের ভিড় করাকে পছন্দ করতেন না। আমাকে বলতেনÑ ‘মাগিনীর পোয়া আমার ছেলের বাড়িতে দস্যুর মত এসে সব খেয়ে সাবার করে দিচ্ছ?’ আমি তখন এম এ ফাইনাল ইয়ারের ছাত্র। তার এই সব বকা গায়ে মাখতাম না। তাতে তিনি আরো চটে যেতেন। আর কাসেম সাহেব ও তার স্ত্রী দুর্বোধ্য চাটটগায়ের ভাষায় তাঁকে শান্ত করার চেষ্টা করতেন।
মধ্যনগর মাইনর স্কুলের সঙ্গেই ছিল একটি তহশিল অফিস। একটি দাতব্য চিকিৎসালয় ও একটি ডাকঘর। সোমধন আমার সঙ্গেই মধ্যনগর স্কুলে এসে ভর্তি হয়। তৃতীয় শ্রেণীর পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হবার পরে আবার ক্লাস থ্রিতেই ভর্তি হলাম। এতে একটি বছর নষ্ট হয়। ইংরেজি শেখার জন্য ক্লাস থ্রিতে কাটাতে হলো একটি অতিরিক্ত বছর। সোমধন আর আমি একসাথে চলাফেরা করতাম। লোকে বলত মানিকজোড়। আমরা দুজনেই ছিলাম বৃত্তিধারী। লোকে আমাদের চেয়ে চেয়ে দেখত আর আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিত ঐ যে দুজন বৃত্তিধারী ছাত্র। আমাদের ক্লাশে আমিই ছিলাম একমাত্র মুসলমান ছাত্র। আমাদের এক ক্লাস উপরে পড়তেন ফজলুর রহমান, তার বাড়ি ছিল সুনই গ্রামে। সম্পর্কে তিনি আমার ভাই হতেন। স্কুলে আর কোনো মুসলমান ছেলে ছিল বলে আমার মনে পড়ে না। আমাদের সাথে দুজন মেয়ে পড়ত। নাম ছিল ভগবতি আর লীলাবতী। তারা ছিল দুই বোন। লীলাবতী ছিল ছোট। আর ওদের বাবা ছিল একজন পল্লী ডাক্তার, নাম ব্রজেন্দ্র বাবু। তিনি আমাদের পারিবারিক চিকিৎসকের মত ছিলেন। পাঠশালায় যখন পড়ি তখন তিনি মাঝেÑমাঝে আমাদের বাড়িতে আসতেন সাইকেলে চড়ে। পথÑঘাট তেমন ভালো ছিল না। বর্ষাকালে তো ডুবেই থাকতে এলাকা। শুকনা মৌসুমে এলাকায় ব্রজেন্দ্র বাবু মাঝেÑমাঝে আসতেন সাইকেলে চড়ে। এর আগে আমাদের গ্রামে কেউ কোনোদিন সাইকেল দেখেনি। সাইকেল দেখে অবাক হতো লোকে। আমিও অবাক হতাম। ব্রজেন্দ্র বাবু যেখানে সাইকেলে চড়তে পারতেন সেখানেই চড়ে যেতেন। পানি, কাঁদা পার হওয়ার সময় তিনি কাঁধে করে সাইকেল পার করতেন। সাইকেল চড়ত তার পিঠে। এভাবে পথ ভাগাভাগি করে তিনি আসতেন।

স্কুলের হেডমাস্টার ছিলেন আন্ডারগ্রাজুয়েট সুরেশ তালুকদার। তিনি হিন্দু দাশ সম্প্রদায়ের লোক ছিলেন। মধ্যনগর ছিল সাহা প্রধান এলাকা। টুকিটাকি ছোটÑখাট ব্যবসা থেকে শুরু করে সকল ব্যবসায়ই ছিল সাহাদের হাতে। দাশ এবং সাহা সম্প্রদায়ের মধ্যে ছিল তীব্র বিদ্বেষ। দাশেরা নিজেদের উচ্চ শ্রেণীর লোক বলে মনে করত। কায়েত কান্দার মনোরঞ্জন দাশ পড়ত আমার সাথে। সে পড়াশুনায় মোটামুটি ভালোই ছিল। আমাদের অংক করাতেন সুজেন্দ্র কুমার রায়। তিনি ভারত বাবুর শ্যালক। আর বাংলার শিক্ষক ছিলেন দীনেশ বাবু। তিনি ছিলেন দাশ সম্প্রদায়ের এবং মৌলবি বাজারের লোক। বাংলার আরেকজন শিক্ষক ছিলেন তার নাম ছিল সখিবরণ রায়। তার বাড়ি ছিল বড়নার চড়। সখি বাবু আমাকে খুব আদর করতেন। ব্যাডমিন্টন খেলতে গিয়ে সখি বাবু একবার পিছলে পড়ে যান, এতে তার একটা হাত ভেঙে যায়। অনেকদিন সেই হাতে ব্যান্ডেজ বাঁধা ছিল।
মধ্যনগর স্কুলে ভর্তি হয়ে আমি এক নতুন জগতের পরিচয় পেলাম। স্কুলে অনেক পত্রিকা রাখা হতো। এর মধ্যে ছিল মাসিক বসুমতি, প্রবাসী, ছোটদের কাগজ শিশুসাথী। এই কাগজগুলো আমি খুটিয়ে খুটিয়ে পড়তাম। বসুমতি পত্রিকার সম্পাদকীয়তেই আমি প্রথম একটা অদ্ভুত নামের সাথে পরিচিত হই। সেই নামটি ছিল জিন্নাহ। সেই পত্রিকায় জিন্না সাহেবের নাম ও ছবি ছাপা হয়েছিল। টাই-কোট পড়া একজন প্রতিভাদীপ্ত মানুষ। তার মাথার চুল ছিল বেক ব্রাশ করা। মাথার উপর এক ফালী চুল ছিল সাদা। মাথার সেই অংশটা সূর্যের আলোতে প্রতিফলিত হয়ে রুপালি রঙ্গে ঝলমল করত। পত্রিকায় এই লোকটার নিন্দা করা হতো। তাঁর অপরাধ তিনি মুসলমানদের স্বার্থ রক্ষার কথা বলতেন। আর তাতেই আমি জিন্নাহ নামটির প্রতি আকৃষ্ঠ হয়ে গেলাম। আমার এই আকর্ষণ দিন দিন বেড়েই চলল। দেশে তখন কংগ্রেস আন্দোলন চলছে। মধ্যনগর বাজারে হাটের দিন প্রায়ই দেখি কাপড়ের দোকানীরা তাদের বিলাতী কাপড়চোপর লুকাচ্ছে। এর বেশ কিছুদিন আগে থেকে বিলাতি বর্জনের আন্দোলন চলছে। লোকে বলাবলি করত যে ভলান্টিয়ার আসছে। এই ভলান্টিয়াররা বিলাতি শাড়ি, ধূতি কেড়ে নিয়ে পুড়িয়ে ফেলত, তাই হাটের দিনে সবাই আতঙ্কে থাকত। মধ্যনগরে তখন কোনো পুলিশ ছিল না। হাটের দিন কোনো কোনো সময় পুলিশ আসত ধর্মপাশা থেকে, তখন ভলান্টিয়াররা আত্মগোপন করত। যেদিন ভলান্টিয়াররা আসত না সেদিন দোকানদারেরা স্বাধীনভাবে বেচাকেনা করত। ভলান্টিয়াররা ছিল হিন্দু আর দোকানদাররাও ছিল হিন্দু। আমরা কৌতুহলের সাথে ওদের কাজকর্ম লক্ষ্য করতাম। বিলাতি কাপড়ের কি দোষ ছিল তা সে সময় বুঝতে পারতাম না।
ক্লাসে আমি ছিলাম একমাত্র মুসলমান ছেলে। গলহা গ্রামের ললিত বিসম্ভর গৌরাঙ্গ পড়ত আমার সঙ্গে। সোমধন আর মনোরঞ্জন তো ছিলই। আমার এক ক্লাস ওপরে পড়ত ফজলুর রহমান। আর ফাইভে পড়ত শিয়ালসালার লাল হোসেন। সে মহিউদ্দিন মিয়ার বাড়িতে জায়গির থাকত। সে ভীষণ হিংসুটে ছিল। আমি পরীক্ষায় সকল বিষয়ে প্রথম হই সে এটাকে সহ্য করতে পারত না। ঐ বাড়িতেই থাকত প্রাইমারি স্কুলের একজন শিক্ষক জনাব আব্দুল হামিদ। তার বাড়ি ছিল সেলবরসের দক্ষিণে সৈয়দপুর গ্রামে। তিনি লাল হোসেনের কর্মকা-ে বিরক্ত হতেন এবং আমাকে সান্ত¡না দিতেন। বলতেন তুমি ছাত্র ভালো এটা তোমার কোনো অপরাধ নয়। আল্লাহই তোমাকে প্রতিভা দিয়েছেন। তুমি এই নিয়ে কোনো দুঃখ করো না। তোমাকে কেউ ঠেকাতে পারবে না।
মাস্টার সাহেব কলেজে ফোর্থ ইয়ার পর্যন্ত পড়েছিলেন। তিনি ছিলেন দীর্ঘদেহী ও ফর্সা। তার মুখে ছিল চাপদাড়ি। আমি কখনো কখনো তাকে আমার ইংরেজি লেখা দেখাতাম, পড়ে তিনি অবাক হতেন। মধ্যনগর থাকতে তার সাথে তার বাড়িতে বেড়াতে গিয়েছিলাম। তার বাড়িতে কাচামিঠা আম ছিল। আমি সেই আম খেয়েছিলাম। তাকে আমি নানা ডাকতাম। আমি মধ্যনগর থেকে চলে আসার পরেও বহু বছর তার সাথে আমার সম্পর্ক ছিল।
সোমধন আর আমি প্রায় গলাগলি করে চলাফেরা করতাম। মধ্যনগর বাজারে প্রায় সকলেই আমাদের চেয়ে চেয়ে দেখত। বৃত্তি পরীক্ষায় সুনামগঞ্জের মধ্যে সেকেন্ড হয়েছিল সোমধন। তার হাতের লেখা ছিল মুক্তার মত। আমি হয়েছিলাম পঞ্চম। দুজনেই এসে ভর্তি হয়েছিলাম মধ্যনগর স্কুলে ক্লাস থ্রিতে। ক্লাস থ্রিতে বার্ষিক পরীক্ষায় সব সাবজেক্টে প্রথম হই। তবুও সোমধনের সাথে আমার ভাব ভাঙলো না। সে আনন্দের সাথে আমার সাফল্যকে স্বীকার করে নিলো। বহু বছর পরে আমি একটি গল্পে সোমধনের সাথে আমার সম্পর্কের কথা লিখবার চেষ্টা করেছি। সোমধন মারা গেছে কিন্তু তার ছেলেমেয়ের জন্য আমি কিছ্ইু করতে পারিনি। মাইনর স্কুলে বৃত্তি পরীক্ষায় যোগ্যতা অর্জনের জন্য মনোরঞ্জন নিজেকে তপশীলি হিন্দু বলে নিজের পরিচিতি দিয়েছিলেন। কিন্তু মনোরঞ্জন ছিল দাশ শ্রেণীর লোক। মনোরঞ্জন বৃত্তি পায়নি। সে ইন্টার পাস করেই একটা চাকরিতে যোগদান করে এবং পাকিস্তান হওয়ার পর সে অবসর নিয়ে শিলংÑএ চলে যায়।

আমি তখন মধ্যনগর স্কুলে পড়ি। আর তখনই মুসলিম লীগের কাজ কিছুটা শুরু হয়েছে। আমাদের এলাকার এম এল এ ছিলেন মকবুল হোসেন। তিনি বিখ্যাত সাংবাদিক ছিলেন। কলকাতায় বিখ্যাত দৈনিক সুলতানের সম্পাদক ছিলেন। পরে সিলেটের যুগভেরী পত্রিকার সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন। তবে এলাকায় তিনি বেশি আসতেন না। লোকেরা তার নাম জানত কিন্তু চিনত না। তার গ্রামের বাড়ি ছিল তাহেরপুর থানায় গাড়ো পাহাড়ের পাদদেশে বিন্নাকলি গ্রামে। একবার শুনলাম যে মকবুল সাহেব বর্ষাকালে স্টিমারে চড়ে মধ্যনগর আসবেন আসামের মন্ত্রী আব্দুল মতিন চৌধুরীকে নিয়ে। এরা দুজনে ছিলেন সুপুরুষ। তখন বোধ হয় আমি ক্লাস ফাইভে পড়ি। তাকে একটা সংবর্ধনাপত্র লেখার দায়িত্ব দেয়া হলো আমার ওপর। আমি তা পাঠ করলাম । তিন দিনের জন্য ছুটি মঞ্জুর হলো। মকবুল হোসেনের ছোট ভাই ছিল ইকবাল হোসেন। তিনি আলীগড় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এমএ এবং ল পাস করেন। কিছুদিন ওকালতি করে পরে জুডিশিয়াল সার্ভিসে যোগ দেন এবং জেলা জজ হিসেবে অবসর গ্রহণ করেন। কয়েক বছর আগে তিনি মারা যান। বনানীতে তাকে কবর দেয়া হয়েছে। ইকবাল হেসেনের সংগে আমার প্রত্যক্ষ পরিচয় হয় সুনামগঞ্জে। তখন আমি সুনামগঞ্জ জুবিলী হাইস্কুলের ছাত্র। তিনি আমাকে আপন ছোট ভাইয়ের মত সহায়তা করতেন। তার প্রেরণায় আমি সুনামগঞ্জের নাজাত দিবসের সভা অরগানাইজ করি। শহরের পার্শ্ববতী গ্রামগুলোর মসজিদে গিয়ে বক্তৃতা করি এবং সভায় আসার জন্য আকুল আবেদন জানাই। সেই মিটিং হয়েছিল মনোয়ার সাহেবের বাড়ির সম্মুখে টেনিস ফিল্ডে। এই মিটিংয়েই আমি সর্বপ্রথম প্রকাশ্য জনসভায় বক্তৃতা করি। মিটিংয়ে প্রধান বক্তা ছিলেন মকবুল হোসেন। এই মিটিংয়ের পর সুনামগঞ্জের মুসলিম লীগের একটা সাড়া পড়ে যায়।
মধ্যনগর ডোবা জায়গা। ছয় মাস অথৈই পানিতে হাঁসের মত ভাসে। হেমন্তে হেঁটে স্কুলে যাই। বর্ষায় যাই নৌকায় করে। আমরা ছোট ছোট ছেলেরা প্রত্যেকের হাতে একটা করে বৈঠা নিয়ে নৌকা বাইতে বাইতে পানি পার হতাম। আমাদের কোনো কোনো শিক্ষক আমাদের সাথে স্কুলে যেতেন। আমাদের উপরের ক্লাসের ফজলুর রহমান বলতেন তোমরা কেউ কেউ সেউতি দিয়ে জল সেঁচ করতে থাক। আমরা তার কথায় হাসাহাসি করতাম। একবার নয় বহুবারই নৌকা ডুবতে ডুবতে বেঁচে গেছে। আমরা ছোট ছেলেরা সকলেই সাঁতার জানতাম। একবার সুনুই পাড়া আর আমাদের স্কুলের মধ্যবর্তী ফাঁকা জায়গায় নৌকা ডুবে যায়। অবশ্য নৌকাডুবির ব্যাপারে আমাদের দুষ্টুমিও ছিল। আমাদের শিক্ষকদের কেউ কেউ সাঁতার জানতেন না। সাঁতার না জানলে যে কী বিপদ হতে পারে তা তারা এবার বুঝতে পারলেন। আমরা নৌকাটি উল্টিয়ে, নৌকার পিঠে সখিবাবু আর দীনেশ বাবুকে চড়িয়ে মজা করলাম। দীনেশ বাবু ছিলেন মোটাসোটা বামন মানুষ। তারই অসুবিধা হয়েছিল বেশি। সখিবাবুর তেমন অসুবিধা হয়নি। তিনি হালকা পাতলা চালাক চতুর মানুষ ছিলেন। নৌকা ডুবাকে তিনি এনজয় করলেন এবং আমাদের সাথে হাসাহাসি করলেন। তিনি বললেন, জীবনে কখনো সাঁতার কাটিনি তবুও তোরা আমাকে ডুবাতে পারলি না। সখিবাবু টিসার্স কমনরুমে তার অদ্ভুত অভিজ্ঞতার কথা বললেন। শুনে সবাই হাসলেন এবং সখিবাবুকে তার সাফল্যের জন্য ব্রাভো দিলেন।
ক্লাস ফোরে বার্ষিক পরীক্ষার ফল প্রকাশ হলো। আমি সব সাবজেক্টে ফার্স্ট হলাম। একটা রীতিমত কানাকানি শুরু হলো। পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানে আমি অনেকগুলো বই পুরস্কার পেলাম। লাল কাগজে মুড়িয়ে লাল ফিতে বেঁধে আমাকে দেওয়া হলো, লাল ফিতা বেঁধে এই পুরস্কার। বইগুলো বয়ে নিয়ে আমার জায়গির বাড়ি যাওয়ার জন্য এগিয়ে এলো আমার সঙ্গি ছাত্ররা। বইগুলো বাড়িতে নিয়ে যাওয়া হলো। পাশের বাড়ির একটি মেয়ে এসে বললেন ভাইসাব আমাকে আপনার একটা বই দেখতে দেবেন? এই মেয়েটিকে আমি কয়েক বছর আগে দেখেছি। আমাকে রসিকতা করে বলেছিল সাঁতার যখন জানো ঝাঁপ দাওনা নদীতে। তখন সে ফ্রক পড়তো। আর এখন রীতিমত একটি শাড়ি পড়েছে। আমি তার মুখের দিকে তাকিয়ে মৃদু হেসে বললাম তুমি বই দিয়ে কি করবে? বেশির ভাগ বইতো ইংরেজি বই। বইগুলোর মধ্যে চার্লস্ ডিকেনসেরবি¬ক হাউজ ইত্যাদি ইত্যাদি বই। মেয়েটি হেসে বললÑ ইস আপনিই শুধু পড়তে পারবেন আর কেউ পড়তে পারবে না! ঠিক আছে চাই না আপনার বই। কী দেমাক! আমি অদ্ভুতভাবে তার মুখখানার দিকে তাকিয়ে রইলাম। বললাম, নিয়ে যাও সব বই। এরপর বইগুলো নিয়ে একটা হুলস্থুল পড়ে গেলো। পরে জানতে পারলাম মেয়েটির নাম রাজবদন।
এতগুলো দামি দামি বই পেয়েছি কিন্তু রাজবদন সব দখল করে বসে আছে। এতে আমার নাম আরো ছড়িয়ে পড়ল, কিন্তু অনেকে হিংসায় জ্বলে পুড়ে মরতে লাগল। ওদের বাড়িতেই থাকে লাল হোসেন। আমার দুই ক্লাস ইপরের ছাত্র। সে বলতে লাগল আমাদের কুদরত আলীর কাছে কিছুই না। লাল হোসেন আজ পর্যন্ত কোনো বই পুরস্কার পায়নি। কোথাকার এক গ- গ্রামের এক ছেলে শাহেদ আলী এসে সব পুরস্কার বাগিয়ে নিয়েছে। সে অস্থিরভাবে রাগে হিংসায় নিজেকে কামড়াতে লাগল। রাজবদন একদিন বললÑ ‘লাল ভাই এত পাগলামি করছে কেন বুঝি না। সে তোমার নাম সহ্যই করতে পারে না।’ একদিন রাজবদন দেখা করতে এলো আমার সাথে। পাশের বাড়িতেই আমি থাকি। যাওয়ার সময় একটা ম্যাচের খোল পিছনে ফেলে যায়। আমি সেটি খুলে দেখি তার মধ্যে ছোট্ট একটি কাগজের টুকরা। আনাড়ি হরফে লিখেছে, ‘আব্বা-আম্মা প্রায়ই শুয়ে শুয়ে তোমার কথা বলেন, তোমাকে নাকি তাদের খুব ভালো লাগে। এটা পড়ে আমার শরীরটা এক অজানা আনন্দে শিউরে উঠল। আমি এরপর খুব শরমিন্দা হয়ে চলাফেরা করি।’
মহিউদ্দিন মামা আমাকে দেখলেই স্মিত হাসেন আর রাজবদনের আম্মা আমাকে দেখে প্রায়ই ডেকে কথা বলেন। এত লাল হোসেনের জ্বালাযন্ত্রণা আরো বেড়ে যায়। সে তলে তলে আমার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র শুরু করে দেয়। কিন্তু প্রকাশ্যে কিছুই বলতে পারে না কারণ সে রাজবদনদের বাড়িতেই জায়গির থাকে। তাদের ক্ষ্যাপাতে সে সাহস পায় না। মহিউদ্দিন মামার এক চাচাত ভাই, সবাই তাকে ডাকে রক্কু বলে। লোকটা ছিল খুবই হিংসুটে। সেও আমাকে সহ্য করতে পারত না। তার সঙ্গে মিলে লাল ষড়যন্ত্র পাকিয়ে বসে। এর মধ্যে রাজবদনের এক খালাত ভাই হাইÑমাদরাসায় পড়ত। সে মধ্যনগর আসে কিছুদিনের জন্য। কিছুদিন থাকবে খালার বাড়িতে। ওর বাড়ি আর লালের বাড়ি একই গ্রামে। এক ছুটিতে আমি ছিলাম আমার গ্রামের বাড়িতে। এসে দেখি আমার কাঠের বাক্সটি ভাঙা। এই বাক্সেই আমি আমার দরকারি কাগজপত্র রাখতাম। রাজবদনের চিঠিগুলো এটাতেই রেখেছিলাম। ওরা আমার বিরুদ্ধে আন্দোলন তৈরি করলেও রাজবদনের কাছ থেকে কিছুই আদায় করতে পারল না। আমার চিঠিগুলো সে কোথায় লুকিয়ে রেখেছিল তার কোনো হদিসই খুঁজে পাওয়া গেলো না। মহিউদ্দিন মামা রাজবদনের চিঠিগুলো নিয়ে আপত্তিকর তেমন কিছু বললেন না। তিনি লাল ও রক্কুকে উল্টো শাসিয়ে দিলেন। একদিন আমি দেখলাম হাই মাদরাসায় পড়া মীর ফাউন্টেনের কালি দিয়ে ইংরেজিতে একটা চিঠি লিখছে আমার বিরুদ্ধে মধ্যনগর হাই স্কুলের হেডমাস্টারের কাছে। আমাকে দেখেই সে থেমে গেলো। চিটিঠা সম্পূর্ণ করেছে কিনা তা আমি জানি না। সম্ভবত মহিউদ্দিন মামার ভয়ে সে শেষ পর্যন্ত চিঠিটি হেডমাস্টারের
কাছে পৌঁছায়নি। তখন থেকে রাজবদনের সঙ্গে আমার দেখা সাক্ষাৎ কম হতো। রাজবদনের ইংরেজি শিখার খুব শখ ছিল। সে মাঝেÑমাঝে ইংরেজি বই নিয়ে আমার কাছে আসত। একদিন সে ইংরেজি হস্তলিপির বই নিয়ে এসেছিল কিন্তু তার লেখা ঠিক হচ্ছিল না। মামা রাজবদনের ডান হাতটা আমার হাতে তুলে দিয়ে বললেন তুমি ধরেÑধরে লেখা শিখাও। আমি রাজবদনের হাতে হাত নিয়ে তাকে কি করে ইংরেজি ক্যাপিটাল লেটার লিখতে হয় তা শিখিয়ে দিলাম। সেই রাজবদনের সাথে তখন আর আমার দেখা সাক্ষাৎ হয় না। মনমরা হয়ে থাকি। রাজবদনও আমাকে এড়িয়ে চলে।
এর মধ্যে আমার জায়গির হলো কান্দাপাড়া ফরমুজ আলী ভাইয়ের বাড়িতে। ফরমুজ আলী ঘি এর ব্যবসা করতেন। সেই সূত্রেই আমাদের বাড়ির সাথে তার পরিচয়। আমাদের বাড়ি থেকে তিনি ঘি কিনতেন। তিনিই আমাকে তার বাড়িতে নিয়ে আসেন। তার স্ত্রীকে আমি ভাবি ডাকতাম। পরম আদরে তিনি আমাকে তার কাছে বসিয়ে খাওয়াতেন।
নোয়াখালীর এক মৌলবি সাহেব কান্দাপাড়া এসে বিয়ে করে এখানকার বাসিন্দা হয়ে গেলেন। তিনি তার নোয়াখালীর ভাষায় খুব দ্রুত কথা বলতেন। তার কথা আমাদের বুঝতে কষ্ট হতো। তার ছেলে হয়েছিল অনেকগুলো। খুব ইচ্ছা হয় তার কাছে বসে তার কথা শুনি। তার কথা বেশিরভাগই বুঝা যায় না। তার কথা বেশি বুঝত তার শ্যালকেরা। আমি অবাক হতাম মৌলবি সাব কেন তার দেশ ছেড়ে এখানে এসে বসতি গড়েছেন। এখন বুঝি এভাবেই মানুষ দেশ বিদেশে এসে ছড়িয়ে পড়ে। মৌলবি সাব ছিলেন খুব বুদ্ধিমান এবং কুটকুশলি একজন মানুষ। তার বাড়ির দক্ষিণে ছিল একটা বড় বটগাছ। চারদিকে তার ডালপালা ছিল ছড়ানো। সেই গোলাকার বটগাছটা আমার কাছে কেমন যেন রহস্যজনক মনে হতো। কান্দাপাড়া থাকতেই পরিচয় হলো আরব আলী ও তার ভাইদের সাথে। আরব আলীর ছোট ভাই জাফর আলীর সঙ্গে আমার হৃদ্যতা জন্মেছিল। জাফর আলী খুব পরিশ্রমী ছিল। বলা যায় তার পরিশ্রমেই তাদের সংসারটা দাঁড়িয়ে ছিল। তখন বাল্লা অঞ্চলে প্রচুর পাট হতো। আরব আলী একবার অনেকটা পাটক্ষেত পাটসহ বন্দক রেখে সেই জমি দেখাশুনা করার জন্য জাফর আলীকে বাল্লা অঞ্চলে পাঠিয়ে দেন। বিদেশে তখন পাটের দাম হু হু করে বেড়ে যাচ্ছে। তখন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলছে। জাফর আলী পাট ছেড়ে না দিয়ে ধরে রাখলেন। এই পাটে প্রচুর দাম পেলেন। জাফরের অবস্থা পাল্টে গেলো এক বছরে। বাড়িতে ওদের দুটি বড় ঘর ছিল ছনের। একটি থাকার ঘর আর একটি ছিল কাচারি ঘর। আগের ছাওনি পঁচে গেলে আর ছাওনি দেওয়া হতো না। এখন উঠে গেলো টিনের চালা। সেই থেকে ধীরে ধীরে একদিন জাফর আলী ও আরব আলীর নামের সাথে যোগ হলো তালুকদার। এভাবে তাদের সম্পত্তি বেড়ে গেলো। কান্দাপাড়ার একটা লাগালাগি পাড়ার নাম হচ্ছে মাছিমপুর। মাছিমপুরের মেন্দি মিয়াকে কান্দাপাড়ার লোকেরা ভক্তি শ্রদ্ধা করত। তাদের নাকি ছোট খাট মিরাশদায়ী ছিল। কিন্তু চালচলনে সাধারণ গৃহস্থের সঙ্গেও তার কোনো পার্থক্য ছিল না। একবার আরব আলীর বাড়িতে মিলাদ মাহফিলের আয়োজন করা হয়। মনে পড়ে কী সম্মানের সঙ্গে আরব আলী মেন্দি মিয়ার সামনে প্লেট ও খাবার পরিবেশন করলেন! এই মেন্দি মিয়ারই আত্মীয় ছিলেন নুরুমিয়া। তাদের আর্থিক দুর্দশার কোনো অন্ত ছিল না। নুরু মিয়া মধ্যনগর মাইনর স্কুলে কোন ক্লাস পর্র্যন্ত পড়ালেখা করেছেন তা আমি জানি না। মধ্যনগরে দেখতাম তিনি প্রতি মঙ্গলবারে গরুর হাটে মহিউদ্দিন মামার সাথে গরু বিক্রির রসিদ লিখছেন। মধ্যনগর বাজারে প্রতি মঙ্গলবার গরুর হাট বসত। তার আর কোনো ব্যবসা ছিল কিনা তা আমি জানি না। পরবর্তীকালে যখন পাকিস্তান হয়। তখন কয়েক শ বিঘা জমি তার নিজের নামে রেকর্ড করিয়ে নেয়। তার ঐ আয় থেকে বেশ সমৃদ্ধির মধ্যেই জীবন অতিবাহিত হতে লাগল।
কান্দাপাড়া থেকে আবার আমি মধ্যনগর চলে আসি। রাজবদনদের পাশের বাড়িতেই থাকি, কালেভদ্রে তার সাথে দেখা সাক্ষাৎ হয় কিন্তু কথা হয় না। একদিন সে লুকিয়ে একটি মেয়েকে নিয়ে আমার সাথে দেখা করতে আসে। আমার মামুদের সম্পর্কে মেয়েটি আমার বোন হয়। হালকা পাতলা লাল টকটকে এই মেয়েটি। মেয়েটির নাম ছিল নাজমা। সে-ই কথা বলল রাজবদন তার সঙ্গে থাকল। কিছুক্ষণ কথা বলার পর তারা উঠে চলে গেল।
রাজবদনকে দেখলাম বিমর্ষ। সে কথা বলতে পারল না। স্কুলে ভগবতী-লীলাবতী আমাদের সঙ্গেই পড়ে। আমাদের সঙ্গে তেমন কথাবার্তা হয় না। ওরা দুজনে একদিন তহশিল অফিসে গিয়ে নায়েব শশধর বাবুর কাছে গিয়ে নালিশ করে বসে। নরেণ আমার সঙ্গেই পড়ে। বাড়ি মহজমপুর, বয়সে আমার চেয়ে দু-চার বছরের বড় হবে। সে নাকি শশধর বাবুর যে মেয়েটি ক্লাস ফোরে পড়ে তাকে চিঠি লিখে।
প্রমাণস্বরূপ ছেড়া চিঠির টুকরাগুলো সংগ্রহ করে ওরা হাজির করল। শশধর বাবু মানুষটা ঠা-া মেজাজের। তিনি হেডমাস্টার সুরেশ বাবুকে ডেকে বিষয়টি জানালেন। সুরেশ বাবু নরেণকে ডেকে জিজ্ঞেস করলেন। নরেণ অনেকক্ষণ চুপ করে বসে থেকে বলল আমার নাম, আমি নাকি ঐ চিটিঠা লিখেছি। নরেণ কয়েকদিন ধরে আমাকে পিড়াপিড়ি করছিল; ভাই আমার হাতের লেখা ভালো না, তুই আমাকে একটা চিঠি লিখে দে? সুরেশ বাবু আমার কাছে জানতে চান ব্যাপারটা কী। আমি বললাম চিঠির হাতের লেখা সব আমার কিন্তু কথাগুলো সব নরেনের। তার অনুরোধেই আমি লিখেছি। শুনে তিনি রাগে কাঁপতে লাগলেন। তারপর একটি বেত নিয়ে আমার গায়ে সপাং সপাং মারতে লাগলেন। নরেণ একপাশে দাঁড়িয়ে আমার অবস্থা লক্ষ্য করতে লাগলেন; আমি মার খেয়ে কাঁদছি কিনা। হেডমাস্টার তা দেখে আমাকে গাল দিয়ে উঠলেন, হারামজাদা তুই এত বড় ক্রিমিনাল যে চোখ দিয়ে একটু পানি পর্যন্ত ঝরছে না। নরেণও দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে মার খেলো। তারপর এক সময় ঘর থেকে বেরিয়ে এলাম। মনে মনে স্থির করলাম আর কোনো দিন স্কুলে যাব না। সোমধন যে আমাকে কি সান্তনা দেবে তাও বুঝতে পারছিল না। হেডমাস্টার আমাকে শাস্তি দিয়েছে সবাই জানে, কিন্তু কেন শাস্তি দিয়েছে তা কেউ জানে না
ক্লাসের ফার্স্ট বয় আমি। আমি পরীক্ষায় ভালো ফল করলে স্কুলের সুনাম হবে সেই অপেক্ষায় আছে আমার শিক্ষকেরা। কিন্তু এর মধ্যে এমন কা- ঘটে গেলো যে, আমার ভবিষ্যতই ধ্বংসের পথে। রাস্টিকেট কথাটা তখন থেকে শুনতাম। এটি খুব অপমানজনক কথা। স্কুলের ফার্স্ট বয় কি তাহলে রাস্টিকেট হয়ে যাবে?
শেষ পর্যন্ত কী এক রহস্যময় উপায়ে স্কুলের ব্যপারটি ধামাচাপা পড়ে গেলো। আমি কয়েক দিনের জন্য বাড়ি চলে গিয়েছিলাম। বাড়িতে গিয়ে হায়দারকে নিয়ে মাছ ধরতে গিয়েছিলাম। ঝুড়ি হাতে নিয়ে আমি নৌকার গলুইতে দাঁড়িয়েছিলাম আর হায়দার বৈঠা হাতে নিয়ে নৌকা বাইতেছিল। আমার পিঠে কালো দাগ দেখে সে চমকে ওঠে বললÑ নানা এটা কিসের দাগ? বললাম, আমাকে হেড মাস্টার মেরেছে। হায়দার প্রায় হাউমাউ করে ওঠল। বাড়িতে গিয়ে শুনতে পেলাম হেডমাস্টার আমাকে স্কুলে যাওয়ার জন্য লোক পাঠিয়েছে। আমি ভাবলাম তাহলে কি শাস্তি আরও বাকি আছে? আমি মধ্যনগর গেলাম হেডমাস্টার তার কামরায় ডেকে পাঠালেন। তিনি লজ্জায় আমার সাথে কথা বলতে পারলেন না। শুধু একবার বললেন যে ‘এখন থেকে মন দিয়ে পড়ালেখা কর। দুষ্ট ছেলেদের পাল্লায় পড়ো না।’ আমি চুপ করে ক্লাসে গেলাম। এ নিয়ে আর কোনো কথাবার্তা শুনলাম না। ছেলেরাও কিছু জানে বলে মনে হলো না। নরেণ কয়েকদিনের জন্য বাড়ি চলে গিয়েছে। শশধর বাবুর মেয়েও স্কুলে আসে না। শশধর বাবু এ নিয়ে আর কোনো উচ্চবাচ্য বলেন নাই। তিনি এমনভাবে লোকের সাথে ব্যবহার করতে লাগলেন যেন তিনি কিছুই জানেন না।

মধ্যনগর এলাকাটায় সাহাদের প্রাধান্য বেশি। ব্যবসা-বাণিজ্য সব তাদেরই হাতে। বহুদিন ধরে সাহা ও দাশ সম্প্রদায়ের মধ্যে স্কুলের নেতৃত্ব নিয়ে রেষারেষি চলছে। সাহা কমিনিউটি স্কুলের একজন দাশ হেডমাস্টারকে বরদাস্ত করতে পারছিল না। তারা চাইলো একজন বিএ বিএড হেড মাস্টার নিযুক্ত করবেন। কাগজে বিজ্ঞাপণ দেয়ার পর সুরেশ বাবু স্কুল ছেড়ে চলে গেলেন। সিলেটের জনৈক বসন্ত কুমার রায়কে এপয়েন্টমেন্ট দেওয়া হলো। তিনি ছিলেন বিএবিএড। সুরেশ বাবুর জন্য আমার খুব দুঃখ হলো। তাকে অপমানিত হয়ে মধ্যনগর স্কুল ছেড়ে চলে যেতে হলো। এভাবে মধ্যনগর স্কুলে সাহা সম্প্রদায়ের কর্তৃত্ব কায়েম হলো। বসন্ত বাবু সাদা ফিনফিনে ধুতি পড়তেন। তার মাথার চুল ছিল কোকড়ানো, গায়ের রঙ ছিল শ্যামলা। হাতে মেয়েদের মত একটা ছোট সৌখিন ঘড়ি পড়তেন। তিনি পরবর্তীকালে মধ্যনগরেই ভগবান বাবুর বোনকে বিয়ে করেন। শিক্ষক হিসেবে তিনি ছিলেন খুবই নিষ্ঠাবান। আমাকে খুব হেল্প করতেন। আমি ভালো রেজাল্ট করব এতে তার স্কুলের সুনাম হবে। বসন্ত বাবু এই স্বপ্ন দেখতেন। বসন্ত বাবুর সময়ে মধ্যনগর স্কুলে একজন স্কুল শিক্ষককে কাজ দেওয়া হয়। তিনি নিচের ক্লাসে পড়াতেন। সম্ভবত তার বাড়ি ছিল সেলবরস। তার জায়গির ছিল সোলেমানপুরে। স্কুলে তার পরিচয় ছিল আজব আলী মাস্টার হিসেবে। তিনি নাকি সেলবরসের আব্দুল খালেকের পালিত পুত্র ছিলেন। অল্পবয়স থেকেই নাকি তিনি খালেক সাহেবের সাথে থাকতেন। খালেক সাহেব কিছুকাল কলমাকান্দা থানার সীমান্তবর্তী একটি মাইনর স্কুলে শিক্ষকতা করতেন। আজব আলী তখন তার সঙ্গেই থাকতেন। বিসরপাশা মাইনর স্কুলে কিছুকাল কাজ করার পর খালেক সাহেব তার ছেলেকে নিয়ে আসামের তেজপুর চলে যান। সেলবরস গ্রামের জমিদার পরিবারের নির্যাতনের ভয়ে তিনি তেজপুরেই অবস্থান করেন। পরে মোক্তারি পাস করে সুনামগঞ্জ শহরে এসে প্র্যাকটিস করতে থাকেন। আজব আলীও মুক্তারি পাস করে সুনামগঞ্জে ব্যবসা শুরু করেন। শিক্ষক হিসেবে আজব আলী ছিলেন ছাত্রদের খুবই প্রিয়।
মধ্যনগর স্কুলে পড়ার সময় আমি কলকাতার ‘শিশুসাথী’ পত্রিকার গ্রাহক হই। এক নতুন জগতের দরজা আমার জন্য খুলে যায়।
মধ্যনগর স্কুলে খেলাধুলার ব্যবস্থা ছিল। আমি সাধারণত ভলিবল, টেবিলটেনিস ও হাডুডু খেলতাম। ফুটবলে আমার খুব উৎসাহ ছিল না। আর তাই একবার ফুটবল খেলতে গিয়ে ব্যথা পাই । তখন থেকেই আমি ফুটবল খেলা ছেড়ে দেই। তবে সাঁতার কাটতে এবং নৌকা বাইতে ছিলাম অগ্রণী। যখন মধ্যনগর স্কুলে পড়ি তখন রহিমপুরে একবার আমাদের কম্পিটিশন হয়। আমি সেই কম্পিটিশনে যোগ দিয়েছিলাম। এক হিন্দু বাড়িতে আমাদের খাবার ব্যবস্থা করা হয়েছিল। ডাল, ভাত আর মাছের তরকারি দিয়ে আমরা খেয়েছিলাম। খাবার পর মুসলমান ছেলেদের বলা হলো তোমাদের প্লেটগুলো তোমরা ধুয়ে নাও। আর হিন্দু ছেলেরা কিন্তু তাদের থালা-বাসন ছেড়ে ওঠে পরল। তাদের ধুতে হলো না। কম্পিটিশন থেকে ফেরার পথে আমাদের নৌকা এসে ভিড়ল একটা খলায় । ওখানে খলার তরফ থেকে আমাদের দুপুরের খাবারের ব্যবস্থা করা হলো। এই খলাটা ছিল কৈর্বত্যদের। তারা খুব যতœ করে আমাদের খাওয়ালেন। মাছের মাথা দিয়ে মুগডাল রান্না করা হয়েছিল। আমি সকলের সঙ্গে খেতে কোনো সংকোচবোধ করিনি।
স্কুলে মুসলমান শিক্ষক ছিল খুব কম। মুসলমান ছাত্রও বেশি ছিল না। ছেলেদের মধ্যে সম্প্রীতি ছিল বেশি । এদের মধ্যে মনোরঞ্জন ছিল একটু আলাদা টাইপের ছেলে। সে আলগা আলগা থাকত। কিন্তু সোমধন আমাদের সঙ্গেই থাকত। আগেই বলেছি তারা ছিল কুমার জাতের লোক। সোমধনের বাবা ছিল খুব স্বাস্থ্যবান মোটাসোটা লোক। সোমধনের বাবা আমাকে তার ছেলের মত আদর করতেন। বৈকুণ্ঠ বাবুর সোমধন ও আমাকে নিয়ে স্বপ্নের কোনো অন্ত ছিল না। তিনি যেখানেই যেতেন আমাদের দুজনকে নিয়ে তার গর্ব ও আশা-ভরসার কথা বলতেন।
মধ্যনগর বাজারের ব্যবসা-বাণিজ্য হিন্দুদের হাতেই থাকত। তারা যখন নতুন কোনো হাট বাজার বসাত সেখানে লোকজনের আকর্ষণ করার জন্য কয়েক নর্তকীকে এনে হাটে বসাত। প্রথম দিকে বেশ্যাপল্লী ছিল জমজমাট। দিঘির উত্তর পাড়ে পূর্ব-দক্ষিণে বসানো হয়েছিল বেশ্যাপল্লী। হাট বাজার করতে এসে লোকেরা বেশ্যাপাড়ায় ঢুকত। বেশ্যা মেয়েগুলো বেশির ভাগই ছিল যুবতী ও জাত ধর্মে সবাই ছিল হিন্দু। আমরা ঐ পাড়ার পাশ দিয়েই চলাফেরা করতেও লজ্জা বোধ করতাম। আজকাল যেমন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান করে প্রায়ই নতুন প্রতিষ্ঠান করা হয়। তখনকার দিনে বেশ্যাপল্লী স্থাপন করা ছিল একটা প্রাচীন ট্র্যাডিশন। মধ্যনগর বাজারের একটা বড় অংশ জুড়ে ছিল ওদের অবস্থান। এখন মধ্যনগর বাজারের যে স্থানে মসজিদ আছে সেখানে আগে ছিল সব পতিতালয়। মধ্যনগর বাজারে এখন আর কোনো পতিতালয় পল্লী নাই। আগে মধ্যনগর বাজার বসত শুক্রবারে স্থানীয় মুসলমানেরা আন্দোলন করে এখন এই হাটবার পরিবর্তন করে শনিবারে হাট চালু করেছে। এই আন্দোলনে আমার এক নানা নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। আমার ছোট মামুর শ্বশুর আহসানউল্লাহ এই আন্দোলনের একজন অন্যতম নেতা ছিলেন। এখনত এই মসজিদে নিয়মিত পাঞ্জেগানা নামাজ জামাতে পড়া হয়। শুক্রবারে জুমার নামাজে বিশাল জামাত অনুষ্ঠিত হয়। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর দ্রুত বাজারের চেহারা বদলে যেতে থাকে। মধ্যনগর মাইনর স্কুলটি পরে হাই স্কুলে রূপান্তরিত হয়। হাই স্কুলকে কেন্দ্র করে এখন হয়েছে কলেজ। ধানচাল সংগ্রহ করার জন্য তৈরি হয়েছে গোডাউন। কিন্তু তহসিল অফিসের পুরানো চেহারা নাই। নামকাওয়াস্তে কোনো রকমের টিকে আছে। এখানকার আয় থেকে তহসিল অফিস রক্ষণাবেক্ষণের জন্য কোনো অর্থ ব্যয় করা হয় না।
যেহেতু আমি পত্রিকার গ্রাহক ছিলাম। সেহেতু একদিন পত্রিকায় বিজ্ঞাপন দেখে আমার একটি হাতঘড়ি কেনার শখ হলো। বায়না ধরলাম মার কাছে আমাকে ঘড়ি কিনে না দিলে আমি আর কোনোদিন বাড়িতে আসবো না। তারপর এক মাস হলো দুই মাস হলো আমি আর বাড়ি যাই না। আব্বা বললেন আমার এখনো ঘড়ি হাতে দেয়ার সময় হয়নি। যখন হবে তখন কিনে দেবেন। এর মধ্যে আম্মা একদিন আমার জন্য গোপনে টাকা পাঠিয়ে দিলেন আর আমি ঘড়ির জন্য চিঠি লিখলাম কলকাতা। ওরা নিকেলের বেল্টওয়ালা একটি ঘড়ি আমার জন্য পাঠিয়ে দিলো। সেই ঘড়ি পেয়ে আমার কি যে আনন্দ! কিন্তু আম্মার কথা মনে হতেই আমার দুঃখও হতে লাগল। কেন আমি ঘড়ির জন্য পীড়াপীড়ি করতে গেলাম।
নতুন ঘড়ি পাওয়ার পর আমি পঞ্জিকা দেখে ঘড়ির সময় মিলাতে লাগলাম। বাড়ির পশ্চিমের ভিটায় দাঁড়িয়ে আমি সূর্যাস্ত দেখতাম এবং তার সাথে ঘড়ির টাইম মিলাতে চেষ্টা করতাম। আর এভাবেই ঘড়িটাকে কয়েকদিনের মধ্যেই নষ্ট করে ফেললাম। আজ এসব কথা মনে পরলে যেমন হাসি পায় তেমন কান্নাও পায়।
দুর্লভপুর যে বাড়িতে আমার ফুফুর বিয়ে হয়েছিল সেই বাড়ির ফুফার ভাইপোর বিয়েতে খুুব ধুমধাম হয়। সফর আলী ভাইকে বহু টাকা পয়সা খরচ করে ছামারাদানী গ্রামের বিত্তশালী কাঞ্চন মোড়লের মেয়ের সাথে বিয়ে দেয়া হয়। খুব ধুমদাম হয় সেই অনুষ্ঠানে। চারদিকে রটে যায় যে কাঞ্চন মোড়ল তার মেয়ের সাথে একজন বাঁদি মেয়ে দিয়েছেন। বাঁদি কাকে বলে জানতাম না। বিয়ে বাড়িতে গিয়ে দেখলাম বধুর পাশে একজন মাঝারি বয়সের মেয়ে দাঁড়িয়ে পাখা করছে। বাঁদি কোথায় জিজ্ঞেস করাতে একজন বলল ঐ যে বাঁদি পাখা করছে। শুনে আমি নিরাশ হলাম। মাঝারি বয়সের মেয়েলোককে তাহলে বাঁদি বলে? যে পাখা হাতে নববধুর গায়ে বাতাস করে। এই বিয়েতে সফর ভাইদের প্রচুর খরচ হয়েছিল। সফর ভাইয়ের দুটি মেয়ে হওয়ার পর সফর ভাই মারা যান। আর ভাবিটা সেই যে বাপের বাড়ি গেলেন আর ফিরে এলেন না।

মধ্যনগর স্কুলে যে লাইব্রেরি ছিল আমি তাই নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়লাম। যতই পড়ি নেশা আর মিটে না। ইংরেজি বই আর পত্র পত্রিকার দিকেই আমার ঝোঁক। তবে ইংরেজি শেখার একটা নেশা আমার পেয়ে বসে। ইংরেজি যে বই বুঝতাম না তাও পড়তাম। কিছুদিনের মধ্যেই স্কুলের প্রায় সব বই পড়ে শেষ করে ফেললাম। ঐ সময়ে একবার বেড়াতে গিয়েছিলাম সুুনই গ্রামে। ঐ গ্রামে আমার এক ফুপুর বিয়ে হয়েছিল। সেই সুবাদে কয়েকটি পরিবারের সাথে ছিল আমাদের আত্মীয়তা। সুনইয়ের হাফেজ আব্দুল রহিমের সঙ্গে আমাদের গ্রামেই দেখা হয়েছিল কয়েকবার। তখন তার খালাত ভাই আমাদের গ্রামের স্কুলে কিছুদিন শিক্ষকতা করেন। মৌলবি আব্দুল ওহাব আমাদের গ্রামের হাতেম মুন্সির বাড়িতে থাকতেন। তার সঙ্গেই আব্দুর রহিম গিয়েছিল আমাদের গ্রামে। তিনি আমার চেয়ে বয়সে একটু বড় ছিলেন। তিনি সিলেটে তেরছা হরফে ইংরেজিতে তার নাম দস্তখত করতে জানতেন। সেদিন এটা আমার কাছে তার একটা বড় কৃতিত্ব বলে মনে হয়েছিল। আহা, আমি যদি এ রকম করে তেরছা হাতে ইংরেজিতে আমার নাম লিখতে পারতাম!
সুনই গ্রামে বেড়াতে এসে আমি আমার কিছুদিনের শিক্ষক মৌলবি আব্দুল ওহাবের সাথে তার বাড়িতে বেড়াতে যাই। তারা ছিলেন দুই ভাই। ছোট ভাই আব্দুল হকও ছিলেন একজন মৌলবি। তিনি অতিশয় আধুনিক টাইপের লোক ছিলেন। তিনি অনেকগুলো পত্রিকার গ্রাহক ছিলেন। কয়েক বছরের মাসিক সওগাত পত্রিকা বাধাই করে রেখেছিলেন। তার টেবিলে সেই বইগুলো পেয়ে আমি খুশিতে লাফাতে শুরু করে দিলাম। আহ! হক সাবকে বললামÑ আপনি আপনার সওগাতগুলো আমাকে পড়তে দেবেন? আমি পড়ে আবার ফেরৎ দিয়ে দেবো। তিনি আমার দিকে তাকিয়ে রাজি হয়ে গেলেন। বললেন, নিয়ে যাও। তবে দেখ যেন নষ্ট না হয়, হারানো না যায়। আমি বাধাই করা কয়েকটি কপি আামার জায়গির বাড়ি নিয়ে এলাম। তারপর সেইগুলো বারবার করে পড়তে লাগলাম। ঐ সময়ের বাংলার সেরা সাহিত্যিকদের মধ্যে যারা ছিলেন তারা প্রায় সকলেই লিখতেন। এই সব সহজাত সাহিত্যিক লেখা পড়ে আমার সাহিত্যের প্রতি আকর্র্ষণ হতে লাগল। ভাবতাম এসব লেখাত আমার মত মানুষেরই লেখা। আমি কেন লিখতে পারব না।
এ দিকে মধ্যনগরে আমার বিরুদ্ধে কয়েকজন মিলে যে চক্রান্ত করছিলো তা আরো দানা বেঁধে উঠেছে। এই চক্রান্তের নায়কেরা ছিল খুবই হিংসুটে, পরশ্রীকাতর। আমি ওদের হিংসা ও নোংরামির তোয়াক্কা না করে গোপনে গোপনে লেখালেখি শুরু করলাম। লাল এবং তার সঙ্গীদের নোংরামি তুলে ধরে একটি উপন্যাস লিখলাম।
একবার গ্রীষ্মের ছুটিতে বাড়িতে যাই। তখন সঙ্গে করে ঐ উপন্যাসের পা-ুলিপিটা নিয়ে যাই। রাজবদনকে ঘিরে ওরা যে শয়তানী চক্রান্ত তৈরি করেছিল তা তুলে ধরি ঐ উপন্যাসে। কি আশ্চর্য সেই উপন্যাস শেষ হওয়ার আগেই উদরস্থ হয়ে গেলো একটা গাভীর। লিখতে লিখতে আমি শুয়ে পড়েছিলাম বিকেলের দিকে। কাচারি ঘরের দরজা ছিল খোলা। ঘুম ভেঙে একবার চেয়ে দেখি একটা গাভী আমার পা-ুলিপি চিবিয়ে চিবিয়ে খাচ্ছে! আমার উপন্যাস আর লেখা হলো না। আমি শয়তানির জবাব দিতে গিয়ে নিজেও শয়তানির আশ্রয় নিয়েছিলাম। তখন আমি বুঝলাম, আল্লাহ চাননি যে আমি এ ধরনের একটি অপকর্ম করি। পরে অবশ্য লাল এর সঙ্গে আমার সম্পর্কটা খুব ভালো হয়েছিল। সে আমাকে দোস্ত ডাকত। আমি তাতে আন্তরিকভাবে সাড়া দিতে পারতাম না। সে আমাকে যে আঘাত দিয়েছিল আমি তা হজম করতে পারছিলাম না। সে যখন আমার অন্তরঙ্গ হবার চেষ্টা করত তাতে আমার মনে হতো যে সে আমার সাথে অভিনয় করছে। আমি তার সাথে সহজ হতে পারতাম না। পরে সে প্রাইমারি স্কুলের শিক্ষক হয়েছিল। এর চেয়ে বেশি কিছু জানি না।
মধ্যনগরে আমার জায়গির বাড়ির পরিবর্তন হলো। আমি গেলাম ফাজিল মুন্সির বাড়িতে। এই বাড়িটা পাড়ার বাইরে একেবারে নদীর কিনারে। বাড়িতে লোকজন ছিল কম। ফাজিল মুন্সি সম্পর্কে আমার নানা হতেন। খুব জ্ঞানী মানুষ ছিলেন তিনি। তাদের একমাত্র ছেলে সামছু ছিলেন পরিশ্রমী এবং খুব বু্িদ্ধমান। তিনি তার একক চেষ্টায় এবং পরিশ্রমের মাধ্যমে তাদের সংসারটাকে গড়ে তুলেছেন। আব্দুল হাই তখন কোলের শিশু। তখন আমার সঙ্গে সঙ্গেই সে বেশি থাকত। এখন সে মধ্যনগর অঞ্চলের একজন বিত্তবান লোক। আব্দুল হাই এর দাদিকে আমি নানি ডাকতাম। তিনি আমাকে খুব আদর করতেন। আসলে নানিই ছিলেন এই পরিবারের কত্রী। আমার যাতে কোনো কষ্ট না হয় তিনি সব সময় খেয়াল রাখতেন। আমি উচ্চস্বরে ইংরেজি মুখস্থ করতাম। রাতে শুনে তিনি অনেক সময় নামাজের মধ্যেও লুটিপুটি খেতেন। নানি খুব সুন্দর করে নামাজ পরতেন। বাড়ির পশ্চিমে একটি প্লটে নয় বিঘা জমি ছিল তার। সামছু মামা কামলার সঙ্গে সেই জমিতে অমানুষিক পরিশ্রম করতেন। আমিও মাঝে মাঝে তাকে জমিতে পানি সেঁচার ব্যাপারে সাহায্য করতাম। এই কঠোর পরিশ্রমের কারণে এই মাঠে অন্যান্য জমি থেকে সামছু মামার জমিতে সবচেয়ে বেশি ধান হতো। এই জমিটাই ছিল সামছু মামার সমৃদ্ধির একমাত্র সোনার কাঠি। এ থেকেই সামছু মামার সমৃদ্ধির সূচনা হয়।
সামছু মামাদের বাড়িতে থাকাকালে একদিন আমি বাড়ির পশ্চিমে জাল নিয়ে মাছ ধরতে গিয়েছিলাম। সেখানে আমি অনেক সড়পুঁটি মাছ ধরেছিলাম। আবার বাড়ির সামনের নদীতে বিকেল বেলায় ডাংÑবরশি ফেলে রাখতাম। সকাল বেলায় আমি ডিঙি নৌকা নিয়ে বড়শিগুলো ওঠাতে যেতাম। একদিন সকাল বেলা বরশি উঠাতে গিয়ে দেখি আমার বড়শিসহ নৌকা টেনে নিয়ে যাচ্ছে। ভয় পেয়ে গেলাম ভাবলাম বড়শিতে কচ্ছপ পড়েছে। আসলে তা নয় । অনেক কষ্ট করে টানাটানিতে ভেসে উঠলো একটা মস্ত বড় শিমুল মাছ। সবাই সে মাছ দেখে অবাক হলো।
সামছু মামার স্ত্রী আমাকে বাজান বলে ডাকতেন। আমার যাতে কোনো অযতœ না হয় সে দিকে সব সময় তিনি খেয়াল রাখতেন। এর আগে আমি মধ্যনগর রাজবদনদের বাড়িতে থাকতাম তখন একবার ভীষণ তুফান হয়েছিল।
আমি গ্রামের মসজিদে আমার কোরআন শরীফখানা রেখেছিলাম। মসজিদটি ছিল একটা আলাদা জায়গায়। একটা দ্বীপের মত জায়গায়। বর্ষামাসে পাড়া থেকে নৌকায় করে মসজিদে যেতে হতো। পানি একটু কমে গেলে লম্বা একটা সাঁকো বেঁধে দেওয়া হতো মসজিদে যাবার জন্য। একদিন তুফানে মসজিদটি ভেঙে গেল। তার সঙ্গে অথৈ পানিতে ভেসে গেলো আমার কোরআন শরীফ। কোরআন শরীফের জন্য আমার খুব দুঃখ হতে লাগল। তারপর আমার জায়গির বাড়ি পরিবর্তন করে চলে গেলাম কান্দাপাড়া। সেই কান্দাপাড়া গ্রামে একদিন আরব আলীদের বাড়িতে কোরআনখানির [কোরআন খতম] আয়োজন করা

হয়েছিল। তাদের অবস্থা তখন খুব খারাপ ছিল। তারা ছিল তিন ভাই। তাদের ছোট ভাই বন্ধক পাটের জমিতে আটকা পড়ে আছে বল্লা অঞ্চলে। সেই বছর থেকে পাটের খুব দাম। কাচারি ঘরে সবাই কোরআন শরীফ পড়ছে। আরব আলী ভাই আমাকে বলল, তুমিও কোরআন পাঠে শামিল হও। তারপর আমার সামনে একখানা কোরআন শরীফ এনে দেয়া হলো। কলকাতায় ছাপা কোরআন শরীফ মেলে দুই পাতার মাঝখানে পেয়ে গেলাম ময়ূরের পাক। আর অমনি আমার মনে হলো আমি আমার কোরআন শরীফের মধ্যে একটা ময়ূরের পাক রেখেছিলাম। আরো কয়েক পাতা উল্টাতেই পেলাম একটা কাগজের টুকরা। তাতে আমার হাতের লেখা আমার নাম ঠিকানা আছে। আমি অবাক হয়ে গেলাম এইত আমার কোরআন শরীফ। কোরআনখানির ফযিলতে তাদের ছোট ভাই মুক্তি পেয়েছিল। আমি পরে আরব আলী ভাইকে জিজ্ঞেস করলাম এই কোরআন শরীফ কোথায় পেলেন। তখন তিনি একটা কাহিনি বললেন। মধ্যনগর বাজার থেকে তিন মাইল দূরে উত্তর পূর্বে একটা গ্রাম আছে নাম সম্পদপুর, ঐ গ্রামের বাসিন্দারা সকলেই হিন্দু। ওদেরই এক বাড়ির ঘাটে দেখা গেলো একটা জিনিষ যেন পানিতে ভেসে আসছে। ওরা বুঝতে পারছিল না যে জিনিসটা কি। তখন ছিল পূর্ণ বর্ষাকাল। ওরা এই ভাসমান জিনিষটাকে তুলে ভীষণ বিপদে পড়ল। ওরা কখনো আরবি লেখা ও পড়ার সাথে পরিচিত ছিল না। ওরা ভয় পেয়ে গেলো এবং পরামর্শ করলো জিনিষটা নিয়ে কি করা যায়। তারপর একদিন জিনিষটি নিয়ে আসলেন কান্দাপাড়ার আরব আলীর কাছে। আরব আলী দেখলো এটি তো একখ- পবিত্র কোরআন শরীফ। নিম্ন মানের কাগজে কলকাতাই ছাপা। মলাট নষ্ট হয়ে গেছে কিন্তু ভেতরে এক ফোটা পানিও ঢুকতে পারেনি। পৃষ্ঠাগুলো মুখে এমনভাবে জোড়া লেগে আছে যে মনে হয় যেন আঠা দিয়ে এঁটে দেয়া হয়েছে। কি আশ্চর্য যেখান থেকে মুল কোরআন শরীফ শুরু হয়েছে সেখান থেকে একটা পাতাও নষ্ট হয়নি। আমি আমার হারানো কোরআন শরীফ পেয়ে আনন্দে মেতে ওঠলাম।
কান্দাপাড়া থেকে আবার চলে এলাম মধ্যনগর। এখন থাকি ফাজিল নানার বাড়িতে। ফাজিল নানা হালকা পাতলা গড়নের মানুষ ছিলেন। ফ্রেন্সকাট দাড়ি রাখতেন। শরীরে মেদ ছিল না। তার গায়ের রঙ কালো হলেও তিনি দেখতে ছিলেন খুব সন্দর। জীবনের শেষের দিকে তিনি অসুস্থ হয়ে পড়েছিলেন। আমি আর নানা কাচারি ঘরে থাকতাম। আমি থাকতাম খাটে আর নানা থাকতেন মাটিতে চাটাই বিছিয়ে। শামসু মামা তখন তার কারবার নিয়ে ব্যস্ত থাকতেন। বর্ষাকালে প্রায়ই তিনি যেতেন সান্না বাজারে। সান্না বাজারে তখন নৌকার হাট বসত। তিনি আরও যেতেন মহেশতলা, কলমাকান্দা। একবার নানা খুব অসুস্থ হয়ে পড়েন। তখন সারা রাত আমাকে জাগতে হতো নানাকে নিয়ে। সারি বেধে পিঁপড়া আসত তার বিছানায়। পিঁপড়ার কামড়ে নানা গোঙাতে থাকতেন। খালি বাড়িতে আমি কি করে নানাকে রক্ষা করি তা বুঝতে পারতাম না। ঘুম থেকে ওঠে মশাল জ্বালিয়ে পিঁপড়া মারার অভিযানে নামতাম। তখন পিঁপড়া মেরে সাবাড় করাকে পাপ মনে করতাম না। কিন্তু এখন আমার খুব অনুশোচনা হয় ঐ পিঁপড়ার জন্য। মাঝে মাঝে মনে হয় ঐ পিপঁড়াগুলো যদি হাশরের দিন নালিশ করে তাহলে আমি কি জবাব দেবো। কেবল পিঁপড়া নয় জীবনে তো অনেক প্রাণীর জীবন নাশ করেছি। তখনতো এর মধ্যে কোনো অন্যায় দেখিনি। তবে আজ কেন মনে হয় এসব প্রাণী হত্যার জন্য একদিন জবাবদিহি করতে হবে? কি জবাব দেবো?
একবার খেয়াল হলো মধ্যনগর মাইনর স্কুলের বিশাল টিনের ঘরে রাজ্যের সব জালালি কবুতর রাতের বেলা এসে থাকে। আমি মধ্যনগর বাজার থেকে একটি র্টচলাইট কিনেছিলাম। রাতে কবুতরের চোখে র্টচ জ্বালিয়ে দেখেছি এতে কবুতর মাথা ঘুরিয়ে পড়ে যায়। আমি আব্দুল হকের বাবাকে একদিন বললাম মামু চলোনা আমরা রাতে একবার স্কুলে গিয়ে জালালি কবুতর ধরি। জালালি কবুতর ধরা বা মেরে খাওয়া নিষেধ, বাল্যকাল থেকেই শুনেছি। তবে মানুষের বুদ্ধিও তো কমতি নেই, যুক্তি দেওয়া হলো সব কবুতর শাহজালালের মাজার থেকে চলে এসেছে। আর তাই এগুলো অবাধ্য, এরা নাফরমান, এজন্য এদের শিকার করলে কোনো দোষ নেই।
আমার প্রস্তাবে আব্দুল হকের বাবা রাজি হয়ে গেলেন। তখন বর্ষাকাল। আব্দুল হকদের বড় পাতাম নায়ে করে আমরা গেলাম। মধ্যনগর স্কুলে রাতে কেউ থাকে না। আমরা নৌকা ভিড়িয়ে স্কুল ঘরে ঢুকে দেখলাম ঘরের উপরের দরজায় সারি সারি অনেক কবুতর। টিনের ঘরে ছাদের নিচে কোনো সিলিং ছিল না। কাজেই পুরো ঘরটি উন্মুক্ত ছিল কবুতরের জন্য। বাঘডসার মত চুপি চুপি আমরা ঢুকলাম স্কুল ঘরের মধ্যে। র্টচলাইট জ্বালাতেই কবুতরগুলো উড়াউড়ি শুরু করে দিল। আর কোনো কোনোটি টর্চের আলো সহ্য করতে না পেরে মাথা ঘুরিয়ে পরে গেল। তখন আমরা সেগুলোকে তাড়াতাড়ি করে ধরতে লাগলাম। এভাবে অনেগুলো কবুতর ধরার পর আমরা আবার আমাদের নৌকায় এসে বাড়ির পথ ধরলাম। রাতটা ছিল মেঘলা এবং অন্ধকার। আকাশে মিটমিট করে তারা জ্বলছিল। নৌকা ছেড়ে আমরা কিছুক্ষণের জন্য দিশা হারিয়ে ফেললাম। হাওরের উপর দিয়ে আন্দাজে নৌকা চলছে। আমরা কিছুই দেখতে পারছিলাম না। এভাবে নাও বাইতে বাইতে কত সময় যে চলে গেলো তা আমরা আন্দাজ করতে পারলাম না। একসময় নৌকা এসে আবার ভিড়ল মধ্যনগর স্কুলের ঘাটে। তাহলে সারারাত আমরা নৌকা বাইলাম কোথায়?
সবাই বলতে লাগল কানাহোলায় পেয়েছে। কানাহোলা ব্যাপারটা একটু বুঝিয়ে বলি। একটা কুসংস্কার আছে হোলা বিড়াল কানা হলে চোখে কিছুই দেখে না। আন্দাজের উপর ছুটাছুটি করে। এই হোলা বিড়ালকে মারতে খুব সুবিধা। কারণ এই বিড়াল তখন আর চোখে দেখে না। এর থেকেই কানাহোলা কথার সৃষ্টি হয়েছে। কেউ এলাকায় পথ হারালেই লোকে বলে কানাহোলায় পেয়েছে। আমরা সারারাত নৌকা বেয়ে দেখতে পেলাম আমরা আবার মধ্যনগর স্কুলে এসে পড়েছি।
মধ্যনগর স্কুলে অনেক খেলাধুলা হতো। আমাদের মধ্যনগর স্কুলের ফুটবল টিমটি ছিল সেরা টিম। বাচ্চাদের টিম হলেও এলাকার কোনো টিম আমাদের সাথে পেরে উঠত না। ভারত রায়ের ভাগ্নে ললিতমোহন রায় ডিব্রুগড় থেকে এলএমএফ পাস করে এসেছিল। তিনি অত্যন্ত পরিষ্কার থাকতেন। তিনি ধূতি পাঞ্জাবি পড়তেন খুব চমৎকার করে। খেলার মাঠে তিনি চিকিৎসক হিসেবে উপস্থিত থাকতেন। কখনো কখনো রেফারির দায়িত্বও পালন করতেন তিনি। তার ছোট ভাই লালমোহন রায় মাস্টারি করতেন মধ্যনগর স্কুলে। তিনি বামপন্থি আন্দোলনের সঙ্গে জড়িত ছিলেন। ললিত বাবু আমাদের শিক্ষক ছিলেন। তিনি জড়িত ছিলেন কংগ্রেসের সঙ্গে। আমাদের এলাকায় তখন কোনো সংগঠিত রাজনৈতিক দল ছিল না। মুসলমানদের মধ্যে তখনো কোনো রাজনৈতিক ক্রিয়াকলাপ শুরু হয়নি। খেলাফত আন্দোলনের সময় মাওলানা সাখায়াতুল আম্বিয়া তখন আমাদের এলাকায় এসেছিল শুনেছি। তার সঙ্গে আমাদের আত্মীয় বংশী কুন্ডার মুন্সি আব্বাস আলী যোগ দিয়েছিলেন খেলাফত আন্দেলনে। আর কারা কারা এই আন্দোলনে যোগ দিয়েছিল তা আমার মনে নেই।
১৯৩৭ সালে প্রাদেশিক নির্বাচনে আমাদের এলাকা থেকে নির্বাচিত হন মৌলবি মকবুল হোসেন। তিনি খেলাফত আন্দোলনের সময় জেল খাটেন। তিনি ছিলেন প্রতিভাবান সাংবাদিক। তার জন্মস্থান ছিল বিন্নাকলি। গাড়ো পাহাড়ের পাদদেশে তাহিরপুর থানার সীমান্তবর্তী একটি গ্রাম। তাকে এলাকার লোক চিনত না। কারণ তিনি এলাকায় বেশি থাকতেন না। সংগঠন না থাকলেও তিনি খেলাফত আন্দোলনের জন্য জেল খেটেছন যার জন্য তিনি আমাদের এলাকায় বিখ্যাত হয়ে ওঠেছিলেন। তার কথা ইতিপূর্বে কিছুটা আলোচনা করেছি।

মধ্যনগর এলাকায় একবার ম্যালেরিয়া রোগের উৎপাত হলো। লোকজনের চিকিৎসার কোনো ব্যবস্থা ছিল না। একটি ফার্মেসি থেকে বিনামূল্যে ঔষধ সরবরাহ করতেন এক ডাক্তার। ঔষধ বলতে বুঝায় কুইনাইন মিকচার। স্কুলের সেরা ছাত্র হিসেবে আমি তার কাছ থেকে প্রায়ই ঔষধ আনতাম।
একবার রটে গেলো গৌরিপুরের মহারাজ আসবেন মধ্যনগরে। কোনো এক শরৎ কালে। মহারাজ কোলকাতায় থাকেন। তার নাম বীরেন্দ্রনাথ চৌধুরী। তিনি ছিলেন সংগীত রসিক মানুষ। তিনি তবলাবাদক হিসেবে বিখ্যাত ছিলেন। জমিদারি থেকে তার জন্য কোলকাতা যেতে কত টাকা-কড়ি লাগে তা কিন্তু তিনি জানতেন না। তার এলাকার লোকজন কোথায় কোথায় কিভাবে থাকে তাদের দুঃখ-কষ্টের খবর এবং তার নায়েব-গোমস্তরা প্রজাদের উপর কি রকম জুলুম করে সে খবর তিনি রাখতেন না। তার আগমন উপলক্ষে মধ্যনগরকে সাজানো হলো, পেন্ডেল তৈরি করা হলো, এর জন্য মধ্যনগর এলাকাটা একবারে নতুন সাজে সজ্জিত হলো। এলাকায় একটা উৎসব শুরু হলো বিশেষ করে হিন্দুদের মধ্যে। তাদের রাজা আসছেন এই অহংকারে তারাও নতুন স্পর্ধা নিয়ে স্ফীত হয়ে ওঠলো। এলাকার ছোট খাট মিরাশদার, তালুকদাররা ভেট নিয়ে রাজাকে দেখতে আসলো। কিন্তু রাজা নিজে কোনো খোঁজ খবর নিল না প্রজাদের হাল হকিকতের।
মহারাজ বীরেন্দ্রনাথ রায় চৌধুরী কোলকাতা থেকে এলেন মধ্যনগর। আমরা দূর থেকে দেখলাম মোটাসোটা বেটে-খাটো মানুষ। পরনে ছিল ধুতি পাঞ্জাবি তার কোনো বক্তব্য আমরা শুনিনি। তাকে দেখতে এলেন শেলবরষের খান বাহাদুর আব্দুল মান্নান চৌধুরী। নৌকায় করে এলেন তিনি। তার নৌকা এসে ভিড়ল কাচারি ঘরের সামনে। দুগ¬ুয়ের জমিদার আবু মিয়া পুরো নাম আব্দুল ওহাব চৌধুরী। দুই পুরুষ আগে হিন্দু থেকে তারা মুসলমান হয়েছেন। তাদের পূর্বপুরুষ ব্রাহ্মণ ছিলেন। তিনি সব মানুষকে তুইÑতোকারী সম্মোধন করে কথা বলতেন। তার একটা মস্তবড় হাতি ছিল। শোনা যায় তিনি নাকি মহারাজকে হাতির দাঁত উপহার দিয়েছিলেন। মহারাজাকে সম্বর্ধনা দেয়ার জন্য নাটক থিয়েটারের আয়োজন করা হলো। হিন্দুদের খুশি দেখে কে। কয়েকদিন উৎসবে মেতে ছিল মধ্যনগর এলাকাটা। মধ্যনগরে বিশ্বেশ্বরী মাইনর স্কুলটির নামকরণ করা হয়েছিল মহারাজার পিতামহের নামানুসারে। কিন্তু এই স্কুলের জন্য তহসিল অফিসের কোনো ব্যয় বরাদ্দ ছিল না। স্কুলটা কোনো রকমে চলে আসছিল। পাকিস্তান আমলে সেটি হাই স্কুলে উন্নীত হয়। তখন সেই স্কুলকে কেন্দ্র করে এখন একটি কলেজ হয়েছে।
১৯৩৯ সালে আমি সুনামগঞ্জ গিয়ে মাইনর বৃত্তি পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করি। আমার সাথে ছিল সোমধন, মনোরঞ্জন, গুলহার, বিসম্ভর বাবু এবং আরো অনেকে। বিশ্বম্ভর বাবু শেষে এলএমএফ পাস করে ডাক্তার হয়েছিল। সে অনেকদিন হাইলাকান্দিতে প্র্যাকটিস করেছে। তার সঙ্গে আমার আর দেখা হয়নি। তার ভগ্নিপতি বীরেন্দ্রনাথ রায় আমার খুব প্রিয়জন ছিলেন। তিনি পাকিস্তান আমলের মাঝামাঝি দেশত্যাগ করে ত্রিপুরা চলে যান। ত্রিপুরায় তিনি তার মেয়েকে নিয়ে বসবাস করেন। আমি তার ঠিকানা জোগাড় করে তাকে একটি চিঠি লিখেছিলাম। তিনি আবেগময় ভাষায় আমার সেই চিঠির উত্তর দিয়েছিলেন। আমাদের এলাকায় হিন্দুরা মুসলমানদের থেকে আলাদা গ্রামে বাস করত। ওদের জীবনযাপন পদ্ধতি একেবারেই আলাদা। চাষ-বাস তথা কৃষি কর্মের ফাঁকে ফাঁকে মাঠে ময়দানে তাদের সাথে দেখা সাক্ষাৎ হয়। এই এলাকার হিন্দুরা কদাচিৎ দুএক ঘর বামুন কায়েস্থ। প্রায় নব্বই ভাগই হচ্ছে বৈশ্য এবং শুদ্র। বৈশ্যরা এলাকায় দাস হিসেবে পরিচিত। আর জেলেরা মাঝি পাটনি প্রভৃতি নামে স্বতন্ত্র নামে পরিচিত। মাছ ধরাই তাদের পেশা। ওদের নৌকা এবং জাল ভিন্ন ভিন্ন ধরনের। মুসলমানরা মাছ ধরাকে ঘৃণ্য পেশা বলে মনে করত। শুধু সাহা সম্প্রদায়রা ব্যবসা বাণিজ্য করত। কিন্তু হিন্দু সমাজে তাদের কোনো ইজ্জত ছিল না। তাদেরকে হিন্দুরা খুব ছোট ও নিম্ন জাতের মনে করতো। দাসেরা মুসলমানদের থেকে দূরে থাকত। কিন্তু সাহাদের সঙ্গে মুসলমানদের সম্পর্ক ছিল অনেক খোলামেলা ধরণের।
মধ্যনগর বাজারটি ছিল ধর্মপাশা গ্রামের ডোবা অঞ্চলে। এই হিসাবে মধ্যনগর নামটা যথার্থ এলাকার একেবারে কেন্দ্রে মধ্যনগরের অবস্থান। সোমেশ্বরী নদীর তীরে। বর্ষায় একেবারে ডুবে থাকে এলাকাটি। মাঝখানে একঝাক হাঁসের ছানার মত ভেসে থাকে মধ্যনগর বাজার। এই বাজারে তখন পুকুরের পশ্চিম অংশ থেকে ক্রমে ঢালু হয়ে যাওয়া অংশটি জুড়ে বসত বাঁেশর হাট। সেখানে আমি দেখলাম আমাদের স্কুলের একটি ছেলে পয়সার জন্য তার বাবার কাছে কান্নাকাটি করছে। বাপ কিছুতেই তার ছেলেকে শান্ত করতে পারছে না। অগত্যা তার বাবা তার পকেট থেকে একটা সিকি বের করে দিয়ে বলছে, ‘এই নে এর বেশি আমি আর দিতে পারব না।’ আমার মনে পড়ে এটি আজ থেকে প্রায় ৬৫ বছর আগের কথা। একজন পিতা তার ছেলেকে একটিমাত্র সিকি পয়সা দিয়ে বুঝাতে পারত। আর আজ ১০০ টাকা দিয়েও সন্তানকে বুঝানো সম্ভব না। এখন যেখানে ধানের মণ সাত/আটশ টাকা সেখানে আগে ধানের মণ ছিল বার থেকে চৌদ্দ আনা। তখন এক আনায় এক দিস্তা কাগজ পাওয়া যেত। একটা ভালো লুঙ্গি কিনতে লাগত মাত্র পাঁচ আনা। একটা রেলি ছাতা কেনা যেত দশ আনা। খাঁটি সরিষার তেল ছিল মাত্র তিন আনা। তখন দুধ কেউ বেচতো না। কারো দুধের দরকার হলে প্রতিবেশী তাদের বিনা মূল্যে দিয়ে দিত। মধ্যনগর বাজারে দুধ সরবরাহ করত পাহাড়তলী অঞ্চলের বহিরাগতরা। তাদেরকে বলা হতো আবাদী। স্থানীয় লোকেরা দুধ বিক্রিকে নিন্দার কাজ বলে মনে করত। জেলে মাঝি এবং পাটুনিরাই মাছ ধরত এবং মাছ বিক্রি করত। আর মুসলমানরা ব্যস্ত থাকত কৃষি কাজে। তারা ধান চাউলের উপরই দিন গুজরান করত। কিনত কেবল নুন আর কেরোসিন। দুবছরে একবার কাপড়চোপড় কিনত। পিয়াজ, রসুন, মরিচ, বেগুন নিজেরাই ফলাত। এদের সাদামাটা জীবনের জন্য ব্যয় খুব কমই হতো। সাবানের মধ্যে শুনতাম, জলে ভাসা সাবানের কথা। এ সাবান সবাই সবসময় ব্যবহার করতে পারত না। আমাদের বাড়িতেও এই সাবান ঈদের মধ্যে আনা হতো। গায়ে মাখার জন্য বাদাম তেল ছিল। যারা শৌখিন তারা এটি সখ করে গায়ে মাখত।
আমাদের গ্রামে ইয়াছিন বলে একটা লোক ছিল। সে ছিলো সম্পর্কে আমার চাচা। তার একবার অসুখ করল। ব্রজেন ডাক্তার তখন তার চিকিৎসা করতেন। তিনি তাকে একটি এডওর্য়াডস টনিক খেতে বললেন। দিন দু’তিন চামচ করে। মাত্র দুদিন ঔষুধ খেয়ে ইয়াছিন চাচা অস্থির হয়ে পড়লেন। কবে আমার ঔষুধ শেষ হবে কবে আমি ভালো হব। তার যুক্তি ছিল যে প্রতিদিন দু’তিন চামচ করে ঔষুধ খেলে যদি একটু একটু অসুখ সাড়ে তাহলে একেবারে ঐ ঔষুধ খেলে তাড়াতাড়ি অসুখ ভালো হয়ে যাবে। তখন তিনি ঔষুদের বোতল হাতে নিয়ে বললেন একটা বদনা এনে দাও। তারপর বদনাতে ঐ ঔষধ উল্টো করে ঢেলে মিশিয়ে উপর করে নাল দিয়ে ঢক্ঢক্ করে গিলে ফেললেন। লোকজন হায় হায় করতে লাগল। এদিকে ইয়াছিন চাচা বেহুশ হয়ে পড়লেন। বাড়িতে কান্নাকাটি পড়ে গেলো। দুদিন পরে তার হুশ ফিরে এলো এবং তিনি ধীরে ধীরে সুস্থ হয়ে উঠলেন। এভাবে তিনি সব ঔষধ একত্রে খেয়ে মরতে মরতে বেঁচে উঠলেন।

তখনকার দিনে ম্যালেরিয়া এবং কলেরা হতো প্রায় প্রতি বছর। বসন্তও লাগত মহামারী আকারে। আমাদের গ্রামে একজন মৌলবি রাখা হয়েছিল। সে তরুণ মৌলবি আমাদের বাড়িতেই থাকত। আমাদের আশেপাশের গ্রামগুলোতে তখন কলেরার আলামত দেখা দিয়েছে। আমি সবাইকে বলতে লাগলাম যদি তোমরা বাঁচতে চাও তাহলে পানি ফুটিয়ে খাও। দুদিন পর বাড়ি এসে শুনলাম মৌলবি বলেছে পানিতে গরম সেঁকা দিলেই দোষ সেরে যাবে। পানি ফুটাতে হবে না। একটা শিক গরম করে ঠান্ডা পানিতে ডোবালেই পানি বিশুদ্ধ হয়ে যায় এবং এটি করলেই কলেরা পালাবে। দেখলাম আমাদের বাড়িতেও মাওলানা সেই হুকুম জারি করেছে। আমি মাওলানাকে ডেকে বকে দিলাম। কিন্তু কে কার কথা শুনে। ততক্ষণে গ্রামের সবার বাড়িতেই হুজুরের নির্দেশনা অনুযায়ী ঘরে ঘরে পানিতে গরম সেঁকা দেওয়া শুরু হয়ে গেছে। আমার কথা কে শুনবে।
মধ্যনগর থেকে মাইনর বৃত্তি পরীক্ষা দেওয়ার তোড়জোড় চলছে। সুনামগঞ্জ যেতে হবে পরীক্ষা দিতে। সে বছর আব্বার হাতে টাকা ছিল না। বাড়ি থেকে গিয়ে পরীক্ষা দিয়ে আসতে যেতে এবং সব মিলিয়ে পরীক্ষা দিতে টাকা লাগবে প্রায় ৩০ টাকা। এই টাকা কোথায় পাওয়া যায়? আমার এক চাচাত ভাই নাম ফজলুর রহমান। অনেক টাকার মালিক সে। আমি মধ্যনগর পোস্ট অফিসে প্রায়ই দেখি প্রতি মাসে ডাকঘরে টাকা জমান। তাকে আব্বা বললেন, অল্প দিনের জন্য আমাকে কিছু টাকা কর্জ [ধার] দাও। ফজলুর রহমান হাউমাউ করে উঠলেন। আমার কাছে টাকা কোথায়? আমি টাকা কোথায় পাবো? আব্বা নিরাশ হয়ে পড়লেন। তখন মজমপুর তহশিল অফিসের নায়েব গীরেন্দ্র বাবু। আমাদের তিনি খুব ভালো করে চিনতেন। আমার সমস্যার কথা শুনে আব্বাকে ডেকে বললেনÑ আপনার ছেলেটাত পড়াশুনায় ভালো। ফজলুর রহমান কি এই সাহায্যটা করতে পারলেন না? তার কাছে তো অনেক টাকা পয়সা আছে। আমিও মাঝে মাঝে তার কাছ থেকে টাকা পয়সা কর্জ করি। দেখা হলে আমি তাকে বকে দেবো নে। এই বলে গীরেন্দ্র বাবু আব্বার হাতে ত্রিশ টাকা তুলে দিলেন এবং বললেন, আমি আর্শিবাদ করি তোমার ছেলেটি মানুষ হোক, সবার নাম উজ্জ্বল করুক।
আমাদের এলাকার জন্য গীরেন্দ্র বাবু ছিলেন বিদেশি। তার বাড়ি ছিল সম্ভবত ঢাকা জেলায়। আমাদের এলাকায় তিনি চাকরি করতেন গৌরীপুরের জমিদারের অধীনে। খুবই শান্তশিষ্ট মানুষ ছিলেন। তিনি কলকাতার দৈনিক পত্রিকার গ্রাহক ছিলেন। এর মধ্যে এমন একটি পত্রিকাও ছিল যাকে লোকে বলত বাজারের কাগজ। কেউ পড়তে পারত না কেবল নায়েব বাবু পড়তেন। আব্বা মাঝে মাঝে কাচারি থেকে পত্রিকার কপি নিয়ে আসতেন। আর আমি উল্টিয়ে-পাল্টিয়ে দেখতাম। ইংরেজি শিখার জন্য খুব আগ্রহ প্রকাশ করতাম। কিন্তু আমাকে সাহায্য করার জন্য কেউ ছিল না। মধ্যনগর স্কুলে ভর্তি হওয়ার পর একটা নেশায় পেয়ে বসল। ইংরেজি হরফ এবং তার উচ্চারণ নিয়ে আমি মেতে ওঠলাম। আমি অল্প দিনেই ইংরেজি হরফগুলোর সঙ্গে পরিচিত হয়ে ওঠলাম।
ফজলুর রহমান লগ্নির কারবার করতেন। সুনামগঞ্জে কোনো কারণে যেতে হলে তিনি গয়নার নৌকায় না গিয়ে হেঁটেই রওয়ানা দিতেন। লুঙ্গি আর গেঞ্জি পড়ে খালি গায়ে চলাফেরা করতেন। গামছায় পোটলা করে মাথায় বেঁধে নিয়ে যেতেন চিড়া আর গুড়। সুনামগঞ্জ তখন মহকুমা শহর। কাজ শেষ করে আবার বাড়ি ফিরতেন পায়ে হেঁটে। নায়েবের কাছ থেকে চেয়ে টেয়ে তিনি অনেক ডোবা এলাকার জায়গা ইজারা নিতেন। তাতে তার প্রচুর লাভ হতো। বিদেশি যেসব লোক আসত আমাদের এলাকায় নৌকা বোঝাই করে মাছ ধরার জন্য তাদের কাছ থেকে তিনি একটা বড় মাপের খাজনা আদায় করতেন। এতে তার কোনো প্রতিযোগিও ছিল না। তাতে করে তার প্রতি বছর অনেক টাকা রোজগার হতো। নায়েব তার পৃষ্ঠপোষকতা করতেন। স্থানীয় লোকেরা এই কাজটাকে ছোট বলে মনে করত। শুধু ফজলুর রহমানের কাছে এই কাজটি ছোট বলে মনে হতো না। তিনি যেখান থেকে দুচার পয়সা পাওয়া যায় সেখানেই হাত বাড়াতেন। তাতে করে তিনি দিনে দিনে প্রচুর টাকা পয়সার মালিক হয়ে গেলেন। আর তারই চাচাত ভাই আমি পরীক্ষা দিতে পারলাম কিনা তার আর কোনো খোঁজখবর নিলেন না। যাহোক তার বিরুদ্ধে আমার কোনো অভিযোগ নাই। তিনি তাঁর পথে চলেছেন আর আমি আমার পথে চলেছি। বৃত্তি নিয়ে মেট্্িরক পাস করলাম সুনামগঞ্জ জুবিলি হাইস্কুল থেকে। সুনামগঞ্জের নেতৃস্থানীয় সকল মহলের লোকের সাথে আমার পরিচয় ঘটল। আমার সম্পর্কে প্রায় সকল বাড়িতেই আলোচনা হতো। সকলেই আমাকে নিয়ে অনেক আশা ভরসা করত। আমার বিভিন্ন পরীক্ষার ফল তাদের চমৎকৃত করত। আমার ক্লাসের বন্ধুরা বলত, তুমিতো অনেক বড় হবে। যখন সুনামগঞ্জ হাইস্কুলে পড়ি তখন ক্লাস নাইন পর্যন্ত আমিই ছিলাম ক্লাসের ফার্স্ট ভয়। কিন্তু নাইন থেকে টেনে উঠতেই আমার অবস্থান অনেক নিচে নেমে যায়। হেডমাস্টার খোঁজ নিয়ে দেখলেন আমি ১০০ নম্বরের কোনো উত্তর করি নাই, মানে একটা বিষয়ে নাকি পরীক্ষা দেই নাই। ফলে ক্লাস নাইনে থেকে ক্লাস টেনে প্রমোশনের পরীক্ষায় পিছিয়ে পড়ি। আমি ছিলাম ফার্স্ট বয় আর সেখানে হয়ে গেলাম নবম। ক্লাসে যাদের অবস্থান ছিল অনেক নিচে তাদের পরীক্ষার ফল হলো আমার চেয়ে অনেক ভালো।

১৯৪০ সলে লাহোর প্রস্তাব পাস হবার পর আমার কাছে একাডেমিক পড়ালেখা কঠিন হয়ে পড়ে। সিরাজগঞ্জে মুসলিম লীগের যে সম্মেলন হয় তাতে আমি অভিনন্দন জানিয়ে দৈনিক আজাদে একটি কবিতা লিখি। বাঘাবানের মুতাব্বের আলী সেই কবিতাটি ছাপিয়ে দেন দৈনিক আজাদের সম্পাদকীয় পৃষ্ঠায়। আর তাতেই আমি কবি হিসেবে একটা স্বীকৃতি পেয়ে যাই। হেডমাস্টার অক্ষয়কুমার বাবুর আশা ছিল আমি মেট্টিক পরীক্ষায় ভালো ফল করব এবং তাতে আমাদের স্কুলের সুনাম বয়ে আনবে। আর সে জন্য আমাকে স্কুলের লাইব্রেরি থেকে বই নিয়ে পড়তে এবং শিক্ষকদের আলাদাভাবে আমার প্রতি যতœ নিতে বললেন যাতে করে আমার পড়ালেখা কোনোভাবেই নষ্ট না হয়। কিন্তু যতœ নিয়ে কি হবে পড়ালেখা থেকে আমার মনতো একেবারেই ওঠে গেছে। আমি রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক আন্দোলনে ব্যস্ত হয়ে পড়লাম। চারপাশে তাকিয়ে দেখতে পেলাম যে, বিদ্যার প্রতি কারো কোনো আকর্ষণ নাই বললেই চলে। কেননা কোনো দরিদ্র ছেলেমেয়ে তার পরিবার এবং তার জ্ঞাতি-গোষ্ঠী থেকে কোনো সাহায্য সহযোগিতা পায় না। আমার এই উদাসিনতা খুবই খারাপ লাগত। একটা মেয়ে যদি ভালো লেখাপড়া করার সুযোগ পায়, একটা ছেলে যদি পরীক্ষায় ভালো রেজাল্ট করে তাতে অন্যদের গর্বিত হওয়ার কি আছে? এই সাফল্য তো তার ব্যক্তিগত ব্যাপার। এই নিয়ে অন্যদের মাথা ঘামানো অহেতুক। গোষ্ঠীর একটা ছেলের নাম হবে, এতে করে তার বংশের কারো উল্লাসিত হওয়ার কোনো মানে হয়? প্রত্যেকের সাথেই তার কপাল রয়েছে, রয়েছে তার অদৃষ্ট। কেউ ভালো রেজাল্ট করলে, কেউ ভালো একটা চাকরি পেলে বা ব্যবসায় উন্নতি করলে তার ফলতো তার পরিবারের সবাই ভোগ করবে। এই নিয়ে অন্যদের উৎফুল্ল হওয়ার কোনো কারণ নেই। কেননা বিত্ত বেসাত বা প্রাচুর্যের অংশ কেউ অন্যের জন্য ছেড়ে দিতে রাজি হয় না। আর তাই সহজে কেউ সমাজের বিরুদ্ধে অভিযোগ এনে ফায়দা কি? প্রত্যেকেই তো আছে তার নিজ নিজ ভাগ্য নিয়ে।
আমি কেন শুধু শুধু অন্যকে দোষারোপ করব। এই মনোভাব নিয়ে জীবন চালাতে লাগলাম। মাইনর স্কুল পাস করে গেলাম সুনামগঞ্জে ভর্তি হতে। আব্বা বললেনÑ মাস্টার সাহেব আমাকে তার বাড়িতে একবার যেতে বলেছিলেন। চলো সুনামগঞ্জ যাওয়ার আগে মাস্টার সাহেবের সাথে একবার দেখা করে আসি। তখন সামারগাঁও যেতে হলে পাগলা একটা মেঠো রাস্তায় কোনো রকমে যাওয়া যেত। সেই অচেনা পথেই আমরা বাপ-বেটা রওয়ানা হলাম। বাসের পথ শেষ হওয়ার পর একমাত্র পা হলো আমাদের সম্বল। এর মধ্যে দুপুরের দিকে আকাশে মেঘ করে শুরু হলো তুফান আর বৃষ্টি। মাঠের মধ্যে দিয়ে সড়ক চলে গেছে, আশেপাশে লোকজনের বালাই বলতে কিছুই নাই। যে দুচার জন লোক ছিল তারাও তাদের নিরাপদ স্থানে চলে গেছে। পথঘাট চেনাজানা নাই কাউকে যে জিজ্ঞেস করব তার কোনো সুযোগও নাই। আকাশের উত্তর পশ্চিম দিকে কালো অন্ধকার হয়ে ছেয়ে গেছে। আমাদের ভয় হতে লাগল। এর মধ্যে তুফান শুরু হয়ে গেছে। জায়গাটার নাম ছিল বোধহয় কলকলিয়া। প্রচ- তুফানের হাত থেকে আমরা বাঁচার জন্য সড়ককে পশ্চিমের দিকে রেখে সড়কের পূর্বদিকে মাটিতে শুয়ে পড়লাম। ভাগ্যিস শীলাবৃষ্টি হয়নি। অনেকক্ষণ পরে আমরা সোজা হয়ে গা ঝেড়ে সড়কে উঠি। ধুলাবালিতে আমরা দুজনেই গোসল করেছি। তারপর বহুপথ পাড়ি দিয়ে আমরা গিয়ে পড়লাম একটা বিলে। চাঁদনী রাত হলেও কিছুই দেখা যায় না। রাস্তার দুই পাশে ধানক্ষেত, বোরো ধানের মৌসুম। তখনো ধান বের হয়নি। পথে দুজন লোককে জিজ্ঞেস করলাম সামারগাঁও আর কত দূর? ওরা বললÑ এ বিল পার হয়ে একটা মাঠ পাবেন ওই মাঠে ছনের বন আছে। এ কথা শুনে আমার ভয় হতে লাগল একি ভূত-পেতিœর যায়গায় এসে পড়লাম নাকি? আব্বাকে জিজ্ঞেস করলাম, লোকটা কি বলল? আব্বা বললেন কিছু না, চলো এগিয়ে যাই। আবার মাঠে উঠে দেখলাম রাস্তার দু’পাশে উঁচু উঁচু ছনের বন। আব্বা বললেনÑ লোকগুলো ঐ ছনের কথাই বলেছিল। আমার শুনেই সন্দেহ হচ্ছিল, না জানি কি আছে সেখানে।

সেই মাঠ পেরিয়ে আমরা পৌঁছালাম একটি গ্রামে। আমার মনে হলো এই গ্রামে মাছ শুকানো হয়। শুটকি মাছের গন্ধ আমার নাকে এসে লাগছে। মনে হলো এটা একটা মাইমল বস্তি। মাইমলরা তো মুসলমান! তাতে অসুবিধা কি? আপাতত তাদের কাছে গিয়ে একটু আশ্রয় নেই। এক বাড়িতে গিয়ে ঘরে ঢুকে বললাম, আমরা দুজন মুসাফির সুনামগঞ্জ থেকে এসেছি, আরো অনেক দূরে সামারগাঁও যাব। শুধু রাতের মত একটু থাকতে পারি কি? আমাদের প্রস্তাবে তারা খুশি হয়ে তাড়াতাড়ি করে একটা রুম পরিষ্কার করে দিলো। তারপর চাটাই বিছায়ে দিয়ে বলল, বোউকা গরিবের বাড়ি।
আমি আর আমার আব্বা অযু করে নামাজ পড়লাম। ওরা আমাদের খাবার জোগাড় করার জন্য ব্যস্ত হয়ে পড়লো। তারপর কাঁচা মরিচসহ ছোট মাছের শূটকির তরকারী দিয়ে পেট ভরে খেয়ে আমরা শুয়ে পড়লাম। চাটাই বিছানো বিছানা তবু এত আরামে কখনো শুয়েছি বলে আমার মনে পড়ে না। পরদিন সকালবেলা বিদায় নিয়ে আবার সামারগাঁও এর দিকে আমরা রওয়ানা দিলাম। সামারগাঁও আমার স্যারের বাড়িতে দুএকদিন রইলাম। তারপর আবার আমরা সুনামগঞ্জের দিকে যাত্রা করলাম। পথে পড়লো পাইলগাঁও ও কুরাজপুর। এগুলো জগন্নাথপুর থানার এক-একটা গ্রাম। এত দীর্ঘ পথ আমরা পাড়ি দিয়েছিলাম পায়ে হেঁটে। পরবর্তীকালে সিলং এর একটি রাস্তায় খলখলিয়ার পরিচিত এক দোকানদারকে পেয়ে নিবিড় মমতায় øাত হয়েছিলাম। কোথায় জগন্নাথপুর থানার কলকলিয়া আর কোথায় জন্মভূমি। সিলং এর একটি রাস্তায় সুনামগঞ্জের এক দরিদ্র ব্যবসায়ীর দোকান। সে শুনল আমাদের বাড়ি সুনামগঞ্জ। তখন সে আমাকে আদরযতœ করার জন্য ব্যস্ত হয়ে পড়লো। বিদেশ বিভূইয়ে এমন আদর-যতœ আমি বহুবার পেয়েছি। পাশাপাশি বাস করলে ধর্মীয় কারণে মানুষ তার কাছ থেকে দূরে থাকে। কিন্তু দূরে গেলে সেই হয়ে ওঠে একজন আপন মানুষ।
সুনামগঞ্জ ফিরে এসে ভর্তি হলাম সুনামগঞ্জ গভঃ জুবিলি হাই স্কুলে। আমার একমাত্র পরিচয় আমি পাঠশালায় বৃত্তি পেয়েছি। মাইনরেও বৃত্তি পাব বলে সবার প্রত্যাশা। সেই কবে কুদরত আলী আমাদের এলাকা থেকে বৃত্তি পরীক্ষা দিয়ে সরকারি বৃত্তি পেয়েছিলেন। এর পরে থেকে সে ভাগ্য এখন পর্যন্ত আর কারো কপালে জোটেনি। স্কুলে ভর্তি হবার পর টিচারদের সাথে পরিচয় হবার চেষ্টা করলাম। ভালো ছাত্রদের প্রতি টিচারদের একটা টান থাকে সবসময়। যদি কারো সাহায্যে আমার থাকা-খাওয়ার একটা ব্যবস্থা হয়ে যায় এই বিশ্বাসে। প্রথমে গেলাম একটা জনপ্রিয় মুসলিম শিক্ষকের বাড়িতে। সুনামগঞ্জ শহরে তার নিজস্ব বাড়ি আছে। তার চাচা একবার মন্ত্রি হয়েছিলেন। তিনি আমার আব্বাকে খুব ভালো চিনতেন এবং আদর করতেন। আমার আব্বা একজন মুরব্বি মানুষ। তিনি অল্প শিক্ষিত হলেও গ্রামের একজন নেতৃত্বস্থানীয় লোক ছিলেন। মাস্টার সাহেব তার সাথে তুমি তুমি করে কথা বলতে লাগলেন। আব্বা এই সম্মোধনে বিরক্ত হলেও খুব ধীরস্থিরভাবে তাঁর কথার জবাব দিতে লাগলেন। ‘আমরা পাড়াগাটয়ের মানুষ। শহরে আমাদের কোনো আত্মীয়-স্বজন নেই। আপনাদের দোয়া চাই’ একথা বলেই আব্বা রওনা হলেন। তিনি বসলেন না। আমিও তার সঙ্গে সঙ্গে রওয়ানা হলাম। আব্বার অসংস্কৃত পোশাক মাস্টার সাহেবের মনে কোনো সম্ভ্রমবোধ জাগাতে পারেনি। তিনি তাকে একজন দরিদ্র ও অসংস্কৃত লোক মনে করে তার সাথে তুই তুই করে কথা বলছিলেন। আমার খুবই খারাপ লাগছিল।
যাই হোক ভর্তি হলাম ক্লাস সেভেনে। অনেকেই উৎসুক্যেরবশে আমার জন্য থাকার জায়গা খোঁজ নিতে লাগলেন। কিন্তু আমার থাকার জায়গা হয় না। স্কুল বোডিংয়ে থাকার মত আর্থিক সংগতি আমার নাই। সুনামগঞ্জের প্রত্যেক ঘরের ছেলেরা প্রায় বোডিংÑএ থেকে পড়াশুনা করে। আমি তাদের কারোর সঙ্গে দেখাও করলাম না। আমার আব্বার পরিচিত একজন লোক পরেশ গার্ড হিসেবে আমাদের বাড়িতে থাকতেন। তার বাড়ি ছিল পাঠানবাড়ি। সুনামগঞ্জ শহর থেকে প্রায় চারÑপাঁচ মাইল দূরে। স্থির করা হলো তার বাড়িতেই আমি থাকব। আমি রোজ পাঠানবাড়ি থেকে কখনো রাস্তায় আবার কখনো ক্ষেতের আইল দিয়ে হেঁটে হেঁটে স্কুলে যেতাম। এভাবে আমার ক্লাসে যেতে প্রায়ই বিলম্ব হতো। ঐ পাড়ায় অর্থাৎ পাঠান পাড়ায় কোনো হাইস্কুল পড়–য়া ছাত্র ছিল না বলে আমার প্রতিদিন একা একাই স্কুলে যেতে হতো। আমি গোসল করে পাজামা কিংবা হাফ প্যান্ট পরে স্কুলে রওয়ানা দিতাম।
মফিজ আলী মিয়ার এক ভাতিজা তার নাম ছিল রব্বানী আমার দুই ক্লাস উপরে পড়ত। স্কুলে যাওয়ার সময় সে প্রায়ই আমার সঙ্গ নিত। পথে মাঝে মাঝে আরো কয়েকজনের সাথে আমার দেখা হতো। ওরা ওদের মত করে কথা বলত আর আমি ওদের কথা বুঝতাম না। স্কুলে ভর্তি হওয়ার পর স্কুলের হেডমাস্টার সবসময় আমার খোঁজখবর নিতেন। আমি তাকে চাচা ডাকতাম। স্কুলের ভালো মুসলমান ছেলেদের প্রতি একটা বিশেষ মমতা ছিল তার। তিনি তার বাড়িতে তিন-চারজন করে জায়গির রাখতেন। আর
আমি যখন সুনামগঞ্জ স্কুলে পড়ি তখন তার বাড়িতে কোনো জায়গিরের আসন খালি ছিল না। আর সে কারণেই তিনি আমাকে তার বাড়িতে নিতে পারেননি। তিনি সাহিত্যের খুব ভক্ত ছিলেন। তার হাতের লেখা ছিল খুব চমৎকার। কিন্তু তিনি আমাকে সাহায্য করতে না পেরে মনে মনে খুব কুণ্ঠিত ছিলেন। তিনি মনে মনে স্থির করে রেখেছিলেন তার বাড়িতে জায়গির খালি হলেই তিনি আমাকে তার বাড়িতে রাখবেন। আমাকে তার বড় ছেলে আব্দুল মুমিনের দেখাশুনা করার দায়িত্ব দেবেন। কিন্তু যায়গা খালি না থাকায় আমাকে তিনি নিতে পারছিল না। এতদূর থেকে আমি রোজ হেঁটে স্কুলে আসি তার জন্য তিনি মনে মনে খুব কষ্ট পেতেন। কিন্তু তাঁর করার কিছু ছিল না। তাঁর মাঝে মাঝে ইচ্ছা হতো যারা ভালো ছাত্র, বিশেষ করে টাকা পয়সা বা থাকা খাওয়ার অভাবে যাদের পড়ালেখা বন্ধ হয়ে যায় তাদের সবাইকে তিনি নিজের বাড়িতে নিয়ে আসবেন। কিন্তু ইচ্ছা থাকলেই সব ইচ্ছা কি পূরণ হয়? এজন্য তাঁকে অপেক্ষা করতে হয়। একজনের যায়গা খালি হলে আরেকটি ভালো ছেলেকে তার বাড়িতে এনে তিনি তা পূরণ করতেন। এভাবে বহু মেধাবী ছেলেকে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিয়ে তাদের পড়ালেখার সুযোগ করে দিতেন। এক সময় সুযোগ এলে তিনি আমাকে ডেকে বললেন, ‘আগামী মাস থেকে তুমি আমার বাড়িতে চলে এসো। খাওয়া থাকায় কষ্ট হবে। তবুও মন দিয়ে পড়াশুনা করতে পারবে। আমি চাইব তুমি একটা ভালো রেজাল্ট কর। একটি মুসলিম ছেলে ভালো রেজাল্ট করলে আমি মনে খুব আনন্দ পাই।’
এভাবে আমি পাঠান বাড়ি থেকে চলে এলাম ষোলঘর আমার নতুন জায়গির বাড়িতে। সেই বাড়িতে তখন আরেকজন জায়গির ছিল। মহররম আলী নাম। সে আমার দু’ক্লাস উপরে পড়ত। মহররম আলী তেমন ভালো ছাত্র ছিল না। একটা দরিদ্র পরিবারকে সাহায্য করার জন্য ইউনুস আলী মিয়াকে নিজ বাড়িতে নিয়ে এসেছিলেন।

সিলেট রেফারেন্ডাম

সিলেট ছিল আসামের একটি জেলা। ধান, চা, সিমেন্ট, মাছ, চুনাপাথর, বালু, নুড়িপাথর ও বোল্ডারের জন্য সিলেটের ছিল খ্যাতি। সিলেটের কমলালেবু ও জলডুবি আনারসের কথা কে না জানে। সিলেটের হযরত শাহজালালের মাজার, মাধবকু-, জাফলং ও পাহাড়ি এলাকার চা বাগানের দৃশ্য মানুষকে প্রবলভাবে আকর্ষণ করে। আসামের ওপর নেতৃত্ব করত সিলেট, শিলং সেক্রেটারিয়েট সিলেটিরাই কন্ট্রোল করত। পাকিস্তান আন্দোলনে সিলেটের মুখ্য ভূমিকা রয়েছে। সিলেটসহ সমগ্র আসাম পাকিস্তানের অধিভূক্ত হবে এই আশা নিয়ে আমরা সেদিন পাকিস্তান আন্দোলন করেছি। আসামের মুসলমানরা একক সংখ্যাগরিষ্ঠ সম্প্রদায়। আসামের উপজাতিদের বাদ দিলে হিন্দুরা ছিল সংখ্যালঘু। আসামের দুটি উপত্যকা। এর মধ্যে সুরমা উপত্যকা ছিল মুসলিমদের নেতৃত্বে। আসাম উপত্যকায় বিভিন্ন উপজাতি, অচ্যূত হিন্দু সম্প্রদায় মিলে অমুসলিমরা ছিল সংখ্যাগুরু। আসামের বোয়ালপাড়া জেলা ছিল মুসলিম প্রধান এলাকা। আবার ওদিকে ধুবড়ি ছিল মুসলিমদের ঘাঁটিস্বরূপ। আমরা এই বিশ্বাস করতাম যে বাংলাদেশ ও আসাম নিয়ে গঠিত হবে পাকিস্তানের পূর্বাঞ্চল অথবা বৃহত্তর বঙ্গদেশ। কিন্ত মাউন্টব্যাটেনের পরিকল্পনা কার্যকর হলো ইন্ডিয়ার অন্তর্ভূক্ত। আর সিলেট সম্পর্কে সিন্ধান্ত হলো পাকিস্তানের সাথে যোগদান করবে কি করবে না, তা নির্ধারিত হবে রেফারেন্ডামের মাধ্যমে। সিলেট জেলা উত্তর পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশ ও সিলেট জেলা মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ এলাকা। সিলেট পুরোটাই, হাইলাকান্দি ও শীলচরসহ পাকিস্তানের অন্তর্ভুক্ত হবে এই ব্যাপারে আমরা ছিলাম নিঃসংশয়। কিন্তু সিলেট রেফারেন্ডাম হবে এই ঘোষণায় সিলেটবাসি হলো এক মহা পরীক্ষার সম্মুখীন। সিলেটে রেফারেন্ডামের দুন্দুভি বেজে উঠল।
মাউন্টব্যাটেনের ঘোষণায় প্রথমটায় মুহ্যমান হয়ে পড়লেও সিলেটবাসী কোমর বাঁধল এই নতুন পরীক্ষার জন্য। সিলেটে হিন্দুরা সংখ্যালঘু হলেও তারা ছিল খুব প্রভাবশালী, অর্থ-বিত্তের অধিকারী এবং মুসলমানদের মধ্যেও দেওবন্দের মাওলানা সৈয়দ হোসাইন আহমেদ মাদানীর প্রভাব দীর্ঘদিনের। তিনি পাকিস্তান বিরোধী ছিলেন। তার দল জমিয়াতে ওলামায়ে হিন্দু কংগ্রেসের পক্ষে কাজ করত।
রেফারেন্ডামের ডাকে কেবল সারা সিলেট নয় পুরা আসাম ও বাংলাদেশে এক অভূতপূর্ব সাড়া পড়ে গেলো। বাংলাদেশে হাজার হাজার মুসলিম লীগ কর্মী, বিশ্ববিদ্যালয়, স্কুল, কলেজের ছাত্র মুসলিম ন্যাশনাল গার্ডের সদস্য ছড়িয়ে পড়ল সারা সিলেট। ভারতের বিভিন্ন জায়গা থেকেও এলো বহু নেতা ও কর্মী। সিলেট শহরে শেখ ঘাটে ছিল মুসলিম লীগের অফিস। সেখানে বসে কাজের পদ্ধতি ঠিক করা হলো। দলে দলে কর্মীদের পাঠানো হতে লাগল বিভিন্ন অঞ্চলে। কমীরা যেখানেই যায় সেখানে গিয়েই দেখে এলাকার স্থানীয় লোকেরা নিজেরাই দলে দলে পাকিস্তানের পক্ষে মিটিং-মিছিল করে চলছে। অবাক কা-! গ্রামের এই জেলে, চাষা, অশিক্ষিত লোকের মধ্যে এই সচেতনতা, এমন অপূর্ব জাগরণ কি করে এলো। বোঝা গেলো দেশ জুড়ে এক মনস্তাত্ত্বিক বিপ্ল¬ব ঘটে গেছে। এ এক ভাবাবেগের বন্যায় দেশের মানুষ ভাসছে। তাহলে এদের ঠেকাবে কে?
আমরা মুসলিম ছাত্র ফেডারেশন কর্মী বাহিনী, তখনকার দিনে সবচাইতে সুসংগঠিত একটি বাহিনী ছড়িয়ে পড়লাম নিজ নিজ অঞ্চলে। আমাদের ছাত্র ফেডারেশনের নেতৃত্বে ছিলেন মাহমুদ আলী সাহেব। বিভিন্ন অঞ্চলে কর্মী বন্টনের ভুমিকা পালন করেন তসদ্দুক আহমেদ। আমি সিলেট থেকে সুনামগঞ্জ চলে এলাম। সুনামগঞ্জ শহরে মাহমুদ আলী সাহেবের বাড়িতে রেফারেন্ডারেমের অফিস। তার চাচা আসাম পরিষদের সদস্য সাবেক মন্ত্রী জনাব মনোয়ার আলী সুনামগঞ্জ মহকুমার সার্বিক কর্মকা-ের দায়িত্বে আছেন। মাহমুদ আলী সাহেব আর আমি একসঙ্গে ছাত্র রাজনীতি করেছি। প্রভাতী পত্রিকা বের করেছি। মনোয়ার আলীর ছেলে রেজা হচ্ছে আমার ক্লাসফ্রেন্ড। মনোয়ার আলী সাহেব আমাকে তার পুত্রের মত স্নেহ করতেন। তিনি আমাকে বললেনÑ তুমি তাহেরপুর ও ধর্মপাশা অঞ্চলের দায়িত্ব নাও? ঐ সব অঞ্চলে ঢাকা থেকে আগত কর্মীদের গাইড হিসেবে দায়িত্ব পালন করবে তুমি। আমার ঠিক মনে নেই তিনি সম্ভবত তিনশ টাকা দিয়েছিলেন কর্মীদের খাবার বাবদ। একটি বড় নৌকায় করে আমি সুনামগঞ্জ থেকে রওনা দিলাম। আমার সাথে ছিল সৈয়দ নজরুল ইসলাম, আব্দুল মতিন খান চৌধুরী, জিন্নাত আলী, শামছুল ইসলাম প্রমুখ। এরা সবাই তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র। আমি তখন সিলেট
এম সি কলেজ থেকে বিএ ফাইনাল পরীক্ষা দিয়েছি। তখনকার দিনে মাসিক মোহাম্মদী, সাপ্তাহিক মোহাম্মদী ও মাসিক সওগাতে আমার লেখা ছাপা হতো। এই পত্রিকা তিনটি ছিল তখন মুসলমানদের নিজস্ব পত্রিকা। এই সব পত্রিকা বাঙালি মুসলিম ছাত্র-শিক্ষকেরা পড়ত। আমার নামের সঙ্গে তারা পরিচিত ছিল। বিশেষ করে মোহাম্মদী পত্রিকায় প্রকাশিত ‘পাকিস্তান আন্দোলনে মুসলিম তরুণদের ভুমিকা’ তাদের বিশেষভাবে নাড়া দিয়েছিল। ফলে তাদের সঙ্গে আমার আলাপ জমে ওঠতে দেরি হলো না। রাজনীতি, সাহিত্য-সংস্কৃতি নিয়ে আলাপে সারা রাত কেটে গেলো নৌকায়। আমরা জামালগঞ্জ এসে পৌঁছলাম। এখানে এসে আরেক দল কর্মীর সঙ্গে আমার সাক্ষাৎ হলো। তারা তাদের চার-পাঁচ দিনের অভিজ্ঞতা আমাদের কাছে বর্ণনা করল। গাঁয়ে গাঁয়ে ছুটাছুটি করেছেন নৌকা নিয়ে। হাওরের বুকে দেখেছেন অনেক ছোট ছোট নৌকা। এক গাঁ থেকে আরেক গাঁয়ে ছুটছে পতাকা উড়িয়ে তাকবির ধ্বনির সাথে স্লোগান দিতে দিতে। দেখা হলে বলছে, আপনারা আসছেন! দেখে যান, বেড়িয়ে যান, আপনাদের কাজ করার তেমন কিছু নেই। আপনারা আমাদের আনন্দে সামিল হয়েছেন এতে আমরা ধন্য। ঐ গ্রুপের কর্মীরা বললÑ আমরা যখন শুনলাম ঐ গ্রামে কিছু বিরোধী লোক আছে তখন নৌকা খাটিয়ে ছুটলাম ঐ গাঁয়ে। ওখানে পৌঁছানোর পর ওরা বললÑ সাব আমাদের গাঁয়ে সবাই পাকিস্তানি, আপনারা অন্য গাঁয়ে যান। হাওরে হাওরে রঙিন পতাকা উড়িয়ে আড়ং জমে উঠেছে। মেলার আমেজ লেগেছে সর্বত্র। সবাই খুশিতে উচ্ছ্বল হয়ে গ্রাম থেকে গ্রামান্তরে নৌকার বাইছ করছে। এ যে এক দেখার মত দৃশ্য। এমন দৃশ্য হাজার বছরে দেখা যায় কিনা তাও সন্দেহ।

এখান থেকে আমরা এলাম তাহিরপুর। শুনলাম বাধাঘাটের কাছে ঘাগটিয়া শিমুলতলা অঞ্চলে কয়েকটি গ্রামে ভিন্নমতের লোকেরা কাজ করছে। আমরা সেখান থেকে রওয়ানা দিলাম ঘাগটিয়ার দিকে। নৌকা এসে থামলো বাধাঘাট বাজারে। এখানে এসে শুনলাম জমিয়তে ওলামা হিন্দের একজন ভারতের পক্ষে প্রচার চালাচ্ছে।

ভাষা আন্দোলন, তমদ্দুন মজলিস ও আমি

স্বতন্ত্র জাতীয়তাবাদের ভিত্তিতে উপমহাদেশের মুসলমানেরা প্রথম স্বাধীনতা অর্জন করে ১৯৪৭ সালের ১৪ আগস্ট। ১৯৪০ সালের পূর্ব পর্যন্ত দাবি দাওয়া রক্ষা কবচের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল ভারতীয় মুসলমানদের আন্দোলন। ১৯৪০ সালে দর কষাকষির রাজনীতি ত্যাগ করে মুসলমানরা ঘোষণা দিল তারা একটা সম্প্রদায় মাত্র নয়। এই ঘোষণা উপমহাদেশের ইতিহাসে একটি বৈপ্লবিক পরিস্থিতির জন্ম দেয়। মাত্র সাত বছরের মধ্যে রাজনীতির ক্ষেত্রে এক আবেগাত্মক জোয়ার এলো যা পৃথিবীর ইতিহাসে একটি বিরল ঘটনা। জাতীয়তার স্বরূপ স্পষ্ট হয়ে ওঠার আগেই এসে গেল রাজনৈতিক স্বাধীনতা সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে পূর্ণ প্রস্তুতির পূর্বেই আমরা একটি স্বাধীন দেশ পেয়েছিলাম। স্বতন্ত্র জাতীয়তার ভিত্তিতে আমাদের স্বদেশ প্রতিষ্ঠিত হলো। আমাদের স্বতন্ত্র অস্তিত্বের স্বরূপ অন্বেষণের জন্য সত্যিকারের কোন সাংস্কৃতিক সংগঠন ছিল না। সংহত করার জন্য তৎকালীন সময়ে ঢাকায় কতিপয় অধ্যাপক, দেশপ্রেমী ছাত্র ও সাংস্কৃতিক কর্মীরা সবাই মিলে একটি সংগঠনের তীব্র প্রয়োজনীয়তা অনুভব করলাম। আমাদের এই আদর্শিক ভিত্তিকে সুদৃঢ় করার লক্ষ্যেই আমরা ১৯৪৭ সালে প্রতিষ্ঠিত করলাম তমদ্দুন মজলিস। তখন অন্য কোন আন্দোলন এদেশে ছিল না কারণ আমরা তখন দেখতে পাচ্ছিলাম যে, পাকিস্তান সৃষ্টি হবার পর থেকে একদল ভাবতে লাগল যে, পেয়ে তো গেছি এখন আর আমাদের করার কিছুই নাই। এখন আখের গোছাও এ নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়ল অনেকে। বিশেষ করে রাষ্ট্রক্ষমতায় যারা ছিলেন। ঠিক ঐ মুহূর্তে ১৯৪৭ সালের ১ সেপ্টেম্বরে গঠন করা হলো একটি সংগঠন। তৎকালীন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থ বিজ্ঞানের লেকচারার জনাব আবুল কাসেমের উদ্যোগে ও নেতৃত্বে তমদ্দুন মজলিস জন্ম লাভ করে।
১৯৪৭ সালে মুসলমানরা যে স্বদেশ অর্জন করেছিল তার ছিল দুটি অংশ, একটি পূর্ব পাকিস্তান ও অন্যটি পশ্চিম পাকিস্তান। প্রশাসনিক ও অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে পাকিস্তানের শাসকগোষ্ঠী ইসলামের ভ্রাতৃত্ব ও সমতার আদর্শ অনুসরণে ব্যর্থ হয়। বৈষম্য, অনৈক্য ও ভুল বুঝাবুঝির সৃষ্টি হয়। পরিণামে একটি রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের প্রয়োজন হয় এবং একমাত্র এই তমদ্দুন মজলিস প্রথম ভাষা আন্দোলনের ডাক দেয়। আমাদের এই তমদ্দুন মজলিসের নেতা-কর্মীদের নিষ্ঠার বিনিময়ে পূর্বপাকিস্তান ও তার জনগোষ্ঠী ভূগোলসহ স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশের রূপ কল্পনা করে । আমরা যখন পাকিস্তান আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলাম তখন আমাদের প্রেরণা ও তাগিদ মনের মধ্যে এক উন্মাদনা সৃষ্টি করেছিল। আর তাই ১৯৪৭ সালের আগস্ট মাসে আমাদের এই স্বপ্ন রূপায়িত হলো পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে। সামাজিক ও সাংস্কৃতিক এবং রাজনৈতিক কর্মকা-ে আমি ছাত্র জীবনের প্রায় শুরু থেকেই জড়িত ছিলাম। ১৯৪০ সালে লাহোর প্রস্তাব গৃহীত হবার পর আমাদের স্বাধীনতার আন্দোলনই ছিল আমাদের প্রায় সার্বক্ষণিক ভাবনা। আসামের ছাত্র আন্দোলনের বিপ্লবী মুখপাত্র ‘প্রভাতী’র মাধ্যমে আমরা তরুণদের স্বাধীনতা সংগ্রামের জন্য সংহত করি। প্রথম দিকে জনাব রজিবুর রহমান ছিলেন এই পত্রিকার সম্পাদক, পরে এই সম্পাদনার দায়িত্ব গ্রহণ করি আমি। বন্ধুবর তসাদ্দুক আহমদ এবং অগ্রজপ্রতিম মাহমুদ আলীর সহকর্মী হিসাবে আমি সেদিন আমার উপর অর্পিত এই দায়িত্ব পালন করেছিলাম। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠা হবার পর সংগ্রামের এই ঐতিহ্য নিয়ে আমি চলে আসি ঢাকায় এবং প্রিন্সিপাল আবুল কাসেমের [তখন অধ্যাপক] সাথে পরিচিত হই এবং তমদ্দুন মজলিসের সাথে জড়িয়ে পড়ি। শুরুতে তমদ্দুন মজলিসের কাজকর্ম সীমাবদ্ধ ছিল সংস্কৃতির ক্ষেত্রে। তমদ্দুন মজলিসের উদ্যোগে আমি এবং সৈয়দ শাহাদাত হোসেন ঢাকায় সাহিত্যিকদের সংগঠিত করবার জন্য প্রচেষ্টা চালাই এবং ঢাকায় সাহিত্যিকদের নিয়ে প্রথম একটি সাহিত্য সভা অনুষ্ঠান করি। আবু রুশদ, মতীন উদ্দিন সেই সভায় আমাদের সাহিত্য-সংস্কৃতির উপরে একটি মূল্যবান প্রবন্ধ পাঠ করেছিলেন। অনেকের মধ্যে মুনীর চৌধুরীও সেই আলোচনা সভায় যোগ দিয়েছিলেন।
কতগুলো বাস্তব ও ঐতিহাসিক কারণে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার শুরুতেই পাকিস্তানের পূর্বাঞ্চলের অর্থাৎ পূর্ববাংলায় জনসাধারণের মধ্যে সংশয় ও সন্দেহের সৃষ্টি হতে থাকে। শিক্ষা-দীক্ষায় অনগ্রসর এই অঞ্চলে প্রশাসনের উচ্চপদে বাঙালি মুসলমানদের প্রায় অস্তিত্বই ছিল না। হিন্দুরাও এসব পদ থেকে হঠাৎ করে ভারতে চলে যাওয়ায় সৃষ্টি হয় এক বিরাট শূণ্যতা এবং সেই শূণ্যতা পূরণ করেন ব্রিটিশ আমলে বাংলাদেশে কর্মরত উচ্চপদস্থ অবাঙালি মুসলিম কর্মচারীগণ। সামরিক বাহিনীতেও বাঙালি মুসলমানরা ছিল অনুপস্থিত। এ অঞ্চলের ব্যবসা-বাণিজ্য ও শিল্পে মুসলামানদের অনগ্রসরতা এক ঐতিহাসিক সত্য। ব্যবসা-বাণিজ্য বলতে গেলে সব প্রায় হিন্দুদের হাতেই ছিল। তারাও তল্পিতল্পা গুটিয়ে হিন্দুস্থানে চলে যাওয়ায় সৃষ্টি হয় বিরাট শূন্যতা। সেই শূন্যতা পূরণ করে অবাঙালি মুসলিম ব্যবসায়ী ও শিল্পপতিরা। ট্রেন সার্ভিস চালু করার জন্য দায়িত্ব গ্রহণ করে বিহার থেকে আগত রেল কর্মচারীরা।পাকিস্থান
প্রশাসনে তারা নেই, ব্যবসা বাণিজ্যে তারা নেই, যোগাযোগ ব্যবস্থাও তাদের হাতে নেই। এই স্বাধীন দেশে তাহলে আমাদের অবস্থানটা কোথায়? ভাষা ও নৃতাত্ত্বিক বৈষম্যের উর্ধ্বে উঠে একটি আদর্শিক ভ্রাতৃত্ব গড়ে তোলার জন্য বিভিন্ন ভাষাগোষ্ঠির মধ্যে দীর্ঘ দিনের যে মেলামেশা, আদানপ্রদান, বৈবাহিক সম্পর্ক গড়ে ওঠা আবশ্যক, ধর্মগত একাত্মতা সত্ত্বেও বহিরাগত এই অবাঙালি মুসলমানদের সঙ্গে তাদের সম্পর্ক গড়ে ওঠেনি। ফলে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠিত হবার পর এই বহিরাগত জনস্রোত পূর্ববাংলার বৃহত্তর মুসলমানদের সঙ্গে মিশে না গিয়ে একটি পৃথক সম্প্রদায় হিসেবে চিহ্নিত হয়ে ওঠে। পাকিস্তানের জন্য তাদের জান ও মালের ত্যাগ ইতিহাসে একটি উজ্জ্বল অধ্যায় তাতে কোন সন্দেহ নেই। কিন্তু এ দেশের মানুষের সঙ্গে মিশে যেতে না পারায় পাকিস্তানের শুরতেই নানা জটিলতার জন্ম দেয়। ভাষা আন্দোলনের সম্পর্কে যে কোন আলোচনা তখনকার এই মনস্তাত্ত্বিক পটভূমির জন্ম দেয়। এদেশের জনগোষ্ঠীর ভাষা বাংলা। তার সমস্ত কাজকর্ম এই ভাষার মাধ্যমেই সম্পাদিত হয়। এর উপর কোন রকম নিয়ন্ত্রণ প্রকৃতপক্ষে বাংলা ভাষাভাষী জনগোষ্ঠীর নিজেদের প্রকাশ করার অধিকার অপহরণেরই সামিল। কোনো জাতির উপর যখন অন্য কোনো ভাষা চাপিয়ে দেয়া হয় তখন সেই জাতির ব্যক্তিত্ব লুণ্ঠিত হয়ে পড়ে এবং অস্তিত্ব হয়ে পড়ে বিপন্ন। সে তখন হয়ে পড়ে একটি তাবেদার জনগোষ্ঠী। তাবেদার জনগোষ্ঠীকে কখনোই স্বাধীন জাতি বলা যায় না। ব্যবসা-বাণিজ্য, শিল্প এবং প্রশাসনিক ক্ষেত্রে কার্যকর ক্ষমতাচ্যুত হয়েও ভাষা ও সংস্কৃতির ক্ষেত্রে স্বাধীন ও অবাধ আত্মপ্রকাশের অধিকার ছিল এ জনগোষ্ঠীর শেষ সম্বল।

এ দেশের মাতৃভাষা বাংলা কিনাÑ এ নিয়ে ব্রিটিশ আমলে কেউ কেউ প্রশ্ন তুললেও বাংলা ছিল বাঙালির মাতৃভাষা এবং মুসলিম ও ব্রিটিশ আমলের কয়েকশ বছরের মুসলমানরা সাহিত্য সংস্কৃতির ক্ষেত্রে যে অবদান রেখেছে তা বাংলা ভাষার মাধ্যমেই। উর্দু, ফার্সি রাষ্ট্রভাষা হওয়া সত্ত্বেও ফার্সি ভাষায় তেমন কোন উল্লেখযোগ্য সাহিত্য সৃষ্টি বাঙালিদের দ্বারা সম্ভব হয়নি। ১৯৪০ সালে লাহোর প্রস্তাবে যখন ভারতের পূর্ব ও পশ্চিমাঞ্চলের মুসলিম সংখ্যাগুরু অঞ্চলগুলো নিয়ে দুটি স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্র গঠনের সিদ্ধান্ত গৃহীত হয় তখন থেকেই পূর্বাঞ্চলের রাষ্ট্রভাষা কি হবে তা নিয়ে এ দেশের চিন্তাশীল বুদ্ধিজীবীরা দ্ব্যর্থহীন ভাষায় তাদের মত প্রকাশ করেছেন। বাংলা যে এই অঞ্চলের রাষ্ট্রভাষা হবে এ বিষয়ে মাওলানা আকরাম খাঁ, আবুল মনসুর আহমদ, আবুল কালাম শামসুদ্দিন, ড. মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ, কবি ফররুখ আহমদ এবং আরো বহু মনীষী উচ্চকণ্ঠে সেদিন তাদের মত ব্যক্ত করেছিলেন। কিন্তু লাহোর প্রস্তাবকে পাস কাটিয়ে এককেন্দ্রিক পাকিস্তান গঠনের সিদ্ধান্ত যে জটিলতা সৃষ্টি করে, উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা করা তারই একটি পরিণতি।

এদেশের সাধারণ শিক্ষিত সমাজকর্মী ও বুদ্ধিজীবীরা এ বিশ্বাস নিয়েছিলেন যে, লাহোর প্রস্তাব মত দুটি স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র সৃষ্টি না হলেও পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে পাকিস্তান হবে একটি দ্বিভাষী রাষ্ট্র, যার থাকবে সমান মর্যাদাসম্পন্ন দুটি রাষ্ট্রভাষা। কিন্তু আমরা যারা তমদ্দুন মজলিসে ছিলাম তারা লক্ষ্য করতে শুরু করলাম।যে,পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পরপরই সুপরিকল্পিত উপায়ে রাষ্ট্র পরিচালনার সকল কাজে উর্দুকে চালু করার চেষ্টা করা হচ্ছে, ডাক টিকিট, এনভেলাপ, পোস্টকার্ড ও মানিঅর্ডার ফরমে, টাকার নোটে, রেলের টিকিটে বাংলা বাদ দিয়ে শুধু উর্দুর ব্যবহার এবং সিভিল সার্ভিস পরীক্ষায় বাংলা বর্জন, রেডিওর বাংলা সংবাদে অপ্রচলিত উর্দু শব্দের ব্যবহার এদেশের মানুষকে শঙ্কিত করে তোলে। প্রতিটি ক্ষেত্রে তমদ্দুন মজলিসের মাধ্যমে আমরা বিবৃতি, প্রচার সভা সমিতি স্মারকলিপির মাধ্যমে এ ধরনের ক্ষতিকর অপপ্রয়াসের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াই।
ভাষা সম্পর্কিত সকল দ্বিধা-সন্দেহ নিরসনের জন্যে তমদ্দুন মজলিস একটি
পুস্তিকা প্রকাশের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করে। তমদ্দুন মজলিসের সম্পাদক অধ্যাপক আবুল কাসেম, বিখ্যাত সাহিত্যিক ও রাজনীতিবিদ আবুল মনসুর আহমদ এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যলয়ের অধ্যাপক ড. কাজী মোতাহার হোসেনের তিনটি প্রবন্ধ নিয়ে ১৯৪৭ সলের ১৫ সেপ্টেম্বর প্রকাশ করে একটি চটি অথচ যুগান্তকারী পুস্তিকা ‘পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা বাংলা না উর্দু।’ এতে দাবি করা হয় বাংলা ভাষাই হবে শিক্ষার বাহন এবং পূর্বপাকিস্তানের অফিস আদালতের ভাষা। পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় ভাষা হবে বাংলা ও উর্দু। বাংলাই হবে পূর্বপাকিস্তানের শিক্ষা বিভাগের প্রথম ভাষা এবং পূর্বপাকিস্তানে উর্দু হবে দ্বিতীয় ভাষা। উর্দু এবং বাংলা এই দুটি ভাষাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবি এ কাজকে যেমন তখনকার শাসকমহলে প্রচ- বিরুপ প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করে, ঠিক তেমনি এদেশের সদ্য স্বাধীনতাপ্রাপ্ত জনগণের একাংশের মধ্যে এক রাষ্ট্রের দুই রাষ্ট্রভাষা প্রস্তাব সমর্থন যোগ্য বলে বিবেচিত হয়নি। পুরান ঢাকার সাধারণ অধিবাসীদের মধ্যে, যারা একধরনের উর্দুতে কথা বলে, তারা বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার প্রস্তাব উর্দুর বিরোধিতা বলে মনে করে ভাষা আন্দোলনের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ায়। তখন অত্যন্ত সর্তকতার সাথে আমাদের পুরানো ঢাকায় চলাফেরা করতে হয়েছে। আমরা সেদিন অধ্যাপক আব্দুল মান্নানকে পুরোনো ঢাকার অধীবাসীদের মধ্যে তমদ্দুন মজলিস ও ভাষা আন্দোলনের পক্ষে কাজ করার জন্য দায়িত্ব অর্পণ করি। তমদ্দুন মজলিসের এই প্রস্তাবকে সামনে রেখে আমরা সভা-সমিতি ও আলোচনা সভা চালিয়ে যেতে থাকি। ফজলুল হক হলের একটি বারান্দায় বসে আমরা লিখতাম ভাষা সম্পর্কিত পোস্টার। সেগুলো ঢাকার বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের দেয়ালে ঝুলিয়ে দেয়া হতো। মুসলিম গার্লস হাইস্কুলের ছাত্রীরাও সেদিন আমাদের এই সব পোস্টার তাদের স্কুলে সাহস করে লাগিয়ে দিয়েছিল।
সেই সময়ে সিলেট, চট্টগ্রামসহ দেশের অন্যান্য স্থানে মসলিসের বাণী পৌঁছে দেবার জন্য আমরা ব্যাপক অভিযান চালাই। চট্টগ্রামে আমাদের অভিযান ব্যাপকতা লাভ করে। কিন্তু সিলেটে আন্দোলনে বাধাপ্রাপ্ত হয়। আমি নিজে কাগজপত্র নিয়ে সিলেট গিয়ে সেখানকার কর্মীদের সাথে যোগাযোগ স্থাপন করি। সিলেটে আমাদের আন্দোলনের নেতৃত্বে ছিলেন দেওয়ান মোহাম্মদ আজরফ, দেওয়ান ওহাহিদুর রেজা প্রমুখ। সিলেট এম সি কলেজের নেতৃত্বস্থানীদের মধ্যে অনেকেই ছিলেন ভাষার ব্যাপারে উদাসীন। ১৯৪৭ সালের সেপ্টেম্বরের ১৫ তারিখ থেকে তমদ্দুন মজলিস পরিকল্পিতভাবে রাষ্ট্রভাষা বাংলার সপক্ষে ছাত্র শিক্ষক, বুদ্ধিজীবী, সাংবাদিক, সাহিত্যিক ও রাজনৈতিক নেতা কর্মীদের মধ্যে প্রচার চালিয়ে যেতে থাকে। এর প্রভাব অনুভূত হতে থাকে বিভিন্ন ক্ষেত্রে। সে বছর ৫ নভেম্বর ফজলুল হক মুসলিম হল
মিলনায়তনে পূর্বপাকিস্তানে বাংলায় রাষ্ট্রভাষা হওয়া উচিৎ বলে দাবি করা হয়। এ সভায় সভাপতিত্ব করেন ড. কাজী মোতাহার হোসেন। আন্দোলন যতই জোরদার হতে থাকে ততই রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবির বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র ব্যাপক হয়ে ওঠে। সরকার যে উর্দুকে একমাত্র রাষ্ট্রভাষা হিসেবে চাপিয়ে দেবার ষড়যন্ত্র করছে এ আর কোন গোপনীয় ব্যাপার রইলো না। ষড়যন্ত্র মোকাবেলা করার জন্য তমদ্দুন মজলিসের উদ্যোগে প্রথম রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ গঠিত হয়। তার আহবায়ক হলেন তমদ্দুন মজলিসের নূরুল হক ভূঁইয়া।
নিরবিচ্ছিন্নভাবে ঢাকা এবং দেশের সর্বত্র তমদ্দুন মজলিস ও সংগ্রাম পরিষদের কাজ চালিয়ে যাওয়ার ফলে রাষ্ট্রভাষার সকল কুয়াশায় কেটে যেতে থাকে এবং রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবি ক্রমেই অপ্রতিরোদ্ধ হয়ে ওঠে। সাংস্কৃতিক ও সাংগঠনিক পর্যায়ে আমাদের তৎপরতা বাঞ্চিত ফল দিতে শুরু করে এবং দেশের সর্বত্র নিজেদের অস্তিত্ব রক্ষার লড়াইয়ে একটা মানসিক প্রস্তুতি গড়ে ওঠে। কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ফজলুর রহমানের উর্দুর পক্ষে ওকালতির প্রতিক্রিয়া এবং পরে ১৯৪৮ সালে ফেব্রুয়ারিতে বাংলাকে গণপরিষদের ভাষার মর্যাদা দানে ধীরেদ্রনাথ দত্তের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যাত হওয়ায় এদেশের সচেতন ছাত্র শিক্ষক, কর্মী ও বুদ্ধিজীবী মহল বিক্ষোভে ফেটে পড়ে। আমাদের সাথে মজলিস অফিসে তখন নিয়মিত আসতেন শামছুল হক, আখলাকুর রহমান, অলি আহাদ, গাজীউল হক ও নোয়াখালীর এম এ আজাদ, ইনসান সম্পাদক আব্দুল ওয়াহেদ, শামছুল আলম, সৈয়দ নজরুল ইসলাম, অধ্যাপক নূরুল হক ভূইয়া প্রমুখ। এ কে এম আহসান তখন ১৯ নভেম্বর আজিমপুরের মজলিসের একটি অংশে থাকতেন আর অন্য অংশে থাকতেন অধ্যাপক আবুল কাসেম। মজলিসের অফিস ছিল ১৯ নং আজিমপুরেই। কখনো কখনো আসতেন মির্জা গোলাম হাফিজ, খন্দকার মোশতাক আহমেদ প্রমূখ। এরা সবাই সক্রিয়ভাবে জড়িত ছিলেন ভাষা আন্দোলনের সাথে। মাওলানা ভাসানীকে আমিই প্রথম এই বাড়িটিতে এনে ঢাকার কর্মীদের সাথে পরিচয় করিয়ে দেই। তখন মসলিসের কোন লিখিত গঠনতন্ত্র ছিল না। আর এই গঠনতন্ত্র রচনার দায়িত্ব আমার উপরই অর্পিত হয়। মুসলিম হলে সৈয়দ নজরুল ইসলামের কক্ষে বসে তার সঙ্গে আলোচনা করে আমি গঠনতন্ত্রের মুসাবিধা সম্পন্ন করি। সৈয়দ নজরুল ইসলাম ছিলেন তখন মজলিসের একজন উৎসাহী কর্মী।
গণপরিষদে ধীরেন্দ্রনাথ দত্তের প্রস্তাব প্রত্যাখান করতে গিয়ে পাকিস্তানের উজিরে আযম লিয়াকত আলী খান যে সতর্ক উক্তি করেন তাতে রাষ্ট্রভাষা বাংলার ভবিষ্যৎ সম্পর্কে এদেশের লোকেরা শংকিত হয়ে পড়েন এবং ষড়যন্ত্রের মোকাবিলা করার জন্য শপথ গ্রহণ করেন। এতদিন পুঞ্জিভূত আক্রোশ বিক্ষোভের আকারে ফেটে পড়ার উপক্রম হলো। সংগ্রাম পরিষদ প্রসারিত হলো ১৯৪৮ সনের ২ মার্চ মজলিসকর্মী শামছুল আলম হলেন সংগ্রাম পরিষদের নতুন আহবায়ক। সংগ্রাম পরিষদের ২ মার্চের সভায় সিদ্ধান্ত হলো ৭ মার্চ ঢাকায় ধর্মঘট পালিত হবে এবং ১১ মার্চ দেশের সর্বত্র রাষ্ট্রভাষা দাবিতে সাধারণ ধর্মঘট পালিত হবে।

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে