ভাওয়াইয়া গান – প্রণব কুমার সত্যব্রত

0
438

গীতিকবি পরিচিতিঃ

প্রণব কুমার সত্যব্রত একজন বহুভাষী কবি,লেখক,গীতিকার,সংগঠক ও গবেষক।তিনি ১৯৯৮ সালে ২০ অক্টোবর কুড়িগ্রাম জেলার সোনাবর গ্রামে জন্মগ্রহন করেন।তার পিতার নাম রাজকিশোর রায় মাতা ধনমালা রায় তিনি পরিবারের বড় সন্তান।কবি প্রণব কুমার সত্যব্রত মূলত ছোটবেলা থেকে ভাবুক ছিলেন,তিনি প্রথম শ্রেনী থেকে ছড়া ও কবিতা লেখার চেষ্টা করতেন।বিশেষ করে কাজী নজরুলের জীবনী ও রবি ঠাকুরের জীবনী তার মায়ের কাছে শুনে কবিদের প্রতি ভালোলাগা সৃষ্টি হয়।

প্রণব কুমার সত্যব্রত ব্রাক পরিচালিত স্কুলে শিশুশ্রেনীতে প্রথম হাতে খড়ি শিক্ষা নেন।সোনাবর রেজি: বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পিএসসি,সাকোয়া উচ্চ বিদ্যালয় হতে এসএসসি, পরবর্তীতে তিনি রাজারহাট মীর ইসমাইল হোসেন কলেজে বিজ্ঞান বিভাগে ভর্তি হন। কবি প্রণব কুমার সত্যব্রত ঢাকা ইন্ট্যারন্যাশনাল বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজি সাহিত্যে অনার্স করেছেন।

ছোটবেলা থেকে খুব দুরন্ত ছিলেন কবি প্রণব কুমার সত্যব্রত।স্কুলের সহপাঠিদের সাথে ছিলো খুব বন্ধুপূর্ণ সম্পর্ক,তিনি ছিলেন তাদের নেতা।বর্ষার মৌসুমে বন্ধুরা মিলে ভেলা বানিয়ে ঘুরে বেড়াতেন।স্কুলের খেলাধুলায় তিনি সব সময় প্রথম পুরস্কারটি পেতেন।বিশেষ করে তিনি মোরগ যোদ্ধা খেলায় খুবি পারদর্শি ছিলেন।সত্য সংঘ নামে গ্রামের বন্ধুরা মিলে একটি ধর্মিও সংগঠন প্রতিষ্ঠা করেন।

যখন ৫ বছর বয়েস তখন প্রণব কুমার সত্যব্রত ত্রৈলক্যনাথ রায়ের কাছে তবলায় তালিম নেন।এবং খুব কম সময়ে তবলা বাজানো শিখে ফেলেন প্রায় দুবছরের তিনি কাহারবা,দাদরা,ত্রিতাল,ঝুমুর তাল বাজানো শিখেছিলেন।প্রণব কুমার সত্যব্রত যখন প্রথম শ্রেণীতে পড়াশুনা করেন তখন তার বাড়িতে
একটি অনুষ্ঠানে তবলা বাজিয়ে সবাইকে তাক লাগিয়ে দেন।তিনি পরবর্তীতে বাঁশি শেখেন আরশি নগর গুরুগৃহ থেকে।নবম শ্রেণী থেকে তিনি পপ,রক,হিপ হপ,দেশগান ভাওয়াইয়া,আধুনিক,শ্যামাসঙ্গীত,বাউল,ভাটিয়ালি,পল্লীগীতি,প্রণব ভক্তিগীতি গান রচনা করেন।তার এপর্যন্ত প্রকাশিত এবং অপ্রকাশিত ৫০০ এর অধিক গান রয়েছে।

তার লেখা গুলো সমসাময়ীক এবং প্রকৃতি প্রেম, মানব প্রেমের প্রকাশ পায়।তিনি এই দশকের অন্যতম একজন রোমান্টিক কবি।তার লেখা বিভিন্ন জাতীয় পত্রিকা ও অনেক লিটল ম্যাগাজিনে প্রকাশ পায়।তার লেখা দশটি বই এ পর্যন্ত প্রকাশ পেয়েছে।গল্প গ্রন্থ “এক বৃষ্টির রাতে” কবিতা “ইচ্ছেরা বলে” তিনি কবি হিসেবে সল্প সময়ে খ্যাতি অর্জন করেন দেশ ছেড়ে বিদেশে।লেখালেখির পাশাপাশি তিনি চাকুরিতে কর্মরত আছেন।

তিনি সাহিত্যে পল্লিকবি জসীম উদ্দিন স্মৃতি পদক,জয়গান সাহিত্য পুরস্কার,সেরা পুস্তক সম্মাননা,দেশ সেবায় কোভিট যোদ্ধা পুরস্কার লাভ করেন।

ভাওয়াইয়া গান

আরে মশার কামরে ওমোর নিন্দে ধরেনা
মিসারি খান ফেলে শোতং তাও মানে না
কয়েল নাগেয়া দেয়ও তাতো কমে না
ওরে মশার কামরে ওমোর নিন্দে ধরে না।।

চপুরাইতে গান কয় মশায় মশারির ভিতর
রক্ত খায়া টুমটুমা করিচে ওদোর,
খেতা ঘোমরে শুতি থাকং তাকো মানে না
মশার কামরে ওমোর নিন্দে ধরেনা।।

ঘ্যান ঘ্যানি আর প্যান প্যানি
মশা মস্ত বড় দেওয়ানি
উরিয়া দেয় কুটুস কামর তার বড় জ্বালানী
ভুতি নাগে পোয়য়া থোং তাও টানে না
মশার কামরে ওমোর নিন্দে ধরেনা।।

***********
কুল নষ্ট মান নষ্ট পিরিতে মজিয়া
ওমোর পিরিতে মজিয়া।।

ওরে চন্ডীদাস আর রজকিনী
উদাস পিরিতির লাগিয়া
শিমুল ফুলের তুলা উদাস বাতাসে ভাসিয়া।
হৃদে হৃদে মনের পিরিত কেমনে যায় বসিয়া
ওমোর পিরিতি করিয়া রে পিরিতি করিয়া।।

জলের তলে নলের আগুন কেমনে যায় বোঝা?
ওরে মনে মনে একনা হইলে তার কিরে জ্বালা
তোমারে দেখিলে ওমোর প্রাণ যায় ভরিয়া
ওরে পিরিতি করিয়া রে পিরিতি করিয়া।।

**********

ওমোর সাত রাজার ধন
আরে কি দিয়া শক্ত করিছেন মন,
এই যে থাকি থাকি মুই যাং হুতাশ হয়া
তোমরা না করেন এমন ঢং।।

আরে পিরিতে জ্বালা বড় জ্বালা
সোনা মনে মনে লাগিলে জোড়া
উরিয়া রে উরিয়া চকোয়ার ঝাক
না ছারে রে জোড়া ওমোর সুন্দরি…..
নরম মন পায়য়া করে কত সং
তোমরা না করেন এমন ঢং ।।

আরে কুমারে গড়ায় মাটির বাসনা
পুড়িয়া করে ঝামা
মাইটাল মাটিরো এমনো গুন
পিরিতির মত আঠারে সোনা ওমোর সুন্দরি…..
নরম মন পায়য়া করে কত সং
তোমরা না করেন এমন ঢং।।

আরে কুমারে গড়ায় মাটির বাসনা
পুড়িয়া করে ঝামা
মাইটাল মাটিরো এমনো গুন
পিরিতির মত আঠারে সোনা ওমোর সুন্দরি…..
নরম মন পায়য়া করে কত সং
তোমরা না করেন এমন ঢং।।

*******
আরে আইসেন আইসেন বন্ধু
আরে ও বন্ধু আইসেন ফির ঘুরি
মনের ভিতরা তালা দিয়া
না হন আর বন্দি বন্ধু রে ।।

ফুলের ভোমরা ফুলে নরে রে
ওবন্ধু ফুলের সঙ্গ সাথী
গাঙ্গের জলে হংস ভাসে
গাঙ্গেতে তার পিরিতি বন্ধু রে ।।

চর বাড়ির ওই বাউনুড়ি রে
ওবন্ধু উদাসীয়া হাওয়া
উদাস মনে নাজান ছারি
কন মাতাতো হাত দিয়া বন্ধু রে ।

***********
আইসেন ক্যানে ধরলার পাড়
ওইদগা কতা বাদ দিয়া
আরে দোনো জনে কমো কতা
মনের হাউস মিটিয়া।।

এই যে এক নজর তোমাক দেখি
মোক যে নাগিল ভাল
এই রুপেতে কি দিয়া তোমরা
করিলেন মাতাল
যাক যাক হইবে কতা
ধরলার পাড়ত আসিয়া
আরে দোনো জনে কমো কতা
মনের হাউস মিটিয়া ।।

মোবাইলে নাম্বার তোমরা টপ করিয়া দ্যাও
নাম্বার কোনা মুই তুলিয়া নেও
ফোনে ফোনে হইবে কতা
জমেয়া জমেয়া
আচ্ছা আচ্ছা হইবে কতা
ধরলার পারত বসিয়া
আরে দোনো জনে কমো কতা
মনের হাউস মিটিয়া।।
***********
তুষের আগুন জ্বলে দ্বিগুন
ঘুংসিয়া ঘুংসিয়া
মনের অনলের কিরে দহন
পিরিতের লাগিয়া সোনা ।।

পিরিতের রসের রসে নাউ পাকে রে বয়সে
আরে গাবুর বয়সে ওমোর পিরিতি
না জুটিলো কপালেরে সোনা
না জুটিলো কপালে ।।

কাঠ পুরিয়া হয় রে ধোঁয়া
উড়িয়া যায় আকাশে
পিরিতি বিনে শূণ্য মরু মোর
তৃষ্ণা নিয়া মরে রে সোনা
তৃষ্ণা নিয়া মরে ।।

*******
ওকি ওহো পঙ্খিরে
পঙ্খি উড়িলু কোন দেশে
এ হিয়ারো বাঁধন ছাড়ি, কোন পরবাসে।।

বাস কাবারির নোয়ায়রে পিঞ্জিরা
সোনা দিয়া গড়া,
সেই না পিঞ্জিরা ছাড়িয়া পঙ্খি
ভুলিলু মোর মায়া রে ॥

কত না আদরের সেই না পঙ্খি
প্রেম কলসি ভরা
এত করিলাম পঙ্খির নামে
তবু না দিলো ধরা রে ॥
**********
আবেগের বয়সে মুই ভাবের পাগেলা
পিরীতি উতলা রসে,
মোর সখি না ভাব করে মোর নজরে নজরে ॥

নয়নে নয়নে দরিশনে
মন মোর উতলা তাতে,
মুখের হাসিতে মন মোর কারি
পিরীতি না হয় আপন দোষে ॥

খোরারো বিলে বগারো সারি
কত না আশায় থাকে,
সখী না বিনে মুই হনু উদাসী
মন মোর ছটফট করে ॥
*********
দুরে দুরে থাকে সখি
ফোনতো না হয় কথা
ভাবের মানুষ তায় না বোঝে মনেরো ব্যাথা ॥

নজরে নজরে হয় কী পিরীতি?
কথা না হইলে পরাণে পরাণে,
মোর সখি বুক বান্দিচে কঠিনো পাষাণে ॥

পাষাণের পাষাণ হিয়া
সখি মোর মরে লাজে,
মোর সখি বুক বান্দিচে কঠিনো পাষানে ॥

ও মোর আবাদ হইবে ভালে।।

গুইয়ার গাছো ঠনঠনা মোর
নাই পাং জল দিবার ছ্যাকে
আরে এই জলেতে ভালে হইলো রে
এবার আবাদ হইবে ভালে।।

ওয়া বাড়ি গেইচে ফাটি কেরাসিন তেলে দামে
আরে এই জলেতে ভালে হইলো রে
এবার আবাদ হইবে ভালে ॥

****
পহেলা পড়িলো রে
রংয়ে ঢংয়ে সবে মাতিলো রে ॥

পইলে পহেলা শুরু হয় দখিনা বাতাস
গাছে গাছে আম কাটোল
আরে ফুলে ভরে জাম গাছ॥

বৈশাক পড়িলে চতুর পাশে
পড়ি যায় ধুম ধাম
গীতাপাঠ আর পূজা পার্বণ
আর ঘরে ঘরে হরি নাম ॥

পইলে পহেলা বৈশাকি ম্যালা বইসে
চরকা, নাগরদোলা, মুড়ি, মুড়কি, বাতাসা,
শকের হাড়ি সোগে আইসে ॥

*******
আরে কিসোত গোসা, কিসের ব্যাজার
কিসোত দোজনা ওঠে
মুই চ্যাংরা বয়সে কামাই দিয়ারে
আনচোং তোমাক তরে ॥

বাপের বাড়ি হইলো তোমার
ওই যাত্রাপুরের চরে
ওইনা ধরলা নদীর পাতারে
অভাব দেকি বিনায় আনচো রে
এলা কিসোত দোজনা উঠে ৷।

চ্যাংরা বয়সের খাটুনি দিয়া
কামাইচোং পাইসা ম্যালা রে
আরে সেই কামাইয়ে যাইবে চলি রে
ওমোর নিদান কালো ভালে ॥

*****************
রূপ কুমারী রূপের কইন্যা রে
চাঁননি রাইতে ও যেমন পূর্ণিমারো আলো
তারো চাইতে রূপ কুমারী অধিক গুণে ভালো রে।।

কালে ভালে রূপ কুমারী চোকে পরে চোক
লাজ শরমে ও কুমারী চুলে ঢাকে মুকো রে ॥

বাড়ির পুবে দিগীর পাড়ে বসিয়া বিকাল ব্যালা
কি ধান্দিয়া চায়া থাকে উদাসীনো হয়া রে।।

শোনো শোনো ও ভাইয়োরে তোমাক গুলাক কং
ওই রূপসির রূপোতে
ওমোর মজিয়া গেইচে মন রে ॥
****************
ও ঘটকের ব্যাটা
গরিব দেখি চ্যাংরা দ্যাকেন
ছাওয়াটাক দিমো বিয়া ॥

বাচ্চাকালে মরিচে মাও
দুধ ছাড়া হয়া
তখন থাকি মানুষ করচোং মুই
কোলে পিটে নিয়া ॥

বুক জুরিয়া মোর একনা ছাও
নাই কিন্তু আর কাও
দেকি শুনি দেইম ছওয়াক মুই
কনু কিন্তু তাও ॥
*************
ওকি ও মোর সরলা
চোখের ভাষা কী মন তোর বোঝেনা?
মুই থাকোং চায়া উদাস রে হয়া
তুই বিনে বাড়ে মনের জ্বালা রে ॥

গলাতে পড়িচেন সোনারো মালা
তোক সুন্দরীক মোক নাগে ভালা রে ॥

নূপুর পরিচেন পায়ে জোরা
পাগোল হয়া যায় মোর মন উতলা রে।।

বাড়ির আগোত খোরার দোলা
তোর সুন্দরীর মন চঞ্চলা রে ॥
*****************
এক নজর তোমাক দেকিয়া
তোমাক মনোত মুই দিচোং থুইয়া
সরলা রে শেষোত তোমরা
নিরাশ না করে করেন মোরে ॥

জানি তোমার মনের কথা
ভাও দেকিলে যায় বোঝা
সেই আশাতে বান্দিয়া থুচোং মনো রে ॥

পাচোত ফিরনা চাঁনদো দেকিয়া
মোর কতা না যান ভুলিয়া
ভুলি গেইলে বাঁচিয়াও মরিমো রে ॥
**********
রবে না মোর এ ঘর বাড়ি,যেদিন থাকিমনা নিজ দেশে
পরাণ পাখি উড়ি যাইবে,তার নিজো দেশে।।

টাকা-করি জমিদারি করো পরের চাকুরি
ভবের মায়ায় পড়িয়া রে মন,বান্ধো ঘর বাড়ি
মায়ার বাধনে বান্দিয়া যেদিন পরবো ফাঁসে।।

যাতনা হায় বড় যাতনা সংসারেরো মাঝে
দিনে-রাইতে খাটিয়া মরিয়া
তবু সুখ কপালে না জোটে।।

ওপারে মোর বন্ধুয়ার বাড়ি ওই পাড়ে মোর ঘর
এই পাড়ে কেউ নয় আপন সগায় গুলা পর
যেদিন মায়া ছাড়িয়া পাড়ি দিমো বিদেশে।।

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে