বিচারহীনতার সংস্কৃতিতে বেড়ে ওঠা সন্তানের কাছে বিচারবোধ আশা করাটাই তো একটা অপরাধ!

0
30

বিচারহীনতার সংস্কৃতিতে বেড়ে ওঠা সন্তানের কাছে বিচারবোধ আশা করাটাই তো একটা অপরাধ!

শৈশবে স্যারের বকুনি,শাসনের যুগ আর নেই। শিক্ষা মন্ত্রনালয়ের এক পরিপত্রের মাধ্যমে শ্রেণীকক্ষে শিক্ষার্থীদের শারীরিক, মানসিক সকল প্রকার শাসন নিষিদ্ধ করা হয়েছে।শিক্ষকরা খুশিতেই হোক আর না খুশিতেই হোক অথবা চাকরি বাঁচাতেই হোক তারা সরকারের সিদ্ধান্তকে মেনে নিয়েছে অথবা মেনে নেবার চেষ্টা করছে।তবে বলার অপেক্ষা রাখেনা যে এই সিদ্ধান্তটি প্রায় ৯৯ ভাগ শিক্ষকই মনের দিক থেকে মেনে নিতে পারেনি।এর অনেক কারণের মধ্যে কিছু কারণ নিচে প্রদত্ত হলো-

প্রথমত,শ্রেণীকক্ষে শিক্ষকদের সম্মানহীনতা। শিক্ষার্থীদের শাসন নিষিদ্ধের ফলে শিক্ষকদের আর আগের মতো শিক্ষার্থীরা সম্মানটা দেন না বা শ্রদ্ধাবোধটা দেখাননা।এর ফলে শিক্ষা প্রতিষ্ঠাণের সম্মানিত শিক্ষকবৃন্দ আর আগের মতো শিক্ষা দানে আগ্রহবোধ করছেননা।একটা জিনিস খুবই পরিস্কার দেশের সব পেশা থেকে শিক্ষকতা পেশায় বেতন ভাতা একবারে নাজুক পরিস্থিতি।যেকারণে দেশের শ্রেষ্ঠ মেধাবীরা এই পেশায় আসতে চাননা।যে কজনই আসেন কিছুটা সম্মান পাবেন এই আশায়।বিদ্যালয়ে শাসন নিষিদ্ধ হওয়ায় শিক্ষকদের এই আশায় ও গুঁড়ে বালি হলো।কাজেই সরকারের শাসন নিষিদ্ধ নীতিটি বাহ্যিক ভাবে মেনে নিলেও অন্তর থেকে কোন শিক্ষকই মেনে নিতে পারেননি।

দ্বিতীয়ত, শ্রেণীকক্ষে নৈরাজ্যতা। শ্রেণীকক্ষে শিক্ষার্থীরা এখন আর শিক্ষকের কথা ঠিক মত শোনেনা, মানেনা অধিকন্তু তারা শ্রেণীকক্ষে এক প্রকার নৈরাজ্যতা কায়েম করছে।।যে কারণে বিষয় ভিত্তিক দক্ষ শিক্ষক থাকলেও এই জ্ঞান আর ক্লাসে প্রয়োগ করা সম্ভব হয় না।এর প্রধান কারণ পড়া লেখার জন্য শিক্ষকরা শাসন না করেও এক জিনিস বার বার চেষ্টা করে শিখাতে পারতেন,কিন্তু একদিকে শিক্ষার্থীরা হাসাহাসি,উচ্চ স্বরে শব্দ করে,উচ্চ স্বরে সাইট টকিং হরহামেসাই করে যাচ্ছে আর এগুলোর নিরব দর্শক শিক্ষক কোনক্রমেই তার অর্জিত জ্ঞান প্রয়োগের পরিবেশ পাননা এবং প্রয়োগ ও করেননা।তাই শিক্ষকরা কোনভাবেই শ্রেণীকক্ষে এমন শাসনহীনতা নীতি মেনে নিতে পারছেননা।

তৃতীয়ত,সামগ্রিক ফলাফল বিপর্যয়তা।শাসনহীনতার কারণে ছেলেমেয়েরা এখন আর পরীক্ষায় পাশ, ফেল এসব নিয়ে ভাবেনা।যেকারণে স্কুলের প্রায় ৯০ ভাগ শিক্ষার্থীই পড়া লেখায় অমনযোগী হয়ে পরেছে।যার জের পরছে পাবলিক পরীক্ষাতে।বোর্ডের ফলাফলে পাশের হার বাড়লেও গুণগত ফলাফল করতে পারছেনা শিক্ষার্থীরা।অপরদিকে শিক্ষার্থীরা ভালো ফল করতে না পারায় বিভিন্ন বিদ্যালয়ে বিষয় ভিত্তিক শিক্ষকদের উপর জবাবদিহিতা চাপিয়ে দেয়া হয়।এখন একজন শিক্ষককে শাসন করতেও দেয়া হবেনা,আবার ফেল করলে জবাবও দিতে হবে সংশ্লিষ্ট শিক্ষককে এই দুইটি বিষয় পুরোপুরিই সাংঘর্ষিক।তাই এসব বিবেচনায় প্রায় সকল শিক্ষকই শাসনহীন নীতিটিকে কালো আইন হিসেবেই দেখছেন।

চতুর্থত, শিক্ষার্থীদের মধ্যে ঝগড়া,মারামারি প্রসঙ্গ।আমি গত ৫ বছর শিক্ষকতা জীবনের অভিজ্ঞতা থেকে বলতে পারি,অতীতের সব রেকর্ড ভেঙ্গে যে বিষয়টি নজরে এসেছে তা হলো শিক্ষার্থীদের মধ্যে ঝগড়া,মারামারি প্রসঙ্গ।প্রতিটা ক্লাসে ঢুকার পর শিক্ষকের সামনে যে পরিমাণ অভিযোগ এসে হাজির হয় তার অর্ধেক বিচার শিক্ষকের করতে গেলেও পুরো ক্লাস টাইম চলে যাবে।অপরদিকে মন্ত্রনালয়ের নির্দেশনা অনুসারে তাদেরকে শাসন ও করা যাবেনা।এখন শাসন না করার কারণে অনেক ক্ষেত্রে ভদ্র ঘরের পড়ুয়া ছেলে মেয়েরা বিদ্যালয়ে ক্লাস বর্জন করতে বাধ্য হচ্ছে।আর এসব কারণে প্রচুর বিতর্কিত হচ্ছেন শিক্ষকরা যার দরুণ এসব পরিস্থিতির জনক হিসেবে সরকারের শাসনহীন নীতিটিকেই দায়ী মনে করছেন শিক্ষকরা।

পঞ্চমত, বিদ্যালয়ে কিশোর গ্যাঙ সৃষ্টি।বিদ্যালয়গুলোতে শাসন না থাকার কারণে শিক্ষার্থীরা অনেকাংশে বেপরোয়া হয়ে উঠছে।ওভার কনফিডেন্স হয়ে তারা গঠন করছে কিশোর গ্যাং যা বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় নিয়মিত সংবাদ হচ্ছে।আর এই কিশোর গ্যাংরা একের পর এক অপরাধ সংগঠিত করছে যা শিক্ষাঙ্গনে সুষ্ঠু পরিবেশের অন্তরায়।ফলে শিক্ষকরা এসব কর্মকান্ডগুলোকে শাসনহীন নীতির ফল হিসেবেই দেখছেন।তাই এই নীতিটিকে একেবারে গ্রহণ করতে পারছেননা শিক্ষক মহল।

ষষ্ঠত,শিক্ষকদের জীবনের হুমকীর মুখোমুখিতা।শিক্ষাঙ্গনে শাসন না থাকায় শিক্ষার্থীরা এতটাই বেপরোয়া হয়েছে যে এখন আর তারা শিক্ষকদের নিয়ে ট্রল করে,হাসাহাসি করে,কথা বিকৃতি করে কিংবা শিক্ষকদের হুমকি দিয়েই ক্ষান্ত থাকছেনা বরং বিভিন্ন বিদ্যাপীঠে তারা শিক্ষকদের উপর আক্রমণ সহ হত্যার মত ঘটনা পর্যন্তও ঘটাচ্ছে।আর এসবের পেছনে একমাত্র কারণ হিসেবে ঐ শাসনহীন নীতিটিকেই একমাত্র দায়ী হিসেবে মনে করছেন শিক্ষকরা।তাই তারা এই নীতিটিকে শিক্ষার উন্নতির ক্ষেত্রে কার্যকর পদক্ষেপ বলে মনে করছেন না শিক্ষকরা।

পরিশেষে উপরিক্ত আলোচনা থেকে নিশ্চিত ভাবেই বলা যায়, শিক্ষা প্রতিষ্ঠাণে শাসনহীন নীতির কারণে শিক্ষা প্রতিষ্ঠাণগুলোতে একপ্রকার নৈরাজ্য বিরাজ করছে।একটা সময় শিক্ষকরা দৈনিক পড়ার জন্য ছাত্রদের মার-দোর করতেন। সেটা না হয় অতিরঞ্জিত ছিল।সেটা হয়তো আইন করে বন্ধ করা যেতে পারে,তাই বলে ছাত্ররা স্যারের সামনে একের পর এক অপরাধ করে যাবে,ক্লাসে শীস দেবে,মেয়েদের দেখে অশ্লীল অঙ্গ-ভঙ্গিমা করবে,অশ্লীল কথা বলবে,উচ্চ শব্দে গল্প করবে,মারামারি করবে অথচ শিক্ষক ওখানে অসহায় ঢাল তলোয়ার বিহীন এক নিধিরাম সর্দার! এমতাবস্থায় আজ বলতেই হয়

“ বিচারহীনতার সংস্কৃতিতে বেড়ে ওঠা সন্তানের কাছে বিচারবোধ আশা করাটাই তো একটা অপরাধ!”

বিষয়টা আরেকটু খোলে বলি,যে বাচ্চাটা ক্লাসে এতকিছু অপরাধ করে পার পাচ্ছে, কোন বিচারের মুখোমুখি হতে হচ্ছে না,একটা সময় সে তো অপরাধ কর্মকান্ডকেই জীবনের পাথেও মনে করবে।তার কাছে তো তখন ন্যায় বোধ আশা করাটা পুরোটাই অন্যায়,অপরাধ বৈকি! আর এই দোষ তো তার নয় বরং আজকের শাসনহীন, বিচারহীন শিক্ষাব্যবস্থাই এর জন্য সম্পূর্ণভাবে দায়ী! যে ছেলেকে শাসন করার সাহস শিক্ষকেরো নেই সেই ছেলে ক্লাসে “সাদা সাদা কালা কালা,তুমি বন্ধু কালাপাখি” বলে উচ্চ স্বরে গান করবেনা তো করবে কি? আর একটা কথা না বললেই নয়।আমরা এই সব শিক্ষার্থীদের আদর করতে করতে এমন একটা জায়গায় নিয়ে এসেছি যে ওদেরকে মারা তো থাক দূরের কথা সামান্য বকলেই আবেগে কান্নাকাটি শুরু করে,ক্লাস থেকে বেরিয়ে যায়।সেদিন এক মেয়েকে খাতায় দুটো স্টার মার্কিং বেশি দিলাম না বলে কান্নাকাটি শুরু করলো,এমন যদি হয় শিক্ষকরা নিরাপদে,সাহস নিয়ে ক্লাস করাবেন কিভাবে,আর হাজার কোটি টাকার ট্রেনিং এ অর্জিত জ্ঞান প্রয়োগই বা করবেন কিভাবে?সেদিন বেশি দূরে নয় এরাই একদিন এ+ দিবার জন্য শিক্ষককে হুমকি ধমকি করলেও অবাক হওয়ার কিছু থাকবে বলে মনে হয় না। এছাড়াও আরো কত কি যে করছে ওরা তা এক কলামে লিখে শেষ করা যাবে না।শিক্ষকের সামনে ছেলে মেয়ে হাত ধরে হাঁটাহাঁটি তো এখন এক প্রকার খুবই নরমাল এবং বীরের প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়েছে। আরো দুঃখ জনক বিষয় হলো যেখানে আগে স্যারেরা শাসন করলে শিক্ষার্থীরা এসে স্যরি বলতো, অভিভাবকরাও এসে স্যরি বলতো,আর আজকাল উল্টো তাদেরকে অনেক শিক্ষকদের স্যরি বলতে হয় বা বলতে বাধ্য করা হয়,এই যে পরিবেশ তৈরী হয়েছে, শিক্ষকরা মুখ বুজে সহ্য করলেও পুরো জাতিকে এর মাশুল একদিন দিতেই হবে।

আর শাসনহীনতার ফল তো ইতোমধ্যেই সমাজ পেতে শুরু করেছে।দৈনিক পত্রিকার সাম্প্রতিক রিপোর্টগুলোই তার প্রমাণ।কিভাবে মা-বাবাকে সন্তানরা লাঞ্চিত করছে ,কিভাবে ধর্ষণ,মাদক কান্ডে জড়িয়ে পরছে অপ্রাপ্ত বয়স্করা।সরকারের উচিত এখনই এসব বিষয় নিয়ে ভাবা,দ্রুত পদক্ষেপ নেয়া। কিছু শিক্ষককে অতিরঞ্জিত শাসনের জন্য শায়েস্তা করা তো দেশের প্রচলিত আইনেই সম্ভব।তার জন্য নতুন আইন করে পুরো দেশের শিক্ষা ব্যবস্থাকে হুমকীর মুখে ফেলতে হবে কেন? আমার কথা পরিস্কার,শিক্ষার জন্য শাসন নিষিদ্ধ হোক,এটা আমি,আমরা সকলেই চাই,এতে শিক্ষায় ঝড়ে পড়া কমবে।তাই বলে শিক্ষার্থীরা শিক্ষকদের লাঞ্চিত করতে আসবে, টিজ করবে,বুলিং করবে, ক্লাসে হইহুল্লোর করবে,শিক্ষা কার্যক্রম চালাতে দিবেনা,মাথায় লম্বা বেকাপ্পা চুল রাখবে আর এসব কর্মকান্ড শিক্ষকদের দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখতে হবে,আর বছর শেষে ভালো ফলাফলও চাইবেন সব বিষয় তো এক সাথে চলতে পারেনা।এমন চলতে থাকলে সমগ্র শিক্ষা ব্যবস্থা যেকোন সময় রাদারফোর্ডের পরমাণু মডেলের মতোই ভেঙ্গে পরতে পারে। তাই আশা করবো সচেতন মহল এসব বিষয়ে দ্রুত ভাববেন এবং এই ব্যাপারে যুগোপযুগী ব্যবস্থা গ্রহণ করবেন।আর সেই ব্যবস্থা যে শিক্ষকদের হাতে শাসন ফিরিয়ে দিতে হবে অর্থাৎ শিক্ষকদের হাতে বেত ফিরিয়ে দিতে হবে তা নয়,বরং গবেষণা করে শিক্ষার্থীদের নিয়ন্ত্রণের কৌশল বের করা যেতে পারে অথবা শিক্ষাঙ্গনগুলোতে সরকারের বিশেষ কোন কমিটি দেয়া যেতে পারে যাতে তারা শিক্ষার্থীদের বিভিন্ন অশালীন বা অমার্জনীয় অপরাধগুলোর বিচার যথযথ ভাবে করতে পারেন। তাহলেই হয়তো শিক্ষাঙ্গনে আবার কিছুটা শিক্ষার সুবাতাস বইতে শুরু হতে পারে নতুবা এই জাতির ভাগ্যে কি আছে একমাত্র স্রষ্টা ছাড়া আর কেউ জানবে বলে অন্তত আমার কাছে মনে হচ্ছেনা।শুভকামনা প্রিয় পাঠক।ভালো থাকুন সবসময়।

লেখক

জীবন কৃষ্ণ সরকার
কবি ও প্রাবন্ধিক

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে