বাউল থেকে বাউল সম্রাট শাহ আব্দুল করিম

0
73

কে জানতো অজো পাড়া গাঁয়ের বাউল শাহ আব্দুল করিম একদিন হয়ে উঠবেন বাউল সম্রাট! হ্যাঁ বন্ধুরা কর্ম এমনই জিনিস।কর্মেই মানুষকে শ্রেষ্ঠত্বের আসনে নিয়ে যায়।তাহলে চলুন বন্ধুরা বাংলাদেশের ফোক গানের রাজা একুশে পদকপ্রাপ্ত বাউল সম্রাট শাহ আব্দুল করিম সম্পর্কে আজ দু চার লাইন জেনে আসি।
গাড়ি চলেনা চলেনা চলেনারে গাড়ি চলে না,গ্রামের নওজোয়ান হিন্দু মুসলমান, কোন মেস্তুরী নাও বানাইলো, আমার বন্ধুরে কই পাবো সখী গো, রঙ্গের দুনিয়া তোরে চাইনা, কেন পিরিতি বাড়াইলারে বন্ধু,আর জ্বালা সহেনাগো সরলা এই গান গুলো গ্রাম বাংলার মুখে মুখে এখনো ধ্বনিত হয়,টেলিভিশন,রেডিও সবখানে প্রতিদিনই কোথাও না কোথাও বাজানো হয়।মূলত এই গানগুলোই তাকে বাউল থেকে আজকের বাউল সম্রাটে পরিনত করেছে।

শাহ আব্দুল করিম ইব্রাহিম আলী ও নাইওরজানের ঘরে ১৯১৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি সিলেটের সুনামগঞ্জ জেলার দিরাই উপজেলায় জন্মগ্রহণ করেন। তিনি খুব ছোটবেলায় তার গুরু বাউল শাহ ইব্রাহিম মাস্তান বকশ থেকে সঙ্গীতের প্রাথমিক শিক্ষা নেন। তিনি আফতাব-উন-নেসা কে বিয়ে করেন, যাকে তিনি সরলা নামে ডাকতেন। তিনি ১৯৫৭ সাল থেকে তার জন্মগ্রামের পাশে উজানধল গ্রামে স্থায়ীভাবে বসবাস করেন। ভাটি অঞ্চলের মানুষের জীবনের সুখ প্রেম-ভালোবাসার পাশাপাশি তার গান কথা বলে সকল অন্যায়, অবিচার, কুসংস্কার আর সাম্প্রদায়িকতার বিরূদ্ধে। তিনি তার গানের অনুপ্রেরণা পেয়েছেন প্রখ্যাত বাউলসম্রাট ফকির লালন শাহ, পুঞ্জু শাহ এবং দুদ্দু শাহ এর দর্শন থেকে। যদিও দারিদ্র তাকে বাধ্য করে কৃষিকাজে তার শ্রম ব্যয় করতে কিন্তু কোন কিছু তাকে গান সৃষ্টি করা থেকে বিরত রাখতে পারেনি। তিনি বাউলগানের দীক্ষা লাভ করেছেন সাধক রশীদ উদ্দীন, শাহ ইব্রাহীম মাস্তান বকশ এর কাছ থেকে। তিনি শরীয়তী, মারফতি, দেহতত্ত্ব, গণসংগীতসহ বাউল গান এবং গানের অন্যান্য শাখার চর্চাও করেছেন।

ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন থেকে শুরু করে ভাষা আন্দোলন, ঊনসত্তরের গণঅভু্ত্থান, একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ, ৭৫ সালে বঙ্গবন্ধুর হত্যা ও নব্বইয়ের স্বৈরাচার সরকারবিরোধী আন্দোলনে শাহ আব্দুল করিমের ভূমিকা অনস্বীকার্য। তিনি প্রতিবাদী গান গেয়ে সাধারণ মানুষকে আন্দোলনে উজ্জীবিত করতেন। এই দিক দিয়ে বিবেচনা করলে তিনি ছিলেন একজন খাঁটি দেশপ্রেমিক। তাই তো তিনি গান গেয়ে বলেছিলেন, “আমি বাংলা মায়ের ছেলে/ জীবন আমার ধন্য যে হায়/ জন্ম বাংলা মায়ের কোলে/ বাংলা মায়ের ছেলে/ আমি বাংলা মায়ের ছেলে।” শাহ আব্দুল করিম শরিয়তি, মারফতি, দেহতত্ত্ব, গণসংগীত, দেশাত্মবোধক, বাউল গানসহ গানের আরও অন্যান্য শাখায় সাবলীল বিচরণ করেছেন। তিনি প্রায় দেড় সহস্রাধিক গানের রচনা ও সুরারোপ করে ছিলেন।
বাউলসাধক শাহ আবদুল জীবনের একটি বড় অংশ লড়াই করেছেন দরিদ্রতার সাথে। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান বিভিন্ন সময় তার সাহায্যার্থে এগিয়ে এলেও তা তিনি কখনোই গ্রহণ করেননি। উল্লেখ্য, ২০০৬ সালে সাউন্ড মেশিন নামের একটি অডিও প্রকাশনা সংস্থা তার সম্মানে জীবন্ত কিংবদন্তিঃ বাউল শাহ আবদুল করিম নামে বিভিন্ন শিল্পীর গাওয়া তার জনপ্রিয় ১২ টি গানের একটি অ্যালবাম প্রকাশ করে। এই অ্যালবামের বিক্রি থেকে পাওয়া অর্থ তার বার্ধক্যজনিত রোগের চিকি‍ৎসার জন্য তার পরিবারের কাছে তুলে দেয়া হয়। ২০০৭ সালে বাউলের জীবদ্দশায় শাহ আবদুল করিমের জীবন ও কর্মভিত্তিক একটি বই প্রথমবারের মতো প্রকাশিত হয়, ‘শাহ আবদুল করিম সংবর্ধন-গ্রন্থ’ (উৎস প্রকাশন) নামের এই বইটি সম্পাদনা করেন লোকসংস্কৃতি গবেষক ও প্রাবন্ধিক সুমনকুমার দাশ।
শাহ আবদুল করিম ২০০০ সালে আব্দুর রউফ চৌধুরী কর্তৃক ’দ্রোহী কথা সাহিত্যিক’ সম্মানে ভূষিত হন। তিনি তাঁর সঙ্গীতপ্রতিভার স্বীকৃতিস্বরূপ ২০০১ সালে একুশে পদক লাভ করেন। কিংবদন্তি এই বাউল সশরীরে আমাদের মাঝে না থাকলেও তার গান ও সুরধারা কোটি কোটি তরুণসহ সব স্তরের মানুষের মন ছুঁয়ে যায়। ২০০৯ সালের ১২ সেপ্টেম্বর ৯৩ বছর বয়সে মৃত্যুবরণ করেন ভাটির এই গুণী মানুষ। মৃত্যুর পর সর্বস্তরের বিশেষ করে সাধারণের কাছে আরো বেশি জনপ্রিয় হয়ে ওঠেন বাউল শাহ্ আব্দুল করিম।আমারা ফোক গানের বরপুত্র এই মহান সাধকের সকল সৃষ্টি সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগে সংরক্ষণের দাবি জানাই।

লেখক-

জীবন কৃষ্ণ সরকার
কবিও প্রাবন্ধিক

তথ্যসূত্র : শাহআব্দুল করিম ডটকম, উইকিপিডিয়া, হাওরপিডিয়া,দৈনিক যায় যায়নদিন(সৈয়দ আসাদুজ্জামান সুহানের প্রবন্ধ)

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে