বংশীকুন্ডা নাকি বংশীকুণ্ডা কোনটি শুদ্ধ।।বংশীকুন্ডা।।বংশীকুণ্ডা।।বংশীকুন্ডা বানান বিতর্ক-১।।

0
340

“বংশীকুন্ডা” নাকি “বংশীকুণ্ডা” কোনটি শুদ্ধ?

লেখাটির শুরুতেই বলে নিচ্ছি আমার এই লেখাটি সম্পূর্ণ ব্যক্তিগত মতামত।মার্জিত ভাষায় যেকারো সমালোচনা করার অধিকার সংরক্ষণ করে।যেহেতু লেখাটি নিজ এলাকা নিয়ে তাই নিজ এলাকার ইতিহাস ঐতিহ্যের প্রতি সম্মান তথা দায়বদ্ধতা রেখেই লেখাটি লিখছি।

গত কয়েকদিন ধরে এলাকার কিছু সংখ্যক লোকের কাছে একটি প্রশ্নের সম্মূখীন হচ্ছি- “আমি কেন বংশীকুন্ডা বানানটি দন্ত্য “ন” দিয়ে লিখি,এটি অশুদ্ধ! ” নব্য এসএসএসি বা ইন্টার পাশ পোলাপানের মূখে বার বার এই প্রশ্নটি শুনতে শুনতে বেশ বিব্রত বোধ করছি তাই আমার এই লেখাটি লেখার প্রয়োজন বোধ করেছি।বলে রাখা ভালো কারো প্রতি রাগ বা বিরাগের বশিভূত হয়ে আমার এই লেখা নয়।

আমি মনে করি অধুনা বিলুপ্ত কোন জিনিসের চাইতে আধুনিকটাই শ্রেয়।কারণ ইতিহাস ঘাটলে পাই আমাদের প্রিয় বিভাগ সিলেটের প্রাচীন নাম ছিল “শিলহাট” অথচ আমরা কেউ-ই এখন শিলহাট বলিনা (সিলেট বলি তাও “সিলেট” শব্দটির তেমন কোন গুরুত্বপূর্ণ অর্থ নেই কেবল সহজবোধ্য উচ্চারণ ছাড়া)।তাহলে কি আপনারা বলবেন সিলেটের বিজ্ঞজনরা সিলেটের ইতিহাস, ঐতিহ্য সম্পর্কে সচেতন নয়? অবশ্যই সচেতন।সচেতন বলেই তারা সহজবোধ্য নামটাকে সকল জায়গায় ব্যবহার করছে,গর্ব করে পরিচয় দিচ্ছে।বর্তমান চট্টগ্রামের পূর্ব নাম “চাটগাঁ” অথচ কেউই এখন চাটগাঁ লিখেনা তাই বলে কি তারা তাদের ইতিহাস ঐতিহ্যকে ধারণ করেনা? এমন অসংখ্য উদাহরণ রয়েছে যা লিখলে শত সহস্র শব্দেও শেষ হবেনা।কোনকিছুর নাম একটি আইডি বিশেষ, এর কোন সুনির্দিষ্ট অর্থ বা উৎস থাকতেই হবে এমন কিছু নয়,তবে অর্থ, উৎস থাকলে ভালো,যদি কোন বিতর্ক না থাকে,জনক্ষোভ না থাকে।

ইতিহাস ঘাটলে দেখা যাবে সিলেটের আগের সকল ডকুমেন্টে,শিলহাট বা শ্রীহট্ট এগুলোই লিখা থাকতো, কিন্তু যুগের পরিবর্তনে বানানকে সহজ বোধ্য করতে নতুন কোন নামকে যদি সকল ডকুমেন্টে ব্যবহার হয়ে প্রচলিত হয়ে যায় এবং সর্বজনগ্রাহ্য হয়ে যায় তাহলে সেটাকে আর ভুল বলা যায়না।একই ভাবে ঢাকার পুরাতন নাম DACCA ছিল। আগের ইতিহাসে ঐ ভাবেই লিখা।তারপরো আমরা কিন্তু এখন এটাকে ঢাকা ( Dhaka)লিখি,এবং সেটাকে কেউ আর এখন ভুল বলিনা।তেমনি ভাবে আমাদের বাংলা সাহিত্য বানানটা কিন্তু আগে “বাঙলা সাহিত্য” ছিল, আগের ডকুমেন্টেও তাই লেখা আছে।তাই পুরাতন ডকুমেন্টের দোহাই দিয়ে আমরা কেউই কিন্তু আগেরটা লিখিনা।তাহলে আমরা কি আমাদের প্রাচীনতাকে অসম্মান করছি? মোটেই না।বুঝে নিতে হবে সময়ের পরিবর্তনে নতুনত্ব তথা যুক্তি সংগত আধুনিকত্ব মোটেও দোষের কিছু নয়।আগের প্রায় সব ডকুমেন্টে “হাওড়” লিখা থাকতো অথচ আমরা,মিডিয়া,সাংবাদিক সবাই “হাওর” হিসেবে লিখি।জন শ্রুতি অনুসারে মধ্যনগর বাজারকে একসময় আনন্দনগর হিসেবে চিনতো অথচ এখন মধ্যনগর!
তাই এতসব যদি আমরা গিলতে পারি তাহলে এই মুহুর্তে এসে বংশীকুন্ডা বানানে মূর্ধন্য “ণ” নাকি দন্ত্য “ন” হবে সেটা আমার কাছে তেমন গুরুত্ব বহন করে না।বুঝে নিতে হবে সবকিছুতে প্রাচীনতা সংরক্ষণ সম্ভব নয়।তাছাড়া ভুলে যাবেননা আমরা একই সাথে “বাঙালি” এবং “বাঙ্গালি ” দুটোকেই শুদ্ধ মনে করি এবং ব্যবহার করি।অতএব “বংশীকুন্ডা” এবং বংশীকুণ্ডা দুটোই চালু থাকলে মহাভারত অশুদ্ধ হবেনা। তাই গবেষণা করতে গিয়ে প্রচলিত কিছু বাদ দিতে গিয়ে নিজেদের মধ্যে কাঁদা ছুড়াছুড়ি যেনো না হয়।গতকাল একজন ছেলে আমার বংশীকুন্ডা বানান ভুল বলে উল্যেখ করেছে অথচ তার প্রোফাইলেই বংশীকুন্ডা বানান দন্ত্য ন দিয়ে,এমনকি তার গ্রামের নামটা পর্যন্ত সঠিক লিখতে পারেনা অথচ সে ও এখন জানে বংশীকুন্ডা বানান কোনটা শুদ্ধ! সে এটি করতে পেরেছে কারণ সে নব্য গবেষণার ফল গিলেছে তাই।অতএব তরুণ প্রজন্মকে ভুল বার্তা দিয়ে উসকানি যেনো না দেয়া হয় এতদ্বিষয়ে অনুরোধ রাখছি।প্লিজ ভুল শুদ্ধের ফতোয়া বন্ধ করুন। আমাদের সর্বজন শ্রদ্ধেয় সিরাজ উদ্দিন স্যার প্রধান শিক্ষক হিসেবে সুদীর্ঘকাল যাবৎ শিক্ষকতা করেছেন বংশীকুন্ডার ঐতিহ্যবাহি বিদ্যাপীঠ বংশীকুন্ডা মমিন উচ্চ বিদ্যালয়ে।তিনি থাকা কালিন সময়েও স্কুলটির এমপিও কপি বা প্যাডে সব জায়গাতেই বানানটি দন্ত্য ন দিয়ে ছিল এখনো আছে।তাহলে তিনি কি ভুল লিখেছিলেন? এই ভাবে ভুল শুদ্ধ ফতোয়া দিলে তো আমাদের পূর্বপুরুষরা অসম্মানিত হবেন তরুণ প্রজন্মের কাছে।অতএব আমরা চাইনা আমাদের পূর্বপুরুষরা আমাদের সামনে অদক্ষ প্রতীয়মান হোক ।

আমার জন্মের পর জন্ম নিবন্ধন থেকে শুরু করে সকল কিছুই যদি দন্ত্য “ন ” দিয়ে সম্পন্ন হলো এগুলোর দায়ভার তো আমার না,আজকের এই ক্ষণে এসে সবগুলো পরিবর্তনও সম্ভব নয়,এমতাবস্থায় নীরোর কি এখন ঘুম ভাঙলো?।তাছাড়া আগের ডকুমেন্টে গুটি কয়েক কাগজে হয়তো মূর্ধন্য আছে কিন্তু বর্তমানে শত সহস্র কাগজে “বংশীকুন্ডা ” হিসেবে ব্যবহার হচ্ছে।বংশীকুন্ডার ইতিহাস ঐতিহ্য নিয়ে ম্যাগাজিন “মনাই নদীর তীরে ” সেখানেও বিভিন্ন লেখকরা বংশীকুন্ডা বানানে দন্ত্য ন ই ব্যবহার করেছেন,বংশীকুন্ডা ছাত্রকল্যাণ পরিষদ’ র নাম এবং লগোতেও দন্ত্য ন ব্যাবহৃত হয়েছে,বংশীকুন্ডার শত সহস্র দলিলেও দন্ত্য ন -ই ব্যবহৃত হয়ে আছে।এমনকি বিশ্বমুক্তকোষ উইকিপিডিয়াতেও মূল লেখা এবং মানচিত্রে “বংশীকুন্ডা” ব্যবহৃত হয়েছে।বংশীকুন্ডা মমিন উচ্চ বিদ্যালয়,বংশীকুন্ডা কলেজ সবকিছুতেই যেহেতু “বংশীকুন্ডা” আত্ত্বীকরণ হয়ে গেছে বহু আগেই,এগুলোতো আমরা করি নাই, তাহলে আজকের এই সময়ে এসে দন্ত্য “ন “আর মূর্ধ্যন “ণ ” এর ফ্যাক্টর আমার কাছে একবারেই পান্ডিত্য জাহির করা ছাড়া তেমন বেশি কিছু মনে হচ্ছেনা।তবে হে, কেউ যদি “বংশীকুণ্ডা ” হিসেবে লিখতে চায় বা লিখে তাতে আমার কোন আপত্তি নেই।কারণ মূল বানানটা যেহেতু কুণ্ড থেকে আসছে তাই মূর্ধন্য ণ দিয়ে যে কেউ লিখলে লিখতে পারে। তাই কুণ্ডা বানানে আমার কোন এলার্জি নেই।যেমন ধরো বাংলা একাডেমী বিভিন্ন বানানের দীর্ঘ ই কার থেকে রস্ব-ই কার ব্যবহার করে শুদ্ধ করছে।তখন আমরা যারা ছাত্রদের খাতা দেখি তারা দুইভাবে লেখাতেই নাম্বার দেই এবং সর্বমহল থেকেই নাম্বার না কাটার পরামর্শ থাকে, অতএব একই প্রক্রিয়ায় বংশীকুন্ডা বানানটাকেও আত্ত্বীকরণ করলেও খুব একটা ভুল হয়ে যাবে বলে মনে হয়না। আর কেউ যদি মনে করেন জীবন কৃষ্ণ একজন লেখক হয়েও বংশীকুন্ডার সঠিক বানানটা লিখতে পারেনা, জানে না,পারেনা,ভুল করে ইত্যাদি ব্লা ব্লা, তাহলে তাদের জ্ঞাতার্থে করুণা রেখে বলবো আমার লেখা প্রথম কাব্যগ্রন্থ “মাটির পুতুল” ২০১৬ সালে প্রকাশিত। সেই বইয়ে আমার ঠিকানাতে বংশীকুন্ডা বানান মূর্ধন্য ণ দিয়ে লেখা,দয়া করে বংশীকুন্ডা হাওরসাহিত্য পাঠাগারে বইটি আছে একটু কষ্ট করে দেখে আসবেন। তখনো বংশীকুন্ডায় এতদ্বিষয়ে কোন গবেষণা জন্ম নেয়নি।তাই জীবন কৃষ্ণকে এ ব্যাপারে জ্ঞান দিবার তেমন অবকাশ নেই।

কিন্তু সমস্যা হইলো তখনো আমি অনেকের প্রশ্নের শিকার হয়েছি আমি কেন বংশীকুন্ডা বানান ভুল লিখলাম! তাহলে মূর্ধন্য ণ দিয়ে লিখলেও ভুল ধরা হয়,ইদানিং দন্ত্য ন দিয়ে লিখলেও ভুল ধরা হয়,তাহলে লিখবোটা কি হে প্রিয় সুহৃদবৃন্দ? আমার ধারণা সম্ভবত মূর্ধন্য ণ দিয়ে বানানটা কম্পিউটারে লিখতে সহজ হলেও খাতায় লিখতে অনেকের সমস্যা হয়,ভুল করে একটানে বানান লিখতে যেয়ে মূর্ধন্য ণ এর উপর মাত্রা চলে আসে যার ফলে অটোমেটিক দন্ত্য ন হয়ে যায়।সম্ভবত আমাদের জ্ঞানী,বিচক্ষণ পূর্বপুরুষগণ অনাকাঙ্খিত বানান ভুল এড়াতেই হয়তোবা সবাই দন্ত ন দিয়ে লিখে আসছেন যেনো সকলেই বার বার ভুল না করে এবং বাস্তবেও সবচেয়ে বেশি প্রায় সবজায়গাতেই দন্ত্য ন ব্যবহৃত হয়েছে। তাই আমি মনে করি এই মুহুর্তে আর “বংশীকুন্ডা” বানানটিতে অশুদ্ধতার কিছু নেই,যেমনটি আমরা দেখি “চন্দ্র ” বানানে।সংস্কৃত “চন্দ্র” বানানটি অনেক স্মার্ট হলেও উচ্চারণ সহজবোধ্যতার জন্য আমরা এখন সবাই “চাঁদ” লিখি বা বলি।তাহলে চাঁদ বলতে যদি
চন্দ্রকে বুঝতে সমস্যা না হয়,তবে কুন্ডা বলতে কেনো কুণ্ডা বুঝতে পারবোনা? কাজেই পারলে আপনারা আপনাদের ব্যক্তিগত কাজে মূর্ধন্য ণ দিয়ে শুদ্ধ করে লিখুন, স্যালুট আপনাদের,আর যদি আমার সকল ডকুমেন্ট সহ বংশীকুন্ডার দালিলিক সকল কাগজপত্র পরিবর্তন করে মূর্ধণ্য দিয়ে সহি শুদ্ধ করতে পারেন তাহলে আমাকেও বংশীকুণ্ডা লিখতে বলুন তা না হলে আমার সিনিয়র শ্রদ্ধেয় সকল পরিচিতজন ব্যাতীত আন্ডারগ্র্যাজুয়েট সকল পরামর্শদাতাগণকে সবিনয়ের সাথে অনুরোধ করবো আজকের পর থেকে অন্তত আমাকে এতদ্বিষয়ে আর কোন পরামর্শ দেয়া থেকে ৬০ হাত সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখুন।প্রিয় জন্মভূমি বংশীকুন্ডা’র কথা স্মরণ করে দেশ বিদেশে জন্মভূমির সুনাম বৃদ্ধির জন্য অক্লান্ত কাজ করে যাচ্ছি দিনে রাতে।তাই এই বিষয়ে আবেগ অনুভুতি নিয়ে খেলা বন্ধ করার অনুরোধ রাখছি। বংশীকুন্ডা বানান বিষয়ক অহেতুক বিভ্রান্তি সৃষ্টির পাঁয়তারা বাদ দিয়ে নিজেকে নিয়ে ব্যস্ত থাকুন।নিজের উন্নতি হবে,দেশের উন্নতি হবে,লকডাউনটা স্বাচ্ছন্দে কেটে যাবে। শুভকামনা সকল পাঠকদের জন্য।

বিঃ দ্রঃ সবাই যদি মূর্ধন্য দিয়ে বংশীকুন্ডা বানান লিখে তাহলে আমার লিখতে কোন অনীহা নেই।আর যদি দন্ত্য ন দিয়ে যে কেউ বংশীকুন্ডা বানান লিখতে চায় তাহলে বলবো লিখুক,সমস্যা নেই, অহেতুক বিভ্রান্তি না ছড়িয়ে, বিভাজন না সৃষ্টি করাই ভালো।দন্ত্য ন দিয়ে বংশীকুন্ডা বানানে অশুদ্ধতার কিছু দেখছিনা।

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে