ফজলুল হক স্যার।।মুন্সী স্যার

0
159

প্রিয় শিক্ষকের প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা

বিশ্বম্ভরপুরে একটি গ্রামের চিত্র পাল্টে দেওয়া
একজন ফজলুল হক স্যার (মুন্সি স্যার):

________ পাশা শাহিনুর Pasha Shahinur

ফজলুল হক স্যারের জন্ম কিশোরগঞ্জ জেলার ভৈরব উপজেলার শিবপুর গ্রামে । ১৯৫২সালের ৯ই অক্টোবর উঁনি জন্ম গ্রহণ করেন। উঁনার পিতার নাম ছিল শব্দর আলী সরকার আর মাতার নাম জাহেরা খাতুন। জন্ম লগ্নে উঁনার বয়স যখন মাত্র ২ বছর তখন উঁনার পিতা মারা যায়। অভাবের সংসারে বড় হয়ে উঠেন তিঁনি।অভাব যে কি জিনিস তা তিনিঁ খুব ভালো করে উপলব্ধি করেছেন। তারপরও উঁনার জীবন থেমে থাকেনি। কখনও অন্যের জমিতে কাজ করে কখনও বা মাটি কেটে; যখন যেই কাজ পেয়েছেন সেটাই করে লেখাপড়া চালিয়ে যান। ১৯৬৮সালে এনট্রাস (এস এস সি) পাশ করেন।১৯৬৯সালে বিয়ে করেন আনোয়ারা হককে।মুক্তিযুদ্ধের সময় মুক্তিবাহিনীর খাবারের ব্যবস্থা করে দিতেন।

দেশ স্বাধীন হলে ১৯৭২সালের দিকে বন্ধুর সাথে বেড়াতে আসেন সুনামগঞ্জ জেলার বিশ্বম্ভরপুর উপজেলার কাটাখালী গ্রামে। কাটাখালীতে বেড়াতে এসে দেখেন সেখানটার প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষক সংকট। উঁনি বাচ্চাদের ক্লাস নেওয়ার জন্য ঢুকে পড়েন ক্লাস রুমে। প্রতিদিন ক্লাস নিতে থাকেন। (এখানে একটি কথা বলে রাখা উচিত এই যে হুটহাট ক্লাস নেওয়ার অভ্যাস এটা উঁনার মধ্যে আগে থেকেই ছিল। অর্থাৎ পাঠদান করানোর বিষয়টি উঁনার কাছে রক্তে মেশা নেশার মত ছিল।)

যা হোক স্যারের এভাবে পাঠদানের আগ্রহ দেখে স্কুল কমিটি মুগ্ধ হয়। স্যারকে পরামর্শ দেন স্যারের সার্টিফিকেট নিয়ে আসার জন্য। স্যার গিয়ে নিয়েন আসেন এগুলো। তারপর উঁনাকে স্থায়ীভাবে নিয়োগ দেওয়া হয় স্কুলে। আগে কিন্তু শিক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রে এখনকার মত নিয়ম ছিল না। এভাবেই বেড়াতে এসে স্থায়ীভাবে থেকে গেলেন কাটাখালীতে। শুরু করেন পুরোদস্তুর শিক্ষকতা। কাটাখালীর অনেক চাকরিজীবী উঁনার ছাত্র ছিলেন। বর্তমানে পাগলা স্কুল এন্ড কলেজের অধ্যক্ষ সৈয়দ রমিজ উদ্দিন , রতারগাঁও উচ্চ বিদ্যালয় অ্যান্ড কলেজের উপাধ্যক্ষ সৈয়দ মো:নুর উদ্দিন উঁনার স্যার ছিল। কাটাখালী উচ্চ বিদ্যালয়ের বর্তমান প্রধান শিক্ষক বেনজীর আহমেদ মানিক উঁনার ছাত্র ছিল। এরকম কাটাখালীর আরও অনেক চাকরিজীবী আছেন। ওখানে ১০-১২ বছর শিক্ষকতা করার পর চলে আসেন তরিঙ্গা প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। তরিঙ্গা প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ৪-৫বছর শিক্ষকতা করার পর ১৯৯১সালে চলে আসেন ভাদেরটেক সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে।

ভাদেরটেক উঁনি আসার পর থেকেই স্কুলের উন্নতি হতে শুরু করে। ভাদেরটেকের মানুষ হাতে পেল এক আসমানের চাঁদ। যার পরশ পরশপাথরকেও হার মানায়। যার তুলনা অনন্য। যার তুলনা একমাত্র তিঁনি নিজেই।হাজার বছরের আরাধনায় যার সান্নিধ্য পাওয়া দুর্লভ। সেই রকম পরম আরাধ্য প্রাপ্তি একজন ফজলুল হক (মুন্সি স্যার) স্যার।

আমার জীবনের শ্রেষ্ঠ্যতম প্রাপ্তিগুলোর একটি জনাব ফজলুল হক(মুন্সী স্যার) স্যারকে শিক্ষক হিসেবে পাওয়া। উঁনার মত শিক্ষকের সান্নিধ্য পেয়েছি বলেই আজকের শাহীনূর হতে পেরেছি।

ফজলুল হক স্যারের বৈশিষ্ট্য ব্যাখ্যা করতে গেলে গুলিয়ে ফেলি। স্যারের কোন দিক রেখে কোন দিক বর্ণনা করব দ্বিধাদ্বন্দ্বে পরে যাই। ১৯৯১ সাল থেকে ২০০৯ সালের ৮ই অক্টোবর পর্যন্ত প্রায় ২০বছর শিক্ষকতা করেছেন ভাদেরটেক সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে।

এই বিশ বছরে কোনদিন দেরীতে স্কুলে আসছেন উঁনি এমনটা কেউ বলতে পারবেন না। বরং উঁনি ফজরের নামাজ আদায় করে উঁনার সুনামগঞ্জ ষোলঘরস্থ বাসা থেকে হেটে সকাল ৬-৭টার দিকে চলে আসতেন স্কুলে । আবার বাসায় ফিরতেন সন্ধায়। এমনটা বছরের ১ম ২-৩ মাস করতেন। এরপরের সময়টা থেকে যেতেন শিক্ষার্থীদের সাথে স্কুলেই। অর্থাৎ ২৪ঘন্টা পরে থাকতেন শিক্ষার্থীদের সঙ্গে। জীবনের মহামূল্যবান সময় ব্যয় করেছেন শিক্ষার্থীদের পাঠদান কাজে।পরিবার পরিজনদের কথা ভুলে যেতেন।এমনকি শুক্রবারে বাসায় গেলে সেখানেও শিক্ষার্থীদের পড়ানোতেই ব্যস্ত থাকতেন। আমরা শুক্রবার সকালে বাড়ি থেকে শহরে স্যারের বাসায় যেতাম আর সন্ধায় ফিরে আসতাম। তখনকার সময়ে মনে হতো এ যেন একটা জেলখানায় আবদ্ধ হয়ে গেছি। কখন মুক্তি পাব এখান থেকে। যেদিন ৫ম শ্রেণির বৃত্তি পরীক্ষার শেষ দিন ছিল সেদিন মনে হয়েছিল কঠিন আজাব থেকে মুক্তি পেলাম। বাধনহারা পাখির মত উড়তে শুরু করি সেদিন থেকে। কিন্তু পরবর্তীতে উপলব্ধি করেছি আসলে মুক্তি পাইনি বরং নিজেকে হারিয়ে ফেলেছি। পরশ পাথরের পরশ ছাড়া হয়েছি।

এই যে স্যারের এই পরিশ্রম ২৪ঘন্টা শিক্ষার্থীদের সঙ্গে লেগে থাকা এটার ফলেই নিজের ভীত শক্ত হয়েছিল। ৫ম শ্রেণিতে যেই শিক্ষাটা পেয়েছি সেটা দিয়েই বাকি শিক্ষা জীবন চালিয়ে দিয়েছি।আমার জীবনে আমি প্রাইভেট টিউটরের কাছে খুব কম পড়েছি একমাত্র স্যারের কল্যাণে।অবস্থাটা এমন হয়েছে যে- “একখান চাবি মাইরা দিছে ছাইড়া জনম ধইরা চলিতেছে! ” স্যার সেই চাবিটা দিয়েছিল।

বিশ বছরে স্যারের অক্লান্ত পরিশ্রমে তৈরি হয়েছে শত চাকরিজীবী। আশেপাশের গ্রামগুলোর সাথে তুলনা করলে দেখা যাবে ভাদেরটেক বর্তমান সময়ে শিক্ষিত বা চাকরিজীবীর দিক দিয়ে অনেক এগিয়ে। এটা সম্ভব হয়েছে একমাত্র স্যারের কল্যাণে।শুধু যে বৃত্তি পাইয়ে দিয়েছেন স্যারে বিষয়টি এমন নয়।মূলত শিক্ষা ক্ষেত্রে চলতে যে ভীত বা ফাউন্ডেশন প্রয়োজন সেটাই তিনি তৈরি করে দিতেন।

এই বিশ বছরে কোন দিন শুনিনি টাকার জন্য স্যার কাউকে পড়াচ্ছেন না।অর্থাৎ তিনি কখনও বিনিময়ের আশায় এত পরিশ্রম করেননি।শুধু ভীত শক্ত করা নয় বরং নৈতিক শিক্ষাও উঁনি শিক্ষার্থীদের দিয়েছেন। কিভাবে সৎ জীবন যাপন করতে হবে। কিভাবে সত্য মিথ্যার তফাৎ রেখে চলতে হবে।কি করে সব সময় সৃষ্টিকার্তার ইবাদত করতে হবে। কিভাবে যৌবনের হেফাজত করতে হবে।

“শিক্ষা লাভ করার প্রধান উদ্দেশ্য হচ্ছে সৃষ্টি জগৎ সম্পর্কে জেনে কিভাবে সৃষ্টিকর্তার আনুগত্য লাভ করতে হবে সে সম্পর্কে জ্ঞান অর্জন করা”:এসব কিছুও উনি শিক্ষা দিতেন।অর্থাৎ ধর্মীয় বিষয়েও উঁনি শিক্ষা দিতেন।আর একজন্যই ফজলুল হক স্যার থেকে উঁনি হয়ে উঠেছিলেন সকলের প্রিয় “মুন্সি স্যার”।
৫ম শ্রেণি শেষ হওয়ার পরই যে উনার সাহায্য বা সহযোগিতার হাত থামিয়ে দিতেন বিষয়টি এমন নয়।বরং এরপরও তিঁনি শিক্ষার্থীদের খোঁজখবর রাখতেন।আবার অনেককে স্যার নিজে উচ্চ মাধ্যমিকে ভর্তি করিয়ে তাদের স্কুলে আনা নেওয়ার কাজও করেছেন।স্যারের এত পরিশ্রমে অনেকে শেষ পর্যন্ত টিকে থেকে আজ সরকারি চাকরিতে আছে আবার অনেকে ঝরে পড়েছে।

উঁনার মত শিক্ষকের সানিধ্য পেয়েছে বলেই ভাদেরটেকের অনেকে আজ বিভিন্ন সরকারি চাকরিতে আছে। বিসিএস ক্যাডার,বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, ডাক্তার সবই তিঁনি তৈরি করে দিয়ে গেছেন।
ফজলুল হক স্যারের গুনাবলি লিখে কয়েকটি বই প্রকাশ করলেও আমার মনে হয় বাকি থেকে যাবে।
ব্যক্তিগত জীবনে স্যারের এক মেয়ে এক ছেলে রয়েছে। স্যার জীবনে কখনও ডিউটি সময় ফাঁকি দেননি যে কারণে আল্লাহ তায়ালা উঁনাকে অর্থ এবং সম্মান দুটোই দান করেছে।

জীবন সায়াহ্নে স্যার এখন একাকী সময় কাটান উঁনার ভৈরবস্থ শিবপুর গ্রামের বাসায়।সকলে স্যারের জন্য দোয়া করবেন।এমন শিক্ষক সকলের ভাগ্যে মিলে না।এমন শিক্ষক তৈরি হোক দেশের প্রতিটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সেই প্রত্যাশা করি। স্যারের দীর্ঘায়ু ও সুস্বাস্থ্য কামনা করছি।

[বিঃ দ্রঃ স্যারের প্রাক্তন ছাত্র ছাত্রী যারা এই লেখাটি পড়ছেন তাদেরকে অনুরোধ করব আপনারা মাসে ১-২দিন স্যারকে কল করে কুশল বিনিময় করবেন। এতে স্যার অনেক খুশি হোন।জীবনের সবচেয়ে মূল্যবান সময়টুকু স্যার আমাদের পিছনে ব্যয় করেছেন।শেষ সময়ে শিক্ষকতা পেশা থেকে অবসরে থাকায় একাকীত্ব অনুভব করেন খুব বেশি। স্যারের এত পরিশ্রমের কোন বিনিময় স্যার চায় না।শুধু চায় আপনারা স্যারের খোঁজখবরটুকু রাখেন। ]

(লেখার ভুলত্রুটি ক্ষমা সুন্দর দৃষ্টিতে দেখার অনুরোধ করছি।)

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে