পূজায় বনের পশুকে নয় আসুন মনের পশুকে বলিদান করি

0
41

পূজায় বনের পশুকে নয় আসুন মনের পশুকে বলিদান করি

সনাতন ধর্মাবলম্বীদের মাঝে পূজায় পশুবলী বহুকাল আগে থেকেই শুরু হয়েছিল যা আজো বিভিন্ন এলাকায় চলমান।বিষয়টি নিয়ে বর্তমানে সনাতন হিন্দু সমাজে বেশ বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে যা অনেকাংশেই যৌক্তিক। যার দরুণ ভারত,শ্রীলংকা,নেপাল,বাংলাদেশ সহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে অনেক খ্যাতনামা মন্দিরেই পশুবলী বন্ধ করে দেয়া হয়েছে।গত ২৯ জুলাই,দৈনিক কালের কণ্ঠের এক সংবাদে দেখা যায় হিন্দু অধ্যুষিত রাষ্ট্র নেপালের মন্দির ট্রাস্ট কর্তৃপক্ষ পশুবলীর উপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে। ৯ অক্টোবর ২০১৯ সালের বাংলাদেশ প্রতিদিন’র আরেক সংবাদে দেখা যায় ভারতের ত্রিপূরায় দূর্গাপূজা উপলক্ষে ৫২৫ বছরের ইতিহাসে পশুবলীর রীতি নিষিদ্ধ করেছে তারা।যার পরপরই সনাতন পন্ডিতগণ এতদ্বিষয়ে নড়ে চড়ে বসেছেন।তুমুল বিতর্ক চলছে দেবতাকে খুশি করতে দেবতার সামনে পশুবলী যৌক্তিক নাকি অযৌক্তিক সে বিষয়ে।তাই আসুন জেনে নিই এতদ্বিষয়ে বৈদিক শাস্ত্র আমাদের কি সিদ্ধান্ত দেয়।

আমাদের খুবই পরিচিত,আলোচিত একটি পুরাণ গ্রন্থ পদ্মপুরানে বলা হয়েছে – যেসব তামসিক ব্যক্তি দেবীর উদ্দেশ্যে জীবহত্যা করে, তাদের অনন্তকাল নরকবাস হয়।

পদ্মপূরাণে এটাও রয়েছে-
“নিহতস্য পশোর্যজ্ঞে স্বর্গ প্রাপ্তির্যদীষ্যতে।
স্বপিতা যজমানেন কিংবা তত্র ন হন্যতে।।
৩৬৭- সৃষ্টিখণ্ড ১৭শ অধ্যায়।”

অর্থঃ যজ্ঞে নিহত হলে যদি পশু স্বর্গ প্রাপ্তি হয়, তবে যজমান( পুরোহিত) কেন স্বীয় পিতাকে এ যজ্ঞে নিহত করে না।
পদ্মপুরাণে পাতালখণ্ডে (৩৯.৩৪) আরো বলা আছে-

সৌবর্ণাং রাজতীং বাপি বিষ্ণুরূপা বলিং বিনা।
হিংসাদ্বেষৌ ন কর্তব্যৌ ধর্মাত্মা বিষ্ণুপূজকঃ॥

অর্থাৎ সুবর্ণময়ী বা রজতময়ী বিষ্ণুস্বরূপা দেবী মহামায়াকেও ছাগাদি বলিদান ব্যতীত পূজা করবে। ঐ সময়ে ধর্মাত্মা বিষ্ণুপূজকের দ্বেষ হিংসা পরিত্যাগ করা কর্তব্য।”

আমাদের আরেক উল্যেখযোগ্য পুরাণ গ্রন্থ শিব পুরাণে উল্লেখিত আছে, মাতা পার্বতীকে শিবজী পশুবলি নিয়ে জিজ্ঞেস করেছিলেন তদোত্তরে দেবী পার্বতী বলেন–

“মম দ্বারে, মম যজ্ঞে যো নরা পশুধাপোকা। যে ধরা নরকাযান্তি যাবৎ চন্দ্র সূর্য দিবাকরম।”

অর্থাৎ, “যে ব্যক্তি আমার মন্দির প্রান্তে ও আমার যজ্ঞে পশুবলি দেয়, সেই ব্যক্তি ততদিন নরকযন্ত্রণা ভোগ করে, যতদিন এই পৃথিবীতে চন্দ্র, সূর্য বিদ্যমান।”

ব্রহ্মবৈবর্তপুরাণের, প্রকৃতি খণ্ডে (৬৪.৪৫-৪৯) বলা হয়েছে–

জীবহত্যাবিহীনা যা বরা পূজা চ বৈষ্ণবী।
বৈষ্ণবাযান্তি গোলকং বৈষ্ণবীবরদানতঃ॥৪৭॥
কিরাতা নরকং যান্তি তামস্যাং পূজয় তথা॥৪৯॥

অর্থাৎ জীবহত্যাবিহীন শ্রেষ্ঠ পূজা বৈষ্ণবী: বিষ্ণুর উপাসকগণ বৈষ্ণবীয় আশীর্বাদে গোলকধামে গমন করে। আর কিরাত তথা নিম্নচেতনাসম্পন্ন ব্যক্তিরা তামসী পূজায় (পশুবলী সম্বলিত পূজায়) নরকে গমন করে।”

আমাদের সনাতন শাস্ত্রের মৌলিক একটি শাস্ত্রগ্রন্থ শ্রীমদ্ভাগবত। শ্রীমদ্ভাগবতে বলা হয়েছে -“বলি দিয়ে মাংস খাওয়া ধর্মানুমোদিত মনে করে যদি কেউ মাংসাশী হয় তবে সে স্বধর্ম ত্যাগ করে বিধর্মকে স্বধর্ম মনে করে।” (ভা ১১/৫/১৩)
“ধর্মজ্ঞানহীন সাধুত্ব-অভিমানী দুর্জন ব্যক্তি নিঃশঙ্কচিত্তে পশুহিংসা করলে পরলোকে সেই পশুরাই ঘাতকদের অনুরূপভাবে ভক্ষণ করে থাকে।” (ভা. ১১/৫/১৪) “আর যে সব দাম্ভিক ব্যক্তি ইহলোকে ধন এবং প্রতিষ্ঠার গর্বে গর্বিত হয়ে দম্ভ প্রকাশ করবার জন্য যজ্ঞে পশুবলি দেয় পরলোকে তারা ‘বৈশস’ নামক নরকে নিক্ষিপ্ত হয়। যমদূতগণ তাদের অশেষ যাতনা দিয়ে বধ করে।(শ্রীদ্ভাগবত ৫/২৬/২৫)

আমাদের সনাতন শাস্ত্রে মহাভারত এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।বলা হয় যা নেই মহাভারতে, তা নেই সারা ভারতে।মহাভারতের অনুশাসন পর্বের ১০০ তম অধ্যায়ে (২১-২৩) ভীষ্মদেব বলেন বিচক্ষণ ব্যক্তি কখনো মাংস ভক্ষণ করেন না। যে ব্যক্তি মোহ প্রভাবে পুত্রমাংসসদৃশ অন্য জীবের মাংস ভক্ষণ করে, সে অতি জঘন্য প্রকৃতির এবং তার সে জীবহিংসা কর্মই বহুবিধ পাপযোনিতে জন্মগ্রহণ করার একমাত্র কারণ।” এই অধ্যায়ে (৭৬, ৭৮, ৮৪) আরো বলা হয়েছে, “যে মাংসাশী দেবপূজা বা যজ্ঞাদিতে পশুবিনাশ করে তাকে নিশ্চয়ই নিরয়গামী (নরকগামী) হতে হয়।

পবিত্র ১৮ টি পুরাণ গ্রন্থের মধ্যে আলোচিত একটি পুরাণ দেবীভাগবত। দেবীভাগবতে আছে-

যে দম্ভাদম্ভয়জ্ঞেষু পশুন্ ঘ্নতি নারাধমঃ তান্ সুখিন যমভটা নরকে বৈশসেতদা।
অর্থঃ যারা পশুবধ বা হত্যা করে তারা নরাধম ও তাদের যমভটা নরক বাস হয়।(২২অঃ ৮ষ্ক দেবী ভাগবত)

আমাদের প্রধান ধর্মগ্রন্থ শ্রীমদ্ভগবদ্ গীতায় ভগবান স্বয়ং বলেছেন-

“পত্রং পুষ্পং ফলং তোয়ং যো মে ভক্ত্যা প্রযচ্ছতি৷
তদহং ভক্ত্যুপহৃতমশ্নামি প্রযতাত্মনঃ৷৷” (৯/২৬)

অর্থ: যে বিশুদ্ধ চিত্ত নিষ্কাম ভক্ত আমাকে ভক্তিপূর্বক পত্র, পুস্প, ফল ও জল অর্পণ করেন, আমি তার সেই ভক্তিপ্লুত উপহার প্রীতি সহকারে গ্রহণ করি।

যেখানে ভগবান বলছেন পত্র,পুষ্প,ফুল,জল অর্পণ করলেই তিনি খুশি,সেখানে পশুবলি দিয়ে আমরা কাকে খুশি করতে চাচ্ছি? নিশ্চই অপদেবতাকে? কারণ রক্ত তো কোন দেবতা চাইতে পারেনা,এগুলো রাক্ষস,ভূত,প্রেতাত্মাদের কাজ।

সত্যি কথা বলতে সনাতনী শাস্ত্রে পাঁঠা বলির কোনো উল্লেখই নেই। বিখ্যাত গড়ুর পুরাণে উল্লেখ রয়েছে “ছাগ” বলির কথা। “ছাগ” মানে ছাগল বা পাঁঠা নয়। “ছাগ” শব্দের অর্থ ষড়রিপু। কাম, ক্রোধ, লোভ, মোহ, মদ, মাৎসর্য – এই ষড়রিপুকে এক কথায় ছাগ বলে। প্রকৃত অর্থে এই ষড়রিপুকেই বলি দিতে হয়। মায়ের কাছে নিরীহ প্রাণী বলি দিয়ে আমরা নিজেরাই পাপের ভাগিদার হচ্ছি।

সংস্কৃতে একটি শব্দেরই অনেক অর্থ থাকতে পারে। যেমন “জীঘ্রং” শব্দের একটি অর্থ হত্যা করা এবং আরেকটি অর্থ দান করা। তদ্রুপ “ছাগ” শব্দের একটি অর্থ ছাগল, আরেকটি অর্থ ষড়রিপু।
একটি শ্লোকের প্রসঙ্গ তুলে বিষয়টি ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করছি।

“যুধিষ্ঠিরস্যয়া কন্যা নকুলেন বিবাহিতা…”
এই শ্লোকটি যদি কোনো সাধারণ মানুষকে শোনানো হয়, তাহলে তিনি এর অর্থ করবেন, যুধিষ্ঠিরের মেয়েকে চতুর্থ পান্ডব নকুল বিয়ে করেছে।
কিন্তু না, তা একদমই নয়।

এখানে “যুধিষ্ঠির” (যিনি সব সময় স্থির) মানে হিমালয় পর্বতকে বোঝানো হয়েছে আর হিমালয়ের কন্যা হচ্ছেন পার্বতী। পার্বতীর সাথে নকুলের বিবাহ সম্পন্ন হয়েছে।আর ন কুল = অকুল; এখানে নঞ-তৎপুরুষ সমাস হচ্ছে। যাঁর কোনো কুল নেই, তিনিই হচ্ছেন নকুল অর্থাৎ মহাদেব শিব। তাহলে এখানে “নকুল” মানে চতুর্থ পান্ডব নয়।

তবে একথাও সত্য যে কিছু কিছু পুরাণে, স্মৃতিশাস্ত্রে শাক্ত ভক্তদের জন্য পূজায় পশুবলীর কথা বলা হয়েছে, সেটাও খুবই কঠোর নিয়মের মধ্য দিয়ে যা কলিযুগে মানা সম্ভব নয়।তাছাড়া সনাতন হিন্দুদের প্রধান ধর্মগ্রন্থ হলো শ্রীগীতা।শ্রীগীতায় ভগবান শ্রীকৃষ্ণ যেখানে পত্র,পুষ্প,ফুল,জল, অর্থাৎ সাত্ত্বিকী প্রক্রিয়ায় প্রভু নিবেদন করার বলা হয়েছে সেখানে আমরা অন্যথা করবো কেন? আমার সোজা কথা, কোন জিনিস শ্রীগীতায় না থাকলে, সেটা যদি অন্য গ্রন্থে থাকে তাহলে সেটাকে মানবো,গ্রহণ করবো। কিন্তু অন্য গ্রন্থে একটি বিষয় আছে, শ্রীগীতায় সেটা বারণ করেছে সেক্ষেত্রে আমরা শ্রীগীতার নির্দেশই মেনে নেবো।তাছাড়া ভগবান আমাদের জ্ঞান দিয়েছেন সেটা আমরা ব্যবহার করলেও তো বিষয়টা স্পষ্ট হয় যেমন-

আমরা পূজায় দেবীকে তুষ্ট করার জন্য আড়াই দিন সংযম করি নিরামিষ (মাংস,মৎস্য বর্জন) খাই।অথচ পূজায় দেবীর সামনে পশুবলী দিয়ে দেবীকে আপ্যায়ন করার আহ্বান জানাই এটা কি যৌক্তিক? তিনি যদি মাংসই খাবেন তাহলে আমাদের কেন মাংস খেতে না করবেন? তাছাড়া রক্ত নিয়ে খেলা করা নিঃসন্দেহে আসুরিক কর্মকান্ড বৈ কি? অশরীরি প্রেতাত্মারা সাধারণত প্রাণী হত্যা,রক্তচুষা পছন্দ করে,আমাদের দেব-দেবী কি সেরকম কিছু? প্রিয় সনাতনী ভাইবোনেরা মনে কষ্ট নেবেননা।নিজ ধর্মকে অবহেলা নয় বরং মজবুত করার জন্যই,গ্রহণযোগ্য করার জন্যই আমার আজকের এই আলোচনা।কেউ কেউ আমিষের চাহিদা পূরণের দোহাই দিয়ে পূজায় পশুবলিকে উৎসাহিত করেন,আপনাদের বলি,আমার লিখাটা নিরামিষকে উৎসাহিত কিংবা মাংসাহারকে নিরুৎসাহিত করার জন্য নয়।আমরা চাইলে পূজার পরের দিন মাংসাহার তথা আমিষের চাহিদা পূরণের জন্য পশুবলি দিয়ে খেতে পারি।তবু দেবতাকে এই সব আসুরিক কাজের সাক্ষী বা অংশীদার করার মত ঘৃণ্য পাপ থেকে আসুন আমরা বিরত থাকি। তাই সবশেষে বলতেই হয় “পূজায় বনের পশুকে নয় আসুন মনের পশুকে বলিদান করি।” দেবতা পূজায় পশুবলির মতো আমরা উগ্রতাজাতীয় কাজ (দড়ি দিয়ে পা বাঁধার পর পশুর চিৎকার,মানুষের উচ্ছৃঙ্খল হই হুল্লোড়,রক্তের প্রবাহ,মহিলা ভক্তদের সামনে অর্ধ- উলঙ্গের মতো কাপড় কাঁচ করা, ধারালো অস্ত্রের ব্যবহার) স্ব- দিলে পরিত্যাগ করি,সেই সাথে সনাতন ধর্মকে শান্তির, সাম্যের,মানবিক ধর্ম হিসেবে সারা বিশ্বে ছড়িয়ে দিতে সম্মিলিত ভাবে একই বৃক্ষের ছায়াতলে এসে হাতে হাত মিলিয়ে একমায়ের সন্তানের মতো কাজ করি।

লেখক

জীবন কৃষ্ণ সরকার
কবি ও প্রাবন্ধিক

তথ্যসূত্রঃ শ্রীগীতা, শ্রীমদ্ভাগবত,মহাভারত, পদ্মপুরাণ,গড়ুর পুরাণ,দেবীভাগবত,ব্রম্মবৈবর্তপুরাণ,রাধাকৃষ্ণ ব্লগস্পট ডটকম,বিভিন্ন অনলাইন,অফলাইন পত্রিকা

বিঃদ্রঃ লেখাটি ভালো লাগলে শেয়ার দিবেন,কেউ দ্বিমত থাকলে এড়িয়ে চলুন।কারো ধর্মবিশ্বাস জোড় করে সরিয়ে দেয়া আমার উদ্যেশ্য নয়।

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে