দীন শরৎ।Dino Shorot।বাউল দীন শরৎ

0
1835

সজলকান্তি সরকার
দীন শরৎ (১৮৮৭-১৯৪১)
একসময় গ্রামভিত্তিক সমাজে প্রান্তিক মানুষরূপে বেঁচে থাকার সুযোগ ছিল, যেখানে সমাজবাদীগণ ছিলেন মানবমঙ্গলের দায়বদ্ধ মহাজন। তাছাড়াও দান দক্ষিণা সাহায্য সহযোগিতা ও সহমর্মিতা ছিল গ্রাম্যলোকের সহজাত প্রবৃত্তি; তাই উদাসি মানুষেরা পাখির মতই ভাবস্বভাবি হয়ে ঘুরে বেড়াতে পারত আপন খেয়ালে এবং মাধুকরী করে ভাবজীবন চলে যেত অনায়াসে।
…ভাবধারীদের প্রতি তখন সমাজের দায় ছিল, ছিল ভাববিনিময়ের পরমসঙ্গ ও বন্ধন লাভের বাসনা। অতিথিসেবা ছিল পরমধর্ম। মানবধর্ম ছিল সর্বমঙ্গলের মঙ্গল। এ প্রসঙ্গে বলতে হয়, ১৯৮৪ খ্রিস্টাব্দে শেষ বৈশাখের কোন এক দুপুর বেলা আমাদের বাড়ির উঠোনে দুই বৈষ্ণবী ও এক বৈষ্ণব কৃষ্ণনামধ্বনি দিয়ে মাধুকরী পাওয়ার আশায় যখন ঘরমুখি দাঁড়ালেন মা তখন পরম শ্রদ্ধায় তাঁদের মধ্যাহ্নসেবার নিমন্ত্রণসহ বাড়িতে নামকীর্তনের অনুরোধ করলেন। গৃহস্থের কল্যাণ কামনায় ভাবধারীগণ সম্মতি দিলেন। ভাব ভক্তিসহকারেই হল অতিথরূপে নারায়ণ সেবা। তারপর গানের আসর চলল রাতভর আর শ্রোতারা গানে গানে বাহুবন্ধনে বুক মিশিয়ে ভাবকাতর হয়ে মিশে গেল অন্তরসত্য প্রেমধারায়।
সুনামগঞ্জ জেলার মাঝাইর গ্রামের গৌরী বৈষ্ণবী ছিলেন এ আসরের প্রধান গায়ক। তাঁদের কৃষ্ণকথা ও নামগানে গ্রামবাসী মুগ্ধ হলেন। পরবর্তিতে গ্রামবাসীর অনুরোধে অন্যদের বাড়িতেও আসর চলল বেশ কয়েকদিন। নামকীর্তন শেষে বাউলগান ও ভাবসংগীত ছিল এ আসরের বিশেষ আকর্ষণ। আর এ পর্বে গ্রামবাসীও গায়ক হতেন। এভাবেই আসর গেয়ে-গেয়ে তাঁদের যথেষ্ট মাধুকরী (ধান চাল ও নগদ অর্থ) সংগ্রহ হত। একটি বিচ্ছেদি গান ছিল এ আসরের প্রধান আকর্ষণ।
কারে দেখাবো মনের দু:খ গো আমি বুক ছিড়িয়া
অন্তরে তুষেরি অনল জ্বলে গইয়া গইয়া।

গৌরী বৈষ্ণবী ভাবে মজে অশ্রু নয়নে এ গানটি গেয়েই আসর শেষ করতেন। একদিন এল তাঁদের বিদায়ের পালা। সেদিন বিদায়ী আসরে ছিল পরমসঙ্গ ত্যাগের বেদনার সুর, যেদিন আমিও চোখের জল ধরে রাখতে পারিনি। বেশ কদিন এই শোকপ্রবাহ বিরাজ করছিল সারাগ্রামের লোকমানসে। গ্রামবাসীর মুখে-মুখে সুরে-সুরে গানের রেশ ছিল অনেক দিন। তারই ধারাবাহিকতায় ভাবকাতর সংসারহীন ভবঘুরে ঠাকুরধন সরকার সন্ধ্যা হলেই বাড়ির আলগঘরে গানের আসর জমাতেন। একে একে ভাবধারী সকলেই আসতেন সঙ্গত করতে। তিনি প্রথমেই গাইতেন জনপ্রিয় একটি গান-
গুরু উপায় বলো না
জনমদুখী কপাল পোড়া
আমি একজনা।

এ গানটি যেন ছিল তার জীবনদলিল, তাই গাইতে গাইতে তিনি কান্নায় ভেঙ্গে পড়তেন। কষ্টের বুক ফুলিয়ে দম আটকাতে আটকাতে চোখ মুছতেন। শ্রোতারা বেশ মজা পেতেন। আমি তখন- গানের রচয়িতা কে ? জানতে চাইলে তিনি বলতেন-‘ভাই এইডা মাইনষের মুখে মুখে হুনা গান। কোন মাজন (মহাজন) কোনদিন লেখছে ঠিক্ঠিকানা নাই।’ তারপর তিনি গাজাসেবনে মনোনিবেশ করলে অন্যরা আসর ধরে রাখতেন। গানের ফাঁকে ফাঁকে গৃহস্থ প্রদত্ত চিড়ামুড়ি খাওয়ারও ধুম পড়ত। গাওইয়া বাজইয়া সকলেই তখন তেজ ফিরে পেতেন। আসরে ঠাকুরধন ভালো গান গাইতে না পারলেও খুব দরদ ও ভাবে মজে আসর জমাইতে পারতেন। এ ভাবেই আলগঘরে চলত গানের মেলা ভাবের খেলা। ঠাকুরধন একদিন আলগঘরের এক আসরে গাইলেন-
এমন উল্টা দেশ গুরু, কোন জায়গায় আছে,
উর্ধ্বপদে হেটমু-ে,সেদেশের লোক চলিতেছে।।

দীন শরৎ চন্দ্র নাথের এ গানটি শোনার পর আসরের সবাই স্থবির হয়ে যেতেন। মনে হত যেন ভাবের দেয়াল ভেঙে সবাই ক্লান্ত ও অনুসন্ধানকাতর। আমি বেশ কদিন এ গান গেয়েই স্কুলের পথ ও মাঠের পথ পেরিয়েছি। মূলত: দীন শরৎ চন্দ্র নাথের গানের প্রতি শৈশব কৈশোরের সেই ভালোলাগাই ছিল তাঁকে অনুসন্ধানের মূল কারণ। ২০০৬ খ্্িরস্টাব্দের পরবর্তি সময়ে বিভিন্ন গ্রন্থে প্রবন্ধে ও নিবন্ধে যখন দীন শরৎ চন্দ্র নাথের ব্যক্তি জীবনের কিছু তথ্য বিশেষ করে তাঁর অন্ধত্বের বিষয়টি জানতে পারি তখন তাঁকে জানার কৌতুহল আরও বেড়ে যায়। আর এ কৌতুহলই আমাকে নিয়ে যায় তাঁর বসতভিটা, দীক্ষাশ্রম ও সৃষ্টিজগতে। ১৯৯৬ খ্রিস্টাব্দে একটি বিবাহ অনুষ্ঠানকে কেন্দ্র করে যখন প্রথম আমি দীন শরতের বাড়িতে যাই তখন তাঁর বসতবাড়িতে কোন উত্তরসূরি ছিল না, ছিল না তাঁর বসতভিটার নিজ মালিকানাসত্ত্ব। কেবলি গ্রামবাসীর মৌখিক বয়ানের আঙ্গিকে দেখেছিলাম দীন শরৎ নাথের স্মৃতিময় পতিতভিটা। সেদিন এ বিষয়টা আমার কাছে তাঁর উত্তরসূরিদের জীবন সংগ্রামের পরাজয় বলেই মনে হয়েছিল।


শরৎ চন্দ্র নাথ বর্তমান নেত্রকোণা জেলার কেন্দুয়া উপজেলাধীন সাজিউড়া গ্রামে সাধারণ নাথ পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। ভাটি অঞ্চল হিসেবে খ্যাত এই কেন্দুয়া উপজেলায়Ñ কবি কঙ্ক, ময়মনসিংহ গীতিকার সংগ্রাহক ও লেখক চন্দ্রকুমার দে, প্রভাত বাউল, বিপ্লবী নরেশ রায়, বিজ্ঞানী বি এন চক্রবর্তী ও ড. মুসলেহ উদ্দিন মল্লিক, নাট্যকার ফণি চক্রবর্তী, চিত্রশিল্পী ললিতকুমার হেশ ও শশীকুমার হেশ, কবিয়াল তালুকদার সূর্যকান্ত চৌধুরী, সঙ্গীত শিল্পী মলয়কুমার গাঙ্গুলী, প্রখ্যাত বাউল সাধক ও কবি জালাল উদ্দীন খাঁ, বিশিষ্ট রাজনীতিবীদ নলিনীরঞ্জন সরকার, হুমায়ুন আহমেদ ও আব্দুল কুদ্দুস বয়াতীসহ অনেক গুণীজন জন্মগ্রহণ করেন। দীন শরৎ চন্দ্র নাথও এই উর্বরমেদিনীর গর্বিত সন্তান। তাঁর পিতা কুটীশ্বর নাথ ছিলেন একজন খ্যাতিমান বাউল শিল্পী, ফলে পারিবারিক পেশা গৃহস্থিতে তাঁর অবস্থান ভালো ছিল না। টানাপোড়েনের মধ্য দিয়েই চলত তাঁর সংসার। শরৎ চন্দ্র নাথ যখন মাতৃগর্ভে তখন সাংসারিক দৈন্যতা রেখেই কুটীশ্বর নাথ অজানা রোগে অকালে মুত্যু বরণ করেন। শুধু তাই নয় শরৎ চন্দ্র নাথ পিতাহীন পিতৃভূমিতে শিশুকালে মাকেও হারান। ফলে অযতেœ অবহেলায় প্রান্তিক মানুষরূপে শুরু হয় তাঁর অনাথ জীবন। বাবার মতই উদাসী হয়ে জীবন কাটাতে অভ্যস্ত হয়ে পরেন তিনি। বাউলআসর কীর্তন ও বিভিন্ন আখড়ায় ভাববাদীদের সাথে শুরু হয় তাঁর মেলামেশা। ঘুরে বেড়ান ভাবজগতের আস্তানায় আস্তানায়। গানে গানে আর গীতিকবিতায় প্রকাশ ঘটে ভাববোধের। আর তখন থেকেই স্বাভাবিক খেয়ালে আসরে তাৎক্ষনিক গীতিকবিতা রচনায় উদাসী শরতের নাম ছড়িয়ে পড়ে। তাতে কারও কারও নজর কাড়লেও অনেকেই উপহাস করতেন। এক পর্যায়ে শরৎ চন্দ্র নাথ আটাশ বছর বয়সে বিয়ে করেন এবং চার সন্তানের পিতা হন। প্রথম সন্তান ছেলে সুধাংশু নাথ, বাকি তিনজনই মেয়ে। বড়ো মেয়ে লাবন্য নাথ, মেজো মেয়ে সুখদা নাথ; তৃতীয় মেয়ের নাম জানা যায়নি। স্ত্রী-সন্তানের ভরণপোষণ ও সংসার জীবন- উদাসী শরৎ চন্দ্র নাথের ভালোলাগার কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠেনি। তাই তিনি একপর্যায়ে ভাব জগতের অন্তরসত্য ধারায় আত্মমগ্ন হন। কেন্দুয়া উপজেলাধীন বৈরাটী গৌরী আশ্রমের প্রতিষ্ঠাতা সচ্চিদানন্দ শ্রীশ্রীমৎ ভারত ব্রহ্মচারীর ছিলেন তাঁর শিক্ষাগুরু। তাঁর কাছেই শিখেন তিনি আসন, যোগ, কুম্ভক ও প্রাণায়ামসহ সাধন স্তরের নানা বিষয়। এক পর্যায়ে তিনি অনন্ত জিজ্ঞাসা নিয়ে বর্তমান হবিগঞ্জ জেলার লাখাই থানাধীন বিতলং আখড়ার প্রতিষ্ঠাতা রামকৃষ্ণ গোস্বামীর সাথে সাক্ষাৎ করেন। তাঁকে তিনি পূর্ণব্রহ্মরূপে জানতেন। তাই তিনি তাঁর রচনায় উল্লেখ করেছেন-
বন্দি গুরু পূর্ণব্রহ্ম, রামকৃষ্ণ চরণ।
দয়ার মূরতি যিনি, পতিত পাবন ॥

দ্বিতীয়ে বন্দিনু গুরু ভারত গোস্বামী।
ব্রহ্মচারী মতে যিনি হন অগ্রগামী ॥
শিখাইলেন আসন, যোগ, কুম্ভক প্রাণায়াম।
শিক্ষাগুরু পদে মোর সহস্্র প্রণাম ॥
মূলত: নাথ সিদ্ধারা গুরুবাদী। গুরুই তাদের একমাত্র উপাস্য। তাই গুরু সাধক শরৎ চন্দ্র নাথ মানব জীবন ও মানব ধর্মের নানা বিষয় নিয়ে সাধনায় মত্ত্ব হয়ে রচনা করেন গীতিকবিতা যেখানে তিনি নিজেকে ‘দীন’ কোথাও কোথাও ‘কাঙাল’ বা ‘অধীন’ বলে পরিচয় দিতে শুরু করেন। আর একপর্যায়ে অনাথ শরৎ চন্দ্র নাথ ‘দীন শরৎ’ নামে পরিচিতি লাভ করেন। যেন ‘দীন’ শব্দটি তাঁর নামের আপন হয়ে মাতা পিতা হারা জীবনেরও শোক প্রকাশ করছে। তখন থেকেই তিনি নি:সঙ্গ জীবনে দুঃখকে সাথে নিয়ে হয়ে উঠেন ভাবুক চিন্তক ও সাধক পুরুষ। মরিয়া হয়ে উঠেন সাধন স্তরের অজানা তথ্য জানতে । খুঁজে বেড়ান নানা সাধকের আস্তানা। শিষ্য হয়ে গুরুর কাছে বিনয়ের সাথে জানতে চান-

জিজ্ঞাসার অপরাধ করিবেন মার্জনা ॥
কেবা গুরু কেবা শিষ্য কেবা আত্মা মন।
দেহের তত্ত্ব জানতে আমার মনে আকিঞ্চন ॥
জানার ইচ্ছাই অজানাকে জয় করে নেয় আর তাই এ প্রশ্নের উত্তরে নিজেই আত্মমগ্ন হয়ে পরমসত্য কুড়িয়ে নিয়ে গুরু ভাবে রচনা করেন-
যিনি অখ- ম-লাকার, গুরু রূপে ভগবান আপনি সাকার।
দেহের গুরু পরমআত্মা, জীবাত্মা হয় শিষ্য তার ॥
অনন্ত জিঞ্জাসা কাতর দীন শরৎ কখন কিভাবে কার নিকট থেকে এসব উত্তরের পিপাসা নিবারণ করেছিলেন তা বলা মুশকিল। তবে একথা বলা যায় যে, তিনি নিজেই গীতিপদ রচনা করে গুরুধারায় তার উত্তরের সমাধান জানিয়ে দিয়েছেন তৎকালের রক্ষণশীল সমাজের সবার কাছে। তাই তিনি শিষ্যরূপে প্রশ্নের যেমন পদকর্তা তেমনি গুরুরূপে উত্তরেরও পদকর্তা অর্থাৎ উভয় ধারায় গীতিকবিতা রচনার গর্বিত কবি। তাই তিনি শিষ্য ও গুরু উভয়েই। সেকালের বাংলা প-িত কবিগণ হয়ত দীন শরতের নাম তাঁদের লিখিত কাগজি সূচিপত্রে রাখেননি। কিন্তু সমাজের হৃদয় দলিলে আজও তা সমাদৃত। এ প্রসঙ্গে ‘দীন শরতের বাউল গান’ (প্রকাশ ১৩৪১ বঙ্গাব্দ)-এ একটি দীর্ঘ ভূমিকায় কামিনীকুমার কর রায় দীন শরতের কতকগুলো গানের উল্লেখ করে মন্তব্য করেছেনÑ‘এই গানগুলি ঠিক যেন চ-ীদাসের প্রতিধ্বনি। কোনও ভূর্জপত্রে এইগুলি পাওয়া গেলে ,দীন শরৎ চ-ীদাসের মর্যাদা নিশ্চয় লাভ করিতেন। ইহা কিরুপে সম্ভব হইল? আমরা বলিব, এই গ্রাম্য কবিও সেই চ-ীদাস, বিদ্যাপতি, গোবিন্দদাস, জ্ঞানদাস, প্রভৃতিরই কনিষ্ট সহোদর, সকলেই একই রাজ্যের লোক, তাই এইরূপ সম্ভব হইয়াছে, যুগেযুগে আরও হইবে।’
বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে যে সকল কবিদের যথেষ্ট মর্যাদা রয়েছে তাঁরা মুখ্যত নগরকেন্দ্রিক। কিন্তু আমরা দেখতে পাই অষ্টাদশ শতকের শেষ থেকে বিশ শতকের শেষ পর্যন্ত এই নাগরিক কবিদের চেয়ে বেশি সংখ্যক কবি রয়েছে নগরের বাইরে যাঁরা সংখ্যায়ই শুধু গরিষ্ঠ নন রচনায়ও তত্ত্বপ্রবল। বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে এই কবিদের কোনঠাসা করে রাখা হয়েছে। দীন শরৎ সম্পর্কে ‘জালালগীতিকা সমগ্র’ (প্রকাশ ২০১৪ খ্রিঃ)-এ যতীন সরকার বলেছেন- ‘…বিশ শতকের গোড়ায় এখানে একজন অসাধারণ প্রতিভাবান কবির আর্বিভাব ঘটেছিল। তাঁর নাম- শরৎচন্দ্র নাথ। তাঁর রচনায় তিনি ‘দীন শরৎ’ ভণিতা ব্যবহার করতেন। দীন শরতের বাড়ি ছিল কেন্দুয়া থানার সাজিউড়া গ্রামে, জালাল খাঁর বাড়ি থেকে মাইল আটেক দক্ষিণে। দীন শরতের দেহতত্ত্বের গানগুলি আঞ্চলিক সীমানা ছাড়িয়ে এক সময় সমগ্র বাংলাভাষী অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়েছিল। ‘দীন শরতের বাউলগান’ ও ‘দীন শরতের এসলাম সংগীত’ নামে তাঁর দুটো সংকলনগ্রন্থও প্রকাশিত হয়েছিল। দুটো গ্রন্থই এখন দুষ্প্রাপ্য। তবে পল্লী অঞ্চলে এখনো তাঁর গান লোকপ্রিয়তা হারায়নি।’ মানবতাবাদী কবি দীন শরৎ চন্দ্র নাথ জাতি ধর্মের উর্ধ্বে থেকে মানুষের মাঝেই সবকিছু চিনে নেওয়ার আহব্বান জানিয়েছেন-
মানুষ হওয়া কঠিন বিষয় সকলে কি জানতে পারে ॥
মানুষেতে মানুষ আছে চিনে লও মানুষের কাছে।
সেই মানুষকে জান্লে পাছে, তবেই মানুষ হতে পারে ॥
অনুসন্ধানি দীন শরৎ মানবকল্যাণে রচনা করেন নানা সাধনস্তরের লোকায়িত জ্ঞানের প্রশ্ন উত্তর পর্বের ধারা। যা তাঁর আগে কেউ এভাবে প্রকাশের প্রমান মিলেনি। তারই ধারাবাহিকতায় ‘দেহতত্ত্ব’ তাঁর গীতিকবিতায় বিশেষভাবে প্রকাশ পায়। শুধু তাই নয়, দেহতত্ত্ব নিয়ে সুবিন্যস্ত রচনায় জনমনে তিনিই প-িত বলে খ্যাত। তাঁর মতে দেহ ঘরেই নিরঞ্জনের বসবাস, এখানেই দেবালয় ও বিশ্বলয় বিরাজমান। তাই আপন ঘর থুইয়া দেবালয়ে নিরঞ্জনের তালাশ অর্থহীন। জীবের মাঝেই শিবের বাস। দেহের ভিতরেই ব্রহ্মা- পাওয়া যায়। তাই দেহতত্ত্ব জানতে হয়।

দেহখানি দেখি যেন ঘরের নমুনা।
তার মধ্যে হবে কিসে ব্রহ্মা-ের তুলনা ॥

এ ঘরের তত্ত্ব কেহ জানিতে না পারে।
সকল ব্রহ্মা- আছে ঘরের ভিতরে ॥

ভেবেছ মন আমি একজন দেহরাজ্যের রাজা।
শমন রাজার হাতে একদিন পাইতে হবে সাজা ॥

সাধ্যবস্তু থুইয়া আপন ঘরের ভিতরে।
ব্রহ্মা- খুঁজিয়া কোথা পাইবে তারে ॥

দেহঘরে আছে সূর্য সদায় দীপ্তমান।
যেদিন সূর্য অস্ত যাবে হবেরে নির্ব্বাণ ॥

শুধু তাই নয় ধর্মের দীপ্তমান পথে নির্ব্বাণ সাধনার রহস্য তাকে ভাবিয়ে তুলে তাই সহজ ধর্মের জটিল সমীকরণে বিস্মিত হয়ে তাতে মানব বৈষম্যের কারণ ও পরমতত্ত্ব লাভে গুরু চিনতে তিনি গেয়ে উঠেন-
‘একটি পরম তত্ত্ব জানতে চাই
মহাপ্রভূর গুরু কেন ভারতী গোসাঞি।,

আমাদের যা অজানা তাতেই ভয় এবং ঈশ্বর নির্ভর ভাবনা আসে। কিন্তু দীন শরৎ চন্দ্র নাথ ধর্ম রাজ্যের গুরুধারার অজানা তথ্য জানতে ধর্মভীরু অনুগতশিষ্য না হয়ে ধর্মাবতার, ধর্মগুরু, দীক্ষাগুরু, শিক্ষাগুরু, সাধনসঙ্গী কিংবা বিভিন্ন আসর ও সভায় অজানার সন্ধান খুঁজেন। আর যা জানেন তা তথাকথিত অলৌকিক ধারণার দেয়াল ভেঙ্গে দিয়ে প্রকাশ করেন জনসম্মুখে অবলীলায়- গীতিধারায়। সেজন্য প্রথার বাইরে গিয়ে তিনি সৃষ্টি করেন ভিন্ন গীতি আঙ্গিক-মালজোড়া বাউলগান। এ গান যুক্তিতর্কধর্মী, তথ্যমূলক ও ন্যায়-নীতিকথায় সমৃদ্ধ বাঁচা-বাড়ার মর্মবাণী। গুরু শিষ্য দুইটি ভাবে রচিত প্রশ্ন-উত্তর পর্বে দুইজন গায়ক আসরে এ গান পরিবেশন করে থাকেন। লোকবাদ্য বাজিয়ে যন্ত্রিকসহ অন্যরা দোহার দেন। আসরে উপস্থিত সময়ে পদ রচনা এ গানের মূল রীতি। সাধারণতঃ সৃষ্টিতত্ত্ব, দেহতত্ত্ব, পরমতত্ত্বসহ সমকালিন বিষয়াদি ও শ্রোতাদের ইচ্ছার বিষয়টিও গুরু ও শিষ্য ধারায় মালজোড়া বাউলগানে স্থান পায়।

শিষ্যধারা (প্রশ্ন) :

কি কারনে জন্মে মানুষ, কেন বা মরে।
আমি কোথায় ছিলাম, কেন বা এলাম,
কোথায় যাব দুদিন পরে।।

গুরুধারা (উত্তর) :
কালের উৎপত্তি জীবের, কালে করে লয়।
পঞ্চে পঞ্চ মিশে গেলে, মরণ বলে কয়।।

মালজোড়া বাউল গানে অনেকটা কবি গানের মত সাদৃশ্য খুঁজে পাওয়া যায়। তবে এ ধারায় কবি গানের মত অশ্লিলপদ ব্যবহার হয় নাই বলে জনমনে আজও সমাদৃত। বাংলাদেশের বৃহত্তর ময়মনসিংহ তথা নেত্রকোনা অঞ্চলেই সম্ভবত মালজোড়া বাউল গানের প্রথম সৃজন ও লালন ক্ষেত্র। ধারনা করা হয় বিশ শতকের প্রথমার্ধে তার প্রসার ঘটে। যেখানে দীন শরতের আগে তার প্রমাণ মিলেনি। তিনি আসরে বসেই গান রচনা করতেন। তবে গাইতেন কম। গান গাইতেন তাঁর প্রথম শিষ্য অতুল শীল। অতুল শীল ছিলেন একই গাঁয়ের প্রতিবেশি। বর্তমানে (২০১৭ খ্রিস্টাব্দ) অতুল শীলের ছেলে সুমঙ্গল শীল (৯৪) এ গানের চর্চা ধরে রেখেছেন। সুমঙ্গল শীল ছিলেন তার বাবা অতুল শীলের শিষ্য। তিনিও শরৎ সান্নিধ্য লাভ করেছেন। তবে দীন শরৎ চন্দ্র নাথের মৌখিক রচনাগুলো লিখে রাখার কাজটা বেশির ভাগ করতেন শিষ্য যোগেন্দ্র দে। মালজোড়া বাউল গানের প্রসঙ্গে বলতে গিয়ে প্রশিষ্য সুমঙ্গল শীল বলেন,‘ সাগলী গ্রামে এক মালজোড়া বাউল আসরে বাউল জালাল খাঁসহ অনেক নামীদামী বাউল উপস্থিত ছিলেন। আসরে দীন শরৎ গানে গানে তাৎক্ষণিক একটি প্রশ্ন রেখেছিলেন যার উত্তর তখন কেউ দিতে পারেনি।’ প্রশ্নটি নি¤œরূপ :
জানবো বলে দয়াল গুরু বাসনা চিত্তে
কোন পদ্মে হয় তোমার আসন কোন শক্তি কোন দলেতে ॥
কোন পদ্মে হয় শিবশক্তির বাস
সেই শিবশক্তির মিলন কথা জানতে অভিলাস
বল তারে ষঠচক্র ভেদ করিয়া নিতে হয় কোন পথে ॥
দীন শরৎ বলে ভারত গোসাইর পায়
ধর্ম অর্থ কাম মোক্ষ রাখি সর্বদায়
তোমার রাঙাচরণ দিয়ে মাথে আমায় নিয়ে চলো সুপথে ॥

আসরে উপস্থিত কেউ তার উত্তর দিতে পারেনি বলে তিনি আসরে কাউকে হেয় মানসিকতায় আঘাত করেননি। বাউল কবি শরৎ চন্দ্র নাথ ছিলেন মানবমঙ্গলের কবি। তাঁর রচনায় মানুষের বাঁচা-বাড়ার গল্প আছে, আছে অসংগতি ও অন্যায়ের প্রতিবাদি সুর। সত্যের আড়ালে সমাজে যে সকল অসত্য মানব বৈষম্যের অবতারণা করেছিল তা তিনি অবলীলায় প্রকাশ করেছেন গানে গানে। এতে সমাজপতিদের রোষানলেও পড়তে হয়েছে থাকে। শুধু তাই নয় জনবিচ্ছিন্ন জীবন যাপনও করতে হয়। কিন্তু সময়ের কথাগুলো তিনি বলে যেতে পিছ-পা হননি। সমকালিন বিষয়াদি নিয়ে বেশ গান রচনা করেছেন তিনি। তন্মধ্য ‘পাটের গান’ বিশেষ ভাবে উল্লেখযোগ্য। তাছাড়া সমকালিন বিশ্বপরিস্থিতিও বাদ পড়েনি তাঁর রচনায়। এ ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য একটি গান হচ্ছে-
যুদ্ধ বাঁধলো এবার চীন জাপানে, জার্মানি ব্রিটিশের সনে,
বিজ্ঞানশক্তি যার যেমন, কইরে নানান মত আয়োজন ॥
ডুবু জাহাজ শূন্য কাপ্তান, আরও কত গোলা কামান
নিয়ে স্থলে জলে উভয় পক্ষে করে অস্ত্র বরিষন ॥

বাউল কবি শরৎ চন্দ্র নাথের পরবর্তিকালে বাউল রশিদ উদ্দিনের প্রকাশিত রচনাতেও ‘মালজোড়া বাউলগান’-এর ধারা খুঁজে পাওয়া যায় যা দীন শরৎ চন্দ্র নাথের মত গুরু-শিষ্যধারায় বিষয়ভিত্তিক সুবিন্যস্ত নয়। অনেকের মতে বাউল রশিদ উদ্দিন (১৮৮৯-১৯৬৪) এ ধারার প্রবর্তক। তবে রচনা ও সময় বিবেচনায় দীন শরৎ তার দাবীদার যাঁর খ্যাতি আশপাশ এলাকাসহ ভারতেও রয়েছে। বাউল গান সম্পর্কে বলতে গিয়ে অধ্যাপক সুধীর চক্রবর্তী বলেন, ‘… লালশীল, লালন, পাঞ্জু শাহ, হাউড়ে গোঁসাই, কুবির, জাদুবিন্দু, জালাল, দীন শরৎ, রশীদ, দুদ্দু, রাধারমণ, ফুলবাসউদ্দিন, দুর্বিন শাহ, পদ্মলোচন, শীতলং শাহ, হাসন রাজা থেকে আজ পর্যন্ত প্রবাহিত বাউলবর্গের গান আমাদের সগর্ব অর্জন।’ শরৎ নাথের ভাবস্বভাবি সৃষ্টি নিয়ে কথিত আছে তৎকালে কৃষ্ঠপুরের (বর্তমান ময়মনসিংহ জেলার গৌরীপুর থানাধীন) জমিদার হাতিতে চড়ে দীন শরতের বাড়ি আসেন। তখন গ্রামের নলিনীরঞ্জন সরকার (কলকাতা কাউন্সিলর/মেয়র/মন্ত্রী)-এর আতিথ্য উপেক্ষা করে দীন শরৎ চন্দ্র নাথের কাঁচা মাটির ঘরে জমিদার মহোদয় রাত্রিযাপন করেন। তিনি দীন শরতের সঙ্গ শেষে তাঁকে জমিদার মহলে স্থায়ী ভাবে নিয়ে যাওয়ার প্রস্তাব দেন, তাতে নলিনী বাবু জমিদার মহোদয়কে অনুরোধ করে বলেন যে, ‘প্রয়োজনে তিনি নিজের সকল সম্পত্তি দিতে রাজি তবুও দীন শরতকে দিতে পারবেন না।’ মূলত নলিনীরঞ্জন সরকারের ছোট ভাই প্রমোদরঞ্জন সরকারের সাথে দীন শরতের সখ্যতা ছিল নিবিড়, তাই এ পরিবারের সকলেই তাঁকে ভালোবাসতেন। অনেকেই বলেন দীন শরৎ নলিনী বাবুর আশ্রিত ছিলেন যা সম্পূর্ণ ভুল, এখানে ভালোবাসাই ছিল মূখ্য; ছিল ভালোবাসার আশ্রয়। তিনি নিজের হাতে সব্জি চাষ করে বাজারে বিক্রয় করে জীবিকা নির্বাহের কিছুটা সংকুলান করতেন বাকিটা ছিল দয়াল ভরসা।

নলিনী বাবুর অনুরোধ মেনে নিয়ে একপর্যায়ে কৃষ্ঠপুরের জমিদার তাঁর মহলে ফিরে গিয়ে বাউল গানের প্রতিযোগিতামূলক আসরের আয়োজন করেন। উল্লেখ থাকে যে তাৎক্ষণিকভাবে বাউল গান রচনা করে যে রাজা-রাণীকে গেয়ে শুনিয়ে মন জয় করতে পারবেন তাকেই তিনি পুরস্কৃত করবেন। শিষ্য অতুল শীলকে সঙ্গে নিয়ে বাউল কবি দীন শরৎ চন্দ্র নাথ অংশ গ্রহণ করেন। আসরে তাঁর ডাক পড়লে তিনি গান রচনা করে দেন এবং শিষ্য অতুল শীল সুললিত কণ্ঠে গেয়ে শুনান।
কি দেব তুলনা জগতে মিলে না
কৃষ্ঠপুর মহারাজের মহিমা অপার।
তিনি মানুষলীলা করিতে অবতীর্ণ ধরাতে
লোকে শিক্ষা দিতে স্বধর্ম আচার ॥
কৃষ্ণভক্ত মতিমান ছোটবড়ো এক সমান
নাহি মান অভিমান হিংসা অহংকার।
দুখী দরিদ্রের মমতা কর্ণসম দাতা
রাজা যুধিষ্টির যথা ধর্ম অবতার ॥
রাজর্ষি জনকের মত ধর্মে কর্মে সদারত
সুখ্যাতি গাহিব কত বিখ্যাত সংসার।
সাধু সৎজনের বন্ধু করুণার সিন্ধু
যেন পূর্ণ ইন্দু সুধার আধার ॥
ছিলেন কর্তীমা সরুজা দেবী জিয়ন্ত দয়ার ছবি
রাণী কি কমলা দেবী জানতে সাধ্য আছে কার।
প্রসবিয়া তিনটি মণি স্বর্গধামে গেলেন তিনি
রাজ অন্তপুরখানি করিয়া আঁধার ॥
কুমার সুরেশ বাবুর গুণে মুগ্ধ সুরাসুর
মধ্যম সুশীল বাবু বৈষ্ণব আচার।
সত্যেশ বাবুর গুণগান গাহিতে জুড়ায় প্রাণ
গন্যমান্য পূন্যবান রাজ পরিবার ॥
মদন মোহন দেবালয় অচলা কমলা রয়
ভোগারতী নিত্য হয় অতিথি সেবা আর।
কাঙ্গাল শরতে কয় যথা ধর্ম তথা জয়
মহারাজের পূর্ণ হয় শান্তি সতাকার ॥

কথিত আছে গান শুনে মুগ্ধ হয়ে মহারাণী মঞ্চে ওঠে এসে নিজের গলার হার খুলে গায়কের গলায় পড়িয়ে দেন। শুধু এ আসরেই নয় ব্রিটিশ পিরিয়ডে ময়মনসিংহের বাউল আসরে গানের প্রতিযোগিতায় সোনার মেডেল পেয়েছিলেন তিনি। তৎকালের ডিস্ট্রিক ম্যাজিস্ট্রেট গুরুসদয় দত্ত মহোদয়কে নিয়ে। চৌপদি সুরে গানটি ‘ময়মনসিংহ গীতি, নামে গ্রন্থিত আছে। সর্বোপরি ‘দীন শরতের বাউলগান’ গ্রন্থ প্রকাশের পৃষ্ঠপোষক নলিনীরঞ্জন সরকারের পরিবারের প্রতি কৃতজ্ঞাতা প্রকাশেও একটি গান রচনা করেন যা চৌপদি সুরে ‘খুসনামি’ নামে গ্রন্থিত আছে। তাছাড়া ভাওয়াল জয়দেবপুরের রাজপরিবারকে নিয়েও তিনি গান রচনা করেছেন। এইভাবে দীন শরৎ চন্দ্র নাথ জীবনের বাঁকে বাঁকে গানের চর জাগিয়েছেন। যেখানে ভাবুক চিন্তক বাউল ফকির ও গান পাগল মানুষের বসবাস। যেখানে হয় মানবমঙ্গলের চাষবাস।

এখন পর্যন্ত ‘দীন শরতের বাউলগান’ ও ‘এস্লাম সঙ্গীত’ নামে দুটি গ্রন্থের গ্রন্থরূপ দলিল পাওয়া গেছে। কথিত আছে ‘গৌরগীতি’ নামে আরও একটি গ্রন্থের কথা। এ বিষয়ে বিশেষভাবে উল্লেখ্য যে ‘দীন শরতের বাউলগান’ গ্রন্থটি নলিনীরঞ্জন সরকারের পরিবারের পৃষ্ঠপোষকতায় গ্রন্থিত হয় যার পা-ুলিপি দীন শরৎ জীবদ্দশায় নলিনীরঞ্জন সরকারের ছোট ভাই পবিত্ররঞ্জন সরকারের কাছে হস্থান্তর করেছিলেন। কামীনিকুমার কর রায়ের দীর্ঘ ভূমিকায় যার ইঙ্গিত পাওয়া যায়। ‘দীন শরতের বাউলগান’ বইটিতে মোট পাঁচটি অধ্যায় রয়েছে যেখানে কিছুটা বিচ্ছিন্নভাবে হলেও বাউল, দেহতত্ত্ব, পঞ্চতত্ত্ব, ষটচক্র, সৃষ্টিতত্ত্ব, পরমতত্ত্ব, বৈষ্ণব সাধন পদ্ধতি, গৌরনিতাই, রাধাকৃষ্ণ, কিছু পদকীর্তন, নিমাই সন্যাস, রাই বিরহ, মালসী ও সূর্যব্রত ধামাইলসহ সমকালিন নানা বিষয়ক গান রয়েছে। শরৎ চন্দ্র নাথ তাঁর প্রথম পা-ুলিপিটি শ্রীযুক্ত নলিনীরঞ্জন সরকার মহোদয়কে উৎসর্গ করেন। তিনি দীর্ঘ উৎসর্গ পত্রে লিখেন-
‘ময়মনসিংহের গৌরমণি বঙ্গজননীর কৃতীসন্তান, ভারত বিখ্যাত অর্থনীতি বিশারদ বঙ্গীয় ব্যবস্থাপক সভার ভূতপূর্ব সদস্য, কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফেলো, বেঙ্গল ন্যাশন্যাল চেম্বার অব কমার্স এর সভাপতি, ভারতীয় জীবনবীমা সমিতি ও ভারতীয় বণিক সমিতি সঙ্ঘের ভূতপূর্ব সভাপতি, হিন্দুস্থান ইন্স্যুরেন্স সোসাইটির প্রধান কর্মসচিব, কলিকাতা মহানগরীর মিনিস্টার সর্ব্বোপরি আমার আশ্রয় দাদা শ্রীযুক্ত নলিনীরঞ্জন সরকার মহাশয়ের কর কমলে ভক্তিকৃতজ্ঞতার অর্ঘ-স্বরূপ এই গীতি-পুস্থিকা অর্পীত হইল- শরৎ চন্দ্র নাথ।’
উল্লেখ্য ‘দীন শরতের বাউলগান’ গ্রন্থটির ছাপানোর কাজ ভারত থেকেই সম্পন্ন হয়। যে গ্রন্থটি আমার সংগ্রহে আছে। তাতে শেষ পৃষ্ঠায় প্রকাশকাল ‘১৩৫৫ সন ১২ই পৌষ’ উল্লেখ আছে শধু তাই নয় দীন শরৎ চন্দ্র নাথের জন্ম মৃত্যুর সনও উল্লেখ রয়েছে। তবে তাতে প্রথম বা দ্বিতীয় মুদ্রণের মত কোন বিষয় উল্লেখ নেই। দ্বিতীয় গ্রন্থ ‘এস্লাম সঙ্গীত’-এর নির্দ্দিষ্ট প্রকাশকাল জানা যায়নি। জীর্ণ-শীর্ণ গ্রন্থটিতে প্রথম কয়েকটি পৃষ্ঠাসহ ৩৩, ৩৪, ৪১, ৪২, ৯৫ ও ৯৬ পৃষ্ঠাগুলি পাওয়া যায়নি। ১৯৯৭ খ্রিস্টাব্দে কইলাটি নিবাসী সুশীল কুমার বল মহাশয়ের নিকট থেকে প্রাপ্ত মূল গ্রন্থ থেকে ২০১০ খ্রিস্টাব্দে রফিকুল ইসলাম খান অনুলিখিত ‘এস্লাম সঙ্গীত’ কপিতে উল্লেখ আছে গ্রন্থটি (ধারণা মতে) চল্লিশের দশকে প্রকাশিত হয়। গ্রামের প্রত্যক্ষদর্শীদের মতে প্রথম গ্রন্থ ‘দীন শরতের বাউলগান, প্রকাশের পরবর্তি সময়ে তুরুকপাড়ার (এলাকার) মৌলভী সাহেব ও রহমান পিয়ন (এই সময়ে পোস্ট অফিসে চাকুরিরত) নামে দুই সুধীজন গ্রামে গ্রামে সাহায্য তুলে দ্বিতীয় গ্রন্থটি প্রকাশ করেন। এই গ্রন্থটি বাউল দীন শরতকে অন্যান্য বাউলদের থেকে স্বতন্ত্র পরিচয়ে পরিচিত করে তুলে। ‘হকনাম’ ‘অজুদনামা’ ‘রুহুতত্ত্ব’ ‘চাইর কলিমা ও ছয় লতিফার স্থিতি’ ‘নূর ভাগ’ ‘দুজকের বয়ান’ ‘আদমতত্ত্ব’ ‘আজাজিলের জন্মকথন’ ‘মৌতনামা’ ‘নামাজ নামা’ ও ‘আখেরতত্ত্ব’ প্রভৃতি ভাগে ইসলামের মারফতি ধারার বিভিন্ন ব্যাখা বিশ্লেষণ দীন শরৎ চন্দ্র নাথ এ গ্রন্থে তুলে ধরেন। ইসলাম সংগীতে মালজোড়া গানের গুরু শিষ্য ধারা এমনভাবে তাঁর আগে কেউ রচনা করেছেন বলে জানা নাই। শ্রী শ্রী হক নাম শিরোনামে প্রথমেই সৃষ্টিকর্তাকে স্মরণ করে তিনি লিখেছেন-

বন্দি গফুরু রহিম আল্লা আপে নিরঞ্জন
যাঁহার কুদ্রতে পয়দা এ তিন ভুবন ॥

বিশেষ ভাবে রুহুতত্ত্ব, নূরভাগ, আদমতত্ত্ব আজাজিলের জন্মকথন, মৌতনামা ও আখেরতত্ত্বে তিনি বিশ্লেষণসহ মালজোড়া বাউলগানের ধারায় বিষয়গুলো যেভাবে ছন্দলয়ে লিপিবদ্ধ করেছেন তা অসাধারণ ও ভিন্ন সৃষ্টি যা এর আগে এমন ভাবে কেউ করেছে বলে আমার জানা নেই। জটিল বিষয়ের সহজ সমীকরণ তাঁর রচনায় প্রতিফলিত হয়েছে। তাই তাঁর রচনাগুলো গ্রামীণ সরল মানুষের কাছে হয়ে ওঠে আদরের ধন। আর তারই বহিঃপ্রকাশ গ্রামে গ্রামে সাহায্য তুলে বইটি মুদ্রণের ইতিহাস। যে ইতিহাসের গর্বিত নায়ক অবোধ প্রশ্নকর্তা ও সুবোধ উত্তরদাতা বাউল কবি দীন শরৎ চন্দ্র নাথ। যেমন-আদম তত্ত্বে তিনি লিখেছেন,
শিষ্যধারা (প্রশ্ন) :
আদমতত্ত্ব জানবো বইলে বাসনা মনে।
গুরু কও শুনি হে আদম হাওয়ার জন্ম হইল কেমনে।।

গুরুধারা (উত্তর) :
মাটির দেহ হবে মাটি খাটি কিছুই না।
মাটি আদম তৈয়ার করিয়াছেন রাব্বানা।।

কথিত আছে ‘গৌরগীতি’ নামে আরও একটি গ্রন্থের কথা। যা প্রকাশের জন্য কৃষ্টপুরের জমিদার পৃষ্ঠপোষকতা করেছিলেন বলে জানা যায়। তবে এ গ্রন্থের কোন মুদ্রণ কপি পাওয়া যায়নি। প্রশিষ্য সুমঙ্গল শীল বলেন-‘বইটি কৃষ্টপুরের জমিদার ছাপিয়ে দিয়েছেন।’ আবার অনেকের মতে বইটি ছাপানোর কথা ছিল কিন্তু ‘রায়টের’ ফলে তা আর হয়ে ওঠেনি। বিচ্ছিন্নভাবে কিছু গান প্রকাশিত হয়েছে। সজলকান্তি সম্পাদিত ‘দীন শরৎ ও তাঁর গান মানবমঙ্গল’ গ্রন্থে এযাবৎ সংগৃহিত গানগুলো মুদ্রণ হয়েছে। তবে ‘দীন শরতের বাউলগান, গ্রন্থেও গৌরগীতি বিষয়ক বেশকিছু গান রয়েছে যেমন-

ও তুই কি দেখিতে ব্রজধামে যাবে রে নিমাই।
সাধের বৃন্দাবন হইল শূন্য আর তো ব্রজে সেই শোভা নাই ॥

গৌরগীতি বিয়ষক গান যা সংগৃহিত হয়েছে তা আরও পাওয়ার আকাক্সক্ষা জাগায়। কেন্দুয়া নিবাসী রাখাল বিশ্বাস এ নিয়ে কাজ করছেন। তিনি আমাকে বেশ কিছু গান সংগ্রহ করে দেন। তাছাড়াও রতিশাস্ত্র বিষয়ক বেশ কিছু গান তাঁর রয়েছে যা মানবমঙ্গল গ্রন্থে ছাপা হয়েছে। এ নিয়ে সাজিউড়া গ্রামবাসীর সাথে আলাপকালে জানা যায় ‘রাইশ্যাম সঙ্গীত, নামে তাঁর আরও একটি গ্রন্থের কথা। ধামাইল গান তাঁর রচনায় খুব বেশি নেই তবে সূর্যব্রত ধামাইল হিসেবে তার বেশ জনপ্রিয় কয়েকটি গান রয়েছে যা গ্রামীণ সমাজে বিভিন্ন ব্রতানুষ্ঠানে গাওয়া হয়। বিশেষ করে করতাল বাজিয়ে ধর্মব্রত, সূর্যব্রত ও সরস্বতী পূজায় বন্দনা পর্বে একটি গান খুব জনপ্রিয়।
বন্দি গুরু পূর্ণব্রহ্ম রামকৃষ্ণ চরণ
শ্রীগুরু গৌরাঙ্গ পদে লইনু স্মরণ ॥

আশি নব্বইয়ের দশকেও অলস বর্ষায় আলগঘরের আড্ডায় দীন শরতের গান ঘাম ঝড়িয়ে গাওয়া হত। শরতের গুরু শিষ্য ধারায় মালজোড়া বাউল গান শুনতে উৎসুক শ্রোতা মাটি কামড়ে বসে থাকত। গানের মাঝে মাঝে শোনা যেত ভাবের-বাহার, আহা-হা হা! অহ-হ-হ! দেহ নাচাতে নাচাতে শ্রোতাদের ভাব গলে গলে পড়ত তালে তালে। গায়কেরা বাউল হত আর শ্রোতারা বাউলিয়ানায় আত্মমগ্ন হয়ে এক আসরে এক ধারায় মিশে যেত। গানের ভাববোধের সাথে এক হয়ে যেত জনবোধ। শুধু দীন শরতেই নয় আসরে বিভিন্ন জানা অজানা গীতিকারের কোন কোন গান যেন সরাসরি অনেকের জীবনের দুঃখবোধের বেদনার্ত দলিলের মত গ্রহণযোগ্যতা পেত। এক্ষেত্রে একটি গান হচ্ছে-
গুরু উপায় বলো না
জনমদুখী কপাল পোড়া
আমি একজনা ॥
গিয়াছিলাম ভবের বাজারে
ছয় চোরা করলো চুরি
গুরু বাঁধল আমারে,
ছয় চোরায় খালাস পাইলো গো
গুরু আমায় দিল জেলখানা ॥
শিশুকালে মইরা গেল মা
গর্ভে থুইয়া পিতা মইল চোখে দেখলাম না,
আমায় কে করিবে লালন পালন গো
কে দিবে মোর সান্ত¦না ॥
এক সময় এ গানটি পল্লীর জনজীবনে খুবই হৃদয়গ্রাহী ছিল। তার একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ হতে পারে গানটির জীবনঘনিষ্টতা। তৎকালে অস্বাভাবিক জন্ম-মৃত্যুর হার বেশি ছিল। সন্তান গর্ভে রেখে পিতার মৃত্যু এবং শিশুকালে মাতার মৃত্যু ছিল স্বাভাবিক ঘটনা। আর এ দশায় ভূক্তভোগী ছিল বাউল সাধকসহ অনেকেই। তাই তাদেরকেই গীতিকবি ‘জনমদুখী কপাল পোড়া’ বলেছেন। একটু খেয়াল করলে দেখা যায় প্রায় প্রতিটি গ্রামেই এমন ‘জনমদুখী’ দু-একজন ছিল যাদের জীবনে এমন ঘটনাটিই ঘটেছে। তাই হয়তবা এই গানটি পল্লীজীবনে অধিক জনপ্রিয় ছিল এবং আছে। এ গানটি বহুজন বহুভাবে উল্লেখ ও উপস্থাপন করলেও কোথাও এ গানের গীতিকারের প্রমাণ পাওয়া যায়নি। লোকশ্রুতি আছে গানটি দীন শরৎ রচিত। দ্বিমতও আছে অনেক। ‘গুরু উপায় বলো না’ গানটি চিত্রপরিচালক কামাল আহম্মেদ তার বাংলা চলচ্চিত্র ‘পুত্রবধু’-তে প্রথম (সত্তর-আশির দশকে) ব্যাবহার করেন। গানের শিল্পী ছিলেন মলয় কুমার ভৌমিক। যেখানে গানটিতে গীতিকারের নাম উল্লেখ নেই।
তবে এ গানটির রচয়িতা দীন শরৎ চন্দ্র নাথ না হওয়ার বিষয়ে কিছু যুক্তি তোলে ধরা যায় যে, তাঁর সকল গানেই ভনিতা পাওয়া গেলেও এ গানটিতে নেই কেন? আবার বলা যায়, তার প্রথম গ্রন্থ ‘দীন শরতের বাউল গান’ যার পা-ুলিপি তাঁর জীবদ্দশাতেই হস্তান্তর হয়েছিল, এ গ্রন্থে উক্ত গানটি অপ্রকাশিত কেন? এমন কি দ্বিতীয় গ্রন্থ ‘এস্লাম সঙ্গীত’-এ গানটির উল্লেখ নেই। তাছাড়া প্রথম গ্রন্থ ‘দীন শরতের বাউল গান’ (প্রকাশ ১৩৪১ বঙ্গাব্দ)-এ একটি দীর্ঘ ভূমিকায় কামিনীকুমার কর রায় দীন শরতের কতকগুলো গানের উল্লেখ করে মন্তব্য করেছেন যেখান এ গানটির উল্লেখ নেই। অনেক বিজ্ঞজনেই লিখেছেন, দীন শরৎ যখন মাতৃগর্ভে তখন তাঁর পিতা এবং শিশুকালে মাতা মারা যান। টাইফয়েড জ¦রে আক্রান্ত হয়ে তিনি অন্ধ হয়ে যান। তাই এ গানটি দীন শরতের জীবনসঙ্গীত। এক্ষেত্রে বলা যায়- বাউল তৈয়ব আলী (১৮৯৩-১৯৮৭), প্রভাত বাউল (১৯১৮-১৯৭১) ও বাউল খুরশেদ মিয়াসহ (১৯৩০-?) অনেকেই এতদাঞ্চলে অন্ধ বাউল ছিলেন। যাঁরাও অনেক গান রচনা করেছেন। যেখানে এ গানটি তাদেরও জীবন সংগীত হওয়ার দাবী রাখে। তাছাড়া অন্ধত্বের সাথে এ গানটির গাথুনি তৈরির কোন যুক্তি আসে না। কেননা এখানে গানের ভাবধারায় অন্ধত্বের বিষয়টি প্রমাণ করে না। দীন শরৎ অন্ধ ছিলেন এ প্রসঙ্গে কামিনী কর রায় যিনি দীন শরতের সঙ্গ (১৯৩৪ খ্রিষ্টাব্দের আশ্বিন) করেছেন, তার ভূমিকায় দীন শরতের অন্ধত্বের বিষয়টি না থাকা খুবই অস্বাভাবিক ও অবিশ্বাস্য। তাই দীন শরৎ ‘অন্ধ’ এ প্রচলিত সত্যটি এবং এই সত্যের কথিত দলিল হিসেবে গানটির বহুবিধ ব্যবহার পুনঃপর্যালোচনার দাবী রাখে।
১. দীন শরৎ চন্দ্র নাথের রচনায় তাঁর জীবনের অনেক তথ্য পাওয়া গেলেও অন্ধত্বের কথা কোথাও উল্লেখ নেই।
যেমন:
বিদ্যাবুদ্ধিহীন আমি অত্যন্ত দরিদ্র।
মনুষ্যের মধ্যে হই ক্ষুদ্রদপি ক্ষুদ্র ॥
ক্ষুদ্রের ভিতরে যাহা ক্ষুদ্রমক্তি আছে
প্রকাশ করিতে নাহি পারি লোকের কাছে ॥
২. দীন শরৎ চন্দ্র নাথের ঘনিষ্টজন কামিনী কর রায়ের লেখায় অন্ধত্ব ও অন্ধত্বের দাবী নির্ভর গানটির কথা উল্লেখ নেই।
৩. সাজিউড়া গ্রামের বাসিন্দা দীন শরতের প্রতিবেশি প্রত্যক্ষদর্শী প্রশিষ্য সুমঙ্গল শীল (৯৪), প্রতিবেশী সুলতান উদ্দিন ফকির (৯০), ভূপালকৃষ্ণ সরকার (৮৬) ও হারান দেবনাথ (৮৯) এর সাথে সাক্ষাৎ করলে (২০১৭ খ্রিস্টাব্দ) তারা দীন শরতের অন্ধত্বের কথাটি সম্পূর্ণ বানোয়াট ও ভুল বলে জানান। তাছাড়া যে সকল লেখক বা গবেষক শরৎ চন্দ্র নাথের ভিক্ষাবৃত্তি ও দীনমজুরীর বিষয়টি তাঁদের রচনায় প্রচার করেছেন তাঁদের প্রতিও প্রত্যক্ষদর্শীরা নিন্দা জ্ঞাপন করেন।
তবে তাঁর জন্ম মৃত্যুর নির্দিষ্ট বছর মাস দিন ক্ষণ না বলতে পারলেও গ্রামের প্রত্যক্ষদর্শী প্রশিষ্য সুমঙ্গল শীল, প্রতিবেশি ভূপালকৃষ্ণ সরকার, হারান দেবনাথ ও সুলতান ফকিরে সাথে সাক্ষাৎ (২০১৭ খ্রিস্টাব্দ) করলে তারা যে ধারণা দেন তাতে ১২৯৪-১৩৪৮ বাংলা সনটিই যুক্তিযুক্ত।
তাছাড়া ভূপালকৃষ্ণ সরকার ৩রা আশ্বিন ১৪০২ বাংলায় একটি চিঠি লিখে নেত্রকোনা জেলার ধীতপুর গ্রামের ডাঃ দিগেন্দ্র চন্দ্র সরকার (সুন্দরদা, গীতিকার)-কে জানিয়েছিলেন-‘…দীন শরৎ দেবনাথের পিতার নাম কুটীশ্বর দেবনাথ। তাহার জন্ম তারিখ জানা নেই তবে ব্রিটিশ পিরিয়ডের শেষ সময়ে মৃত্যুবরণ করেছেন।’ তাছাড়া দীন শরৎ নাথের প্রথম গ্রন্থ ‘দীন শরতের বাউল গান’-এ ১২৯৪-১৩৪৮ বাংলা সনটি মুদ্রিত আছে যার সচিত্র সংযোজন হল। স্থানীয় দৈনিক জনতা (২ মে ২০০৪) পত্রিকাতেও উক্ত সালকেই তাঁর জন্মমৃত্যু হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। যা নিয়ে ভ্রান্ত ধারণার আর সুযোগ থাকে না। তাই একথা বলা যেতে পারে দীন শরৎ চন্দ্র নাথ ১২৯৪ বাংলা (১৮৮৭ খ্রিস্টাব্দে) জন্ম গ্রহণ করেন এবং ১৩৪৮ বাংলা (১৯৪১ খ্রিস্টাব্দে) মৃত্যুবরণ করেন। যদিও অনেকের মতে তিনি ১৩১০ বাংলা (১৯০৩ খ্রিস্টাব্দে) জন্মগ্রহণ করেন এবং ১৩৭০ বাংলা (১৯৬৩ খ্রিস্টাব্দে) মৃত্যুবরণ করেন। উল্লেখ্য সুমঙ্গল শীল তাঁর দাদাগুরু শরৎ চন্দ্র নাথের জন্মমৃত্যু ও অন্ধত্ব নিয়ে এই তথ্যবিকৃতি ও মিথ্যা গল্প রচনার প্রেক্ষিতে মনের দুঃখে একটি গানও রচনা করেছেন।
দীনবন্ধু কৃপাসিন্ধু দীন শরতের রাখো মান
চোখ থাকিতে অন্ধ বানায় কেন এত অসম্মান ॥
আসল তথ্য না জানিয়া কল্পনায় গল্প সাজাইয়া
অন্ধ ভিক্ষুক মুর্খ কইয়া কেন করছেন অপমান ॥
সঠিক তথ্য প্রমাণ নিয়া যত পারেন যান লিখিয়া
শান্তি পাবে শরৎ হিয়া লেখকেরও বাড়বে মান ॥
আমি সাজিউড়ার সন্তান আরেকজন হয় ফকির সুলতান
গোপালকৃষ্ণ হারাণ নাথের বয়স প্রায় সমান সমান ॥
বাউল সাধক শরৎ নাথে গান লিখেছেন নিজের হাতে
দেখেছি তা স্বচোখেতে চারজন আছি বর্তমান ॥
আধ্যাত্বিক এই বাউল সাধক কৃষিকাজেও ছিলেন স্বার্থক
ছিল না তাঁর অর্থ সম্পদ অক্ষরজ্ঞানে গুণবান ॥
সুমঙ্গল দিয়েছে প্রমান আরও যদি জানতে চান
কৃপাকরে জানিয়া যান দীন শরতের জীবনমান।

৬.
দীন শরৎ চন্দ্র নাথ নিয়ে আমার জানা মতে আশির দশক থেকে এ যাবৎকাল যে সব কাজ হয়েছে তা তাঁর গানগুলো রক্ষায় বিশেষ অবদান রাখলেও তাঁর ব্যক্তি জীবনের পরিচয়কে করেছে অনেকাংশে খ-িত ও প্রশ্নবিদ্ধ। তবে আশার কথা পল্লী হৃদয়ে ধারণ করা তাঁর সৃষ্টিগুলি অন্বেষণে আজও একদল মরিয়া হয়ে কাজ করে যাচ্ছে। বর্তমানে বাউল শিল্পীদের সহজভাবে জীবন যাপনের সামাজিক প্রেক্ষাপট নেই বললেই চলে। মাধুকরী এখন চাঁদা আদায়ের মত। ‘অতিথরূপে নারায়ণ’-কথাটির বিশ্বস্ততা ও যথার্থতা বর্তমান জনজীবনের চেতনাশক্তিতে আগের মত নেই। অতিথসেবা এখন-‘নগদরূপে নারায়ণ’। তাই ভবগুরে, বাউন্ডুলে, যাযাবর, বৈষ্ণব ও বাউল ফকিরগণের মাধুকরী জীবনের নীতিধর্মস্বভাবে পরিবর্তনের হাওয়া বইছে। বাউলধারাকে কেন্দ্র করে কিছু বাউলগান গায়ক, বাউলগান লেখক ও বাউল বেশকের উদ্ভব হয়েছে যারা নিজেদেরকে বাউল বলে পরিচয় দেয়। শুধু তাই নয় তারা বাউলরাজা, ভাবরতœ ও বাউলস¤্রাট উপাধিতে খ্যাত হয়। এ পদবীদাতারা বাহ্যিক বাউলে বিশ্বাসী বলেই পদতলে পদবী অঞ্জলি দেন। অন্তরসত্য প্রেমধারায় তাদের আসা-যাওয়া নেই। আসল বাউল অক্ষরজ্ঞানের ধার ধারে না। তাঁরা জাত পাতহীন, পুঁথিনির্ভর ভাব তাঁদের নেই। তাই তাঁদের বেদ কোরআন ত্রিপিটক ও বাইবেলের মত পুঁথিশ্রাস্ত্রও নেই। ফলে পুঁথিবীদগণ (পুঁথিবাদীগণ) ‘পুঁথিয়া’ বাউলের সন্ধান জানলেও ‘অপুঁথিয়া’ বাউলের সন্ধান জানেন না। আর জানলেও রাং-এর দরেই সোনা চেনেন। তাই ‘অপুঁথিয়া’ বাউলদের জানতে হলে মাটির ডেরায় মানুষের সন্ধানেই আত্মমগ্ন হতে হয়। দীন শরৎ এর জিজ্ঞাসা ও অনুসন্ধানের মিলিত সাধনা এই পুঁথিবাদীদের জটিল ও অর্থহীন বন্ধন ছিন্ন করে হয়ত আমাদের সহজ মানুষের সরল দর্শনে দীক্ষিত করবে আর এ মানবমঙ্গলের আশায় দীন শরতের রচনাগুলি উৎসর্গ হয়ে থাকুক।
(লেখক: হাওর গবেষক)

তথ্যসূত্রঃ দৈনিক সুনামগঞ্জের খবর

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে