ডায়াবেটিসে করণীয়

0
32

ডায়াবেটিসে খাদ্য তালিকা।।Diabetic Food Chart

সম্প্রতি বাংলাদেশসহ বিশ্বে প্রতি সাত সেকেন্ডে একজন মানুষ ডায়াবেটিস রোগে আক্রান্ত হচ্ছে। জাতীয় জনসংখ্যা গবেষণা ও প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠান (নিপোর্ট)-এর একটি জরিপে দেখা গেছে, বাংলাদেশে মোট ডায়াবেটিস আক্রান্ত মানুষের সংখ্যা এক কোটি ১০ লাখ। এদের মধ্যে ১৮ থেকে ৩৪ বছর বয়সীদের সংখ্যা ২৬ লাখ আর ৩৫ বছরের বেশি বয়সীদের সংখ্যা
৮৪ লাখ (তথ্যসূত্র বিবিসি)।আরেক গবেষণায় দেখা গেছে দেশের ৫০-৬০ ভাগ রোগী জানেই না যে সে ডায়াবেটিসে আক্রান্ত! এমতাবস্থায় বিভিন্ন বয়সী মানুষের যাদের ডায়াবেটিসের বিভিন্ন উপসর্গ যেমন বার বার গলা শুকিয়ে যাওয়া,অধিক পানি পান করা,বার বার প্রশ্রাব করা,শরীর দুর্বলতা ইত্যাদি দেখা গেলে দ্রুত ডায়াবেটিস চেক করিয়ে নেয়াই উত্তম।সাধারনত ডায়াবেটিসের মাত্রা ৬.৫ এর উপরে দেখা গেলেই স্বাভাবিক অর্থে ডায়াবেটিস হয়েছে ধরে নিয়ে খাদ্যাভ্যাস পরিবর্তন করা জরুরী,যদিও ৬.৫- ৮ পর্যন্ত মাত্রাটিকে চিকিৎসাবিদরা প্রি-ডায়াবেটিস স্থর বলে উল্ল্যেখ করেন অনেকে।তবে এই স্থরের রোগীদের অনেকেই শুধু মাত্র খাদ্যাভ্যাস পরিবর্তন এবং বিভিন্ন শারীরিক ব্যায়াম করেই কোন প্রকার ওষুধ সেবন না করেই নিজেকে সুরক্ষিত করতে পারেন।৮ মাত্রার বেশি হলে নিশ্চিতভাবেই তিনি ডায়াবেটিস রোগী এবং অতিদ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী চিকিৎসা এবং খাদ্যাভ্যাস পরিবর্তন করে আহার করতে হবে।ডায়াবেটিস হচ্ছে নিরব ঘাতক।বলা হয়ে থাকে ডায়াবেটিস কোন রোগ নয় তবে তা সর্ব রোগের কারণ।ডায়াবেটিসের মাত্রা বাড়লে কিডনী,হার্ট এমনকি চোখ পর্যন্ত বিকলাঙ্গ হতে পারে।তাই কখনই ডায়াবেটিসকে অবহেলা করার সুযোগ নেই।তাই আজকে আমার আলোচ্য বিষয় ডায়াবেটিসের খাদ্য তালিকা।নিচে একটি খাদ্য তালিকা আপনাদের জ্ঞাতার্থে দেয়া হলো।এখানে মূলত কোন খাদ্যে ১০০ গ্রাম পরিমানের মধ্যে কি পরিমান শর্করা অর্থাৎ কার্বোহাইড্রেট আছে তার পরিমাপ দেয়া হয়েছে।আপনারা এই পরিমান দেখে নিজের মতো করে পছন্দ করে খাবার খেতে পারবেন।তবে খাবার আগে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়ে প্রতিটি উপাদানের ক্যালরিটা খেয়াল করেও খাবেন কারণ অতিরিক্ত ক্যালরি কোলেস্টল বৃদ্ধিতে সহায়ক।আর কোলেস্টরল বৃদ্ধি ডায়াবেটিস রোগীদের জন্য মহাবিপদ সংকেত।তবে যাই খান না কেন অতিরিক্ত কোন কিছুই খেতে পারবেননা কারণ শুধু শর্করার পরিমান দেখলেই হবেনা সেই সাথে অধিক ক্যালরিযুক্ত খাবার ও সীমিত খাবারের বিষয়টাও বিবেচনায় রাখতে হবে।অর্থাৎ মনে রাখবেন ডায়াবেটিসে খাবার হবে একেবারেই পরিমিত। তাহলে কথা না বাড়িয়ে চলুন বন্ধুরা দেখে নেয়া যাক তালিকাটি…

(নিচে প্রতি ১০০ গ্রাম খাদ্যে শর্করা(রক্তে গ্লুকোজ বৃদ্ধিকারী প্রধান উপাদান) পরিমান ব্র্যাকেটে দেয়া হয়েছে)

যা খেতে পারবেন

১। ডিম (১.১২ গ্রাম,সাদা অংশে ১ গ্রাম- সাদা অংশে ১৭,পুরো ডিমে ৭২ক্যালরি)
২। দুধ (প্রাকৃতিক)( ৪.৪ গ্রাম- ৬৫.৩)
৩। টক দই (প্রাকৃতিক)(৪.৭ গ্রাম-২৫৭-)
৪। বেগুন (৫.৮ গ্রাম- ২৫ ক্যালরি )
৫। টমেটো (৩.৯ গ্রাম-২০ক্যালরি)
৬। লাল শাক(৪.৯৬ মি. গ্রা.- ৪৩ কিলোক্যালরি)
৭। মুলা (৬.৮ গ্রাম-১৬ ক্যালরি)
৮। ফুল কপি (৫ গ্রাম- ২৫ ক্যালরি)
৯। ব্রোকলি (আধ কাপে ৩ গ্রাম- ৩১ ক্যালরি)
১০। বাঁধাকপি(৫.৮ গ্রাম- ২২ ক্যালরি)
১১। কচু (৬.৮ গ্রাম-৭৭ কিলোক্যালরি)
১২।কাঁকরোল (৭.৭ গ্রাম-১৭ ক্যালরি)
১৩। গাজর (১২.৭ গ্রাম- ৫৭ ক্যালরি)
১৪। মিষ্টিকুমড়া(মিষ্টি লাউ) ( ৩.৪ গ্রাম)(২৬ ক্যালরি)
১৫। করলা (৪.৩ গ্রাম-১৭ কিলো ক্যালরি)
১৬। ডাবের পানি (২.৭ গ্রাম-১৬.৭ ক্যালরি)
১৭৷ পাতি লাউ (২.৫ গ্রাম-১৫ ক্যালরি)
১৮। চাল কুমড়া (৩ গ্রাম-৩০ ক্যালরি)
১৯। তরমুজ (৬ গ্রাম-১৫৪ ক্যালরি)
২০। লাল শাক (৫ মিলিগ্রাম-২৩ ক্যালরি)
২১। পালং শাক (২.৮ গ্রাম-২৩ ক্যালরি)
২২। পুঁই শাক (৪.২ গ্রাম-২৭ ক্যালরি)
২৩। বথুয়া শাক (২.৯ গ্রাম-২৫ ক্যালরি)
২৪। পেঁপে ( ৭.২ গ্রাম-৩২ কিলোক্যালরি)
২৫। জলপাই (৯.৭ গ্রাম-১৪৬ কিলোক্যালরি)
২৬। সরিষা (৭.৮ গ্রাম- ১ চামচে ১২৬ ক্যালরি)
২৭। রুই মাছ (৩.৪ গ্রাম- ৯৭ ক্যালরি)
২৮। মলা মাছ (৩.১ গ্রাম-১০৬ ক্যালরি)
২৯। ট্যাংরা মাছ (৩.১ গ্রাম-১৪৪ ক্যালরি)
৩০। সকল ছোট মাছ (২-৩.৫ গ্রাম-১০৬ ক্যালরি)
৩১। কাতলা মাছ (২.১ গ্রাম-১০৫ ক্যালরি)
৩২। ডাটা শাক(ডেংগা শাক)- (১.৮ গ্রাম,-২৩ কিলোক্যালরি)
৩৩। সকল মাংসে (২.১ – ৪ গ্রাম- ১৫০-২০০ কিলোক্যালরি)
৩৪। কমলা লেবু (১৩ গ্রাম-৪৯০ ক্যালরি)
৩৫। মাল্টা (১ টিতে-১২ মিলিগ্রাম- ২০০ কিলোক্যালরি))
৩৬। কলা (১৪ গ্রাম-৮৯ ক্যালরি)
৩৭। পেঁয়ারা (৫গ্রাম-৬৮ ক্যালরি)
৩৮। স্ট্রবেরি (৭ গ্রাম ৩০ ক্যালরি)
৩৯। আনারস(১৩.২ গ্রাম-৫০ ক্যালরি)
৪০। লেবু(৮.৫ গ্রাম-২৯ ক্যালরি)
৪১। শশা(৩.৫ গ্রাম-২২ কিলোক্যালরি)
৪২। শালগম(৬.২ গ্রাম)
৪৩। খেঁজুর(৭৫ মিলিগ্রাম)
৪৪। কামরাঙ্গা(৫.১ গ্রাম)
৪৫।আমড়া(৫ গ্রাম)
৪৬। তেঁতুল(১৩.৯ গ্রাম)
৪৭। জাম্বুরা(৮.৫গ্রাম)
৪৮। ডালিম(১৪.৫ গ্রাম)
৪৯। ড্রাগনফল (১১ গ্রাম)
৫০। চিচিঙ্গা(৩.২-৩.৭ গ্রাম)
৫১। ঝিঙ্গা(৪.৩ গ্রাম)
৫২। বরবটি (৯ গ্রাম)
৫৩। ডিমের কুসুম (৩.৫৯ গ্রাম)
৫৪। সীম( ৬.৭ গ্রাম)
৫৫। সীমের বিচি(৬.৭ গ্রাম)
৫৬। পেঁয়াজ (৯.৩৪ গ্রাম)
৫৭। কলমিশাক(৩.১৪গ্রাম- ৩০ কিলোক্যালরি)
৫৮। পটল(৪.১ গ্রাম)
৫৯। ঢেঁড়স (৮.৭ গ্রাম)
৬০। ঝিঙ্গা(৪.৩ গ্রাম)
৬১৷ ধুন্দল (পুরল)(৪.৪ গ্রাম)
৬২। আমলকি(০.২গ্রাম-৭০ কিলোক্যালরি)

যা অবশ্যই খাবেন (রক্তের শর্করা কমায়)

১। পর্যাপ্ত পানি
২। লেবুর রস
৩। দারুচিনি
৪।ধনে পাতার রস
৫। তুলসী পাতার রস
৬। কাঁচা হলুদ

যা পরিমিত খাবেন

১। ভাত (৭৭গ্রাম)
২। গম (৭১.২ গ্রাম)
৩। রুটি (৭১.২ গ্রাম)
৪। আলু( ২২.৬ গ্রাম- ৮০ ক্যালরি)
৫। ভুট্টা (১৯ গ্রাম)
৬। চিড়া (৭৭.৩ গ্রাম)
৭। মুড়ি (৮৯.৮ গ্রাম)
৮। আম (২৪ গ্রাম)
৯। কাঁঠাল (২৪ গ্রাম)
১০। বরই (২৩.৮ গ্রাম)
১১। আঙ্গুর (১৮.১ গ্রাম)
১২। আপেল (১৩.৮১ গ্রাম)
১৩। আতাফল (২৫ গ্রাম)
১৪। মসুর ডাল (৫৯ গ্রাম)
১৫। ছোলা বা বুটের ডাল (৬৪গ্রাম)
১৬। ছানা বুট (৬১ গ্রাম)
১৭। মুগ ডাল (৬৩ গ্রাম)
১৮। মাসকলাই ডাল( ৫৯.৬ গ্রাম)
১৯। সয়াবিন (৩০ গ্রাম)
২০।বাদাম (২১ গ্রাম)
২১। কলা (২৫ গ্রাম)
২২। আঁখ (২৫০-ml-30g)
২৩। আতপ চাল (৩১ গ্রাম)
২৪। সিদ্ধ চাল (২৬ গ্রাম)
২৫। নাশপাতি (২৩ গ্রাম)
২৬। তরমুজ (১৭ গ্রাম)
২৭।কালোজিরা (৩৮ শতাংশ)
২৮। তিসি(২৮.৮৮ গ্রাম)
২৯। আঁদা(১৭.৮৬ গ্রাম)
৩০। কাঁচা মরিচ(২৩.৭ গ্রাম)
৩১।লিচু (১৬.৫ গ্রাম)
৩২।রসুন (৩৩.৬ গ্রাম)
৩৩। মুখি কচু(৩২.৪গ্রাম- ২৬৬ লোক্যালরি)
৩৪। কচুর লতি (৮.১ গ্রাম- ৭৭ কিলোক্যালরি)

যা অবশ্যই এড়িয়ে চলবেন

১। বিভিন্ন প্রকার মিষ্টি
২। জিলাপি
৩। চিনি মিশ্রিত কৃত্রিম দই
৪।টাইগার(পানীয়)
৫। স্পীড(পানীয়)
৬। সেভেন-আপ(পানীয়) সহ সকল প্রকার ড্রিংকস
৭।তেলে ভাজা বাজারি খাদ্য
৮। সকল প্রকার ফাস্টফুড ইত্যাদি।
৯।লবন( প্রেশার বৃদ্ধি করে)
১০। সিঙ্গারা,সমুচা,পাটিসাপটা(যদিও এগুলো ফাস্টফুড তবে সাধারণের বুঝার জন্য উল্যেখ করা)
১১। বিড়ি,চুরুট,মদ,গাঁজা সকল প্রকার মাদক
১২।চিনি (৯৯.৯৮ গ্রাম) সম্পূর্ণ নিষেধ
১৩। সিরাপ জাতীয় ওষুধ(চিনি থাকে এগুলোতে)
১৪। ময়দা ও ময়দা তৈরী রুটি,পরোটা
১৫। গ্লুকোজ

ডায়াবেটিসের সুপার ফুড অর্থাৎ ডায়াবেটিস প্রতিরোধকবা ডায়বেটিসের যম হিসেবে পরিচিত যেসব খাবার তা নিচে প্রদত্ত হলো। এগুলো মূলত প্রাকৃতিক ইনসুলিন হিসেবে পরিচিত।প্রতিদিন এগুলো খেলে আশা করা যায় অনেকেরই ইনসুলিন এমনকি কোন ওষুধ ছাড়াই সুগারের মাত্রা নিয়ন্ত্রণে থাকবে।

১। লেবু ২। আমলকি ৩। হরতকি
৪। করলা ৫। দারুচিনি ৬। লালশাক ৭।শশা
৮। আমড়া ৯। রসুন ১০। পেঁপে(কয়ফল)

বন্ধুরা,এই তালিকা বাদেও আরো অনেক খাবার আমরা খাই যা এখানে নেই।আশা করি আরো খাবারের তথ্য পেলে আমি অবশ্যই লিস্টে এড করবো।এই লিস্ট ছাড়াও আপনারা চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী অথবা গ্লাইসেমিক চার্ট অনুসারে যাদের গ্লাইসেমিক ইন্ডেক্স ৫০ বা ৫০ এর নিচে এই খাবার গুলো পরিমিত ভাবে খেতে পারবেন।

আর আপনার ডায়াবেটিসের মাত্রা প্রতিদিন চেক করার জন্য একটি ডায়াবেটিসের মেসিন কিনে নিয়মিত চেক রাখবেন,সাথে বিপি,স্ট্যাথোস্কোপ রাখলে আরো ভালো কারন ডায়াবেটিসের রোগীদের নিয়মিত প্রেশার আপ-ডাউন করে তাই প্রেসার না মেপে কখনো প্রেশারের বড়ি খেতে যাবেননা।এছাড়া মাঝে মাঝে দৈনিক গড় সুগারের পরিমানটা বুঝার জন্য RBS(Random Blood Sugar) টেস্ট করে দেখে সতর্ক হতে পারেন,এছাড়াও তিনমাসের গড় সুগার পরিমাপ বুঝার জন্য HbA1c নামে একটি হিমোগ্লোবিন টেন্ট আছে ওটা করালে আপনার ডায়াবেটিক কন্ডিশন বুঝতে আরো সহজ হবে।ডায়াবেটিসের সাথে কোলেস্টরল বৃদ্ধি খুব স্বাভাবিক বিষয় তাই মাঝে মাঝে Lipid Profile Fasting নামে একটি টেস্ট আছে সেটি করালে আপানার শরীরের HDL(ভালো কোলেস্টরল), LDL(খারাপ কোলেস্টরল) সহ মানব জীবনের চার ধরণের কোলেস্টল বিস্তারিত পেয়ে যাবেন এবং তদানুযায়ী ব্যবস্থা নিয়ে সুস্থ থাকতে পারবেন।প্রয়োজন সাপেক্ষে ডাক্তারের পরামর্শ অনুযায়ী ইনসুলিন নিতে পারেন বা বড়ি সেবন করতে পারেন।মনে রাখবেন ডায়াবেটিসে আতংক নয় সচেতনতা দরকার।তাহলে সুস্থ জীবন যাপন সম্ভব।

তাহলে আজ এ পর্যন্তই।আশাকরি আজকের লেখাটিতে আপনারা নিশ্চিত উপকৃত হবেন।আপনারা সুস্থ থাকুন,সুন্দর থাকুন এই প্রত্যাশা সবসময়।

লেখক

জীবন কৃষ্ণ সরকার
কবি ও প্রাবন্ধিক

তথ্যসূত্রঃ বিবিসি বাংলা,কালের কণ্ঠ,প্রথম আলো সহ বিভিন্ন নিউজ মিডিয়ায় বিশেষজ্ঞ ডাক্তারের পরামর্শ।

বিঃদ্রঃ লেখাটিতে অনেক পত্রিকা থেকে তথ্য সন্নিবেশিত হয়েছে।কোন তথ্য ভুল বা সন্দেহজনক মনে হলে আমাকে নক দিবেন, আমি দ্রুত তা ঠিক করে নেবো।লেখাটি শেয়ার করে ছড়িয়ে দিন,মানুষের কাজে লাগতে পারে তবে কপি করবেননা আশাকরি।

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে