অম্বুবাচী কী?

0
196

অম্বুবাচী কি ?

অম্বুবাচী শব্দের অর্থ
অম্বুবাচী কথাটি এসেছে সংস্কৃত শব্দ ‘অম্ব’ ও ‘বাচি’ থেকে । ‘অম্ব’ শব্দের অর্থ হলো জল এবং ‘বাচি’ শব্দের অর্থ হলো বৃদ্ধি । অতএব গ্রীষ্মের প্রখর দাবদাহের পর যখন বর্ষার আগমনে ধরিত্রী সিক্ত হয় এবং নবরূপে বীজধারণের যোগ্য হয়ে ওঠে সেই সময়কেই বলা হয় অম্বুবাচী ৷

ধর্মের আচরণীয় বিভিন্ন ব্রতের মধ্যে অম্বুবাচী একটি অন্যতম ব্রত। সনাতন ধর্মে প্রচলিত আচার অনুষ্ঠানগুলোকে কয়েকটি ভাগে ভাগ করা যায়।

যেমন-
★দেশাচার [দেশ ভেদে পালনীয় অনুষ্ঠান]
★ কুলাচার [বংশ পরম্পরাগত কিছু নিয়ম]
★বেদাচার [বেদ ও শাস্ত্রীয় নিয়ম]
★ স্ত্রী আচার [শুধুমাত্র নারীদের জন্য এবং নারীদের দ্বারা
পালনীয় নিয়ম]
★ লোকাচার [প্রাচীন জনসাধারণের দ্বারা কৃত কিছু নিয়ম]
ইত্যাদি।

#অম্বুবাচী হলো এক ধরনের দেশাচার বা লোকাচার/লৌকিক অনুষ্ঠান। আষাঢ় মাসের মৃগশিরা নক্ষত্রের তৃতীয় পদ শেষ হলেই অর্থাৎ চতুর্থ পদের শুরু থেকে ৩ দিন অম্বুবাচী আচার বা ব্রত পালন করা হয়।

অম্বুবাচী বিভিন্ন আঞ্চলিক ভাষায় অমাবতি নামেও পরিচিত।
আমাদের সনাতন শাস্ত্রে পৃথিবীকে মাতৃস্বরুপে সম্মান করা হয়। #বৈদিক_শাস্ত্রে ধরণীকে মা বলা হয়েছে।

ধরনী আমাদের মাতা। কারণ এই ধরণীর বুকেই আমাদের জন্ম। শুধু আমাদের কেন- বৃক্ষ, লতা, গুল্ম, ফুল, পশু, পাখী, কীটপতঙ্গ এক কথায় সবাই আমরা পৃথিবীর সন্তান।

মহাজাগতিক ধারায় পৃথিবী যখন সূর্যের মিথুন রাশিস্থ আদ্রা নক্ষত্রে অবস্থান করে সেদিন থেকে বর্ষাকাল শুরু হয়। শাস্ত্রমতে ধরণী মৃগশিরা নক্ষত্রের চতুর্থ পদে ঋতুমতী হন।

মেয়েরা ঋতুবতী বা রজঃস্বলা হলে যেমন সন্তান ধারণে সক্ষম হন। ঠিক তেমনি প্রতিবছর অম্বুবাচীর এই তিন দিনকে পৃথিবীর ঋতুকাল ধরা হয়। ধরণীমাতা ঋতুমতী বা অম্বুবাচীর পর শস্য শ্যমলা হয়ে ওঠেন।

প্রচলিত ধারা অনুযায়ী এই তিন দিন জমিতে কোন চাষ করা হয়না। মৃত্তিকা খুঁড়া হয়না। নতুন মাটির চুলা তৈরী কিংবা অগ্নি প্রজ্জ্বলিত করা হয়না। অর্থাৎ ধরণীমাতা কষ্ট পান এমন কোন কাজ করা হয়না।

বর্ষায় সিক্তা পৃথিবী নতুন বছরে নতুন ফসল উৎপাদনের উপযোগী হয়। উর্বরতা কেন্দ্রিক কৃষিধারায় নারী এবং
ধরিত্রী সমার্থক বলে গণ্য করা হয়। আষাঢ় মাসের শুরুতে পৃথিবী বা বসুমতি মাতা যখন বর্ষার নতুন জলে সিক্ত হয়ে ওঠে তখন তাকে ঋতুমতি নারী রূপে গণ্য করা হয় এবং শুরু হয়
অম্বুবাচী প্রবৃত্তি, তার ঠিক তিন দিন পরে সেটা শেষ হয়, সেটা হল অম্বাবাচি নিবৃত্তি।

এই নিবৃত্তির পরই প্রাচীন কালে জমি চাষ করত কৃষকেরা এখনও বিভিন্ন জায়গায় এই নিয়ম রক্ষা হয়। ভারতের বিভিন্ন জায়গাতে এটা রজোৎসব নামেও পালিত হয়। আসামের
কামরূপে কামাখ্যা দেবীর মন্দির এই তিনদিন বন্ধ থাকে। তবে মন্দির প্রাঙ্গনে বিভিন্ন অনুষ্ঠানকার্য চলে।

এই তিন দিনে প্রতিহিন্দু ঘরে সবাইকে আম ও দুধ খেতে দেয়া
হয়। প্রচলিত বিশ্বাস অনুযায়ী সাপের ভয় নিবারণের জন্য-ই নাকি এই দুধ ও ফল খাওয়ানোর ব্যবস্থা। তবে এই তিনদিন আম দুধ খাওয়া কেবল লোকিক আচার, ধর্মীয় কোন কারণে নয়।

প্রতি বছর আষাঢ় এর ৭ তারিখে এই অম্বুবাচী শুরু হয় এবং ১০ তারিখে শেষ হয়। আমি আবারও বলছি- এটা আসলে হিন্দুদের একটা লৌকিক আচার। এর সাথে ধর্মের সরাসরি কোন সম্পর্ক নেই। প্রাচীন লোকের বিশ্বাসের উপর ভিত্তি করে যুগ যুগ ধরে এই অনুষ্ঠান চলে আসছে।

এই আচারের মূল্য এই যে, হিন্দু চিন্তাবিদগণ কিছু বিশেষ নিয়ম ও আচারের মাধ্যমে সমাজের জীবনব্যবস্থায় একটি উন্নত
আবহাওয়া ও জলবায়ুগত চিন্তার উপহার দিয়েছেন।

অম্বুবাচীর ৩ দিন ধরণীমাতা কষ্ট পান এমন কোন কাজ করা যাবেনা। তবে এই অম্বুবাচীর নামে আমরা এখনো অনেকেই কুসংস্কারের মাঝে অবস্থান করছি। আমি বরাবরই কুসংস্কারের বিরুদ্ধে কথা বলি। অম্বুবাচীতে অনেকেই ঠাকুর সেবা অর্থাৎ নিত্য কর্ম বন্ধ করে দেন। ঠাকুর সেবা পূজা করেন না। গীতা, ভাগবত, চৈতন্যচরিতামৃত ইত্যাদি গ্রন্থ পর্যন্ত অধ্যয়ন করেন না। অনেকেই অম্বুবাচীর জন্য হরে কৃষ্ণ মহামন্ত্র জপ পর্যন্ত বন্ধ করে দেন, যা সত্যি দুঃখজনক।

#অম্বুবাচীতে_একাদশী_পড়লে_করা_যাবেনা_এটা_সম্পূর্ণ কুসংস্কার। ঠাকুর সেবা বন্ধ রাখতে হয়; এটাও কুসংস্কার।

#মনে_রাখা_আবশ্যক-
অম্বুবাচীতে নিত্য কর্ম কোন মতেই বন্ধ করা যাবেনা। নিত্য কর্ম চলবে। একাদশীও নিত্য কর্মের অংশ।

অম্বুবাচীতে বিধবা মায়েরা অর্থাৎ যারা সব সময় সাত্ত্বিক আহার গ্রহণ করে ব্রহ্মচর্যব্রত পালন করেন, তারা ৩ দিন পারমার্থিক কল্যাণের জন্য মৃত্তিকায় শয়ন করে অগ্নিপ্রজ্জ্বলিত কোন খাদ্যদ্রব্য গ্রহণ না করে ফলমূল গ্রহণ করে ব্রত করেন।

কিন্তু এটা বাধ্যতামূলক করতে হবে এমন কোন কথা নয়। এটা প্রত্যেকের ব্যক্তিগত বিষয়। আমরা এখনো অনেকেই শাস্ত্রের দোয়াই দিয়ে বিধবাদেরকে শোষণ করছি। সতী দাহের নামে কঠিন ফাঁদে কত বিধবাদের অতীতে আমরা ফেলেছি। জ্বলন্ত চিতায় বিধবা নারীর আর্তচিৎকারে আকাশ বাতাস প্রকম্পিত হলেও তৎকালীন ধর্মান্ধ সমাজপতিদের হৃদয়ে আঘাত হানেনি। অবশেষে রাজা রামমোহন রায়ের ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় এই করুণ বিদারক সতীদাহ প্রথা দূর হয়েছিল

সনাতন শাস্ত্রের বেদ তথা বিভিন্ন উপনিষদ বিধবাদের পুনঃ বিবাহ গ্রহণের অনুমতি দিয়েছেন। সমাজ সংস্কারক ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর বিধবা বিবাহের জন্য কঠোর সংগ্রাম করেছিলেন। সমকালীন হিন্দু সমাজ তাঁকে মেরে ফেলার চেষ্টা করেছিল। অবশেষে তিনি সফল হয়েছিলেন। নিজ পুত্র নারায়ণচন্দ্রকে এক বিধবা মেয়ের সঙ্গে বিয়েও দিয়েছিলেন। অথচ এখনো আমাদের সমাজ বিধবা বিবাহ কিংবা বিধবাদেরকে একটু হীন চোখে দেখে, যা সত্যি দুঃখজনক।

এমন অনেক বিধবা মায়েরা আমাকে কল করে বলেছেন-
তারা শারীরিক দিক থেকে অসুস্থ। অম্বুবাচী ব্রত করতে অক্ষম। তথাপি তাদের পরিবার কিংবা সমাজ শাস্ত্রের দোয়াই দিয়ে তাদেরকে হীন চোখে দেখছে, বিধবাদের নাকি করতেই হবে!

#এরকম_আচরণ_কি_শোষণ_নয় ?

তাই আমাদের কুসংস্কার থেকে বের হয়ে আসতে হবে।
এটা প্রত্যেকের ব্যক্তিগত বিষয়। করতে হবে এমন কোন বাধ্যবাধকতা নেই। অম্বুবাচীর যথার্থ অর্থ না বুঝে আমরা যেন বিধবাদের শোষণ না করি।

অম্বুবাচীতে কাপড় ধুয়া যাবেনা এই নিয়ে কত জল্পনা কল্পনা।

#সহজ_কথা- কাপড় চোপড় ধুতে গিয়ে অনেক সময় কাপড়ের ময়লা ছাড়াতে পাথরে কাপড় আঘাত করা হয়, তাতে ধরণীমাতা কষ্ট পান এই অনুভূতিতে আমরা কাপড় ধুই না। এখন আমরা যদি পাত্রে হুইল, সাবান বা বিভিন্ন পাউডার দিয়ে সতর্কতার সঙ্গে কাপড় ধুই, তাহলে সমস্যা কোথায়?

অম্বুবাচীতে [৩ দিন] ধরণী মায়ের প্রতি আমাদের ভালোবাসা উথলে পড়ে। অথচ সনাতন ধর্মের এক তৃতীয়াংশ লোক আমরা ঘুম থেকে উঠে ধরণীমাতাকে প্রণাম পর্যন্ত দেইনা। কিংবা ধরণীমাতার প্রণাম মন্ত্র পর্যন্ত জানিনা। ধরণীমাতাকে কত নিষ্পেষণ করি। ধরণীমাতার প্রতি সম্মান পোষণ যেন তিন দিন-ই আমাদের সীমাবদ্ধ না থাকে। ধরণী মাতা সব সহ্য করতে পারেন কিন্তু অধার্মিকের বিষাক্ত নিশ্বাস সহ্য করতে পারেন না।

তাই আমাদের সবাইকে #ধার্মিক হতে হবে, তবে #ধর্মান্ধ নয়!

আসুন আমরা এই অম্বুবাচীর [৩ দিন] ধরণী মাতা কষ্ট পান এমন কোন কাজ যেন না করি, আর এই অম্বুবাচী থেকে শিক্ষা নিয়ে ধরণীমাতার প্রতি সম্মান এবং শ্রদ্ধা সব সময়ের জন্য বর্ধিত করি।

অম্বুবাচীর নামে যে কুসংস্কারে আমরা এখনো আটকে আছি, তা থেকে বের হয়ে আসি।

#অনন্তকোটি_প্রণাম_ধরণীমাতার_চরণে

সমুদ্রে মেখলে দেবী পর্বত-স্তনমণ্ডলে।
বিষ্ণুপত্নি! নমস্তুভ্যং পদস্পর্শ ক্ষমস্ব মে।।

[অনুগ্রহ করে প্রবন্ধটি শেয়ার করে সবাইকে জানিয়ে দিন]

[#রাহুল_কৃষ্ণ_দাস]

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে